কেমন ছিল ভুলে যাওয়া নব্বইয়ের দশক? তার সিনেমা, বাংলা সিরিয়াল, তার ফেলে আসা শুকিয়ে যাওয়া লাল পতাকা, তার বন্ধ কারখানা, তার প্রেম, বন্ধুতা আড্ডা? এই কলকাতার কোনও এক আন্ডারগ্রাউন্ড গুপ্তকক্ষে নাকি ঘুমিয়ে আছে ভুলে যাওয়া নব্বইয়ের লেখকদের বইয়েরা। ঘুমিয়ে আছে মুনমুন সেনের এক অ্যাডাল্ট ফিল্ম, যাকে গোটা নব্বই জুড়ে খুঁজতে খুঁজতে একটা প্রজন্ম দুম করে বড় হয়ে গিয়েছিল। আছে মৃত বইয়ের কবরখানা, অপারেশন সানশাইনের রাত আর ঝুপড়িহারা টারজান। এইসব মায়া-টয়া নিয়ে নব্বইয়ের পাতা ওল্টানো আরেকবার। পুরোনো পাতার ভাঁজে হুট করে খুঁজে পাওয়া গুঁজে রাখা পেয়ারা পাতাটি। চিলেকোঠার জঞ্জাল ঘেঁটে খুঁজে পাওয়া এক চিলতে পুরোনো কৈশোর, যেখানে ছাদভর্তি অ্যান্টেনার কাঁটাতার থেকে অন্যমনে ঝুলে আছে এক পশলা অন্য নব্বই। শাক্যজিত ভট্টাচার্যের এই বইয়ে। গুরুচণ্ডা৯ র চটি সিরিজে।
স্মৃতিগদ্যে স্মৃতিকাতরতা এসে পড়াটা স্বাভাবিক আর এসে পড়লে আমার বিরক্ত হওয়াটা আরো স্বাভাবিক ঘটনা। স্মৃতিকাতরতার মধ্যে বর্তমান থেকে পালানোর ও অযথা নিজেকে অসুখী ভাবার একটা প্রবণতা কাজ করে। শাক্যজিৎ আশি ও নব্বই দশকে নিজের শৈশব কৈশোর, সিপিএমের উত্থান পতন ( এ পতনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া), মুনমুন সেনের পর্নো খুঁজতে যেয়ে সে সময়কার সাধারণ ছেলেপিলের মনস্তত্ত্ব, এক ভূতুড়ে বাড়িকে কেন্দ্র করে শ্রমিক তোষণ আর নব্বইয়ের অখ্যাত সব লেখকদের লেখা নিয়ে আলোচনা করেছেন। শাক্যজিতের স্মৃতিকাতরতার মধ্যে গদগদ ভাব নেই, হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে নিষ্করুণ হাহাকার ও সংক্রামক বিষণ্ণতা আছে। ভালো লাগলো পড়তে।
৯৫ সালে জন্ম নেওয়ায় নিজেকে নব্বই দশকের বলে চালিয়ে দিতে খুব বেশি বেগ পাওয়ার কথা না আমার। সাদাকালো টিভিতে অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে হুট করে ঝিরঝির পর্দার দিকে তাকিয়ে তাকার অভিজ্ঞতা আছে অনেক। তখন অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটতো ঠিকই, তবে তার জন্য কর্তৃপক্ষের কেউ দুঃখ প্রকাশ করতো না, আমরাও দুঃখিত না হয়ে বরং অ্যান্টিনার বাঁশ ঘুরিয়ে স্বচ্ছ ছবি আনার চেষ্টা করতাম!
শাক্যজিতের লেখা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তার কলকাতা কেন্দ্রিক নব্বই দশকের স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে বাগেরহাটের অখ্যাত গাঁয়ে বেড়ে ওঠা নিজের শৈশবের কিছু ঘটনার মিল খুঁজে পেলাম। বেশ ভালো লাগলো।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই নব্বই দশক নিয়ে হাহুতাশ চোখে পড়ে প্রত্যহ। কী যুগ ছিল, কী জীবন ছিল—এমন কতশত কথা। সেই নব্বই দশকে বেড়ে ওঠা লেখক নিজের স্মৃতি তুলে ধরেছেন এখানে।
একেক যুগে কিশোরদের বেড়ে ওঠা, বড় হয়ে ওঠার ধরণ আলাদা আলাদা হয়। দশকে দশকে ধরণটা যায় বদলে। আমি যেভাবে বড় হয়ে ওঠতে পেরেছি নব্বইয়ের আড়াই-তিন দশক পর, তার সাথে এর দূরত্ব তাই শত যোজন।
টিউশন থেকে ফেরার পথে দেওয়া চিঠি, নায়িকার পর্ন খুঁজতে যাওয়া, এক রাজনৈতিক আক্ষেপ সাথে আরও বহু স্মৃতি দিয়ে মোড়ানো এই বই পড়তে গিয়ে মুগ্ধ হতে হয় শাক্যজিৎ-এর গদ্যের কাছে।
আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে আমাদের ছেলেবেলা কাটিয়েছি তারা গর্ব করে বলতেই পারি দুই শতকের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের ঝুলিতে। যখন দুহাজার সাল এলো বয়স তখন ১১। অর্থাৎ বোধশক্তি এসেছে যথেষ্টই। শনি রবি টিভিতে কৃষ্ণ , শক্তিমান, রাতে আলিফ লায়লা। গানের ভুবন ভরাতে হাজির ছিল রঙ্গোলি, চিত্রহার আর হাজারো বিচিত্র খবরের ডালি সাজিয়ে রবিবার সক্কাল সক্কাল সুরভী। তবু, সবাই কি আর দেখতে পেত ? পাড়ায় মাত্র দুচারটে বাড়িতে টিভি। রবিবার আঁকার ক্লাস শেষ হতে না হতেই ছুটতাম তাদের টিভির ঘরে। সবাই মিলে গোল হয়ে বসে টিভি দেখতে দেখতে যেই জমে উঠেছে সিরিয়াল ঠিক তখনি ঘেচাং ফু ! লোডশেডিং। বিকালবেলা গোটা তিনেক উইকেট , টেনিস বল আর একখানা ব্যাট নিয়ে দু দলে ভাগ হয়ে হাড্ডা হাড্ডি ম্যাচ যেন শারজায় ভারত পাকিস্তানের লড়াই। সত্যিকারের মাঠে তখন সবে সবে ম্যাজিক দেখতে শুরু করেছে বেহালার এক বাঁহাতি। টিভির মতো পাড়ায় তখন মাত্র কয়েক ঘরেই টেলিফোন। রাত আটটায় ঘোষ বাড়ির জন্য ফোন আসবে , রাত নটায় সরকার বাড়ি। ভালো মন্দ সব খবর গুলো একসাথে ভাগ করে নেওয়া। ক্লাস ফাইভের গন্ডি পার হয়ে যখন সেভেন এইটে উঠলাম খেয়াল হলো গার্লস ইস্কুলের যেসব মেয়েরা একসাথে টিউশন পড়ে তারা শুধুই সহপাঠী নয়। হঠাৎ তাদের মধ্যে বিশেষ কাওকে দেখলে মন কেমন করে ওঠে। একদিন পড়তে না এলে ভাল লাগেনা , অভিমান হয় আর জানতে ইচ্ছা করে কেন সে এলো না। অনেক টানাপোড়েন কাটিয়ে সাহস করে একদিন জানাতে চাই তাকে। একটা কাগজে সেই প্রথম লেখাপড়ার বাইরে কোনো লেখা অনভিজ্ঞ হাতে। আর তারপর উৎকণ্ঠার অপেক্ষা তার উত্তরের জন্য। সেই চিঠির দিন গিয়েছে। মহার্ঘ্য এসএমএসের সময় ফুরিয়ে এখন আমরা হোয়াটসাপের যুগে। কোনো অপেক্ষা নেই শুধু চটজলদি উত্তরের পালা। বিকেলের খেলার মাঠ দখল করেছে দুই তিন তলা নতুন নতুন বাড়ি। এন্টেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সাদাকালো টিভিতে খুব কষ্ট করে ধরতো ডি ডি টু আর কোনোদিন উপরি পাওনা তিননম্বর চ্যানেল বাংলাদেশের বিটিভি। এখন রঙিন টিভিতে ঝকঝকে ছবি আর হাজারো চ্যানেলের অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটে না। এসব লেখা নেই এই বইতে কিন্তু স্মৃতি জ্বলজ্বলে হয়ে ফিরবে এই বইয়ের প্রতিটি পাতা পড়তে পড়তে। বই পড়ে যদি সেসব হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে আসে ভালোতো লাগবেই।
একটা দশক নিয়ে বই লিখতে গেলে কিছুটা অনিবার্য ভাবে চারণভূমি কিছুটা সীমিত হয়ে যায়। প্রথমত, এর একটা ভৌগলিক পরিসীমা এসেই যায়। এই ক্ষেত্রে যেমন কোলকাতা, আরো সবিশষে দক্ষিণ কোলকাতা। এই দশকে ঘটে যাওয়া আরো বৃহত্তর পৃথিবীর নানান ঘটনার উল্লেখ আর তাদের সরাসরি ফেলা আঁচের কথা জানা যায় বটে, যেমন বাবরি মশজিদ ভাঙা, ফিল্মের জগত, বিশ্ব অর্থনীতি। কিন্তু এই ঘটনাগুলি এই বইতে মূর্ত হয়েছে একটা বিশেষ এলাকার মানুষদের জীবনে। অর্থাত বৈশ্বিক ঘটনাগুলির তাদপর্য-র খোজ পাওয়া যাচ্ছে ৯০-এর দশকের দক্ষিণ কোলকাতাবাসীর পাড়াতুতো জীবনে। এই অর্থেই এর ভৌগলিক ব্যাপ্তি সীমিত।
স্মৃতিচারণা থেকে উদ্ভুত বিবৃতির আরেকটা অনিবার্য সীমাবদ্ধতা থাকবে কম বেশি, সেটা হলো শ্রেণিগত। যেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলির কথা বলা হয়ে আর তাদের রেখাপাত, সেইগুলি হয় লেখকের নিজস্ব হবে, নয়তো তিনি যেই প্রজন্ম-শ্রেণি-দ্বয়ের প্রতিভূ, তাদের জনমানসে হয়ে থাকবে। এই বইতে ৯০ দশক জুড়ে নানান অপুর্ব মানসিক যাত্রার কাহীনি জানা যায়, গণ-মাধ্যমে যৌনতা প্রকাশের সাথে অভ্যস্ত হওয়া, পরিয়ায়ী পরিবারের মানুষদের আদর্শের সন্ধানে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান, সেই পার্টির অবঠামোর অবক্ষয়, অধিকাঠামোর জীর্ণতা, আর এই সব মধ্যবিত্ত আদর্শবান মানুষদের চোখের আড়ালে পার্টির দুর্বৃত্তায়ন, খোলা বাজার অর্থনীতির সাথে সাথে ভোগ বিলাস আর বৈভবের আকাঙ্খার প্রথম জাগরণ, আর শহরতলিতে শিল্পাঞ্চলগুলির প্রায় অদৃশ্য কিন্তু ধীর গতিতে বিলুপ্তি। কিন্তু এই আবেক্ষণ গুলি, তের সাথে জড়িত ভাবাবেগগুলি, নিঃসন্দেহে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির। অর্থাত ৯০-এর দশক প্রাপ্তবয়স অর্জন করা একটা ছেলে বা মেয়ের চোখে কি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছিল, নতুন কি সম্ভাবনা এনেছিল বা কেড়ে নিয়েছিল, অথবা দৈনন্দিন রুজি রোজগাড়ের ওঠানামায় কোন অদৃশ্য অর্থনৈতিক হাতের ইশারা পেয়েছিল, এই প্রস্নগুলি ��ম্ভবত জনা যাবে না।
তবে কোনো লেখকের দায় নেই, সব শ্রেণি, সব দৃষ্টিকোন বা দেশের সব জনবসতির বাস্তবতা তার স্মৃতিচারণায় আটক করার। আমার মতে একটা স্মৃতিনির্ভর, ব্যাক্তিগত চর্চা স্বার্থক হয় যদি তা ক্ষুদ্রের মধ্যেও বৃহৎ-কে ধারণ করতে পারে। এতেই এর আবেদন সময় আর স্থান অতিক্রম করতে পারে। আমি নিজে ৯০-এ শিশু আর বালক ছিলাম, বড়ও হয়েছি ঢাকুড়িয়ায়। আমার জন্য এই জগতটা অচেনা নয়। এই সময় আর স্থানের সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন কারুর কাছে আখ্যানট কত অর্থময় হবে, তার নিজের চেনা বর্তমানকে চিনতে সাহাজ্য করবে, সেটা নিয়ে আমার খুব কৌতুহল, তবে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আমার নিজের প্রাপ্ত বয়সে অর্জন করা অধারণগুলির সাথে আমার নিরুদবেগ, খেলাধুলার বাল্যকালে ঘটে ঘটনার সাথে অনেক মিলিয়ে নিতে পারলাম। আমার বাবা মায়ের মুখে শোনা নানান হাল-ঘটনা নিয়ে কিছু কিছু আফশোষ, আক্ষেপ বা তৃপ্তির গোড়া খুজে পাওয়া গেল এই দশকে। আমার বড় হয়ে ওঠার শুরুতে আমাদের বাবা-মায়ের নানান আর্থিক বিষয়ে আপোষ আর সুবিবেচনা, আর পরবর্তিকালে যুগের নিয়মে আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, এই ছবিটার সূচনা ৯০-র দশকেই হয়েছে জানতে পারলাম। গড়িয়ায়, বজবজে একালে বন আর জলাশয়ে ভরপুর ছিল জানতে পারলাম। তার সাথে, তাদের অনুপস্থিতির কারণের পিছনে শাসকগোষ্ঠিদের দুর্নীতি আর অবক্ষয় আবার টের পেলাম।
বইটা স্বল্প-দৈর্ঘ্যের, ৮টা পরিচ্ছদে বিভক্ত। প্রথম পরিচ্ছদটা অবতরণিকার কাজ করে, নব্বইয়ের দশক কে ঘিরে লেখকের আবেগ, অনুভূতি আর ৯০-র স্মৃতির সৌধগুলি একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর নব্বইকে পর্যালোচনা করতে হলে কি কি বিচার্য্য বিষয় ওনার মাথায়, সেই পরিকল্পনাটাও এখানেই হয়েছে। বাকি পরিচ্ছদগুলি এই নানান বিষয় নিয়ে প্রসারিত করে লিখেছেন। উপক্রমণিটা থেকে বইটার সুর পাওয়া যায়, ফিরে দেখার আকুতিটা ধরা পরে, যদিও কিছু কিছু জায়গায় অতিরিক্ত ভাবালুতা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
এর পরের পরিচ্ছদ্গুলিতে নব্বইয়ের দশকে সিপিআইএম পার্টির সামাজিক ভূমিকা আর রাজনীতির বিবর্তন, নব্বইয়ের সিনেমায় ক্রমশ যৌনতার আবির্ভাব, নব্বইয়ের দশকের টিভির বিজ্ঞাপনের বৈশষ্ট্য আর তাতে ঘটমান পুজিবাজারের বৃদ্ধির পূর্বাভাস, দক্ষিণ কোলকাতার শ্মসানের পার্শ্ববর্তী শহরতলির পথঘাট আর পরিমন্ডল, শিল্পাঞ্চলের ধ্বংশের শুরু এবং নব্বইয়ের লিটিল ম্যাগাজিন আর অন্যান্য পত্রিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। লেখককের একটা বড় কৃতিত্ব, যে তারতম্য বিহীন একপেশে স্মৃতিচারণা করে তথ্য দিয়ে বোঝাই করেনি। বিভিন্ন বিবৃতি-শৈলি দিয়ে প্রত্যেকটা পরিচ্ছদ রচিত, কখনো বাবার উদ্দ্যশ্যে তীব্র সহানুভুতি, অনুযোগ আর সম্মান মেশানো চিঠির মাধ্যমে রাজনৈতিক ভাঙনের হবি, একটা পিকনিকের কাহীনি থেকে একটা শিপাঞ্চলের ধ্বংসাশেষের প্রমাণ, একটা বর্ণাঢ্য বিজ্ঞাপনের বিবরণ দিয়ে যুগের হাওয়ার ইঙ্গিত্ত, আর খাটের নীচে জমাইত পত্র-পত্রিকাদি খুজে পাওয়ারর মতো নিত্যকার ঘটনার মধ্যে দিয়ে সেই যুগের প্রান্তিক সাহিত্য জগতের হদিস, আর নবারুণের "হার্বারট" নামের অদ্ভুত চরিত্র আর তার জগতকে স্মরণ করে স্মশানবর্তী এয়াকার মোহময় পরিবেশের স্বাদ দিয়েছেন।
বইটা নিয়ে একটা অল্প অনুযোগ হলো, যে অনেক জায়গায় প্রচুর ইউরোপীয় বই থেকে সংলাপ, অথবা কোন উপমান খাড়া করতে সেই বইয়ের কোন চরিত্রদের উলেখ করা হয়েছে। এই ইঙ্গিতগুলি সম্পূর্ণ আমার মাথার ওপর দিয়ে গেছে। ৯০-এর দশক-কে চিনতে হলে নিশ্চই পাঠকদের থেকে রুশ, ফরাসি বা চেক সাহিত্যে অবগতি দাবি করা যায় না। চেনা জগতকে ভালো করে চেনাতে হলে চেনা বা লোকায়ত কৃষ্টির আশ্রয় নেওয়া ভালো, বিনা ভূমিকায়, অথবা যোগসূত্র থাপন না করে ভিনভাষার সংলাপ বসালে উল্টে পন্ডিতি দেখানোর মতো লাগে।
নব্বই দশকের আর ক’জনের মত আমার ছেলেবেলাও ছিল ফ্রেমে বন্দী করার মতন। কি করিনি আমরা? ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে সিডির দোকান দেওয়া, এমনকি সিনেমা পর্যন্ত বানিয়েছিলাম, তাও আবার খুব নাজুক একটা ফিচার ফোনে।
ঝিরিঝিরি টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে রাতভর ঢিস এন্টেনা নিয়ে নাড়াচাড়া। তাছাড়া তখনকার দিনে লোডশেডিং ছিল সবচেয়ে নিয়মিত ঘটনা। অন্ধকার হলেই উঠোনে গিয়ে ভরা জ্যোৎস্না গা’য়ে মেখে হারিকেনের আলোয় ভূতের গল্প শোনার এমন সব দিনে চাচাতো বোনটিকে সঙ্গে করে গোসলের পরে উঠোনে দাঁড়িয়ে বাটি ভ’রে চানাচুর খেতাম। এমন একটা ছবিও আছে যদিও! বরাবরের মতন ছবিখানা দেখলে দু’চোখ ছলছল করে। কারণ ভীষনভাবে স্মৃতিকাতর আমি। ‘অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত’ পড়তে পড়তে আজ বহুদিন বাদে মন কেমন করা সেই নব্বই এর কথা মনে পড়ে গেলো।
আমার গল্পটা আজ না হয় তোলাই থাকুক! এই বইখানা শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণ মূলক লেখনী। দক্ষিণ কলকাতার শহরতলিতে বেড়ে ওঠা লেখকের আট থেকে আঠারো হওয়া নব্বই জুড়ে ঘটে যাওয়া টুকরো টুকরো ঘটনা স্থান পেয়েছে লেখাটিতে। সময়ের নির্যাসে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন সেসময়কার পারিপার্শ্বিক উপাদানসমূহের। তবে স্মৃতির রঙ মনে হয় সর্বদাই হলদেটে, ছেঁড়া খোঁড়া। যেমন: প্রথম সিগ্রেট টানার বয়সের রোমাঞ্চকর অনুভূতি, ডিভানের নিচে অযত্নে লুকিয়ে রাখা অজস্র বই পত্তর, চিঠি চাপাটি আর ছাত্র রাজনীতির সময়কার একগাদা মেনিফেস্টোর পুরনো ঘ্রাণ।
যেদিন গঙ্গার ধারে আমার শৈশবের খেলাঘর, আমার আস্তে আস্তে তরুণ হয়ে ওঠার চিলেকোঠা আমার ছাদটা কোন এক বিকেলে বিক্রি হয়ে গেল, সেদিন থেকে বুঝতে শিখলাম আমার ছেলেবেলার মনখারাপ সাড়িয়ে তোলার অন্যতম বন্ধু তারাটাকে আমি আর হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারবো না। নীল নির্বাসিত হল। হারিয়ে গেল আমার নব্বই। তারপর হারিয়েছি অনেক কিছু, বদলে গেছে তার চেয়েও বেশী কিছু। ভুলে থাকার ভান করে ছিল মস্তিষ্ক। আজ কিছু আগেও যখন শাক্যজিৎ এর বইটা হাতে তুলে নিচ্ছিলাম, ভাবতে পারিনি সেই ফাঁকা ক্লাসরুম হাহাকার করে উঠবে। ক্লাসরুমই তো, ওখানেই তো মিওসিস পদ্ধতিতে একটু একটু করে গড়ে উঠেছিল আজকের রক্তমাংস, মগজের কোষ আর মেরুদন্ড।
নব্বই। আমার মত কিছু মানুষের নিজস্ব সময়। বেখেয়ালে যখন পিছনে চেয়ে দেখলাম তখন সে হাত ছাড়িয়ে বহুদূরে। মনে হলো কোমায় ছিলাম। হুড়মুড়িয়ে ছুটে পালিয়ে গেল সময়টা। ঘন ঘন লোডশেডিং। দুপুরের অনেকটা সময় জুড়ে সামনের নারকেল গাছে কাঠঠোটরার শব্দ। স্কুলের সিলেবাসে গ্রীষ্মের দুপুরের ওপর লেখা মিস-এর রচনাকে তখনও রিলেট করতে পারা যেত। তখনও বিক্রি হত একটাকায় কাঠির ওপর বরফ দেওয়া আইসক্রিম আর পেপসি, সব মনে পড়ে যাচ্ছে... ধুলোমাখা বই যেগুলো প্রাণে ধরে আজও বেচতে পারিনি। সেদিন বাড়ী ফিরে গুছিয়ে রাখতে গিয়ে একটা ছোট্ট গোলাপের ফসিল ঝরে পড়লো। মিশনের টেস্টের শেষ দিন একজন ওখানের বাগান থেকে লুকিয়ে তুলে বইয়ের ভাঁজে রেখে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। আদুরে স্মৃতির নৌকো, হ্যালোজেনের আলো মেখে অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটিয়েই ছাড়লো। অসম্ভব ভালো। এর বেশী আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
এই বইএর গদ্য খুবই সুস্বাদু! কিছু অংশ বারবার পড়া যায়।লেখকের চেয়ে মাত্র তিন বছরের ছোটো হয়েও আমার নব্বই প্রায় একদমই যে এরকম নয় তাতে দুজনের পারিবারিক আবহাওয়ার ভিন্নতা বোঝা যায়। লেখক অত্যন্ত যত্ন নিয়ে লিখেছেন এটা বোঝা যায়। আর একটু স্পেস পেলে ভালো লাগতো। মানে আরও একটু বিস্তারে লিখলে। প্রচ্ছদ বেশ ভালো লেগেছে।ভবিষ্যতে পড়তে চাইবো এ লেখকের আরও গদ্য।
এই বই এমনই এক অনুসন্ধান, যেখানে নব্বইয়ের দশককে দেখা হয়েছে দক্ষিণ কলকাতার জানালা দিয়ে। পৃথিবীর বড় বড় ঘটনাগুলো—বাবরি মসজিদ ধ্বংস, বিশ্বায়নের ঢেউ, সিনেমা ও অর্থনীতির রূপান্তর—এখানে প্রতিফলিত হয়েছে স্থানীয় জীবনের ভেতর; পাড়ার আড্ডা, চা-দোকান, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন কিংবা রাজনৈতিক পোস্টারের মধ্য দিয়ে। ভৌগলিক পরিসর সীমিত হলেও, সেটিই বইটির অন্তরস্বরকে গভীর করেছে।
লেখকের দৃষ্টি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির—যাদের জীবনে নব্বইয়ের দশক ছিল একই সঙ্গে আদর্শভঙ্গ ও নতুন আকাঙ্ক্ষার সময়। গণমাধ্যমে যৌনতার উন্মুক্ততা, বাম রাজনীতির অবক্ষয়, বাজারের মোহ, শিল্পাঞ্চলের পতন—সবই এখানে উপস্থিত। তবে বইটি কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়; এটি এক প্রজন্মের মানসিক ভূগোল, যা ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের রূপরেখা আঁকে।
লেখক কখনও বাবাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লেখেন, কখনও পিকনিকের গল্পে এক যুগের অবসান ধরে ফেলেন। তথ্যের ভারে নয়, অনুভূতির স্রোতে বইটি এগিয়ে যায়। হার্বার্ট-এর স্মরণ, ছোট পত্রিকার গন্ধ, কিংবা শহরের হারানো সবুজ—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক সময়ের নস্টালজিক প্রতিচ্ছবি।
শেষ পর্যন্ত, বইটি কেবল স্মৃতিচারণ নয়, বরং এক সময়ের প্রতিধ্বনি—যেখানে ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষুদ্র আলোয় প্রতিফলিত হয় বৃহত্তর সমাজের ছায়া। সম্ভব হলে অবশ্যই পড়ুন। নমস্কার!
হারিয়ে যাওয়া নব্বইয়ের দশক আর তার হারিয়ে যেতে বসা স্মৃতি, যে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিই খুব যত্ন সহকারে রোমন্থন করেছেন নবাগত তরুণ লেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য.. সেই দশকের সিনেমা, প্রথম শুরু হওয়া বাংলা সিরিয়াল, লুকিয়ে করা প্রথম প্রেম আর প্রথম দেখা লাল পতাকা; সবকিছুই যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনে.. শুধু তাই নয়- বন্ধ কারখানা, সুমনের গান, গলির ক্রিকেট, বিকেলের ফুটবল আর প্রথম দেখা অ্যাডাল্ট ফিল্ম; কিছুই বাদ পড়েনি তাঁর মনের মণিকোঠা থেকে.. আর এই মনিকোঠায় সংগ্রহ করে রাখা টুকরো টুকরো ছবি দিয়ে তৈরী হওয়া কোলাজই হল তাঁর এই বই "অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত".. যার প্রতিটা পাতায় পাতায় ধরা পড়েছে নব্বই দশকের কলকাতার এক আশ্চর্য সুন্দর খন্ডচিত্র.. পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আপনিও হারিয়ে যাবেন আপনার ফেলে আসা পুরোনো দিনে, নব্বইয়ের দশক যাদের কৈশোরকাল তাদের কাছে এটা শুধু বই নয়, যেন একচিলতে ছোটবেলা..
আমি নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের জন্মেছি। সেই হিসেবে সেভাবে নব্বইকে আমার চিনে ওঠা হয়নি। কিন্তু আমার বেড়ে ওঠার সময়, মানে ওই ২০০০ সালের প্রথম দেড় দশকের ফ্লেভারটা খুব বেশি আলাদা ছিল না। ছেলে আর মেয়েদের কিছু অভিজ্ঞতা আলাদা থাকে, সামাজিক কারণেই। যেহেতু, আমাদেরকে সমান বা এক হিসেবে দেখতে এখনও তার সমস্যা হয়। তাই পুরো অভিজ্ঞতা মিলবেনা, সে ছেলে হলেও মিলতো না যদিও। তবে, বইটা আমার, আমাদের হারিয়ে যাওয়া অথচ অস্তিত্বের গভীরে কোথাও থেকে যাওয়া সময়ের, আবেগের, অনুভবের, দলিল হিসেবে থেকে যাবে।
এই বই অনেক কিছু ফিরিয়ে দেয়, মনে করিয়ে দেয়। আমাদের, মানে তথাকথিত নাইন্টিজ কিডসদের খুব কাছের, খুব নিজের হয়ে রইবে এই বই। সুমন, চন্দ্রবিন্দুর প্রথম মেমোরি, ঝিরঝিরে দূরদর্শন, লোডশেডিং থেকে কুয়াশা জড়ানো শীতের সন্ধে, লুকিয়ে আনন্দলোক পড়া, বামফ্রন্ট সরকারের পতন, সবকিছুই আছে, শাক্যজিতের জাদু কলমে।