সুপারহিরো তো দূরের কথা, হিরোই হওয়ার কথা ছিল না তাঁর। তিনি যে হরিপদ, হরিপদ কেরানি। মেসবাড়িতে একা থাকেন। বন্ধুবান্ধব নেই, আত্মীয় নেই। আত্মীয় আর বন্ধু আছে কজন, যাদের খবর আমরা জানতাম না। পিপলি নামে এক পিঁপড়া আছে, হরিপদ অফিস চলে গেলে ওর ভীষণ মন খারাপ হয়। আছে দারুণ জ্ঞানী এক ধেড়ে ইঁদুর-নেপাল। আছে আলাভোলা তেলাপোকা তেচু। আছে ভুলু- সবকিছু ভুলে যান বলে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বোধ হয় তিনিই। আর আছে পরি। পরির মতোই দেখতে মেয়েটার ভীষণ অসুখ। অনেক টাকা লাগবে। হরিপদ ভাবেন, একদিন তাঁকে চমকে দিয়ে ব্রিফকেসভর্তি টাকা কেউ রেখে যাবে ঘরের দুয়ারে।
হরিপদ জানতেন না, এর চেয়েও বড় চমক অপেক্ষা করছে। একদিন হরিপদের দুয়ারে হাজির হয় সেই আগুন্তকেরা, যাদের বড় বড় গোল চোখ। হরিপদ কেরানিকে যারা মনে করে, এই তো সেই সুপারম্যান।
যদিও বইয়ের কোথাও লেখা নেই এই বইটা কম বয়সীদের, তারপরেও প্রচ্ছদ দেখে একটা ধারণা করা যায় এবং খানিকটা পড়লে তো বটেই। লেখকের প্রথম উপন্যাস। প্রথম উপন্যাসটাই বাচ্চাদের জন্যে। একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত কেরানি, হরিপদ; তার আশেপাশে কয়টা বিচিত্র চরিত্রের মানুষ। একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে পরি, যে কি না ভয়ানক এক রোগে আক্রান্ত হয়ে আছে। আর কয়টা ইঁদুর তেলাপোকা এবং পিঁপড়া... যাদের সাথে এই ভদ্রলোকের যোগাযোগ হয় একরকম। প্রচন্ড নিয়মানুবর্তী, সৎ এবং সাধারণ একটা মানুষ। হরিপদ তার প্রতিবেশী ঐ বাচ্চা মেয়েটার অসুখ নিয়ে প্রচন্ড চিন্তিত থাকেন। কিছু একটা করার কথা ভাবেন। এই হরিপদ কোন এক সকাল বেলা অফিস যাবার পথে তার ঘরের পিঁপড়ার সাথে কথা বলতে যেয়ে দেরী করে ফেলেন, এবং ফলস্বরূপ অফিস যেয়ে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিব্রত একটা অবস্থায় পড়ে যান। মানুষের ব্যাপারে তার হতাশাজনক ধারণা যখন প্রচন্ড তখন ভিনগ্রহের কোন এক সত্তা তার সাথে যোগাযোগ করে, আর তারা তাকে একজন সুপারম্যান অথবা সুপার-হিউম্যান হিসেবে চিহ্নিত করে। যার মন কি না ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। হরিপদ, সেই সাধারণ হরিপদ তখন এই পৃথিবীটাকে ভালোবাসায় পূর্ণ করে তুলতে চান, একই সাথে পড়েন নানাবিধ জটিলতায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভবত ভালোবাসার জয়ই হয়।
আসলে এটাকে উপন্যাস বলা ঠিক হবে না, নভেলা বলাটাই ভালো। খুব বেশি সময় লাগেনি পড়ে শেষ করে ফেলতে। আর পড়তে যেয়ে একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে আংশিক আংশিক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখা পড়ছি। একেবারে শুরু দিকটায় মনে পড়ে গিয়েছিল টুকুনজিলের কথা, মাঝের বেশ অনেকগুলো জায়গায় ক্রমান্বয়ে সায়রা সায়েন্টিস্ট, সফদর আলী কিংবা অনিক লুম্বার কথা মনে পড়ে গেছে। গল্পটা খুব আহামরি না। নিয়মিত বই পড়ে এমন কোন সদ্য কিশোর হওয়া বাচ্চার কাছে যদিও বইটা এই কাহিনী নিয়েই উৎরে যাবে বলে আমার ধারণা। তবে যেহেতু বইটা বিভিন্ন কারণে আমার কিংবা কাছাকাছি মানুষের পড়া হয়েছে, হচ্ছে বা হবে... সেহেতু তাদের কাছে গল্পটা বড্ড সাদামাটা মনে হতে পারে। বইয়ের প্রতিটা চরিত্রকেই লেখক বিশেষণের সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে গেছেন। প্রচন্ড সৎ, প্রচন্ড ভালো মানুষ, প্রচন্ড মিথ্যাবাদী, প্রচন্ড ভুলোমনা... ব্যাপারটা খুব দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। আর পুরো বইজুড়েই লেখক পৃথিবীতে মানুষের জীবন নিয়ে নিজস্ব দর্শন বলে গিয়েছেন। একটা লেখাই সম্ভবত লেখকের দর্শন প্রকাশের সবচাইতে চমৎকার মাধ্যম, তবে কি না বাচ্চাদের জন্যে লিখে ফেলা একটা বইয়ে এমনটা কতটা মানানসই, সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন থাকতে পারে। একই কথা বলতে হয় গল্পে আবেগের অতিশায্য নিয়ে। ছোটদের জন্যে লেখা কোন বইয়ে এতটা আবেগ থাকাটা খুব বেশি জরুরী কি?
তারপরেও লেখকের প্রথম প্রচেষ্টা... ছোটদের জন্যে এইসময়ে খুব বেশি লেখাও হয় না। এইজন্যে লেখক ধন্যবাদ পেতে পারেন। তবে আশা করব, আবার ছোটদের জন্য লিখলে তিনি গল্প বলায় জোড় দেবেন, দর্শন বলায় না। সুযোগ থাকলে আড়াই আমি আড়াই অর্থাৎ ২.৫ দিতাম... কিন্তু গুডরিডসে আড়াই দেয়া যায় না এবং বেনিফিট অফ ডাউটে প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে তিন তারকা দিয়ে দেয়াই যায়।
এডিট: তিন তারকা দেয়াটা বেশিই হয়ে যায়। অনেকদিন ধরেই মনে ছিল, কিন্তু বদলানো হচ্ছিল না। তাই দুয়েই ভালো থাকুক!
প্রথমার বই সাধারণত এত নিম্ন মানের হয় না। বইটা কিনি নি। পুরস্কার পেয়েছিলাম। তাই অর্থের অপচয় বলতে পারব না। গল্পের বলার ভঙ্গিতে মাঝে মাঝেই হুমায়ূন আহমেদ বা মুহম্মদ জাফর ইকবালের অবিকল নকল এসেছে। একজন লেখকের স্বাতন্ত্র্য থাকা উচিত। আর কাহিনি তো প্রায় হুমায়ূন আহমেদীয় মনে হচ্ছে। হুমায়ূনের 'পোকা' বলে একটা উপন্যাসে প্রায় একই রকম কাহিনি দেখেছি। পটভূমিটা নির্বাচনও লেখক কষ্ট করে নিজে থেকে নির্বাচন করতে চাননি। সময়ের অপচয়। বই নির্বাচনে প্রথমার আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
অন্যসব দিনের মত সেদিনও হরিপদ লোকাল বাস ধরে রওনা দিয়েছিল অফিসে। বাস ছাড়তেই দেখে কখন যেন পিপলিও সাথে চলে এসেছে। এখন ওকে একলা রেখে তো আর অফিসে যাওয়া যায় না। অগত্যা আবার বাসায় ফিরতে হল।
পিপলিকে চিনলে না। পিপলি।।।
একটা ছোট্ট পিপড়া। হরিপদর অনেক আদরের পিপড়া। আরো আছে তেচু, নেপাল আর ফুডুক্কু। চিনলে না তো? পিপলি, ধেড়ে ইদুর নেপাল আর পাঁচপেয়ে তেলাপোকা তেচুকে নিয়ে হরিপদর সংসার। আর আছে উপর তলার ছোট্ট মেয়ে পরী। সত্যিই যেন একটা ফুটফুটে পরী।
কিন্তু কঠিন এক অসুখে আক্রান্ত ছোট্ট মেয়ে পরী। অনেক অনেক টাকা লাগবে তার চিকিৎসায়। তবুও কি অনাবিল প্রাণোচ্ছন্দে মেয়েটা ভেসে বেড়ায়। হরিপদর কাছে তার একমাত্র দাবি একটা পিঙ্ক কালারের নেলপলিশ। আর কিচ্ছু চাইনা তার।
সরকারি অফিসের সামান্য কর্মচারী হরিপদ। চুপচাপ কাজ করে আর একলা একলা বাসায় সময় কাটায়। তার আশেপাশের চরিত্রগুলো একেকটা একেকরকম। ভাল মন্দে মিলিয়ে কেটে যাচ্ছিল হরিপদর জীবন।
এরপর একরাতে ঘুমিয়ে পড়ার সময় তার চোখের পর্দায় কী একটা উজ্জল আলো এসে পড়ল। এই আলোতে ঘুম তো ভাঙ্গলোই না বরং আরো আমেজে ঘুমিয়ে পড়ল হরিপদ।
ঘুম ভেঙ্গে তার দেখা হল গেলিয়েনদের সাথে। গেলিয়েনরা এলিয়েনদেরই একটা প্রজাতি। তারা সবসময় মানুষের ভাল চায়। তাই তারা তাদের প্রতিনিধি হিসেবে হরিপদকে অতিমানবিয় শক্তি দিয়ে পৃথিবীর ভালোর জন্য পাঠাতে চায়।
এত বড় দায়িত্ব কি নিতে পারবে হরিপদ? আর ক্ষমতাটাই বা কি? কি কাজ করতে হবে তাকে? আর এত সহজেই কি মানুষের সব দুঃখ দূর করা যাবে?
আমার কথা :
অন্যের রিভিউ পড়ে বই খুব কমই কিনি আমি। এটা অনেকদিন পর নেয়া এমন একটা বই যা আমি এই গ্রুপের একজনের রিভিউ পড়ে নিলাম। হতাশ হইনি।
প্রচ্ছদ থেকে কিশোরোপযোগী মনে হলেও এই লেখা বড়রাও নির্দিধায় পড়তে পারেন। খুব ভাল কিছু সময় নির্মল আনন্দে কাটানোর জন্য খুব উপযোগী।
গেলিয়েন শব্দটা এই প্রথম শুনলাম। এলিয়েন আর গেলিয়েনদের বর্ণনা পড়ে খুব মজা পেয়েছি। "এই গেলি" এই তাচ্ছিল্যকর শব্দটা থেকেই গেলিয়েন শব্দের উৎপত্তি। আর তারা বাস করে অন্ড্রোমিতা গ্যালাক্সিতে, এন্ড্রোমিডা নয় কিন্তু।
লেখক অত্যন্ত যত্নের সাথে যে ছবি আকঁতে চেয়েছেন তা করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। হরিপদের মধ্য দিয়ে লেখক নিজের পিতৃ সত্তার কিছুটা প্রকাশ ঘটিয়েছেন, নিজের প্রথম লেখায় তা করা যথেষ্ট শক্ত।