পিতার ত্যাজ্যপুত্র সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হয়ে কলকাতায় নাখোদা মসজিদের নিচে ডিসপেনসারি দিয়েছিলেন। সেই নাখোদা মসজিদ যেখানে ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ রাখীবন্ধন উৎসবে সবার বারণ উপেক্ষা করে দৃপ্ত পদচারণায় এগিয়ে যান ভাতৃত্বের বিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু সৈয়দ হুসাইনের কলকাতায় থাকা হলো না। একদিন মাগরেবের আজান হচ্ছে, আকাশ টকটকে লাল, হঠাৎ তাঁর মনে হলো আমি এখানে কী করছি? সেই যে তিনি ডিসপেনসারিতে তালা দিলেন সে তালা আর খোলা হল না। চলে এলেন আসামের পাহাড়ি কোলের ঘেষে নেমে আসা দরিদ্র, আর অনুন্নত এক জেলা, কুড়িগ্রামে।
ভাগ্যিস এসেছিলেন। তাঁর আট সন্তানদের ভেতর জ্যৈষ্ঠ সন্তান নইলে যে পেতেন না এমন শৈশব, এমন জলেশ্বরীর ভুবন। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আশঙ্কা তখন হয়তো বৃথা যেত না, পকেটে শৈশব নেই যার সে যেন কল্পনায় সৃষ্টিশীলতার পথে পা না রাখে। আমরাও একজন সব্যসাচীকে পেতাম না। একটা প্রোপাগাণ্ডা হ্যান্ডবিল পোস্টারের চিত্রস্মৃতি থেকে জন্ম নিত না নুরুলদীনের সারাজীবনের মত অনন্য নাট্যসৃষ্টি। আমাদের গভীরে ঠাঁই করে নিত না লাইনগুলো,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমারই দেশে
এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায়
ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়।
আমাদের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক নিজের বাল্যস্মৃতিকে ধরতে চেয়েছেন 'হে বৃদ্ধ সময়' ক্ষুদ্র গ্রন্থটিতে। সে সময় তিনি বালক কিন্তু যখন লিখতে বসেছেন তখন সেই সময় বৃদ্ধ হয়ে গেছে, বৃদ্ধ হয়ে গেছেন নিজেও। আঁজলা ভরে স্মৃতির পাত্র থেকে রাখতে চেয়েছেন গ্রন্থটিতে। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে অনেকখানি গড়িয়ে ঝড়ে গেছে। কিন্তু যেটুকু ধরতে পেরেছেন সেও খানিকটা রেশমের তুলোর মত মোলায়েম। ভেতর দিয়ে ছুঁয়ে যায়।
আট বছর বয়সে বাবার কাছে নামাজ পড়া শিখেছিলেন। ১৪ বছরে এসে নামাজ ছেড়ে দিলেন। বাবা কড়া শাসন করলেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে গমগমে বললেন, 'যাও! রক্ত যখন ঠান্ডা হবে, তখন আবার নামাজ পড়বে।' সে রক্ত আর কখনো ঠান্ডা হয়নি। এক বোহেমিয়ান কন্ঠ তাকে তাড়া করে ফিরেছে শৈশব থেকেই। 'না, আমি তো আসলে এদের কেউ নই, কুড়িগ্রামেরই নই, আমি অন্য কোথাও থেকে দুদিনের জন্যে এই শহরে আসা একজন।'
সেই জলেশ্বরীর পৃথিবীতে বন্ধুত্ব হয় যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে। যুধিষ্ঠির নিয়ে যায় শহরের লাশকাটা ঘরে। বাবার জায়নামাজের নীচ থেকে পয়সা চুরি করে সেই ঘরের লাশকাটা বেদিতে দুজনের জমে ওঠে লুচি মোহনভোগের ভোজ। লাশকাটা ঘরের কথা পড়তে পড়তে অবচেতন মনে এসে ভিড় করে 'আট বছর আগের এক দিন' কবিতার লাইনগুলা,
শোনা গেল লাসকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে— ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লো তার সাধ;
এখানেও কি এমন কেউ এসেছিল লাশ হয়ে? সব ফেলে দুর্নিবার মরণের সাধ নিয়ে?
যুধিষ্ঠিরের বোন মধুয়ার সাথেও পরিচয় ঘটে। বড্ড অসুখকর সে পরিচয়। ভবঘুরে সেই কিশোরীটিকে গুদাম ঘরে পাটের গাঁটের আড়ালে উলঙ্গ করে ইস্টিশানের টালিক্লার্ক বাবু। নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আরেকদিন যুধিষ্ঠির সাথে উড়ে বেড়ানোর সময় মধুয়া এসে জোটে। কথাপ্রসঙ্গে মধুয়া বুকের পেয়ারা দুটো ধরে দেখতে বলে। যুধিষ্ঠির পাশ থেকে শুনেও ভ্রক্ষেপ করে না। উল্টে উৎসাহ দেয়।
সময়ের পালতোলা নৌকায় যুধিষ্ঠির এগিয়ে যায়। নোঙর করে বিপিন। ইশকুলে মুখচোরা বিপিন নিভৃতে এসে স্কুল পথযাত্রী ছাত্রদের মিছিলে। চুপচাপ ক্লাস শেষে ঘরে ফিরে যায়। সেই বিপিনের মারোয়াড়ী গুদামের ভেতর উঠোনের ঘরটা কী সুন্দর করে গোছানো! পরিপাটি। বিপিন তাকে সাজানো জারের মুড়ি বাতাস খেতে দেয়। কিন্তু বাসায় কেউ নেই। বিপিনের মা কোথায় থাকে জানা যায় না। পরে কিছু বছর পেরিয়ে জানা যায়, পাশের গলি বারবনিতা পাড়া বিপিনের মায়ের কর্মস্থল। দেহ পসারিণী হলেও তিনি যে মা। নিজের জগতের বাইরে ছেলে একটু আশ্রয় দিয়ে পড়াশোনা করান। আর সুযোগ পেলেই এসে সব কাজ করে যান দিয়ে নিঁখুতভাবে। ভাতের দাসি বিপিনের মাতৃ হৃদয়, নিজের সংসারের জন্য উদয়াস্ত খেঁটে চলা নিজের মায়ের সাথে অভিন্ন মনে হয়।
হঠাৎ একদিন দূরদেশে যাবার নিমন্ত্রণ আসে। দীর্ঘ ট্রেন যাত্রার পরে ফুলছড়ি ঘাট থেকে চাকা সদৃশ প্রপেলারের বিরাট স্টিমার শিয়ালু (আরিচা) ঘাটে এসে পৌছায়। আরেকটু টমটমে গেলেই মামাবাড়ি, রৌহা। কিন্তু রৌহা পৌছে কৌতূহলী মন চলে যায় জাফরগঞ্জে, ছোট চাচীর বাবা মীর নানার কাছে। মীর নানার মাথাটা নাকি খারাপ হয়ে গেছে। দূরে ক্ষেতের ভেতর নিভৃতে থাকেন দুটো চালার ঘর করে। বড় ঘরে দুর্গামন্ডপের বা পাশে মশারির ভেতর শাদা গোলাপ মোড়ানো কোরআন। ডান পাশে খ্রিস্টানদের একটা ক্রুশ। তিনি পূজাও করেন, নামাজও পড়েন আবার বলে ক্রুশকাঠের ওপর কোশার জল ছিটিয়ে বলেন, 'গড ইজ গ্রেট'। ছোটঘরে ঘুমান বালিশহীন। বুদ্ধের মত ডানহাতের উপর মাথা রেখে। তারপর যুগ যুগান্তর সেই মীর নানা স্মৃতির বেদিতে চিরকাল তাওয়ায়েফ করে চলেন। মনের ভেতর সকল মহামানব জায়গা করে নেন। অন্তঃপর লেখক উবাচ, 'যিশু মোহাম্মদ বুদ্ধ কাউকে আমি ফেলে দিতে পারিনা। সবাই আমার কাছে এক মানুষ হয়ে ওঠে।'
পরাণের গহীন ভেতর সে বৃদ্ধ সময় লুকিয়ে উঁকি দেয়। বার বার স্মৃতিস্রোত বিপরীতে সময় স্রোতের মুখোমুখি দাঁড়ায়। আঁজলা ভরে ধরতে গেলে গড়িয়ে পড়ে। ধরতে না গেলেও এসে ভিজিয়ে দেয়।
'ক্যান তুই গিয়াছিলি?- আমি তরে জিগামু অখন
চান্দের ভিতর ফের, যেইখানে জটিলতা বাড়ে,
অশথ জড়ায়া থাকে নদী নিয়া জলের কিনারে,
আমার গেরাম ঘিরা যেইখানে খালি পলায়ন?-'