ইমতিয়ার শামীম আমাদের ছোটগল্পে ভিন্ন বিষয় ও স্বর নিয়ে বিরাজ করছেন। তাঁর গল্পে বাংলার সমাজ ভূগোল রাজনীতি আলাদা মাত্রা পায়। জীবন ও বাস্তবতার আনাচে-কানাচে তাঁর গহন অবগাহন ও নিবিড় আলোকপাত আমাদের বিস্মিত করে।
এই বইয়ের অধিকাংশ গল্পে বাংলার গ্রামজীবন ও এর শেকড় ধরে থাকা দরিদ্র ও প্রায়-উন্মুল মানুষের বাসনা কামনা স্বপ্ন দ্বন্দ্ব আর হাস্যকরুণ অন্তর্গত বাস্তবতা তাঁর কলমে তীব্রতা ও রসবোধ নিয়ে জেগে উঠেছে। অন্যদিকে মানুষের দস্যুতা, লোভ ও ভোগপ্রবৃত্তির কারণে ক্রমশ বিলীয়মান বাংলার নিসর্গ ও ভূগোলের বিবরণ তিনি তুলে এনেছেন গভীর বেদনায়। রূপসী বাংলা পর্বের কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছেন বাংলার 'ত্রস্ত নীলিমা'র কথা, আর ইমতিয়ার শামীম তাঁর গল্পে তুলে ধরেছেন বিধ্বস্ত বাংলার গাঢ় বয়ান।
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
প্রথমত প্রতিটা গল্পই রাতে পড়ার চেষ্টা করেছি কারন রোজা অবস্থায় এই ভারী লেখা পড়লে রোজা লেগে যেত শিওর। তারপর ও সাবলিল হয়নি আমার কাছে। বড় বড় বাক্য, একটু ভিন্ন শব্দচয়ন আর সাধারণ কথা গুলো অসাধারণ ভাবে তুলে ধরার মাঝে বেশ ঘোরের ভেতর পরা লেগেছে।
কিছু গল্প হয়তো সাধারণ ছিল, কিছু গল্প অসাধারণ। তবে সবই আমাদের অতিপরিচিত একেকটা চরিত্র, গ্রাম বাংলার একেকটা গল্প।
এটা ইমতিয়ার শামীমের পড়া দ্বিতীয় বই আমার। কুউউ ঝিকঝিক পড়ে ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম। এটা পড়ে ইমতিয়ার শামীমের প্রতি ভালো লাগা আরো বাড়লো। প্রথম বইয়ের ভাষা থেকে এই বইয়ের ভাষা একদম ভিন্নতর। ইমতিয়ার শামীমের এই বইয়ের গদ্য একটা ঘোর সৃষ্টি করে। ভাষাশৈলী শহীদুল জহিরের থেকে অনুপ্রাণিত মনে হয়েছে। সবগুলো গল্পের পটভূমি ই গ্রাম আর গ্রামীণ মানুষ, তাদের জীবন যাপন,চিন্তা ভাবনা,জীবনের ধারাবাহিকতা এসবের প্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীলতার বয়ান। সব মিলিয়ে পুরো বইটি আচ্ছন্ন করে রাখবে পাঠককে।
ইমতিয়ার শামীম এবং তার সৃষ্টির ঘোর! হঠাৎ করে দু'একবার মনে হলো শহীদুল জহির উঁকি দিলেন। ২৩ সালেই শেষ করতে পেরে ভাল লাগছে। ভালো লাগা, মন্দ লাগা মিলিয়ে ৩টি তারা। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগলো 'লোকনাথ ও মোহাম্মদী পঞ্জিনামা'। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রতিটা গল্প পড়ার পরই মনে হচ্ছিল লেখক চাইলেই উপন্যাস হতে পারতো ওরা! কী আর করার!
দীর্ঘ বাক্য, অসংখ্য চরিত্র এবং গল্পের অনবরত বাঁকবদলে হোচট খেতে খেতে আবার নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে গ্রামীন আবহের সঙ্গে সামান্য কমিক টোনের ছিটেফোঁটা মেশানো ছয়টি নোভেলেট আকারের গল্প পড়ে শেষ করতে আমার ঘাম ছুটে গেছে। তবে সবগুলো গল্পই চমৎকার।
যে ধরনের গল্প আমি পড়তে চাই—একবার নয়, বারবার; 'শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে' গল্পগ্রন্থের মোট ছয়টি গল্পের প্রতিটিই ছিল ঠিক তেমন। 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা', 'লোকনাথ ও মোহাম্মদী পঞ্জিনামা', 'গ্রামীণ নিরাপত্তার দু-একটি খসড়া'—এ তিনটি আমার পড়া অন্যতম সেরা গল্প।
কোন গল্পে মঙ্গাপীড়িত জনপদে সামরিক লেফট রাইট এবং দ্রুত হস্তপদক্ষেপে ডেকচি ভরা রান্নার ঘ্রাণ (মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা) কিংবা কোন গল্পে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেডিওতে হত্যার উল্লাসে বিভোর জলপাইকন্ঠ আর ফোরগ্রাউন্ডে গোপন অস্ত্রের সন্ধানে আসা আর্মির জিপ মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে অস্ত্র খুঁজতে হানা দিয়ে বের করে আনে পোকায় কাটা শস্যবীজ (কৃষক হত্যার সম্ভাব্য প্রাক-পুরাতনী)। এদিকে লোকনাথ আর মোহাম্মদী পঞ্জিকা আফতাব খলিফার দোকানেই শুধু যেন একসাথে থাকতে পারে; তাও সেই থাকাটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকা (লোকনাথ ও মোহাম্মদী পঞ্জিনামা)। ওদিকে মদ কিংবা মেয়েমানুষে মেতে থাকার বয়সে একদল যুবক সাঁওতাল পল্লীতে কাতার বেঁধে খাওয়ায়, নামায পড়ে আর গণ আকিকার জাদুতে জোসেফ, ডেভিড, জোনাথন কিংবা পূর্ণিমারা হয়ে যায় সবর আলী, আব্দুর গফুর, কাদের আলী কিংবা তোজল্লী খানম(গ্রামীণ নিরাপত্তার দু-একটি খসড়া)। কোথাওবা ভূমিদস্যুরা মেরে ফেলে নদী যাতে আষাঢ় আর শ্রাবণ যেন পঞ্জিকাতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে (৩২ দিনের আষাঢ়)।
যথারীতি প্রতি গল্পেই গল্পের হাত ধরে খানিকটা ইতিহাস কিংবা ভূগোলের সত্য চলে আসে।
শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে - ইমতিয়ার শামীম আমি মূলত ইমতিয়ার শামীমের বই পড়া শুরু করি 'আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক' দিয়ে। তারপর লেখার যে মুগ্ধতা শুরু হয়েছিলো, সেই ধারাবাহিকতায় 'শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে' পড়েছিলাম। এই বইটা সেই মুগ্ধতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার মতে উনার লেখার সবচেয়ে বড় গুণ হলো ভাষার ব্যবহার। 'কুউউ ঝিকঝিক'-এর ভাষার সারল্য যেখানে স্নিগ্ধতা এনেছিলো, সেখানে 'শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে'-এর গদ্য একেবারেই ভিন্ন এক আবহের সৃষ্টি করেছে। এই বইয়ের ভাষা একটা ঘোর লাগা ফিল দেয়, যা আমাকে ধীরে ধীরে গল্পের গভীরে টেনে নিয়েছে। গল্পের প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি বর্ণনা এক অদ্ভুত ফিল ক্রিয়েট করে। ফিল লাইক শহীদুল জহিরের লেখা পড়ছি। আমার মনে হয় উনি শহীদুল জহিরের ফ্যান ছিলেন (একান্তই ব্যক্তিগত ধারণা, আমার ভুলও হতে পারে)। তার এই গদ্য স্টাইলে গল্পের প্রতিটি লাইনে অন্যরকম একটা ভালোলাগা এনেছে। যা আমাকে আরাম দিয়েছে বইটা পড়তে গিয়ে। এই বইয়ের প্রায় প্রতিটি গল্পের প্লট হলো গ্রাম আর গ্রামীণ মানুষ। তাদের লাইফ-স্টাইল, চিন্তা-ভাবনা, জীবনের ধারাবাহিকতা—সবকিছুই লেখকের চোখে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি গ্রামের সরল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, দ্ব*ন্দ্ব আর বিটারসুইট রিয়্যালিটিগুলোকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। শুধু তাই নয়, মানুষের লো*ভ আর “আমার সব চাই” প্রবৃত্তির কারণে বাংলার গ্রামীণ সৌন্দর্য কীভাবে ক্রমশ বিলীন হচ্ছে, তার একটা মন খারাপ করা বিবরণও তিনি দিয়েছেন। জীবনানন্দ দাশ যেমন তার কবিতায় বাংলার 'ত্রস্ত নীলিমা'র কথা বলেছেন, ইমতিয়ার শামীম তার গল্পে বিধ্বস্ত বাংলার এক বিষণ্ণ গল্প এঁকেছেন। এই বইটিতে থাকা প্রতিটি গল্পই যেন একেকটি জীবন্ত ছবি, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। গল্পগুলো: 1. মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা 2. কৃষক হত্যার সম্ভাব্য প্রাক-পুরাতনী 3. লোকনাথ ও মোহাম্মদী পঞ্জিনামা 4. গ্রামীণ নিরাপত্তার দু-একটি খসড়া 5. ৩২ দিনের আষাঢ় 6. মন তুমি কৃষিকাজ ইমতিয়ার শামীম-এর প্রতিটি গল্পেই জীবন ও বাস্তবতার আনাচে-কানাচে এক গভীর পর্যবেক্ষণ ধরা পড়ে, যা আমাদেরকে চারপাশের জগৎকে নতুন করে দেখতে শেখায়। সব মিলিয়ে, 'শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে' বইটা আমাকে একরাশ মুগ্ধতা দিয়েছিলো। আপনাদের কার কেমন লেগছে?
এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ গল্প অবশ্যই 'গ্রামীণ নিরাপত্তার দু-একটি খসড়া'। বেহুলা আর জোনাকি��� সংলাপে বুঁদ হয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ, মাজুলের বাসা মাথায় বনবন করে ঘুরছিল অনেকক্ষণ। শিরদাঁড়া বাঁকা না করতে পারা সবর আলির কাহিনী যখন পড়ছিলাম তখন ভাগ্যক্রমে ছিলাম দিনাজপুরের কান্তনগরে। সেখানে সিধু আর কানু মুর্মুর ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম আজ আমাদের প্রাচীনতম পূর্বপুরুষদের এই দশার পেছনে আমরাই তো দায়ী! মনে পড়ে গেল ২০১৫ সালে পুলিশ কর্তৃক সাঁওতালদের গ্রামে অগ্নিসাধনের ঘটনা। বেঁচে থাকুক সবর আলি আর বেহুলারা যুগযুগ ধরে, তাদের সন্তানরাও বেঁচেবর্তে থাকুক।
সাঁওতালদের জীবন-যাপন নিয়ে ইমতিয়ার শামীমের লেখনি দ্বিতীয়বারের মত পেলাম এই গল্পে, প্রথমবার পেয়েছিলাম গ্রামায়নের ইতিকথার ১ নম্বর গল্পে। তিনি যেভাবে ক্রমশ বদলে যাওয়া গ্রামীণ সমাজের সাথে তথাকথিত বুনোদের জীবন-যাপনের যে সমান্তরাল বর্ণনা করে থাকেন তা অনবদ্য।
বইয়ের প্রথম দুটো গল্প অত মন ভরাতে পারে নি নইলে পাঁচ তারাই দিতাম বইটিকে।
শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতের গল্পগুলো সময়ের ব্যস্তানুপাতে লেখকের স্বভাবসুলভ দীর্ঘায়িত গদ্য মসৃণ পথ ছেড়ে দুর্বোধ্যতার খেঁজুর কাঁটা বিছিয়ে রাখলে গল্পপাঠে মনযোগের বিচ্যুতি ঘটে। ভাবনা আসে, দুর্বোধ্যতার তপস্যা কি তাহলে সফল গদ্যর সিদ্ধিলাভের উপায় নাকি ? পাঁচটা গল্পের মধ্য মাঝের দিকে ''লোকনাথ ও মোহাম্মদী পঞ্জিনামা'' এবং ''গ্রামীণ নিরাপত্তার দু— একটি খসড়া'' — এই দুটো গল্প তুলনামূলক ভালো ছিল। বাকি কিছু মনে ধরলো না।