সৈয়দ শামসুল হকের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিকথা। কী বিচিত্র সেই স্মৃতির রং। তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময় থেকে শুরু করে শেষ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং পরাধীন ভারত যে স্বাধীন হবে সেই আবহের সূচনালগ্নের ভেতর দিয়ে। কুড়িগ্রামের মতো মফস্বল শহর, তার জনজীবন, ধরলা নদী, তার উৎসব পার্বণ, জনজীবনের সঙ্গে বাদশার—সৈয়দ হকের ডাকনাম—গভীর সখ্য, পাঠককে থেকে থেকেই নিয়ে যাবে সেই কালপর্বটিতে, যা ভুলবার নয়, চিরকাল মনে রাখবার।
Syed Shamsul Haque (Bangla: সৈয়দ শামসুল হক) was a Bangladeshi poet and writer. Haq lived alternately in Dhaka and London. He wrote poetry, fiction, plays - mostly in verse and essays. He, the youngest writer to be honored with Bangla Academy Award, achieved it at the age of 29. He was honored with Ekushey Podok in 1984.
(সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মেছিলেন। বর্ণাঢ্য লেখকজীবনের অধিকারী সৈয়দ হক। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, কাব্যনাট্য, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, চলচ্চিত্রের গান – যা লিখেছেন সবকিছুতেই পেয়েছেন জনপ্রিয়তা, সাফল্য।
মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান সৈয়দ হক। এখন পর্যন্ত বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ লেখক তিনি।
সৈয়দ হকের লেখালেখির শুরু তাঁর শৈশবেই। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে লিখে ফেলেন দুই শতাধিক কবিতা। ১৯৫১ সালে ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায় ‘উদয়াস্ত’ নামে তাঁর একটি গল্প ছাপা হয়। সেটাই তার প্রথম ছাপা হওয়া লেখা।
সেই বছরই বাড়ি থেকে পালিয়ে বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) চলে গিয়েছিলেন তিনি। কাজ করেন পরিচালকের সহকারী হিসেবে। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও লেখাপড়া শেষ করেননি। পুরোপুরি মনোযোগ দেন লেখালেখিতে।
১৯৫০-এর দশকেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’। এ সময় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন তিনি। তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে নির্মিত হয় ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’। তাঁর উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়।
সৈয়দ শামসুল হক চিত্রনাট্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের জন্য প্রচুর গান লিখেছেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’।
তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘একদা এক রাজ্যে’, ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’, ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘অপর পুরুষ’, ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’।
বিখ্যাত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘বারো দিনের জীবন’, ‘তুমি সেই তরবারী’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নুরলদীনের সারা জীবন’ তাঁর বিখ্যাত কাব্যনাট্য। এ ছাড়া অসংখ্য অনুবাদ এবং শিশুসাহিত্যে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ হক।)
পিতার ত্যাজ্যপুত্র সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হয়ে কলকাতায় নাখোদা মসজিদের নিচে ডিসপেনসারি দিয়েছিলেন। সেই নাখোদা মসজিদ যেখানে ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ রাখীবন্ধন উৎসবে সবার বারণ উপেক্ষা করে দৃপ্ত পদচারণায় এগিয়ে যান ভাতৃত্বের বিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু সৈয়দ হুসাইনের কলকাতায় থাকা হলো না। একদিন মাগরেবের আজান হচ্ছে, আকাশ টকটকে লাল, হঠাৎ তাঁর মনে হলো আমি এখানে কী করছি? সেই যে তিনি ডিসপেনসারিতে তালা দিলেন সে তালা আর খোলা হল না। চলে এলেন আসামের পাহাড়ি কোলের ঘেষে নেমে আসা দরিদ্র, আর অনুন্নত এক জেলা, কুড়িগ্রামে।
ভাগ্যিস এসেছিলেন। তাঁর আট সন্তানদের ভেতর জ্যৈষ্ঠ সন্তান নইলে যে পেতেন না এমন শৈশব, এমন জলেশ্বরীর ভুবন। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আশঙ্কা তখন হয়তো বৃথা যেত না, পকেটে শৈশব নেই যার সে যেন কল্পনায় সৃষ্টিশীলতার পথে পা না রাখে। আমরাও একজন সব্যসাচীকে পেতাম না। একটা প্রোপাগাণ্ডা হ্যান্ডবিল পোস্টারের চিত্রস্মৃতি থেকে জন্ম নিত না নুরুলদীনের সারাজীবনের মত অনন্য নাট্যসৃষ্টি। আমাদের গভীরে ঠাঁই করে নিত না লাইনগুলো,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়; নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়; নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায় ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়।
আমাদের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক নিজের বাল্যস্মৃতিকে ধরতে চেয়েছেন 'হে বৃদ্ধ সময়' ক্ষুদ্র গ্রন্থটিতে। সে সময় তিনি বালক কিন্তু যখন লিখতে বসেছেন তখন সেই সময় বৃদ্ধ হয়ে গেছে, বৃদ্ধ হয়ে গেছেন নিজেও। আঁজলা ভরে স্মৃতির পাত্র থেকে রাখতে চেয়েছেন গ্রন্থটিতে। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে অনেকখানি গড়িয়ে ঝড়ে গেছে। কিন্তু যেটুকু ধরতে পেরেছেন সেও খানিকটা রেশমের তুলোর মত মোলায়েম। ভেতর দিয়ে ছুঁয়ে যায়।
আট বছর বয়সে বাবার কাছে নামাজ পড়া শিখেছিলেন। ১৪ বছরে এসে নামাজ ছেড়ে দিলেন। বাবা কড়া শাসন করলেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে গমগমে বললেন, 'যাও! রক্ত যখন ঠান্ডা হবে, তখন আবার নামাজ পড়বে।' সে রক্ত আর কখনো ঠান্ডা হয়নি। এক বোহেমিয়ান কন্ঠ তাকে তাড়া করে ফিরেছে শৈশব থেকেই। 'না, আমি তো আসলে এদের কেউ নই, কুড়িগ্রামেরই নই, আমি অন্য কোথাও থেকে দুদিনের জন্যে এই শহরে আসা একজন।'
সেই জলেশ্বরীর পৃথিবীতে বন্ধুত্ব হয় যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে। যুধিষ্ঠির নিয়ে যায় শহরের লাশকাটা ঘরে। বাবার জায়নামাজের নীচ থেকে পয়সা চুরি করে সেই ঘরের লাশকাটা বেদিতে দুজনের জমে ওঠে লুচি মোহনভোগের ভোজ। লাশকাটা ঘরের কথা পড়তে পড়তে অবচেতন মনে এসে ভিড় করে 'আট বছর আগের এক দিন' কবিতার লাইনগুলা,
শোনা গেল লাসকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে; কাল রাতে— ফাল্গুনের রাতের আঁধারে যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ মরিবার হ’লো তার সাধ;
এখানেও কি এমন কেউ এসেছিল লাশ হয়ে? সব ফেলে দুর্নিবার মরণের সাধ নিয়ে?
যুধিষ্ঠিরের বোন মধুয়ার সাথেও পরিচয় ঘটে। বড্ড অসুখকর সে পরিচয়। ভবঘুরে সেই কিশোরীটিকে গুদাম ঘরে পাটের গাঁটের আড়ালে উলঙ্গ করে ইস্টিশানের টালিক্লার্ক বাবু। নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আরেকদিন যুধিষ্ঠির সাথে উড়ে বেড়ানোর সময় মধুয়া এসে জোটে। কথাপ্রসঙ্গে মধুয়া বুকের পেয়ারা দুটো ধরে দেখতে বলে। যুধিষ্ঠির পাশ থেকে শুনেও ভ্রক্ষেপ করে না। উল্টে উৎসাহ দেয়।
সময়ের পালতোলা নৌকায় যুধিষ্ঠির এগিয়ে যায়। নোঙর করে বিপিন। ইশকুলে মুখচোরা বিপিন নিভৃতে এসে স্কুল পথযাত্রী ছাত্রদের মিছিলে। চুপচাপ ক্লাস শেষে ঘরে ফিরে যায়। সেই বিপিনের মারোয়াড়ী গুদামের ভেতর উঠোনের ঘরটা কী সুন্দর করে গোছানো! পরিপাটি। বিপিন তাকে সাজানো জারের মুড়ি বাতাস খেতে দেয়। কিন্তু বাসায় কেউ নেই। বিপিনের মা কোথায় থাকে জানা যায় না। পরে কিছু বছর পেরিয়ে জানা যায়, পাশের গলি বারবনিতা পাড়া বিপিনের মায়ের কর্মস্থল। দেহ পসারিণী হলেও তিনি যে মা। নিজের জগতের বাইরে ছেলে একটু আশ্রয় দিয়ে পড়াশোনা করান। আর সুযোগ পেলেই এসে সব কাজ করে যান দিয়ে নিঁখুতভাবে। ভাতের দাসি বিপিনের মাতৃ হৃদয়, নিজের সংসারের জন্য উদয়াস্ত খেঁটে চলা নিজের মায়ের সাথে অভিন্ন মনে হয়।
হঠাৎ একদিন দূরদেশে যাবার নিমন্ত্রণ আসে। দীর্ঘ ট্রেন যাত্রার পরে ফুলছড়ি ঘাট থেকে চাকা সদৃশ প্রপেলারের বিরাট স্টিমার শিয়ালু (আরিচা) ঘাটে এসে পৌছায়। আরেকটু টমটমে গেলেই মামাবাড়ি, রৌহা। কিন্তু রৌহা পৌছে কৌতূহলী মন চলে যায় জাফরগঞ্জে, ছোট চাচীর বাবা মীর নানার কাছে। মীর নানার মাথাটা নাকি খারাপ হয়ে গেছে। দূরে ক্ষেতের ভেতর নিভৃতে থাকেন দুটো চালার ঘর করে। বড় ঘরে দুর্গামন্ডপের বা পাশে মশারির ভেতর শাদা গোলাপ মোড়ানো কোরআন। ডান পাশে খ্রিস্টানদের একটা ক্রুশ। তিনি পূজাও করেন, নামাজও পড়েন আবার বলে ক্রুশকাঠের ওপর কোশার জল ছিটিয়ে বলেন, 'গড ইজ গ্রেট'। ছোটঘরে ঘুমান বালিশহীন। বুদ্ধের মত ডানহাতের উপর মাথা রেখে। তারপর যুগ যুগান্তর সেই মীর নানা স্মৃতির বেদিতে চিরকাল তাওয়ায়েফ করে চলেন। মনের ভেতর সকল মহামানব জায়গা করে নেন। অন্তঃপর লেখক উবাচ, 'যিশু মোহাম্মদ বুদ্ধ কাউকে আমি ফেলে দিতে পারিনা। সবাই আমার কাছে এক মানুষ হয়ে ওঠে।'
পরাণের গহীন ভেতর সে বৃদ্ধ সময় লুকিয়ে উঁকি দেয়। বার বার স্মৃতিস্রোত বিপরীতে সময় স্রোতের মুখোমুখি দাঁড়ায়। আঁজলা ভরে ধরতে গেলে গড়িয়ে পড়ে। ধরতে না গেলেও এসে ভিজিয়ে দেয়।
'ক্যান তুই গিয়াছিলি?- আমি তরে জিগামু অখন চান্দের ভিতর ফের, যেইখানে জটিলতা বাড়ে, অশথ জড়ায়া থাকে নদী নিয়া জলের কিনারে, আমার গেরাম ঘিরা যেইখানে খালি পলায়ন?-'
যাযাবর ছুটে চলেছে-অতীত থেকে ভবিষ্যতে। তার কাঁধে একটা ঝোলা,যা ভর্তি স্মৃতিতে। কিন্তু যাযাবরের সেই ঝোলা ছেঁড়া, তাতে অনেক স্মৃতি ঝরে পড়ে যাচ্ছে। তবু যটুকু আছে,তাই সম্বল।
যাযাবর তার স্মৃতির ঝাঁপি খুলে, আমাদের গল্প শোনাতে বসে তার অতীতের। সেই সব গল্পে কখনো আসে কুড়িগ্রামের কথা,গোড়া সৈনিকের কথা, স্কুলের কথা,বন্ধুদের কথা। চমৎকার সব স্মৃতি কথা,পড়তে পড়তে বিমোহিত হয়ে পড়ি। কিন্তু দুঃখের কথা হলো বই টি অসমাপ্ত, শেষ করে যেতে পারেননি যাযাবর বা বাদশা।
যাযাবর সময় তার কাঁধে ঝুলি নিয়ে ছুটে চলেছে, অবিরাম সেই ঝুলিতে কুড়িয়ে তুলছে আবার তার কিছু পড়েও থাকছে পথে। এমনটাই ছিলো বালক বয়সের কল্পনা। তবে সময়ের সে ঝুলি ছিদ্রময় আর সেই ছিদ্রের নাম বিস্মৃত।
সৈয়দ রইসউদ্দিন ইংরেজি পড়ার অপরাধে ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করলেন। নিজের খরচে দুবছর পড়ালেখা করলেন কলকাতা মেডিকেলে। টাকা আর সময়ে কুলাতে না পরে ছেড়ে দিয়ে হোমিওপ��যাথিতে চলে যান।
তেরো বছর বয়সে বাবার হোমিওপ্যাথিক নতুন বই "হোমিও মেটেরিয়া মেডিকা" বইয়ের ভূমিকাতে লেখেন প্রথম পদ্য, এটাই ছিলো সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম লেখা।
"হে বৃদ্ধ সময়" বইটা সৈয়দ শামসুল হকের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিকথা। বইটা অসমাপ্ত, হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর ইচ্ছা ছিলো কিছু সংযোজন করবেন এবং সম্পাদনা করবেন। উনার প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোন সম্পাদনা ছাড়া বইটা ছাপা হয়েছে।
শুরু হয়েছে তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময় থেকে আর শেষ হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ও ভারত স্বাধীন হবার সূচনালগ্নের ভেতর দিয়ে। ডাকনাম বাদশা, বেড়ে ওঠা কুড়িগ্রামে। তাই কুড়িগ্রামের মফস্বল শহর, জনজীবন, দরলা নদী ও উৎস সব কিছু কবি জীবনের সাথে মিশে উঠে এসেছে লেখাতে।
স্মৃতি কথা বা জীবনী যাঁরা লেখেন নানান ভাবে লিখে থাকেন। এ যেন গল্প বলে গেলেন আর পাশে বসে শুনে নিলাম এমনটাই মনে হলো বইটা পড়ে। কি সহজ ও আন্তরিকতা মেশানো এ বলে যাওয়াটা ।
এতো দারুণ কাব্যময় শব্দের গাঁথুনি দিয়ে গদ্য লেখা খুব কম পড়েছি। ছেলেবেলার প্রতিদিনের সাধারণ জীবনে যে গভীর দৃষ্টি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাতে শুধুই মুগ্ধতা প্রকাশ করা যায়। এই বইটি হক সাহেব শেষ করতে পারেননি, এই অপূর্ণতা পূর্ণ হবার নয়।
কী সুন্দর বর্ণনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে এক প্রত্যন্ত গ্রামের বর্ণনা অনেক সরল ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন। সব যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছলাম৷ পুরো বইটা লেখক শেষ করতে পারেননি এই আফসোস আমার আজীবন থাকবে।
Time you old gipsy man, Will you not stay, Put up your caravan Just for one day? -Ralph Hodgson
লেখকের মতো আমিও এই চারটা ছত্র দিয়েই শুরু করছি আমার লেখাটি। সৈয়দ হকের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিকথা 'হে বৃদ্ধ সময়।' ছোট্ট বইটায় একটা মধুমাখা ঘ্রাণ আছে, যে ঘ্রাণটা অতীতের কথা সকলকেই মনে করিয়ে দিতে পারে।
কুড়িগ্রামে শৈশব কাটানো সৈয়দ হকের বাবা ছিলেন হোমিও চিকিৎসক। বাবার স্বভাবই তিনি পেয়েছিলেন, সেই স্বভাবটাই, বাউণ্ডুলে বলা যায় কী? নিজ বাড়িতেও নিজেকে অতিথি ভাবতেন সৈয়দ হক। ভাবতেন কদিনের জন্য এসেছেন, কদিন পরেই চলে যাবেন দূরদেশে, কোন অচেনা নগরে একাকী ঘুরে বেড়াবেন, দেখবেন পৃথিবীর সবচাইতে আশ্চর্য সুন্দর কবিতা- মানুষ।
গোয়েন্দা গল্প পড়ে পড়ে অ্যাডভেঞ্চার এর শখ কার না আসে ছেলেবেলায়? একবার রৌহাতে নানাবাড়ি বেড়ানোর সময় জাফরগঞ্জ থেকে রৌহা পর্যন্ত রাস্তার নিশান রাখার জন্য ছোটভাই আর তিনি মিলে খবরের কাগজ ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে গিয়েছিলেন চিহ্ন, যে চিহ্ন ধরে পরদিন ফিরে এসেছিলেন জাফরগঞ্জে, এক পাগলাটে নানার সাথে দেখা করতে, যে নানার ছিল নিজস্ব একটা উপাসনাঘর, যেখানে কোরআন শরীফ, যিশু খ্রিস্ট আর মা দূর্গা থাকতেন পাশাপাশি আর নানা নিজে ঘুমাতেন মাথার নিচে হাত ভাঁজ করে বালিশ ছাড়া, যেভাবে ঘুমাতেন ভগবান বুদ্ধ।
লেখকের এক মেথর বন্ধু ছিল যুধিষ্ঠির, যে তাঁকে লাশকাটা ঘরের নির্জনতা আর রহস্যময়তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আর ছিল বিপিন নামের এক বন্ধু যার মা ছিলেন রূপোপজীবিনী। অথচ অন্তরে চিরন্তন একটা মাতৃমূর্তি খোদাই করা ছিল যার।
যুদ্ধের মরসুমে রেশনের গন্ধ চাল এর ফাঁকে হঠাৎ যেদিন পাশের বাসার দারোগা বৌ সুগন্ধী চালের ভাত খাবার দাওয়াত দেন, সেই সন্ধ্যাটা স্মরণীয় হয়ে থাকে তাই।
সময় এক জিপসী বৃদ্ধের মতো বয়েই চলেছে, যার কাঁধে রয়েছে এক ছিদ্রযুক্ত থলে। যে থলেতে ধরা থাকে স্মৃতিসম্ভার আর ফুটো দিয়ে যা পড়ে যাই তা-ই বিস্মৃতি।
সময়ের চাকা ঘুরে চলেছে অবিরাম। ভবঘুরেও তার গন্তব্যের শেষ ঠিকানায় উপস্থিত। তবুও ছুটে চলতেই হবে আবার কোন নতুন ঠিকানার খোজে। এরই মাঝে কিছু স্মৃতি আর বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় কিছু সময়। এটাই হয়ত জীবন।
বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথির ডাক্তার। যদিও মেডিক্যালের পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। টাকা পয়সায় সংকুলান না হওয়াতে দু বছর পরেই ছেড়ে দিতে হয়। এরপরই হোমিওপ্যাথির পড়াশোনা করেন।
বয়সটা তখন সদ্য কৈশর, মাত্র তের বছর। এর মধ্যেই বাবার হোমিওপ্যাথির বই "হোমিও মেটেরিয়া মেডিকা" এর ভূমিকাতে লেখেন পদ্য। সেই শুরু, সেখান থেকেই সৈয়দ শামসুল হকের লেখালিখি। ছন্দ গদ্য কবিতা পদ্য এরপর ছাড়িয়ে গিয়েছেন যেন নিজেকেই। হয়ত কখনও ভাবেননি লেখক হবে।
"হে বৃদ্ধ সময়" বইটি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা স্মৃতিকাতরতামূলক একটি। যদিও এই বইটি অসমাপ্ত। কারণ বইটি শেষ করার আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পরেন এবং আমাদের ছেড়ে চলে যান। তার মৃত্যুর পর বইটি প্রকাশিত হয়। যদিও তিনি বইটিতে আরও কিছু সংযোজন ও পরিবর্ধন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। তাই ওনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কোন ধরনের সম্পাদনা ছাড়াই বইটি প্রকাশিত করা হয়।
তার ডাক নাম ছিল বাদশা। রাজার রাজা, হ্যা যেন লেখার জগতের বাদশা তিনি হয়েছিলেন। বেড়ে উঠেছেন কুড়িগ্রামে। কুড়িগ্রামের মফস্বল শহর, জনজীবন, ধরলা নদী ও উৎস সব কিছু কবি জীবনের সাথে মিশে উঠে এসেছে লেখাতে। তার স্মৃতিবিজড়িত জায়গা গুলো নিয়ে উঠে এসেছে আবেগ ও অনুভূতি। যেন তিনি বার বার ফিরে পেতে চাইতেন সেই সময়।
গল্পের ছলে নিজের স্মৃতি বা আত্মকথা বলে গেলেন আমাদের। যেন জানিয়ে গেলেন সময় তো বৃদ্ধ হবে। তার সাথে সাথে জীবনও চলবে। তবুও স্মৃতি গুলো অমর হয়ে থাকবে।
সময়ের ঝুলি ছিদ্রময়! সেই ছিদ্রের নাম বিস্মৃতি। পুরোনো দিনের গল্প করতে বসে লোকে খেই হারিয়ে ফেলে, অপ্রতিভ হয়ে বলে, ভুলে গেছি! মনে পড়ছে না! আমি বলি, যতটুকু মনে পড়ছে, ওটুকুই সত্য।
এই প্রচণ্ড রকম কাঁচা সত্য গুলো শুনতে শুনতে সময় এত দ্রুত কেটে গেল! কী ভীষণ সুন্দর গল্প বলার চাল, মনে হয় যেন শুনতেই থাকি।
কিছু পছন্দের অংশ যোগ করে রাখছি, পরবর্তীতে নিজেই দেখব বলে :
১। প্রতি শিশুর ভেতরেই থাকে একজন যিশু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা, সে যে পরের কালে বিশ্বাসঘাতক জুদাস হয়ে যায়, এ তার নিজেরই করণ। এখন আমি দেখি ময়লাটি জামাতেই শুধু, দেহে নয়। মানুষ তবে ময়লা জামায় ফেরেশতা!
২। সুগন্ধ সুন্দর ভাত। জুঁই ফুলের মতো ভাত!
৩। আমার বন্ধুত্ব করতে ইচ্ছে করত তাদেরই সঙ্গে যাদেরই আমি দেখতাম একটু অন্য রকম।
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হকের শিল্প মানের অনন্য সব রচনা থেকে আত্মজীবনী মূলক রচনা ‘হে বৃদ্ধ সময়।’ যা জীবনের শেষ সময়ে লিখিত, মৃত্যুর কারণে এতে যথাযথ সম্পাদনা ও পরিবৃদ্ধি সম্ভব হয় নি, তার প্রতি সম্মানার্থে তার মৃত্যুর পর এ বই তার লিখিত রূপে কোনরূপ সম্পাদনা ছাড়া প্রকাশিত হয়। তার বহু রচনার মধ্যে এই স্বল্প আয়তনের বইখানাও আমার অতি পছন্দের।
রবীন্দ্রনাথ - থিসিস এ ছিল - গত পরশু যেটার রেজাল্ট পাইলাম। আ চাইল্ড'স গার্ডেন অফ ভার্সেস - এখন পড়তেসি এরকম ৪টা বইএর একটা - আর যেটার উপরের এটা কে রাখতে হইসিল আর যেটার উপর এখন আসে এটা - আর হেমিংওয়ে তো গতকাল শেষ করলাম। যদিও হেমিংওয়েও তো সত্য গল্প লিখে। কিন্তু বিপিন এর গল্প - বিপিনেরই গল্প। একজনের জীবনের বিপিন। বিপিনের জীবন - একজন বিপিন!
ভাল লাগলো অনেক। মওলানা আকরম খাঁ ও হয়ত আর বাকি থাকবে না। কিন্তু সৈয়দ প্রথম হকের দ্বিতীয় - তৃতীয় - চতুর্থ বই পড়তে হবে। তাড়াতাড়ি। সময় জোয়ান-ব্যাটা থাকতে থাকতেই।
বেশিরভাগ কবির গদ্যে আমি কেমন একটা মায়াঞ্জন খুঁজে পাই; এই বইটিও ব্যতিক্রম নয়। তেমন আহামরি কোন চমক নেই, রোজকার সহজ সরল দিনগুলোই কবি ফিরে দেখেছেন। চমক যা আছে তা উপস্থাপনার শৈলীতে, দৃষ্টির গভীরতায়। বইটি হক সাহেব শেষ করে যেতে পারেন নি এবং এই অসম্পূর্ণতার আফসোস নিয়েই পাঠক বইটি শেষ করবেন।