বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিকের আবির্ভাব সেই ষাটের দশকের গোঁড়া থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ব্যান্ডগুলো কিভাবে শুরু হল, সেই গল্প থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাদের নতুন করে জেগে ওঠার গল্প, আশির দশকে ব্যান্ড মিউজিকের উত্থান আর নব্বইয়ের স্বর্ণযুগ; এসবই স্থান পেয়েছে এই উপন্যাসটিতে। পাশাপাশি থাকছে এক কিশোর শ্রোতার সংগীতজগতের খুব কাছাকাছি থেকে বেড়ে ওঠার গল্প। এসব কিছুকেই কেন্দ্র করে "রক যাত্রা"।
রক যাত্রা! নামটা দেখার সাথেই বুঝেছিলাম, ভেতরে যা-ই থাক, কিনতে হবে, পড়তে হবে। আজ পড়ে ফেললাম, দারুণ লেগেছে! যদিও বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা উপন্যাস, তবে আমার কাছে কিছুটা স্মৃতিচারণা মূলক রচনা মনে হয়েছে। তবে ভীষণ তথ্যসমৃদ্ধ স্মৃতিচারণা। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের "হাঁটি হাঁটি পা পা" করে কিভাবে সূচনা ঘটলো তার দারুণ বর্ণণা দিয়েছেন লেখক স্মৃতিচারণার ছলে। পার্সোনালি ব্যান্ড মিউজিক নিয়ে আগ্রহ থাকায় বইয়ের অনেক কিছুই আগে থেকে জানতাম, সেই সাথে অনেক অজানা বিষয়ও জানা হয়ে গেলো ^_^
বইয়ের শুরুটা হয় বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে একটা গিটার কেনার মাধ্যমে। রকপ্রেমি অথচ গিটার বাজানোর ইচ্ছে হয়নি এরকম খুঁজে পাওয়া দায়। তাই শুরু থেকেই আপন আপন মনে হচ্ছিল বইটা। আর সেইম টেস্টের লিসেনারদের মধ্যে, বিশেষ করে রক মিউজিকের ক্ষেত্রে খুব সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে যায়। গিটার কেনার পর বইয়ে আসে এলিফ্যান্ট রোডের সেই বিখ্যাত "রেইনবো" গলির কথা। বাবার কাছে অনেক শুনেছি, নাজিম ভাইয়ের কাছে আরো ডিটেইলসে শুনেছি,আগে ইংরেজি ব্যান্ডের লং প্লেগুলো পাওয়া যেতো এখানেই, সেখান থেকে ক্যাসেটে রেকর্ড করে দিতো। সেটারই একটা দৃশ্যকল্প পড়লাম যেন বইয়ে। এরপর ধীরে ধীরে বর্ণনার ছলে বইয়ে উঠে আসে বিভিন্ন ব্যান্ডের গোড়াপত্তন আর এগিয়ে চলার গল্প। রক সম্রাট আজম খান আছেন অনেকটা জুড়ে। তারপর ধীরে ধীরে রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেজ সহ হেভি মেটাল ব্যান্ডগুলোর গোড়ার কাহিনী, অ্যালবাম রেকর্ডিং এর কাহিনী। তখনকার কনসার্টের বর্ণনাগুলো পড়ে ভীষণ শিহরিত হয়েছি। আফসোসও হয়েছে, এখন আর সেরকম কনসার্ট হয় না। আশি নব্বই দশকের ভিন্টেজ স্বাদ, তখনকার মিউজিক কালচার নিয়েও জানা যাবে অনেক কিছু।
তবে কিছু কিছু জায়গায় একটু ব্যান্ডগুলোর ইতিহাস নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত ভাবে, গল্পের ছলে বলা যেতো। একটু যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিলো বর্ণনা সেখানে। তবে ওটুকু কনসিডার করাই যায় :) পরবর্তী বইয়ে লেখক আরেকটু খেয়ালী হবেন আশা করছি।
আমাদের দেশে মিউজিকের ওপর বই প্রায় নেই বললেই চলে, সেখানে এরকম একটা প্রয়াস অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। আশা করছি লেখকের রক যাত্রা অব্যাহত থাকবে। অনেক শুভকামনা।
রক যাত্রা - বইয়ের বিষয়বস্তু বোঝার জন্য আসলে নামটাই যথেষ্ট! গল্পের তালে তালে বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাস-ই রকযাত্রা বইটির মূল উপজীব্য। হাজার বছরের পুরনো আমাদের বাংলার সংস্কৃতি; বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া মুর্শিদি, জারি সারি গান আমাদের জীবনের সাথে মিশে আছে, সেই সাথে আমাদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে এসেছে চিরকাল ধরে। সংগীত জিনিসটা আমাদের কাছে নিছক শখ নয়; প্রকৃতি, যাপিত জীবন, অন্তরের গহীনের আবেগ অনুভূতি সব কিছুর পরিপূর্ণ মিলনেই জাতিগত ভাবে আমাদের সঙ্গীত প্রেম।
আজ থেকে চল্লিশ/পঞ্চাশ বছর আগে দেশের সঙ্গীত জগতে এক বিপ্লব ঘটেছিল। আশির দশকে পাশ্চাত্য ধারা থেকে কীভাবে ধীরে ধীরে নিজস্ব আমেজে আমাদের দেশে সবার মন জয় করে নিয়েছিল রক মিউজিক, সীমিত পরিসরে অথচ পর্যাপ্ত তথ্য সহকারে দারুণ গোছানোভাবে বর্ণ্না করা হয়েছে সেই ইতিহাস। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে যে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, তা সুগম ছিল না মোটেও। সম্পূর্ণ ভিন্নধারার, ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গীতকে সহজে মেনে নিতে চায়নি অনেকে। বহু কাঠখড় পেরিয়ে একাধিক গানপাগল তরুণদের সংগ্রামী প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিতি পেয়েছিল রক মিউজিক। রক যাত্রা আমাদের সেই গল্পই শুনিয়েছে। পপ সম্রাট আজম খান থেকে শুরু করে রকস্ট্রাটা, মাইলস, এলআরবি, আর্ক, জেমস, ওয়ারফেজ - বিস্তৃতি থেকে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জনের পেছনের গল্পটা এখানে ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে।
সেই সময়টায় আবার বিদেশি ক্যাসেট পাওয়াটাও বেশ দুষ্কর ছিল। এলিফ্যান্ট রোডের বিখ্যাত "রেইনবো" গলি ছিল তখনকার গান পাগলদের তীর্থস্থানের মতো। সেই ভিন্টেজ বর্ণনাও ধরা দিয়েছে রকযাত্রার পাতায়।
রক যাত্রা শুধু ইতিহাস নয়, গান পাগল এক কিশোর মিলনের গল্পও বটে। প্রথম গিটার কেনা , প্রতিভাবান মিউজিশিয়ানের সাহচর্য লাভ, দৌড়ঝাপ করে পছন্দের শিল্পীদের অ্যালবাম জোগাড় করা, বন্ধুদের সাথে গান নিয়ে আড্ডা তর্কে মেতে ওঠা - কতশত আনন্দ অভিজ্ঞতা জীবন্ত রঙিন হয়ে উঠেছে বইয়ের সাদাকালো ক্যানভাসে। আহা!
#কিছু ব্যাক্তিগত স্মৃতিচারণঃ (কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক)
কিশোর বয়সে যখন প্রথম প্রথম রক-মেটাল মিউজিক শুনে রক্ত গরম হয়ে যেত- পাগলের মত এদিক ওদিক থেকে সিডি সংগ্রহ করার চেষ্টা করতাম তখন। এখনকার মত সহজলভ্য ইন্টারনেট ছিল না তখন; যেদিক থেকে যতটূকূ পারি তথ্য যোগাড় করাটা একটা নেশার মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পিঙ্ক ফ্লয়েড,কুইনস, গানস এন্ড রোজেস, আয়রন মেইডেন, লেড জেপলিন- শুধু গান শুনলেই হবে না! ডিস্কোগ্রাফি জেনে, লাইভ কনসার্ট এর ভিডিও সংগ্রহ করে মিউজিশিয়ানদের ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত সবকিছু জানা থাকতে হবে। স্কুল,কোচিং,বাসা, আড্ডা - সবজায়গায় শুধু একটাই ধ্যান-জ্ঞান থাকত। কার কাছে কোন সিডি আছে, নতুন কী রিলিজ হল, পেন ড্রাইভে করে কার থেকে পুরো ডিস্কোগ্রাফি পাওয়া যাবে... কত সময় কেটেছে গান শুনতে শুনতে রীতিমত পাল্লা দিয়ে লিরিক্স মুখস্থ করাবার চেষ্টায়.. নিউমার্কেট-নিলক্ষেত দৌড়াদৌড়ি করে আয়রন মেইডেন,মেটালিকা, জিম মরিসনের পোস্টার জোগাড় করেছি, সেই পোস্টারে ঘর ভরিয়ে দেয়ালের পলেস্তারা খসিয়ে বাসায়বকুনি খেয়েছি, আবার পরম যত্নে ভাজ করে রেখেছি বিছানার নীচে! সেই দিনগুলো কী ভোলা যায়??
এদিকে ওয়ারফেজ, আর্টসেল,ভাইব,ব্ল্যাক,শিরোনামহীন আরো কত রকম মাথা খারাপ করে দেয়া বাংলা রক/মেটাল মিউজিকের সম্ভার। নতুন এলবামের খবর শুনে সবাই মিলে কত ছটফট করেছি, টিফিনের টাকা জমিয়ে দৌড়ঝাপ করে কিনেছি মিউজিক এলবাম। আহা! রকযাত্রার পাতায় পাতায় সেই নস্টালজিয়া খুব তীব্র ভাবে ভুগিয়েছে!
মিউজিকের প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকে স্কুল-কলেজের বন্ধুরা মিলে একসময় হেভি মেটাল ব্যান্ড লাইন আপ ফর্ম করেছিলাম। কত বিচিত্র সময় কেটেছে শব্দনিরোধক প্র্যাক্টিস প্যাডের আধো আলো আধো অন্ধকার মেশানো রহস্যময় পরিবেশে! দেশি/বিদেশি অসংখ্য মিউজিশিয়ানের দ্বারা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। প্রথম মাইকের সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাকে আমি কিছুটা অতিপ্রাকৃত অনুভূতিই বলব। বিদেশ থেকে আনানো বন্ধুর দামী জ্যাকসন গিটারে হাত বুলানোর সময় শরীরের ভেতর বিদ্যুত খেলে গিয়েছিল, এখনও মনে আছে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে সেই ব্যান্ড আর টিকে থাকেনি। প্রাশোনা,ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত জীবন সব মিলিয়ে একেকজন ছিটকে পড়েছে একেকদিকে; তবুও সেই স্মৃতি রোমন্থন করেই কাটিয়ে দেয়া যায় এক জীবন।
আবার বাড়ি পালিয়ে বন্ধুদের সাথে রক কনসার্টে যাওয়ার স্মৃতি, তাও ভোলার নয়। ধোয়াঘেরা ঝকমকে লাইটিং এর সাথে গিটারের গর্জন, উন্মাদের মতো হেড ব্যাং করে এক সপ্তাহ ঘাড়ের ব্যথায় ভুগে দুইবেলা প্যারাসিটামল খাওয়া! সত্যিই, আমাদের চেয়ে বেশি গানপাগল প্রজন্ম কী আদৌ সম্ভব?
রকযাত্রা সেই স্মৃতিকে জীবন্ত করে তুলে ধরেছে চোখের সামনে, মনের গভীরে। মিলনের চরিত্রে নিজেকেই খুঁজে পেয়েছি, পরিচিত পরিবেশে পরিচিত জগতে ঘুরে বেড়িয়েছি - এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। চমৎকার টাইম ট্রাভেলের অভিজ্ঞতা উপহার দেবার জন্য লেখককে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
#যা ভালো লাগেনিঃ
বইয়ের খারাপ দিকটা হচ্ছে গল্পের খাপছাড়া ভাব। স্বল্প পরিসরে অধিক তথ্য আঁটানোর কারণে মনে হয়েছে এর চেয়ে বরং নন ফিকশন হলেই বোধহয় ভালো হত। কাহিনীটা ঠিক জমে ওঠেনি অনেকাংশে।
বইয়ের ভূমিকায় ইঙ্গিত পেয়েছি, সামনে এধরনের আরো বিষয়ে লেখার ইচ্ছা আছে লেখকের। আশা করছি আরও সাবলীল ভাবে বড় পরিসরে এধরনের উপ্ন্যাস/গল্প উপহার দেবেন তিনি।
রক মিউজিক ভালবাসেন আর নাই বাসেন, রক যাত্রা আপনাকে রোমাঞ্চকর এক যাত্রার অভিজ্ঞতা দেবে - এ কথাটা জোর গলায় দাবী করতে পারি।
দেশের রক মিউজিকের ইতিবৃত্ত নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ চমৎকার এক বই 'রক যাত্রা'। ব্যক্তিগতভাবে আমি গানবাজনার তেমন ভক্ত নই, তবুও খুব ভাল্লাগেছে পড়তে। সেই ষাটের দশক থেকে শুরু করে কীভাবে ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রবেশ ঘটল আমাদের দেশে, তারপর ধীরে ধীরে গড়ে উঠল আমাদের নিজস্ব রক সংস্কৃতি ও ইতিহাস, কীভাবে রক মিউজিক মিশে গেল আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে, কীভাবে গড়ে উঠল রকমিউজিকপ্রেমী জেনারেশন—এর সবকিছুই চমৎকারভাবে উঠে এসেছে বইটিতে।
রক মিউজিকপ্রেমী আর বইপ্রেমীদের মাঝে দারুণ এক মিল আছে। বইপ্রেমীরা সেমন স্রেফ বইয়ের সুবাদেই, বই নিয়ে কথা বলতে বলতেই পরিণত ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে, তেমনি রক মিউজিকপ্রেমীরাও গান শুনতে শুনতে, রক গান নিয়ে কথা বলতে বলতে পরিণত হয়েছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে! 'রক যাত্রা'য় উঠে এসেছে কিংবদন্তী আজম খান থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রায় সব লেজেন্ডারি ব্যান্ডের গঠনপ্রক্রিয়ার কথা। বাংলা গানের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ব্যান্ড মিউজিক কীভাবে বদলে দিয়েছে বাংলা ভাষার শ্রোতাদের রুচি, কীভাবে তাদের দিয়েছে নতুনত্বের স্বাদ, সেইসব কথাও এসেছে খুবই স্বাভাবিকভাবে। এসেছে কীভাবে কনসার্টের প্রচলন শুরু হলো বাংলাদেশে, সেই কথা। সেইসব কনসার্টের উন্মাতাল দিনগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে উঠেছে একের পর এক।
বইটিকে লেখক উপন্যাস হিসেবে পরিচয় দিলেও আসলে স্মৃতিচারণমূলক। বইটিকে উপন্যাস হিসেবে লেখার চেষ্টা না করে স্রেফ ননফিকশন হিসেবে লিখলেই মানানসই হতো বলে মনে হয় আমার। লেখনীও একটু দুর্বল মনে হয়েছে—যেন ঠিকমতো ঘষামাজা করার সময় পাননি লেখক। এই ধরনের বই দীর্ঘ পরিশ্রম ও সময় দাবি করে লেখকের কাছ থেকে। আরও দীর্ঘ পরিসরে হতে পারত বইটি।
এইসব খামতি বাদ দিলে আদ্যন্ত উপভোগ্য এক বই 'রকযাত্রা'। আমার মতো গান-টানে নিম-আগ্রহী মানুষও যেহেতু খুব আগ্রহ নিয়ে দেড় বসায় পড়ে ফেলেছে বইটা, তাহলে মিউজিকে আগ্রহী পাঠকদের জন্য যে বইটা একটা রসগোল্লা সেটা বেশ সহজেই অনুমেয়।
মিলু আমানের ‘রকযাত্রা’ আমাকে ছোটবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আগেই স্বীকার করে নেই, আমি পশ্চিমা সংগীতের জনরা সম্পর্কে পুরোপুরি মূর্খ। এমন একজন মানুষের আসলে বাংলাদেশের রক মিউজিক নিয়ে লেখা কোন বই সম্পর্কে খুব বিশদ আলোচনা করা সাজে না। সুতরাং, এই লেখাটিকে কঠিন বা মৃদুমন্দ সমালোচনার চেয়ে পাঠমুগ্ধতা প্রকাশের জন্য লিখিত একটি পোস্ট হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয়।
যা বলছিলাম, তাতে ফিরে যাই। আমার ছোটচাচার ছিল ক্যাসেটযুগে ব্যান্ড মিউজিকের নেশা। আম্মু আধুনিক বাংলা গান ও পুরানো হিন্দি শুনতেন। বাবা ইংরেজীও শুনতেন। রাঙাফুফু আর ছোটফুফু ছিল সুমনা হকের গানের পাগল। এর বাইরে ছোটবেলায় আর কিছু শোনা হয় নি। ছোট বলতেও বেশ ছোট, ষষ্ট শ্রেনীও পেরোয় নি। সব মিলিয়ে ‘রকযাত্রা’ পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, ভাগ্যিস, চাচু এসব শুনিয়েছিলেন! নাহলে বড় হয়ে নিজে এসব গান শুনলেও মনে গেঁথে থাকার বিষয়টি যেহেতু মধুর কোন স্মৃতির সাথে সম্পৃক্ত, পড়তে গিয়ে নিজেকে একেবারে দলছুট মনে না হওয়ার মধ্যে একটা স্বস্তি পাচ্ছিলাম। আসলে, লেখকের পরিবার থেকে গানের প্রতি ভালোবাসাটুকু কিভাবে তার মধ্যে প্রবেশ করেছে তা পড়তে পড়তে আমার ধারণা সব পাঠকই নিজের ছোটবেলায় উঁকি দিতে বাধ্য হবেন। ‘ ‘রকযাত্রা’ বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের সূচনা থেকে আরম্ভ করে এদের উত্থান পতনের গল্প ও শুরুর পর একেক যুগে দেশ, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতির সাথে এদের পাল্টে যাওয়া চরিত্রের কথা খুব যত্নের সাথে তুলে ধরেছে। লেখক আত্মকথনের আশ্রয় নিয়ে নিজের সময় থেকে বের হয়ে অতীত ও ভবিষ্যতে পাঠককে পরিক্রমন করিয়ে আবার তার সময়টিতে ফিরিয়ে নিয়ে গল্পের ইতি টেনেছেন। বইটি যতো না ব্যান্ড সংগীতের কথা বলেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বলেছে এদের পাগলা শ্রোতাদের কথা। একটি ক্যাসেট বের হওয়া ও তা নিয়ে সবার মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা পাঠকদের জন্য কল্পনাতীত। একারনে এই বই আরো টানে, কারন, আপনাকে এটি এমন এক অতীতে নিয়ে যায়, যা নিয়ে খুব বেশি বাংলা সাহিত্যে এখনো লেখা হয় নি। আশি-নব্বই দশক নিয়ে প্রচুর গল্প উপন্যাস থাকলেও বাংলাদেশের ব্যান্ড সিনারিও নিয়ে কখনোই ঐ সময়ে লেখা সমসাময়িক ফিকশন বা নন ফিকশন লেখার চেষ্টা করা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। হলেও এরকম সাধারণ পাঠকদের কথা মাথায় রেখে লেখা হয়েছে কিনা জানি না।
খুব সহজ গদ্য হলেও ‘রকযাত্রা’ এর গদ্য ঠিক অলস নয়। লেখক সদ্য এসএসসি পাশ করে একটি গীটার কেনার পাঁয়তারা করা নিয়ে গল্প শুরু। এরপর তা নানা পথ ঘুরে কখনো রেইনবো গলিতে, কখনো নিলয়দার কাছে গীটার শেখার আড্ডায়, আবার কখনো একেবারে কনসার্ট শুনতে গিয়ে মাথায় কাঁচের বোতল ভাঙা পর্যন্ত ঘটনার ঘনঘটায় আমরা বুঁদ হয়ে থাকি। জানতে থাকি আজম খান থেকে শুরু করে মাইলস, এলআরবি, ওয়ারফেজ সহ আরো অনেক ব্যান্ডের শুরুর কাহিনী। খুব ভালো লাগে বইয়ের শেষটা! এক ধরনের পরিপূর্নতা পায় রকযাত্রীরূপী লেখকের আখ্যান।
‘রকযাত্রা’ হয়তো শব্দের খেলায় অভ্যস্ত পাঠককে আসক্ত করবে না, কিন্তু, লেখকের সততা, এই বিষয় নির্বাচন ও তা নিয়ে লেখার ইচ্ছা ও তাগিদের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি করবে। আমি মিলু আমানের আরো দুটি বই ‘ফ্লয়েডিয়ান’ ও ‘গানের মিলন’ পড়তে আপাতত আগ্রহী। আশা করছি মিউজিক নিয়ে তিনি আরো লিখবেন যা এই বিষয় নিয়ে লিখতে আরো অনেক লেখককে উৎসাহী করবে।
যদিও ফ্ল্যাপ অনুযায়ী বইটা একটা উপন্যাস, আমি ৮২ পৃষ্ঠার ছোট বইটাকে তথ্যসমৃদ্ধ স্মৃতিকথাই বলবো। বইয়ে লেখক তার আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে তুলে আনতে চেয়েছেন বাংলাদেশের রক মিউজিকের স্বর্ণযুগের সময়টা। কৈশোরে বাসায় লুকিয়ে মায়ের থেকে টাকা নিয়ে প্রথম গিটার কেনা, বাবার ভয়ে লুকিয়ে গিটার শেখা, ভাইবোন আর বন্ধুদের মাঝে নান স্বাদের গান নিয়ে বিভিন্ন ঘটনার মতো মজার মজার ব্যাক্তিগত ঘটনার পাশাপাশি সে সময়ের এলপি আর ক্যাসেট সংগ্রহের নেশা, এলিফ্যান্ট রোডের বিখ্যাত রেইনবোর গলি, সে সময়ের কিংবদন্তীতুল্য ব্যান্ডগুলোর অ্যালবাম রিলিজ আর ঐতিহাসিক কিছু কনসার্টের মতো বিষয়গুলোও উঠে এসেছে বইয়ে। তাই এই���িজ আর নাইন্টিজের সময়টার ভিন্টেজ স্বাদটাও পাওয়া যায় বেশ ভালোভাবেই। এছাড়া ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসও আছে, পূর্বক ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর ব্যান্ডগুলোর জেগে উঠার গল্প, আশি আর নব্বইয়ের স্বর্ণযুগে রক মিউজিকের উত্থানের ইতিহাসটাও লেখক কিছুটা জানিয়েছেন পাঠকদের।
বইটা ছোট, একবসাতেই শেষ করে ফেলা যায়। মিউজিকের ইতিহাসের অংশগুলো শুধু আউড়ে না গিয়ে আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে ভালোলাগতো, সে ক্ষেত্রে বইটা আয়তনে আরও বড় হতে পারতো।
আমাদের সাহিত্যে মিউজিক নিয়ে এরকম বই বেশি নেই। বইয়ের ভূমিকায় লেখক আগামীতে বর্তমান ব্যান্ডগুলো ও মিউজিক নিয়ে লেখার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। তাই আশা করবো আরও অভিজ্ঞ হাতে তিনি মিউজিকনিয়ে আরও ভালো একটা বই উপহার দিবেন।
চরিত্রগুলো বাস্তব কিন্তু ঘটনা কাল্পনিক। এখানে আছেন এক নিলয়দা, আছে এক রেইনবোর গলি আর আছে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থার কারিগরদের শুরুর গল্প। যেই কারিগরদের কাউকে ভবিষ্যতে NAAM এ আমন্ত্রন করা হবে। বিশ্বখ্যাত মিউজিশিয়ান স্টিভ ভাই তার সাথে অ্যালবাম বের করবেন। আছেন একজন নিলয়দা যিনি পাদপ্রদীপের পেছনে থেকেই সাধনা করে যাবেন সংগীতের। যার লেগ্যাসি মাতাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। স্বাগতম পাঠক।
সেকেন্ড টাইম পড়তে যেয়ে কিছু জিনিস চোখে পড়েছে যেটা প্রথমবার পড়েনি। এটাকে উপন্যাস হিসাবে ক্লাসিফিকেশন করলেও সেলফ-ইনসার্ট আর হিস্টোরিক্যাল ফ্যাক্টস প্রশ্ন তুলে কতটুকু ফ্যাক্ট আর কতটুকু ফিকশন? এছাড়া প্রুফে কিছু ভুল ছিলো। এটা পাবলিশারের দায়ভার। কিন্তু এই সেমি রিসার্চ পাবলিকেশনকে পুরো ইতিহাস বেসড করলেই ভালো হত আরো বলেই আমার মনে হয়
বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাস নিয়ে বই। বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। লেখক গল্পের ছলে আত্নকথাই তুলে দিয়েছেন বইতে। তবে খুব বেশি খাপছাড়াবভাবে। এখান থেকে এক খাপলা অখান থেকে এক খাপলা। তাছাড়া খুব বেশি ডিটেইলস ও ছিলো না। কিন্তু শুধু ৪ তারা পাবে বইয়ের বিষয় বস্তুর জন্যই।
মিলু আমান ভাইয়ের স্মৃতিসম্ভারের গুপ্তধনগুলি স্রেফ স্মৃতিকথা আকারে লিখলেই মনে হয় ভালো হতো। উপন্যাসের মতো শুরু করে এটার জনরা শিফটিং এমনভাবে হয়েছে যা খুবই খাপছাড়া লেগেছে। এই বইটা আরো দ্বিগুণ হওয়া উচিত ছিল আকারে। চরিত্রগুলির রসায়ন আরো খোলতাই হতে পারত। তবে সবকিছুর পরেও এই বইটা মূল্যবান এবং নস্টালিজিক না হয়ে উপায় নেই।