পৃথিবীর সবচেয়ে প্রার্থিত সোনার গম্বুজ। যার নিচেই আছে পবিত্র কালো পাথর। আছে আত্মার রহস্য, আছে বোরাককে বেঁধে রাখার স্তম্ভ এবং ঊর্ধ্বাকাশ গমনের ডোম।
আছে রক্ত, আছে ধ্বংস, আছে ক্রুসেড। আছে ওমরের ক্ষমা, সালাদীনের মহিমান্বিত বিজয়, সুলতান সুলেমানের কীর্তিময় চল্লিশ-ফুট উঁচু নরর-প্রাচীর। আছে রানি বিলকিস, জেজেবেল, হেরেম সুলতান রোক্সালিনা। আছে প্রকৌশলী চার্লস ওয়ারেন, ইলুমিনিতির হিরাম আবিফ ও হসপিটালার-টেম্পলাররা।
দ্বিতীয় কিবলার পাশাপাশি আছে রোদন প্রাচীর। নেবুকান্দনেজার ও টাইটাসের কান্নার সাথে মিশে আছে ইহুদি-বর্বরতা। আছেন ইব্রাহিম থেকে এরিয়াল শ্যারন পর্যন্ত মহানায়ক-খলনায়ক।
তাই সেই সোনালি গম্বুজের টান চিরায়ত। বিশ্ব পর্যটকের সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ সেখানে। বহু বছরের খাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই স্বপ্ন, সেই প্রেমের অঞ্জলি--না ইতিহাস, না ঘৃণার উপাখ্যান। প্রেম ছাড়া এ পরিভ্রমন অসম্পূর্ণ; অর্থহীন।
লেখক ও কবি বুলবুল সরওয়ার পেশাগত জীবনে একজন চিকিৎসক ও শিক্ষক। অসাধারণ কিছু ভ্রমণকাহিনী রচনার জন্য অধিক খ্যাত হলেও গল্প, কবিতা, উপন্যাসেও তাঁর অবাধ বিচরণ। এছাড়া অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর শক্তিশালী অবদান রয়েছে।
জেরুসালেমের ইতিহাসের সাথে পুরো বিশ্বের ইতিহাস জড়িত। সেই জেরুসালেম ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে বুলবুল সরওয়ারের এই বই।
জনাব বুলবুল সরওয়ার একটি বিশেষ মতাদর্শের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জানতাম। কিন্তু তিনিও যে তাদেরই মতাদর্শের লোক তা জানা ছিল না।ধন্যবাদ জনাবকে নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্যে। জনাবের মতো উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক আর কতো ঘাপটি মেরে সাধু সেজো আছে কে জানে? সারা বইতে জেরুসালেম ভ্রমণের নামে পুরো জেরুসালেমের ইতিহাস একটানা লিখেছেন।যেন ভ্রমণকাহিনী নয়, পাক্কা ঐতিহাসিক হিসেবে পাঠ্যবই লিখতে বসেছেন। তার উগ্রবাদীতার নজির -
শেবার রানীর কাহিনী লিখতে গিয়ে যা লেখেন, " সে হলো জিন এবং মানুষের ঔরসজাত -কিংবা আল্লাই ভালো জানেন - এক অপরূপ ললনা, যার দেহে সূর্যের আভা। শত সহস্র সেনাপতি তার আজ্ঞাবহ এবং তার কাছে পরাস্ত হিন্দুস্তানের দেবতা রাম- কৃষ্ণ" (পৃষ্ঠা ১০২) শেবার রানীর কাহিনীতে রামকৃষ্ণ কোথা থেকে প্রাসঙ্গিক হয়? মীর মশাররফ "বিষাদসিন্ধু" তে মরুভূমিতে হিন্দু ব্রাহ্মণ খুঁজে বের করে, তাদেরকে মুসলমান বানিয়ে ছেড়েছিলেন। জনাব বুলবুল সরওয়ারও তো কম যান না।
" আধুনিকতাই কি জন্ম দেয়নি চরমপন্থার? " (পৃষ্ঠা ১৯২) আধুনিকতার সাথে চরমপন্থার জন্মের সম্পর্ক তিনি অবশ্য ব্যাখা করেননি।
" মুঘলদের সাড়ে তিনশো বছরের ইতিহাসে একটিও বিদ্রোহ নেই ; অথচ ইংরেজদের পৌনে দুশো বছরে অগুনিত বিদ্রোহ, বিপ্লব এবং গণজাগরণ। " ( পৃষ্ঠা ১৮৬) আমার প্রশ্ন লেখকের নিজ মাতৃভূমি বারো ভূঁইয়াদের কথা তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন? আর মুঘলদের পিতা-পুত্রের ক্ষমতা আর নারী ভাগাভাগি নিয়ে বিদ্রোহ, পু্ত্রের মাথা কেটে পিতাকে উপহার দেয়ার ঘটনা নাহয় নাই বললাম।
" আর খ্রিস্টানদের কান্ডটা সর্বার্থেই ভয়াবহ। ইহুদিদের হাতে-বোনা পবিত্র গ্রন্থের অর্ধেক তারা ধার নিয়েছে বড়ভাই থেকে ; যা আবার হাদিসের মতো যাচাই-বাছাই করার চেয়ে ঠিকঠাক করা হয়েছে সমকালীন চার্চ, সম্রাটের ইচ্ছা ও উচিতের দোহাই দিয়ে। " ( পৃষ্ঠা ১৫৩) বাইবেল নিয়ে সরাসরি এগুলো লিখছেন। লেখক নিজেকে ধর্মপ্রাণ দাবি করার চেষ্টা করেছেন সারা বইতে। একজন ধর্মপ্রাণ নিশ্চয়ই অন্যের ধর্মেকে হেয় করে নিজের দ্বীনকে মহিমান্বিত করতে চেষ্টা করেন না।
" আমার চোখ ভিজে আসে। কারণ, ঈসা নবীর শিক্ষা এবং উপদেশ এত দ্রুত ইহুদিরা গিলে ফেলে যে মাত্র পাঁচশো বছরের মধ্যেই নতুন নবী পাঠাতে হয় দুনিয়ায়। " ( পৃষ্ঠা ১৩৭) ঈসা (আ) কী শুধু ইহুদিদের জন্য এসেছিলেন? না, যদি ঈসার সব উপদেশ ইহুদিরাই গিলতো তবে আরবে কেন নবী হযরত মুহাম্মদ (স) জন্মেছিলেন? উপদেশ গিলে খেল ইহুদিরা অথচ নবী এলেন আরবদের মাঝে? কাকে ভুল প্রমাণ করতে চায় এই বুলবুল সরওয়ার? কাদের মাঝে নবী প্রেরিত হয় তা ক্লাস ফাইভের ইসলাম শিক্ষা বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে লেখা আছে। লেখকের উচিত অবিলম্বে তা পাঠ করা।
এতো সাম্প্রদায়িক লোক কীভাবে লিখতে পারে তা বুঝতে পারছি না। সমাজেই সবাই তাহলে অসুস্থতার পথে হাঁটছি।
বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের তিন অমররত্ন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশংকর রায় এবং মুজতবা দ্য গ্রেট তো অন্যের ধর্মে, বিশ্বাসে আঘাত দেননি। তাঁরা তবে এত বেশি পাঠকপ্রিয়তা কীভাবে পেলেন? হাল আমলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদও ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন কই তাঁরা তো সাম্প্রদায়িকতা আনেন নি। তাঁরা তো জনপ্রিয়তার মাপকাঠির বাইরের লোক। ইদানীং শাকুর মজিদ, মঈনুস সুলতান নামের দুই ভদ্রলোকের ভ্রমণকাহিনী পড়ি। তাঁরাও তো এভাবে আক্রমণ করেননি। তারেক অণুও বেশ লিখেন। তিনিও তো এসব ভুজুংভাজুং দেন না।
লেখক জেরুসালেমকে তীর্থতুল্য মানেন। তাই আবেগের ফাঁদে পড়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না হয়ত। নানা উদ্ভট কথাবার্তা লিখে দিলেন।
বুলবুল সরওয়ারের (লেখকের জন্ম ১৯৬২, ফ্লপ মতে)জন্মের ঢের আগে এক বাঙালি হিন্দু সাধু তীর্থ ভ্রমণ নিয়ে ধর্মীয় রসে ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন "মরুতীর্থ হিংলাজ" নামে। সেই সাধু অবধূত তো তাঁর বইতে অপরের বিশ্বাসকে আঘাত করেননি। অথচ নিজ ধর্মের গুণকীর্তন সারা বইতে ঠিকই করেছেন।
তবুও বলবো জনাব বুলবুল সরওয়ার যথেষ্ট পড়াশোনা করে বইটি লিখেছেন। বিশেষত, ইতিহাসের ওপর তাঁর দখল নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য।তাঁর এই বই পড়ে ক্রুসেড নিয়ে আলাদা আগ্রহ সৃষ্টি হল, জানতে ইচ্ছা করছে রুকনউদ্দিন বাইবার্সকে নিয়ে। ঘাঁটাতে হবে নতুন করে জ্যাক দ্য রিপারের ঘটনাটিকে। আর তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব তো সারা বই জুড়েই ছিল।
ভ্রমণকাহিনী লেখার সময় লেখকদের অনেক দায়িত্বশীল হওয়া উচিত, এক সময় লেখক থাকবেন না, এখনকার পাঠকেরাও থাকবেন না, কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষেরা সেই দেশ ও সময়কে জানতে পারেন কেবল লেখকের সেই লেখা অভিজ্ঞতাগুলো থেকেই। সম্প্রতি ২০১৭ সালে প্রকাশিত বুলবুল সারোয়ারের ‘স্বপ্নভ্রমণ জেরুজালেম’ পড়লাম, লেখকের জেরুজালেম ভ্রমণের স্মৃতিকথা। নাম শুনেই উৎসাহ পেয়েছি বইটি পড়ার জন্য, আর ২০১৮র অক্টোবর মাসে জেরুজালেম ঘুরে আসলাম আমরা, তাই কিছুটা কৌতূহল এবং উৎসাহ নিয়েই পড়া শুরু করলাম, সেই সাথে এটাও জানার ইচ্ছে ছিল সে লেখক কিভাবে ইজরায়েল ভ্রমণে গেলেন, যেহেতু বাংলাদেশী পাসপোর্টে সেখানে যাওয়া যায় না ।
( ২০১৭ সালে এক বাংলাদেশী জেরুজালেমে যেতে সক্ষম হন ইংল্যান্ড থেকে, যাকে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ইসরায়েলে প্রবেশ করা প্রথম ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে জেরুজালেম পোস্ট। সেটা এক বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে যেখানে সেই ব্যক্তি নিজেকে ইজরায়েল, ইহুদী ধর্মপ্রেমী ইত্যাদি হিসেবে নানা বছরের ইতিহাস দেখিয়ে সারা জীবনের জন্য সেখানে যেতে চেয়েছেন। যদিও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কোনো নাগরিক ইসরায়েলে ভ্রমণের জন্য অনুমোদিত নয়। এমনকি বাংলাদেশি পাসপোর্টেও উল্লেখ আছে যে, ভ্রমণকারী ব্যক্তি ইসরায়েলে ভ্রমণ করতে পারবেনা। )
বইয়ের প্রথম পাতাতেই ‘প্রবেশক’-এ লেখক উল্লেখ করেছেন সিনাই-তাবার সীমান্তে যখন বাংলাদেশী পাসপোর্টে ‘নিষেধাজ্ঞা’ ( সেই সীমান্ত দিয়েই আমরাও ইজরায়েলে প্রবেশ করেছিলাম) দেখানো হয় তখন সস্ত্রীক তিনি ইব্রাহিম (আঃ) থেকে ঈসা( আঃ) পর্যন্ত সকল নবীকে স্বীকার করেও মহানবী মুহম্মদ ( সাঃ) এর উম্মত থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাধু সিদ্ধান্ত, কিন্তু এর পরেই লেখক উল্লেখ করেছেন যে এই প্রাচীন নগরী তাকে বুকে টেনে নিল!
কিছুই বুঝলাম না, এভাবে তো আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করা যায় না। তাহলে ব্যাপারটা কোথায়?
বইটি বেশ সুপাঠ্য এবং তথ্যসমৃদ্ধ , জেরুজালেমের ইতিহাস এবং নানা স্থাপত্য নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ আছে। সেই সাথে নানা যুদ্ধের, ক্রুসেডের এবং ইহুদী জাতির ইজরায়েলের মাটিতে ধীরে ধীরে আগমনের ইতিহাস সম্পর্কে ভালোই জানা যায়। ধাক্কা খেলাম ৮৫ পাতায় এসে, যেখানে লেখক ২য় বিশবযুদ্ধে ইহুদীদের উপর নাৎসি বাহিনীর অত্যাচারকে বর্ণনা করেছেন ‘ নির্যাতনের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সাথে কল্পনার রং চড়িয়ে চরম তথ্য-সন্ত্রাস করা হলো।‘ – এটি একটি অত্যন্ত হতাশাজনক এবং চরম কলঙ্কিত স্টেটমেন্ট! আর সব কিছু বাদ দিয়ে হলেও যেখানে ৬০ লক্ষ মানুষকে শুধু মাত্র ইহুদী পরিবারে জন্ম নেবার অপরাধেই গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মেরেছিল নাৎসিরা, যার প্রমাণ আছে সবখানেই, সেখানে এমন উন্নাসিক মন্তব্য খুবই দুঃখজনক।
ইতিহাসের নানা ডাল-পালা বেয়ে ২৫৮ পাতার বইটিতে প্রাসঙ্গিক এবং অপ্রাসঙ্গিক ভাবে এসেছে ব্রিটিশ রাজ-পরিবারের বিশেষ রাণী ভিক্টোরিয়ার কথা, স্পেনের রানী ইসাবেলা, অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতানের কথা, এবং ইতিহাসের সাথে সাথে এসেছে নানা কন্সপেরিসি থিয়োরির কথা। সত্যি কথা কন্সপেরিসি থিয়োরির তোড়ে ভেসেই যাচ্ছিলাম-
কেবল একটির কথা উল্লেখ করি
- উইনষ্টন চার্চিল এক রোমানিয়ান তরুণীর প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ব্রাম স্ট্রোকার ‘ ড্রাকুলা’ লিখেন রোমানিয়ান চরিত্রকে ভিলেন বানিয়ে এমন কথা লেখা হয়েছে একাধিকবার। এটি অত্যন্ত অবিচার বই ও লেখকের প্রতি। প্রথম কথা উনি ব্রাম স্ট্রোকারকে ইংরেজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু ব্রাম স্ট্রোকার ছিলেন আইরিশ, আয়ারল্যান্ডের মানুষ, এই দুই জাতির মধ্যে আছে চির রেষারেষি। আর ফরমায়েশ করে এমন বই লেখানো যায় না, আমাদের কাছে ড্রাকুলা শুধু গা ছমছমে ভ্যাম্পায়ার কাহিনী হলেও সাহিত্যবোদ্ধার কাছে সে এক ব্রিটিশ উপনিবেশিকতা বিরোধী এক অদ্বিতীয় অনন্য উপন্যাস, যা গ্যাব্রিয়েল গার্সিইয়া মার্কেজের কাছ থেকে উপহার পেয়ে সারা রাত জেগে পড়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম পড়ুয়া ফিদেল কাস্ট্রো। সেই সাথে ড্রাকুলার কাহিনী কয়েকশ বছরের পুরনো কিংবদন্তী। একজন লেখক হয়ে এভাবে একজন ক্ল্যাসিক লেখক সম্পর্কে লেখা খুবই অন্যায়।
বইয়ের একেবারে শেষে মিশরের তাবায় হিলটন হোটেলের বিছানায় লেখকের স্ত্রী তাকে টেনে তলেন, তিনি অবাক হয়ে জানতে চান যে তিনি কোথায়! এবং তার আগের লাইনেই লিখেছিলেন ‘ কবির স্বপ্নকে বন্দী করার কানুন তো সব দেশের সরকারই বৈধ করেছেন’ – মানে ব্যাপারটা বোধগম্য হল না! বইয়ের নাম তো ‘স্বপ্নভ্রমণ জেরুজালেম’, তাহলে কি লেখক বুলবুল সারোয়ারের কুশলী ভাষায় লেখা এ এক কাল্পনিক ভ্রমণকাহিনী? কিন্তু সারা বইতে তো তেমন কোন উল্লেখ নেই। ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশিত চমৎকার ভাবে ছাপা বইটির দাম রাখা হয়েছে ৫৮০টাকা। বইটি নিয়ে সন্দেহ এবং কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপনের জন্যই এই পাঠ-প্রতিক্রিয়া, পাঠক মাত্রেই এই অধিকার সবারই রয়েছে।
(লেখক বুলবুল সারোয়ারের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় নেই, থাকলে অবশ্যই জানতে চাইতাম এই বিষয়গুলো নিয়ে। এবং সীমান্ত অতিক্রমের বিষয়টি নিয়ে) ।
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রার্থিত সোনার গম্বুজ। যার নিচেই আছে পবিত্র কালো পাথর। আছে আত্তার রহস্য, আছে বোরককে বেঁধে রাখার স্তম্ভ এবং ঊধ্বার্কাশ গমনের ডোম।
আছে রক্ত, আছে ধ্বংস, আছে ক্রুসেড। আছে ওমরের ক্ষমা, সালাদীনেন মহিমান্বিত বিজয়, সুলতান সুলেমানের কীর্তিময় চল্লিশ-ফুট উঁচু নরর-প্রাচির। আছে রানি বিলকিস, জেজেবেল, হেরেম সুলতান রোক্সালিনা। আছে প্রকৌশলী চার্লস ওয়ারেন, ইলুমিনিতির হিরাম আবিফ ও হসপিটালার-টেম্পালাররা। দ্বিতীয় কিবলার পাশাপাশি আছে রোদন প্রাচির।
নেবুকান্দনেজ্জার ও টাইটাসের কান্নার সাথে মিশে আছে ইহুদি-বর্বরতা। আছেন ইব্রাহিম ধেকে এরিয়াল শ্যারন পর্যন্ত কত মহানয়ক-খলনায়ক।
তাই সেই মোনালী গম্বুজেনন টান চিরাচরিত। বিশ্ব পর্যটকের সবচেয়ে বেশী ভ্রমন সেখানে। বহু বছরের খাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই স্বপ্ন, সেই প্রেমের অন্জলি—না ইতিহাস, না ঘৃনার উপাখ্যান। প্রেম ছাড়া এ পরিভ্রমন অসম্পূর্ণ; অর্থহীন।
#মতামত
আমি চমৎকৃত হয়েছি বইটি পড়ে। কারন লেখকের সাবলিল বলার ঢং। তিনি এই ছোট্ট বইটিতে এত কঠিন ইতিহাস কতো সহজে তুলে ধরেছেন। যারা ভ্রমন কাহিনীর পাশাপাশি ইতিহাস জানতে চায়, তাদের জন্য এই বই সুখাদ্য।
জেরুসালেমের যে এত ইতিহাস আছে তা আমি বইটি পড়ার আগে জানতাম না। জেরুসালেমের আকর্ষন ডোম-অব-রক যা সেখানকার সকল ধর্মালম্বিদের তীর্থস্থান। সেখানে পাশাপাশি জায়গায় নামাজও হচ্ছে, খ্রীষ্টান রা উপাসনা করছে আবার ইহুদিরাও প্রার্থনা করছে। সে এক মহা মিলন মেলা।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ(সা:) মিরাজ গমনের পথে মসজিদুল আকসায় নামাজ পড়েন। সেই মসজিদের সুন্দর বর্ননা দিযয়েছেন লেখক। নবীজি তার বোরাক কোথায় বেঁধেছিলেন, কোধাথেকে ঊর্ধ্বগামী হয়েছিলেন তাও উল্লেখ আছে।
নবী সোলাইমান(আ:) যিনি পৃথিবীর সকল মাকুলকাতকে তার আদেশ করার ক্ষমতা রাখতেন, তিনি এই জেরুসালেমের কোন প্রসাদ জীনদের দিয়ে তৈরী করিয়ে ছিলেন তাও জেনেছি। নবী সোলাইমান (আ:) এই ডোম-অব-রক তৈরীর পর কিভাবে সেটা দখল করে নেয় ইহুদিরা, তাদের থেকে আবার ক্রুসেডরা, তারপর তাদের থেকে সুলতান সালাদিন, তারপর আবার ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, তারপর হযরত ওমর, থেকে আবার খ্রিষ্টানরা, তাদের থেকে আবার সুলতান সুলেমানের দখল।
জ্যাক দ্য রিপারের রহস্য আমরা মোটামুটি সকলেই কম বেশী জানি। কিন্তু মূল কি ষড়যন্ত্র তা অকেই জানি না। রানি এলিজাবেত সহ কিরে এই ষড়যন্ত্র তৈরী করে তা লেখক সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই কাহিনী থ্রিলার গল্পকেও হার মানায়। এ যেন এক স্বপ্ন। রক্ত হিম করা কাহিনী, ঘৃনা, সুখ, আনন্দ সব কিছু।
আর সব শেষে ধন্যাবদ ‘ঐতিহ্য' প্রকাশনীকে। এত চমৎকার বই প্রকাশ করার জন্য। বইয়ের বাইন্ডিং খুব ভালো এবং বিশেষত এই বইয়ের পাতা গুলো খুব উন্নত মানের।
আমি অধম তাই আমার মনের আবেগ তুলে ধরতে পারিনি। পারিনি লেখকের আর্জি। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন সকলে।
ভ্রমণকাহিনী ভেবে পড়া শুরু করেছিলাম কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখলাম ইতিহাস। (উচ্চমাধ্যমিকে যখন ইসলামের ইতিহাস পড়তে খুব বিরক্ত লাগতো এই বইটা তখন পেলে হয়ত একটু আগ্রহ তৈরী হলেও পারতো!) যদিওবা ভ্রমণকাহিনী লেখার এই স্টাইলটা খারাপ লাগেনি তবে অনেক বেশি ইতিহাস হয়ে গিয়েছে এবং মনেহয়নি কোন ভ্রমণকাহিনী পড়ছি। আর অনেকাংশেই মনে হয়েছে লেখকের হালকা বিদ্বেষপূর্ন মনোভাব ছড়িয়ে পরেছে লেখায়। পড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে তাল কেটে গিয়েছে। লেখক চেষ্টা করেছেন বইটিকে কিছুটা তথ্যবহুল করে তোলবার জন্য।
" ঝিলাম নদীর দেশ" এর লেখক বুলবুল সরওয়ারের স্বাপ্নিক ভ্রমণ কাহিনী "স্বপ্নভ্রমণ জেরুসালেম"। ঝিলাম পড়ে স্বয়ং সৈয়দ আলী আহসান মন্তব্য করেছিলেন, " বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা ভ্রমণ কাহিনী!" আর ঝিলামের লেখক যখন প্রেম, পূর্ণ, শতশত নবীর পূর্ণভূমি আর নয় নয়টি ক্রুসেট সংঘটিত হবার আতুড়ঘর জেরুসালেম নিয়ে লিখবেন সেটা অসাধারণ এক সৃষ্টি হবে সেটা সহজেই অনুমেয়! আক্ষরিকভাবে এটাকে ভ্রমণকাহিনী না বলে ইতিহাসের গ্রন্থ বলাই শ্রেয়। কারণ সবুজ পাসপোর্টধারী কেউ জেরুসালেমে যেতে পারে না! তাই লেখক যেন স্বপ্নে তাঁর প্রিয় শহরে গেছেন আর হাজার বছর ধরে উন্থান পতন আর পৃথিবীর ভূরাজনীতির আবর্তীত এ শহরের আদ্যপান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। ইতিহাসের গ্রন্থ হলেও ইতিহাসের বইয়ে যেন সাল আর তারিখের ছড়াছড়ি এমনটা এখানে নেই। গল্পের ছলে অনেকটা থ্রিলিং টাইপের লেখা। যার একটি অনুচ্ছেদ পড়লে পা��কের মনে পরের অনুচ্ছেদ পড়ার জন্য একধরণে তাড়না অনুভব করে! বইটির বড় একটা অংশের মসজিদুল আল আকশা, ডোম অব রক, কান্নার দেয়ালের নির্মাণ কৌশল সম্পর্কে আলোচনা আছে। আছে রক্ত, আছে ধ্বংস, আছে ক্রুসেড। আছে ওমরের ক্ষমা, সালাদীনের মহিমান্বিত বিজয়, লকচোখি বাইবার্সের বিরত্ব, সুলতান সুলেমানের কীর্তিময় চল্লিশ-ফুট উঁচু নগর-প্রাচীর। আছে রানি বিলকিস, জেজেবেল, হেরেম সুলতান রোক্সালিনা। আছে প্রকৌশলী চার্লস ওয়ারেন, ইলুমিনিতির হিরাম আবিফ ও হসপিটালার-টেম্পলাররা।
আছে কোর্ট টাই আর আপাদমস্তক কেতাদুরস্ত ভদ্রবেশি ব্রিটিশ রাজ পরিবারের ভেতরের কাহিনী। তাদের ফ্রি মেসন আর ইলুমিনাতি প্রচারের লোমহর্ষক সব বর্ণনা। তবে আমাকে সব থেকে অবাক করে রোক্সালিনা নামক এক সাধারণ এতিম বালিকা যে তার রূপ আর সৌন্দর্য গুনে সুলাইমান দ্যা ম্যাগনিফিসেন্টের স্ত্রী হয়েছিলো আর সে হারিয়া যাওয়া সাধারণ বালিকার মনের বিস্তৃত দিগন্ত দেখে যার মাধ্যমে সে আরব্যরজনীর নায়ক বাদশাহ হারুনুর রশিদের বেগমের সাথে পাল্লা দিয়েছিলো!
সবশেষ ফিলিস্তিনিদের উপর বর্বর ইহুদের নির্যাতন আর শোষণ বঞ্চনার ইতিহাস যা হৃদয়কে সিক্ত করে। তবে কিছু বিষয় খুব খারাপ লেগেছে। অনেক বর্ণনায় পূর্বাতন কিতাব আর পশ্চিমাদের গড়া ইতিহাস থেকে ধার করা হয়েছে। যাতে জগৎবিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্রের উপর কিছুটা কালিমা লেপনের চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এগুলা বিচার বিশ্লেষণ করা পাঠকেরও কর্তব্য।
সব মিলিয়ে চমৎকার একটি বই যা পাঠক হৃদয় কে নাড়া দিতে সক্ষম! Pesonal Rating:: 8.5/10
This entire review has been hidden because of spoilers.
একজন প্রিয় মানুষের উপহার দেয়া বই। এতদিন সযত্নে তুলে রেখেছিলাম পড়লেই তো ফুরিয়ে যাবে ভেবে... অবশেষে পড়ে শেষ করলাম বইখানি।
জেরুজালেম এমনই এক নগরী, যার সাথে জড়িয়ে আছে পুরো বিশ্বের এত বছরের ইতিহাস। বইটিতে জেরুজালেমের সাথে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ঘটনা, সংস্থা এবং ব্যক্তিদের তুলে আনার চেষ্টা করেছেন লেখক। এবং তিনি তা প্রবল নিপুণতার সাথেই করতে সক্ষম হয়েছেন। কিতাবধারীদের ঘটনা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, যুদ্ধ, আত্মোপলব্ধি, রহস্য, প্রেম, ইতিহাস, লোক কাহিনী... কী নেই এতে! পাতায় পাতায় ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে লেখকের মুন্সিয়ানায় বিমোহিত হয়েছি। জেরুজালেমকে তিনি যতগুলো অ্যাঙ্গেল থেকে দেখেছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। সব মিলিয়ে বইটিকে সুখ পাঠ্যই বলা চলে। নিজের মত প্রকাশে লেখক সামান্যতম কার্পণ্য করেননি এখানে, যা তাকে উঁচু মাপের ব্যক্তি হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেয়...