"... The morning shift police had gone off duty and the next shift had not yet come. Three young men came rushing towards the building but the guard ran and locked the grill gate of our building, from inside. So they threw bombs at the windows, on the front of our building. We were awakened by the loud sound of an explosion on our windows. It was a very scary experience. I remember, Nabil and Yeshim screaming. Yeshim was crying and screaming "Abbu, hide, please hide!..."
This book is a story of a public university, not only of academics and research but also of dedication, sacrifice, friendship, hardship, sadness, violence, dishonesty, deceit, anger and above all, personal courage. It is the story of young teachers making the campus vibrant. The unquestioned love of the students is what stands out among the list of unusual and exciting incidents, narrated in this book.
সাস্টে ভর্তি হই ১ ডিসেম্বর, ২০১০। ২ তারিখ প্রথম রাস্তায় দেখি জাফর স্যার আর 'তাঁর স্ত্রী' কে। তখন জানতাম মুহম্মদ জাফর ইকবাল অনেক প্রিয় লেখক। আর তাঁর স্ত্রী ও নাকি ফিজিক্স এর প্রফেসর। ম্যা'ম কে নিয়ে অত কিছু মাথায় আসে নাই তখন। যেদিন থেকে হলে থাকা শুরু করলাম তখন থেকে জানতাম কিছুদিন আগেও ইয়াসমিন ম্যা'ম ছিলেন হল প্রভোস্ট। এখন আর নাই। সিনিয়র আপুদের মুখে শুনতাম উনি কি ছিলেন। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবতাম এত সাহসী মানুষ হয়? এভাবে হলের মেয়েদেরকে নিজের মেয়ের মত আগলে রাখে কোন প্রভোস্ট? এটা সম্ভব? নিশ্চয়ই জাফর স্যার এর স্ত্রী বলেই সবাই বাড়িয়ে বলছে। ধীরে ধীরে হল লাইফের বিভিন্ন সমস্যা , নিজের পরিবার ছেড়ে একা একটা মেয়ে দূরে থাকার নানা বিড়ম্বনা যখন আসা শুরু করলো তখন ও সিনিয়র আপুদের কাছে একটা কথাই শুনতাম ইয়াসমিন ম্যা'ম হলে এটা এভাবে ঠিক করতেন। ম্যা'ম থাকলে এই সমস্যা হতো না । অথবা যে কোন সমস্যার প্রথম আর একমাত্র সমাধান ইয়াসমিন ম্যা'ম এর কাছে যাওয়া। এরপর সরাসরি নিজের যখন কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হওয়া শুরু করলো, তখন ভাবতাম ম্যা'ম এর কাছে সত্যি যদি যাই ম্যা'ম তো চিনেন ও না আমাকে; যদি রাগ হন? অনেক চিন্তা ভাবনার পর কয়েকজন সাহস করে গেলাম একদিন ম্যা'ম এর রুমে; কার সাথে যেন আলাপ করছিলেন। আলাপের মাঝে ম্যা'ম এর বক্তব্য ছিল "একটু দাঁড়ান , আমার মেয়েরা এসছে, কথা বলে নেই ওদের সাথে।" এরপর আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন "তোমরা কি একা কথা বলবে?" ওই মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলাম শোনা কথাগুলা একবিন্দুও বেশি ছিলনা। এরপরের যে কয় বছর সিলেট ছিলাম প্রতিটা পদে পদে ম্যা'ম এর হেল্প ছিল। মনে হত মাথার উপর একটা ছায়া আছে। সমস্যা যাই হোক সমধান ইয়াসমিন ম্যা'ম। এই বইতে লিখা বেশিরভাগ ঘটনা হলের সিনিয়র আপুদের মুখে শোনা। শুনে শুনে মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। তারপরে ম্যা'ম এর লিখায় পড়ে মনে হয়েছে সব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। নিজের ছাত্রীদেরকে 'আমার মেয়ে' মুখে বলা সহজ কিনা জানি না। কিন্তু সবার বলাতে আন্তরিকতা বোঝা যায় না। ইয়াসমিন ম্যা'ম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মেয়েকেই 'আমার মেয়ে' বলেন এবং সেটাতে আন্তরিকতার এক তিল পরিমাণ কমতি নেই।
জাফর ইকবাল-ইয়াসমীন হক আমার খুব প্রিয় এক দম্পতি। তারা এদেশে ১৯৯৫ সাল থেকে স্থায়ীভাবে চলে আসেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেন। এতদিন মু জাফর ইকবাল এর বিভিন্ন কলাম থেকে জেনেছি তার পর থেকে তাদের জন্য সময়টা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু তারই সহযাত্রী ইয়াসমীন হক এই প্রথম এসব ব্যাপারে মুখ খুললেন- তাই স্বভাবতই এই বইটা নিয়ে আমার আগ্রহের সীমা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইয়াসমীন হক বিচ্ছিন্ন ভাবে নানা ঘটনা-উপঘটনার মাধ্যমে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন তাদের এই দীর্ঘ ২২ বছর সময়টি । আমি সিলেট ওসমানী মেডিকেলে পড়াশোনা করায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় আমার খুব পরিচিত জায়গা, নানা কাজে বহুবার গিয়েছি এবং সিলেটে আছি ২০০৯ সাল থেকে। তাই বইয়ে বর্ণিত নানা ঘটনা ও জায়গা আমার কাছে পরিচিত ছিল। কিছু কিছু ব্যাপার অাধাআধি জানতাম। যেমন সাস্টের দুইটা ছেলে একবার মারা যায় ঘুরতে গিয়ে, তাদের দুষ্কৃতিকারীরা হামলা করেছিল- আমার মনে আছে এই পুরো ঘটনা নিয়ে অনেক গুজব শুনেছিলাম। বন্ধু শাহরিয়ার মজুমদারের মৃত্যু নিয়েও ইয়াসমীন হক যখন স্মৃতিচারণ করলেন এক জায়গায় তখন চমকে উঠলাম,কারন আমরা ওর মৃত্যু নিয়ে যেমন চিন্তা করেছি ইয়াসমীন হকও সেভাবে চিন্তা করেছেন। জাহানারা ইমাম হলের নামকরণ, একমুখী শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন, এসএমএস পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার নিবন্ধন, অলিম্পিয়াড ইত্যাদি নানা পরিচিত ঘটনার ভিতরটা কেমন ছিল, কিভাবে শুরু হল বা পরিচালিত হল সেসব সম্পর্কে আমার অনেক কনফিউশন দূর করতে বইটা সহায়তা করেছে সেটা নিদ্বির্ধায় বলতে পারি। এসব আন্দোলন-ঘটনা-উপঘটনায় এই দম্পতির ভূমিকা আগেই জানতাম, কিন্তু যেটা আমার ধারণা ছিল না, মু জা ই এর স্ত্রী হিসেবে নয়, ইয়াসমীন হক নিজ কর্মদক্ষতায় গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ আমাদের সময়ের জন্য। নিজ ব্যক্তিত্বে তিনি অসাধারণ তেজস্বী এক নারী। আমার মতে এই বইমেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বই সাস্টে ২২ বছর।
ড: ইয়াসমিন হক ও ড: জাফর ইকবালের কল্যাণে শাবিপ্রোবি আজ দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে শূণ্য থেকে শীর্ষে যাত্রাটা মসৃণ ছিলো না। ছাত্র রাজনীতি, ক্যামপাসে সহিংসতা, শিক্ষকদের দলাদলির ঘাত-অভিঘাতে ইয়াসমিন হকের একজন পাকা প্রশাসকে পরিণত হয়ে উঠার সাথে শাবিপ্রোবির বিবর্তনটা ও যেন প্রতিফলিত হয়। ভাবলে কষ্ট লাগে যে ইয়াসমিন হকদের মতো মেধাবী গবেষকদের যেখানে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা ছিলো, সেখানে দলাদলি ও সহিংসতা সামাল দিতে দিতেই উনাদের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যেও যে একটা আন্তর্জাতিক মানের নন-লিনিয়ার অপটিক্স ল্যাব ও গণিত অলিম্পিয়াড আন্দোলনের সূচনা করতে পেরেছেন, সেটা ইয়াসমিন হকের অনন্য কৃতিত্ব।
২০১৫ সালের ভিসিবিরোধী আন্দোলনের করুণ পরিণতি দিয়ে বইটির সমাপ্তি। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে জাফর ইকবালের একটি চিঠি এই অধ্যায়ে বিধৃত হয়েছে। জাফর ইকবাল আন্দোলনকারীদের সরকারকে চাপমুক্ত রেখে নিরামিষ আন্দোলন করার উপদেশ দিয়েছিলেন; যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকারই একমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে, তাই কোনমতে সরকার উৎখাত হয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। বারংবার "আমি রাজনীতি বুঝি না" আওড়ানো জাফর ইকবাল রাজনীতি বুঝেন না দেখেই হয়ত বুঝেন না যে সরকারকে চাপ দেয়া আর সরকার উৎখাত করা এক জিনিস নয়। বস্তুত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার সবসময়ই জনগণের চাপে থাকে; একমাত্র স্বৈরাচারী রাষ্ট্রেই সরকার নির্ভার থাকে। শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বহিস্কার করার জন্য শেখ হাসিনার নির্দেশে জাফর ইকবাল আস্থা রেখেছিলেন, কিন্তু জাফর ইকবালের পরামর্শ-অনুসারে আন্দোলন স্থগিত করার সাথে সাথে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সদর্পে ক্যামপাসে ফিরে আসে। এহেন পরিপূর্তিতে বিস্মিত হওয়া একমাত্র জাফর ইকবালের পক্ষেই সম্ভব।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে হলের নামকরণের অধ্যায়টা নিয়ে আমি বিশেষ আগ্রহী ছিলাম, কারণ বিএনপি-জামায়াতের সেই সন্ত্রাসের ঝড়ঝাপ্টা এই দম্পতির উপর দিয়েই গেছে, তাঁদের দুই সন্তান আর কখনও সিলেটে স্থায়ীভাবে ফিরেনি। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিলো, কিন্তু নির্বাচন সন্নিকটে থাকায় বিএনপি-জামায়াতের সাথে প্রত্যক্ষ সংঘাতে যেতে আগ্রহী হয়নি। সে আমলে দেশে নির্বাচন হতো, নির্বাচন ঘিরে হিসাব কষাকষি হতো, ২০২০ সালে বসে এসব পড়লে মনে হয় how quaint! তবে দিনশেষে ছাত্রী হলের নাম শহীদ জননীর নামে হয়েছে, এটাই স্বস্তির বিষয়।
শাবিপ্রোবিতে ইয়াসমিন হকের ২২ বছরের ক্যারিয়ারের এই আলেখ্যে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে হলের নামকরণ কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস দেখি, আবার আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামী লীগেরও সন্ত্রাস দেখি। ইয়াসমিন হকের সেই উদ্দেশ্য না থাকলেও পরোক্ষভাবে এই বইতে বাংলাদেশের রাজনীতির অচলায়তন ও ভবিষ্যৎ গতিধারা ফুটে উঠেছে। বিএনপি-জামায়াতের জঙ্গী আদর্শবাদী সন্ত্রাস আর আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী সন্ত্রাসের মাঝে পার্থক্য আছে বৈকি, কিন্তু সেটা কেবলই তত্ত্বীয় পার্থক্য। নারায়ে তাকবির বলে চাপাতির কোপ দিক আর জয় বাংলা বলে হকিস্টিকের বাড়ি দিক, দিনশেষে ব্যথাটা একইরকম লাগে। যে মা ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়ে নিঃসন্তান হয়, যে সন্তানের পিতা ক্রসফায়ার হয়ে যায়, তার কিছুই যায় আসে না খুন হবার সময় নারায়ে তাকবির স্লোগান দেয়া হইসিলো নাকি বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদী স্লোগান দেয়া হইসিলো।
২২ বছর পর শাবিপ্রোবির করুণ অবস্থা দেখে ইয়াসমিন হক - জাফর ইকবাল হিসাব মেলাতে পারেন না, কীভাবে পরিস্থিতি এমন হলো। উনারা বিজ্ঞান-গণিত যতোটা ভালো বুঝেন, রাজনীতি ততোটা বুঝলে প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতেন।
এবারের বইমেলায় যখন শুনলাম জাফর ইকবালের স্ত্রী ইয়াসমীন হক সাস্টে তাদের দীর্ঘ ২২ বছরের দিনলিপি আকারে একটা বই লিখেছেন, প্রথমে খুব কৌতূহলী হলেও শেষের দিকে বইটা কেনা হয়নি। বলা যায়, মাথা থেকে একরকম বইয়ের কথাটা হারিয়ে যায়। কিছুদিন আগে হুট করেই বন্ধু তানভির আলীমের কাছ থেকে বইটা পাই। খুব একটা দেরি না করে পড়া শুরু করে দেই। সত্যি বলতে বইটা পড়ার আগে আমার কাছে ইয়াসমীন হকের মূল পরিচয় জাফর ইকবালের স্ত্রী হিসেবে ছিল। কিন্তু বইটা শেষ করার পর মনে হচ্ছে জাফর ইকবালের মূল পরিচয় হবে তিনি ইয়াসমীন হকের স্বামী !
জাহানারা ইমাম হলের নামকরণ, একমুখী শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা, SMS পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার নিবন্ধন, দাবা অলিম্পিয়াড ইত্যাদি নানা পরিচিত ঘটনার ভিতরটা কেমন ছিল, কিভাবে এর শুরু হল বা পরিচালিত হল সেসব সম্পর্কে খুব দারুণ কিছু তথ্য দিয়ে বইটা সহায়তা করেছে সেটা এক কথায় বলা যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফাঁকে ফাঁকে হালকা মজার কাহিনি গুলো ছিলো বেশ আনন্দদায়ক। হয়ত এভাবেই আমাদের জীবন কেটে যায়, দুঃখ আর সুখের মাঝে। বইয়ের এক জায়গায় প্রিয় বড় ভাই শাহরিয়ার মজুমদারের মৃত্যু নিয়েও ইয়াসমীন হক যখন স্মৃতিচারণ করলেন তখন চমকে উঠতে হয় বইকি! যার সাথে মৃত্যুর তিনদিন আগেও কথা হয়েছিলো বই নিয়ে; সে কিভাবে আত্মহত্যা করতে পারে? এতো টা হতাশায় আছে তো মনে হয়নি। দুঃখের বিষয় সরকারী তদন্তে(?!) সে আত্মহত্যা করেছে।
ম্যাম বইটি ইংরেজিতে লিখেছিলেন। জাফর স্যার অনুবাদ করেছেন। সাবলীল অনুবাদ। এক বৈঠকেই পড়ে ফেলার মতো বই। একদম রোলার কোস্টার রাইড। শিবু'দার প্রচ্ছদটা বেশ আকর্ষণীয়। আর লেখকের ছবি তুলেছে আমারই বন্ধু তানভীর আলীম ! এখন বুঝলাম ব্যাটা কেন আমাকে পড়তে দিয়েছে ! অবশ্য বই পড়তে গিয়ে বেশ কিছু ছাপার ভুল চোখে পড়েছে। আশা করি পরবর্তী সংস্করণে সেগুলো শুধরে নেওয়া হবে।
দেকার্তে বলেন - 'ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সাথে কথা বলা।' বই পড়ে মনে হল ইয়াসমীন ম্যামের কাছ থেক উনার জীবনের গল্প শুনছি। কি প্রাণোচ্ছল সেই গল্প ! সিনেমায় মন্তাজ বলতে যেমন একটি দৃশ্যের সাথে আরেকটি দৃশ্যের জোড়া লাগিয়ে তৃতীয় অর্থ নির্দেশ করা। তেমনি ভাবে শব্দের সঙ্গে শব্দ যুক্ত হয়ে সাস্টকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। অসাধারন লেখনী। অবশেষে এক কথায় শেষ করতে গেলে বলা যায়, যে জীবন দেখিনি, তেমনই আরেকটা বই পড়া হয়ে গেল।
ভালো থাকুক সাস্ট। আরো অসাধারণ লেখা উঠে আসুক প্রিয় জাফর ইকবাল - ইয়াসমীন হক দম্পতির হাত ধরে। ভালোবাসা !
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসমীন হক উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ২২ বছরের কর্মজীবন নিয়ে একটি বই লিখেছেন ’22 Years at SUST’ নামে। আমি মূল বইটি পড়তে পাইনি, পড়েছি মুহম্মদ জাফর ইকবালকৃত অনুবাদ ‘সাস্টে ২২ বছর’ ফলে এই পাঠপ্রতিক্রিয়াটি আসলে অনুবাদ বইটির। যেহেতু অনুবাদকর্মটি মুহম্মদ জাফর ইকবাল করেছেন তাই বইটি পড়তে গিয়ে ভাষাগত কারণে প্রায়ই মনে হয়েছে ‘মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা বই’ পড়ছি। মূল বইটি পড়তে পেলে ইয়াসমীন হকের ভাষা, শব্দচয়ন, উপস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলা যেত। সেটি যখন ঘটেনি তাই বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনাতে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
ইয়াসমীন হকের পরিচয়ের ব্যাপারে সবচে’ ক্লিশে বাক্যটি হচ্ছে — ইয়াসমীন হক মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্ত্রী। কথাটি সত্য বটে, এবং বাংলাদেশে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বেশ জনপ্রিয় লেখক, আলোচিত ব্যক্তিত্ব বলে ইয়াসমীন হকের পরিচয় দানের ক্ষেত্রে এই বাক্যটি আসা স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মানুষ, যিনি একটি বিশেষ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহন করেছেন, ঐ বিষয়ে বহু বছর ধরে অধ্যাপনা ও গবেষণা করে আসছেন, একজন দক্ষ শিক্ষা প্রশাসক হিসাবে অনেক বছর কাজ করেছেন, শিক্ষা বিষয়ক নানা উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, নানা প্রকার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর পরিচয় কেবল তাঁর বৈবাহিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা শুধু আপত্তিকর নয়, তাঁর শিক্ষা-কর্ম-গবেষণা-অবদানকে অস্বীকার করার বা খাটো করার নীচ প্রয়াসও বটে। সুতরাং ‘অধ্যাপক ইয়াসমীন হক’ বা ‘ডঃ ইয়াসমীন হক’ বলে তাঁর পরিচয় দেয়াটা শ্রেয়। স্বীয় অবদানগুণেই তিনি ভাস্বর, অন্য কারো আলোয় নয়।
বাংলাদেশে একটি অপেক্ষাকৃত নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কিছু কীভাবে মোটামুটি শূন্য থেকে নির্মিত হয়, কীভাবে এর এক একটি অন্তঃপ্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, কীভাবে তার সংস্কৃতি-ঐতিহ্য তৈরি হয়, কী করে সেখানে একটু একটু করে নোংরা বিষয়গুলো ঢোকে, দুর্নীতি-অসদাচরণ-নীচতা-মিথ্যাচার-অদক্ষতা-নোংরা রাজনীতি কীভাবে তার শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে গ্রাস করে, কীভাবে বিপুল সম্ভাবনার অপমৃত্যু হয়, কীভাবে মরুতে ঘাসফুল ফোটে সে সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা পাবার জন্য এই স্মৃতিচারণমূলক বইটি যথেষ্ট। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জীবন নিয়ে আরও কিছু বাংলাদেশী অধ্যাপকের বিচ্ছিন্ন রচনা পড়ার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সুশীলতার মিথ্যাভাষণে এতোটা পূর্ণ যে সেগুলো পাঠকের বিশ্বাসযোগ্যতা পায় না। এই বইটি অমন সুশীলতার দোষ মুক্ত।
ব্যক্তিগতভাবে আমার বাংলাদেশের দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে — একটি বিশাল বড়, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়; আর একটি খুবই ছোট, বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। নানা জনের কৃপায় বিশ্ববিদ্যালয় দুটিতে ৬ বছরের পাঠ প্রায় ১১ বছরে সমাপ্ত করা সম্ভব হয়েছিল। প্রায় এক যুগের কাছাকাছি সময় ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ, অবস্থান ও যাতায়তের ফলে এই বিষয়ে যে সম্যক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তাতে বলতে পারি এই বইটি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির এক সৎ বর্ণনা। যেহেতু বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বা অন্য কোন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কোন অভিজ্ঞতা আমার নেই তাই এইসমস্ত বিষয়ের কোনরূপ তুলনা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। এখানে কিছু কিছু ঘটনার বা বিষয়ের বর্ণনা পড়তে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতায় থাকা অনুরূপ ঘটনা বা বিষয়ের কথা ম���ে পড়ে শিউড়ে উঠেছি।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী এই চার গোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে গঠিত। এখানে শিক্ষার্থীরা মুখ্য গোষ্ঠী, কারণ তাদের নিমিত্তে বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা হয়েছে এবং তা যথাযথ পরিচালনার জন্য বাকি তিন গোষ্ঠীকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। সম্ভবত এই কারণে শিক্ষার্থীদেরকে বাকি তিন গোষ্ঠীর মানুষ সচরাচর সহৃদয়তার চোখে দেখতে চান না। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ধরেই নেন শিক্ষার্থীরা যা কিছু দাবি করবেন তা নির্বিচারে নাকচ করতে হবে। অবশ্যই এই সকল বিষয়ের ব্যতিক্রম আছে, এবং ব্যতিক্রম নিয়মেরই অংশ। তাই ইয়াসমীন হক যখন বলেন,
“এটা মনে হয় সত্যি যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণ ভাষা বোঝে না, তাদের সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলতে হয়”
তখন স্পষ্ট হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে বাকিদের সম্পর্কের মাত্রাটি কীরূপ! আমার মতো ভুক্তভোগীরা তো বটেই, কেউ একটি বিশেষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহ গণমাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও এই সত্য অনুধাবন করতে পারবেন।
বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধাসমূহের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রায়ই অনীহা থাকে। চরম কোন আন্দোলনের পর্যায়ে না গেলে সেসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করতে চান না। ইয়াসমীন হক বলেছেন,
“আর বিশেষ করে যখন মেয়েদের নিয়ে কিছু করতে হয় তখন তারা সেটাকে কোনো গুরুত্বই দিতে চায় না।“
আমি এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি যেখানে নারী শিক্ষার্থীদেরকে পৃথক শৌচাগারের জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে। নারীদের জন্য যে পৃথক শৌচাগার প্রয়োজন সেটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুরুতে বিবেচনা করার উপযুক্ত মনে করেননি। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা উচ্চ শিক্ষিত জনেরা চালান তাদের এহেন আচরণ ইঙ্গিত করে দেশের বাকি জনসাধারণ নারীদের প্রয়োজনসমূহের ব্যাপারে কতোটা উদাসীন হতে পারেন।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হত্যা বা ধর্ষণের শিকার হলে শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া, প্রশাসনের উদাসীনতা এবং বিচার না হবার চিত্রটি এখানে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় একটি কথা বলি, হত্যা বা ধর্ষণের মতো চরম মাত্রার ফৌজদারী অপরাধ, সেটি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে হোক আর অন্যত্র হোক, সংঘটিত হলে রাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে মামলা করে যথাযথ তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা করা কাম্য। কিন্তু বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এমন কিছু হলে খুব কম সময়ে তার বিচার হয়, যথাযথ শাস্তি হয় আরও কম। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার বা চাকুরিচ্যুতি হত্যা বা ধর্ষণের মতো অপরাধের শাস্তি হতে পারে না — কিন্তু বাস্তবে বড় জোর তাই হয়। একারণে, সাত জনকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেও কাউকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় না অথবা শতাধিক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে কেক কেটে ‘সেঞ্চুরি’ উদযাপনকারীকে পরবর্তীতে পুনর্বাসন করা হয়।
এই বইয়ে শিক্ষার্থীদের কিছু অদ্ভূত আচরণের কথা এসেছে বিশেষত ২০১১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ‘চ্যাংগের খাল’-এ অনীক ও খায়রুলকে হত্যার প্রসঙ্গে। সহপাঠিনীদেরকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টায় যখন দুই সহপাঠী জীবন দেন তখন বেঁচে যাওয়া সহপাঠিনীরা লোকলজ্জার ভয়ে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে আত্মত্যাগকারীদেরকে পরিত্যাগ করতে পারে তাতে ইয়াসমীন হক অবাক হন। কিন্তু শত-সহস্র বছর ধরে এদেশের সমাজ নারীদের জন্য যে উন্মুক্ত নরক তৈরি করে রেখেছে সেকথা বিবেচনায় নিলে ইয়াসমীন হক বুঝতেন যে অনীক ও খায়রুলের ঐ সহপাঠিনীদের আচরণ অকল্পনীয় ছিল না।
নিহত অনীক ও খায়রুলের বাকি সহপাঠীরা তাদের সৎকারের জন্য যথাযথ চেষ্টা অথবা অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা না করে অহেতুক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সেনসেশন তৈরি করে তার এক করুণ উদাহরণ এই ঘটনা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন ঘটনা বার বার ঘটে, সেগুলো নিয়ে নানা জনে নানা মন্তব্য করেন কিন্তু ন্যায় ও মানবতার নির্মোহ অবস্থান থেকে এমন বিশ্লেষণ খুব সুলভ নয়।
সবাই জানেন এমন একটি বিষয়, যা খুব কুণ্ঠার সাথে আমাদের স্বীকার করতে হয়, সেটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, বিশেষত তার ছাত্র সংগঠনের নৈরাজ্য, অন্যায়, অত্যাচার এবং তাতে শিক্ষকদের একাংশের নির্লজ্জ সক্রিয় সহযোগিতা। এই প্রকারই আরেকটি বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিযুক্ত উপাচার্য ও তার বশংবদ শিক্ষকদের নোংরা রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কেউ কেউ এসব বিষয় নিয়ে এক-আধটু বলেন বটে তবে প্রায়ই তা দলকানা দোষে দুষ্ট হয়। ইয়াসমীন হক এই ব্যাপারে দলনিরপেক্ষভাবে লিখেছেন — সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখেছেন। তবে ব্যাপারটি এমন নয় যে ইয়াসমীন হকের অবস্থান অরাজনৈতিক, বরং তিনি ঘোরতরভাবে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তিনি কট্টরভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। কোন বিবেচনায় তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, জামায়াত-শিবির প্রশ্নে আপোষ করতে রাজি নন্। এই ব্যাপারটি অকুণ্ঠচিত্তে অনেকেই স্বীকার করেন, কিন্তু কাজের বেলায় কেউ কেউ প্রতিপক্ষের হুমকিতে পিছিয়ে পড়েন। এই ব্যাপারে ইয়াসমীন হক কথায় ও কাজে অভিন্ন — তাঁর লেখায় বার বার সেটা ফুটে উঠেছে।
বইটি কালানুক্রমে লেখার কিছুটা চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু প্রায়ই সেটা লঙ্ঘিত হয়েছে। পরের ঘটনা আগে বা আগের ঘটনা পরে আসায় কিছু কিছু বিষয়ে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বিষয়ানুযায়ী অধ্যায় ভাগ করে লিখলে প্রত্যেকটি বিষয় আরেকটু বেশি স্পষ্ট করা যেতো এবং এতে অনেক পুনরাবৃত্তি রোধ করা যেতো।
একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীরা তাঁর সন্তানবৎ, পক্ষান্তরে একজন শিক্ষা প্রশাসকের কাছে তারা অধস্থন মাত্র। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে সাম্যাবস্থায় রেখে শাসন ও সোহাগ দুটোই বজায় রাখা এক দুরূহ কাজ। অধ্যাপক ইয়াসমীন হক সেই কঠিন কাজটি সাফল্যের সাথে করতে পেরেছেন বলে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা হচ্ছে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ। শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে পারলে দেখা যায় বয়সে তরুণ বলে সংসারের অনেক কালিমাই তাদের স্পর্শ করতে পারেনি এবং তাদের বেশিরভাগের মন সুন্দরের পূজারী, ভালোবাসায় পূর্ণ। তাই তাদের কাছে দুহাত ভরে ভালোবাসা নিয়ে গেলে তারা ভালোবাসার ডালি নিয়ে হাজির হয়। এই সত্যটি অধ্যাপক ইয়াসমীন হক অনুধাবন করে তদানুরূপ অনুসরণ করায় তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন,
“আমি আবার বলতে চাই যে আমি সাস্টে যত দিন আছি, আমার সব থেকে সুন্দর সময় কেটেছে একটা কারণে, সেটি হচ্ছে আমি আমার হলের মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারতাম।”
একজন পাঠক বইটি যতই অগ্রসর হবেন ততই তাঁর কাছে এটা স্পষ্ট হতে থাকবে যে, আলোচ্য বিশ্ববিদ্যালয়টি বিপুল সম্ভাবনা নিয়েও আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এক নিঃসীম অন্ধকারের পথে যাত্রা করেছে। ফলে দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে, অধ্যাপনা করে, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেও লেখকের কাছে এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়টি তার কাছে আর চেনা ঠেকে না। তিনি বলেন,
“এটা দেখতে ঠিক আগের মতনই আছে। কিন্তু তার পর মুহূর্তেই মনে হয় এটি আসলেই কত ভিন্ন একটি ক্যাম্পাস”!
তারপরেও তিনি আশা হারান না। আস্থা রাখেন তাঁর শিক্ষার্থীদে��� ওপর। শেষে তিনি উচ্চারণ করেন,
“ছাত্রদের ওপর আমাদের যে বিশ্বাসটুকু আছে সেই বিশ্বাসটুকু আমাদের পথ চলায় প্রেরণা জোগায়। আমি সব সময়েই অনুভব করেছি যে, এই ক্যাম্পাসে কী হচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা তার সবকিছু জানে এবং বুঝে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ভবিষ্যতে সাস্টকে মাথা উঁচু করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে”।
২০১৩ সালের পহেলা জানুয়ারী খুব ভোরবেলা। বাবার সাথে আমি সিলেট এলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। এখানে একা একা থাকতে হবে এখন থেকে। আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভুতি কাজ করছিলো। কেমন করে এখানে একা একা থাকবো এরকম বিষয়াদি।
এখন ২০১৭। শেষ সেমিস্টার চলছে। আর কয়েকদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার করে ফেলবো। এই শেষ সময়টায় দাঁড়িয়ে সেই '১৩ সালের পহেলা জানুয়ারীর ভীতু ছেলেটার দিকে তাকালে মনেহয় এই সাস্টে না আসলে জীবনের সম্ভবত খুব বড় অধ্যায় অদেখা থেকে যেত।
আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি খোদা আমাকে বিশাল একটা কপাল দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলো যে জাফর স্যারের মতন একজন মানুষের ক্লাসে বসার সুযোগটুকু আমার হয়েছে এবং আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচাইতে বড় প্রোজেক্টটা এমন একজন মানুষের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে করতে পারছি।
যাইহোক বই নিয়ে কিছু কথা লেখা যাক এবারে। জাফর স্যার ইয়াসমিন ম্যাম দম্পতি সম্ভবত আমার দেখা সবচাইতে সেরা দম্পতিদের মধ্যে অন্যতম। এই দম্পতির অনেক অজানা সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে এই বইতে। গত ৪ ঘন্টায় এক নিঃশ্বাসে আমি এই বইটা শেষ করে এখন এটা লিখতে বসেছি। প্রিয় সাস্টের অনেক অজানা ইতিহাস এই চার ঘন্টায় জানা হয়ে গেছে আমার। বিষয়টা মোটেই বিশ্বাস করার মতন না যে এটা ম্যামের প্রথম লেখা।
কিছুদিন পরেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের ইতি ঘটবে। কিন্তু শেষবেলায় এমন একটা লেখা পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাবার সময়কার দুঃখের অনুভুতিটাকে কিছুটা বাড়িয়েই দিয়েছে বৈকি। ভালো থাকুক প্রিয় সাস্ট। এমন আরো লেখা আসুক প্রিয় জাফর ইকবাল - ইয়াসমীন হক দম্পতির হাত ধরে। ভালোবাসা!
কিছু কিছু বইয়ের রেটিং ঠিক কিভাবে দিব বুঝতে পারিনা। সাস্টে ২২ বছর হচ্ছে তেমনই একটা বই,। বইটার কনটেন্ট নিয়ে রিভিউ দিব নাকি অনুবাদ নিয়ে বুঝতে পারছি না। লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে বইটার কনটেন্ট নিয়ে না লিখে আমার নিজের ফিলিংস নিয়ে লিখলে মেবি ভাল হবে। সাস্টে ২২ বছর বইটা লিখেছেন আমাদের সুপরিচিত এবং আমার শ্রদ্ধাভাজন জাফর ইকবাল স্যারের সহধর্মিনী ইয়াসমিন হক। জাফর ইকবাল স্যারকে আমার যেমন পছন্দ তেমনি ইয়াসমিন হক ম্যামকে নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে আমার দারুন আগ্রহ ছিল। কারন, জাফর ইকবাল স্যার যা করেছেন (বেল ল্যাব এর চাকরি ছেড়ে নিজের বাচ্চাদের ভবিষ্যৎকে একপ্রকার অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেশে এসে সাস্টে যোগদান, ধীরে ধীরে সাস্টকে গড়ে তোলা, ক্রমাগত জামাত শিবির এর বিরুদ্ধে কথা বলা এবং জনমত গঠনে সাহায্য করা ইত্যাদি) সেটি করার জন্য সাপোর্ট সিস্টেম না থাকলে সম্ভব হত কিনা সেটি নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের একজন নারী হিসেবে ১৯৭৬ সালে ইয়াসমিন হক অবিবাহিত অবস্থায় পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন সেটাও আমার কাছে অনুপ্রেরণাদায়ক বলে মনে হয়। কাজেই বইটি আমি পড়ব তা জানতাম কিন্তু বইটি পড়তে এত দেরী হল কেন সেটি সঠিক জানিনা। বইটার নাম বইটার কনটেন্ট এর ব্যাপারে খানিকটা সেলফ এক্সপ্ল্যানেটরি। সাস্টের শুরু থেকে ২২ বছরের অম্লমধুর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইটি। আমরা সাধারণত কোন/কারো ব্যাপারে নিজস্ব জাজমেন্ট দেবার সময় সারফেসে যা দেখা যায় সেইসব উপাত্ত নিয়েই বিচার করতে বসি। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে হলে আসলে ভেতরের ঘটনাবলি জানতে হয়। ইয়াসমিন হকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বর্ণনায় সাস্টের অনেক ভেতরের ব্যাপার নিয়ে একটু ঝলক দেখা যায়। বইটিকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। সাস্ট গড়ে ওঠার সময় থেকে নানা উত্থান পতন ইত্যাদির গল্পটা জানা যায়। জাফর ইকবাল স্যারের সেই বিখ্যাত(কিংবা হৃদয়বিদারক) বৃষ্টিতে ভেজার ছবিটার পেছনের গল্পটাও জেনেছি বইটা পড়ে। ক্যাম্পাস রাজনীতির কদর্য রুপ, রাজনীতির বলি হওয়া ছাত্র, অনেকক্ষেত্রে কিছু করতে না পারার বেদনা এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও পড়তে হবে, সবকিছুই মধুর নয়। আমি জাফর ইকবাল স্যরের করা অনুবাদ পড়েছি। অনুবাদের মান নিয়ে ততটা সন্তুস্ট নই। বাংলা অনুবাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, বইটি অনুবাদের সময় সেগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ইংরেজি থেকে একটা বাক্য সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পড়তে আরামপ্রদ হয়না, জাফর ইকবাল স্যার ও এই সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এছাড়া বইটি চমৎকার। সামাজিক, শিক্ষাসহ জীবনের নানাদিক নিয়ে ব্যক্তি ইয়াসমিন হকের চিন্তাভাবনার জায়গাটি কিছুটা বুঝতে পেরে আমি আপ্লুত। কনটেন্টের জন্যই ৫ তারা দিলাম। অনুবাদের মান বিচারে তা কিছুটা কমবে।
এই বইটা নিয়ে আমি শুরু থেকেই বেশ এক্সাইটেড ছিলাম। নিরাশ হইনি খুব একটা। এদেশেরই একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে দুই বছর কাটানোর পরে, আসলেই জানি এইখানে জীবন কতোটা বিচিত্র হতে পারে। আর স্টুডেন্টরা চার-পাঁচ বছর পরে বদলে গেলেও শিক্ষকরা থেকেই যান। তাদের বিচিত্র সেই অভিজ্ঞতার কিছুটা জানতে পারা গেল এই বইটি থেকে। এমনিতেই আমি বেশ কৌতূহলী ছিলাম এই ইয়াসমিন হক-জাফর ইকবাল দম্পতিকে নিয়ে। তাদের দাম্পত্য জীবনের ঘটনা এখানে তেমন নেই বললেই চলে, তবে সাস্টে কাটানো বাইশ বছর জীবন যথেষ্ট কৌতূহল উদ্দীপক ছিলো। আমি যেহেতু সরাসরি সাস্টের সাথে যুক্ত না, তাই ঠিক জানি না, তবে ইয়াসমিন হক মানুষটিকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। সিকিউরিটি অফিসারের বাড়ির সামনে গার্লস হোস্টেলের ময়লা রেখে আসা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়েলের ট্রেনের কামরার জানালার স্ক্রু খুলে কাচ খোলার ঘটনার মতো বেশ কিছু মজার ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার অন্যদিকে জাহানারা ইমাম হলের প্রভোস্ট ফারহানা ফারাহ ইসলামের মৃত্যু/হত্যাকান্ড, কিংবা অ্যানীর সুইসাইড নিয়েও বেশ প্যারা লেগেছে আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টার্নাল কিছু পলিটিক্সের ব্যাপারও উঠে এসেছে এখানে। শিবির আর ছাত্রলীগের ধাওয়া পালটা ধাওয়ার পেছনে ইয়াসমীন হকের মারপিট থামাতে ছুটে যাওয়া কিংবা রাজনৈতিক দলের সহিংসতায় মৃত্যু, ভিসির ড্রামাবাজিসহ, শিক্ষকদের কিছু কোন্দল- এসব কখনো হাস্যরস আর কখনো বা তিক্ততার মাধ্যমেই উঠে এসেছে। বইটিতে "দেখুন জাফর ইকবাল কিভাবে মেয়েদের সাথে নাচছে, ভিডিওসহ" ট্যাগলাইনের যে সেই "বিশেষ ভিডিও" তার ব্যাখাও পাওয়া যাবে কিন্তু!
যাই হোক, সব ভালোর মধ্যে মন্দ কিছু তো আছেই। আমি সরাসরি ইয়াসমিন হকের লেখা বইটিই (যেটি ইংরেজিতে লেখা) কিনেছি, তবুও প্রথমদিকে মনে হচ্ছিলো লেখা আমাকে টানছে না। তারপর বইটির অনুবাদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল করেছে শুনে আমি অনুবাদ পড়া শুরু করি। তখন অনুবাদের চেয়ে আমার আসল বইটিই বেটার মনে হয়েছে, অনুবাদটা একদমই জমছিলো না।
যাই হোক, সবকিছু মিলিয়ে, আমার বইটি এবং লেখক দুইজনকেই বেশ ভালো লেগেছে, আর এইটাই আসল কথা!❤️
এই বইয়ের মূল লেখা নিয়ে রিভিউ লেখার দুঃসাহস আমার নাই। কি রকম শক্ত কঠিন আর দৃঢ় মনোবল থাকলে এরকম একজন মানুষ হওয়া যায় সেটা বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব না। জাফর ইকবাল স্যারের সাহস আর শক্তির ৭০ ভাগের বেশিই মনে হয় এই মহিলা পেছন থেকে জোগান দিয়ে গেছেন ক্রমাগত। অবশ্য শুধু সাহস থাকলে হয় না। যথেষ্ট বোকাও(কথায় আছে যে বোকারাই এ দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি সাহসী!) হতে হয়। তারা স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই যে অসম্ভব বোকা তা তাদের কর্মকাণ্ড দেখলেই বোঝা যায়। নাইলে কিসের আশায় তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় এত দূর্যোগ, ভীতি, বিপদ উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সবকিছু বদলানোর চেষ্টা করে গেলেন! সব কিছু দিন শেষে নষ্টদের অধিকারেই যাবে, উনাদের জীবদ্দশায়ই হয়ত উনারা তা দেখে যাবেন। তাও হয়ত উনারা আবার পথে নামবেন! বোকা না হলে এসব কেউ করে নাকি?!
যা হোক, বইয়ের লেখনি অত্যন্ত প্রাঞ্জল। জাফর স্যারের অনুবাদও সুখপাঠ্য বলা যায়। দুশ পৃষ্ঠার বই দু বেলায় টেনে শেষ করে ফেললাম।
অত্যন্ত সুখপাঠ্য স্মৃতিকথা৷ মুহাম্মদ জাফর ইকবাল অনুবাদক হিসেবেও যথেষ্ট সফল।
১৯৯৫ সালে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এবং তাঁর স্ত্রী ইয়াসমীন হক যোগ দিলেন নতুন প্রতিষ্ঠিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই থেকে পরবর্তী ২২ বছরের বিভিন্ন ঘটনা যা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষকতাকে ঘিরে তা নিয়েই ইয়াসমীন হকের ২২ বছর।
খন্ড খন্ড ঘটনা আকারে স্মৃতিগুলো লিখেছেন অধ্যাপক ইয়াসমীন হক। তাঁর পুরো বইটা পড়লে অত্যন্ত স্পষ্ট একটি ধারণা পাওয়া যায় এদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে। তিনি যদি পুরো বইটার নাম দিতেন 'কীভাবে চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়' তাও ভুল হতো না।
ছাত্রলীগ কর্তৃক জাফর ইকবালকে সাস্টে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, ক্যাম্পাসে শিবিরের কনডম ছিনতাই, ছাত্রদলের ধর্ষণ, নামকরণ নিয়ে বিএনপি,জামাতের নোংরা রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির অন্ধকার দিকটা খুব ভালো করে তুলে ধরেছেন ইয়াসমীন হক। তাঁর রসবোধের প্রশংসা না করলে অবিচার হবে।
পুরো বইটা অধ্যাপক ইয়াসমীন হকের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। ঘটনা তিনি তাঁর অবস্থান থেকে বিচার,বিশ্লেষণ করে লিখেছেন। তাই অন্যপক্ষের কথা যাচাই করা সম্ভব নয়৷ মোটকথা অনেকের পক্ষেই অভিযোগ রয়েছে বইতে। তথ্যগুলো ক্রসচেক করা সম্ভব নয়। তাই শতভাগ আস্থা বইটির পক্ষে অর্জন অসম্ভব।
তবে লেখার গতি দুর্দান্ত। পড়তে গিয়ে খুব আনন্দ পেয়েছি।
ইয়াসামীন হকের সাস্টে কাটানো ২২ বছরের রোলার কোস্টার জীবনের সাথে পাঠকের পরিচয় হবে। ২২ বছরের টুকরো টুকরো ঘটনার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠা লেখিকার দৃঢ় ব্যক্তিত্বই সম্ভবত এই বইয়ের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। বইটা পড়ার আগে পাঠকের কাছে হয়তো ইয়াসমীন হকের মূল পরিচয় জাফর ইকবালের স্ত্রী হিসেবে হয়ে থাকবে কিন্তু বইটা শেষ করার পর জাফর ইকবালের মূল পরিচয় মনে হবে তিনি ইয়াসমীন হকের স্বামী...
একটা ছেলে দৌঁড়াচ্ছে, রামদা হাতে তাকে তাড়া করছে আরেকটা ছেলে। আর দুজনকেই ধাওয়া দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ইয়াসমীন ম্যাম! তাঁর নাকি রামদা দেখে খুব ‘মেজাজ গরম’ হয়েছিল, তাই তিনি দুজনকে ধরে বলেছিলেন, ‘তোমরা এসব করতে পারো না!’
এই বইয়ের তাৎপর্য তার সাহিত্যগুণের জন্য না, বইটার সাথে সম্পর্কিত মানুষগুলোর জন্য। গত বাইশ বছর ধরে সাস্টে ম্যামের যাত্রার একটা চিত্র যেমন বইতে দেখা গেছে, তেমনই আংশিকভাবে দেখা গেছে জাফর ইকবাল স্যারের মূর্তিটাও। স্যারের গল্পের ‘দুই টেকি আপা’-র মত স্যার নিজেই যে স্টেশনের পিচ্চিদের দুই টাকা দিতেন, কিংবা মহব্বত আলীর একদিনের ঘটনাটা যে সাস্টে প্রায় হুবহু ঘটেছিল—এসব আমি জানতাম না। জানতাম না যে, আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড শুরু করার জন্য স্যার টেলিফোনে মতিউর রহমান সাহেবের সাথে রীতিমত হুংকার দিয়ে চেঁচামেচি করেছেন! ব্যাপারটা কল্পনা করে আমার অসম্ভব তৃপ্তি হচ্ছে।
বইতে সাস্টের ছোটখাট একটা ছবিও আমরা দেখি, অবধারিতভাবেই সেটা ম্যামের চশমা দিয়ে একবার ছেঁকে নেয়া। চশমাটা অস্পষ্ট হলে দুশ্চিন্তার কারণ ছিল, কিন্তু এই চশমা যথেষ্টই স্বচ্ছ। সম্ভবত জাফর স্যারের চেয়েও। যেটার অভাব অনুভব করেছি—সেটা হল রেফারেন্স। কেবল এই একটা জিনিস না থাকার কারণে ভবিষ্যতে এই বই নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলার সুযোগ পাবে।
মূল লেখাটা ছিল ইংরেজিতে, সেটা বাংলায় অনুবাদ করেছেন জাফর ইকবাল স্যার। কাজেই বইটা পড়তে গেলে চোখে একটা জাফর ইকবাল–জাফর ইকবাল ঘ্রাণ লাগে। এতে অবশ্য সমস্যা নেই, বরং এতে আমি খুবই আগ্রহী। কেমন যেন ছেলেবেলা–ছেলেবেলা একটা ভাব চলে আসে!
তবে হতাশ হয়েছি তাম্রলিপির প্রুফ রিডারের অবস্থা দেখে। তাম্রলিপিও যদি নির্বোধ হতে শুরু করে, তাহলে কপালে খানিকটা দুঃখই আছে।
I go through her (Yasmeen mam) 22 years in just 12 hours. Almost all chapters I couldn't hold my mind that I was reading a story of a 'university'! By natural, A university would be gathered by the best intellectuals of a nation- simply no disagreement I think. But I was swimming in the turbulence of corruption, violence, dishonesty, deceits, people of contradictions. I read her a sailor of a ship that tries to heading to hope of lighthouse in that turbulence. Politics and its paws be loose in the storm of that turbulent sea we live in nationally. Let the 'Tuesday Adda' be the power to hope, to dream, to go ahead.
প্রথমে রসকষহীন দিনলিপি ভেবে একটু বোরিং লাগছিল, কিন্তু পরে দেখলাম- বইটি আসলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গঠন, শিক্ষানীতি আর নিজস্ব মতাদর্শের প্রতি আত্মনিবেদিত কিছু মানুষের জীবনের খণ্ডিত প্রতিচ্ছবি, যে কারণে তাঁরা "শক্তের ভক্ত, নরমের যম" দুনিয়াতে ভালোভাবে, নিজেদের আদর্শ ধারণ করে বেঁচেবর্তে রইলেন! এখনো সমাপ্তি রেখা ছুঁতে না পারলেও অন্তত আমার কাছে এটি এক নাগাড়ে দেড় শতাধিক পৃষ্ঠা পড়ে শেষ করার মত একটি ঘটনাবহুল, আগ্রহ জাগানিয়া বই বলে মনে হয়েছে। আর অবশ্যই- প্রখ্যাত মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্ত্রী রূপে নয়, একজন তেজস্বিনী-সাহসী নারী শিক্ষক রূপে ইয়াসমীন হকের পরিচয় এখানে বিধৃত হয়েছে।।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে নিয়ে আমার অনেক কিছু জানা থাকলেও ওনার ওয়াইফ সম্পর্কে আমি তেমন একটা কিছু জানতাম। ইয়াসমীন হক এতো সুন্দর চিন্তার একজন মানুষ বইটা না পড়লে হয়তো এটাও অজানা থাকতো। একজন মহিলা কতোটাই না স্ট্রং,বিউটিফুল এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
সাস্ট নিয়ে আমার ছোট বেলা থেকেই একটা অ্যাট্রাকশন কাজ করতো কারণ যেহেতু জাফর ইকবাল স্যার ওখানের শিক্ষক ছিল। কিন্তু সাস্টের ভিতর যে কত শ রকমের ঝামেলা ছিল তা এই বইটা পড়লে জানা যায়। এছাড়াও সাস্ট কর্তপক্ষের জন্যই আমাদের দেশের একাডেমিকে অনেক নতুন নতুন কিছু যুক্ত হয়েছে।
"সাস্টে বাইশ বছর" বইটাতে ইয়াসমীন হক ম্যামের ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাস্টের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেছেন,কিছু তিক্ত কিছু মিষ্টির। বইটা পড়ে বেশ ভালো লেগেছে,অনেক কিছু জানতে পেরেছি।কারোর সময় নষ্ট হবে না এ কথা বলতে পারি।
আর যেহেতু ম্যাম বইটা ইংলিশে লিখছেন আর জাফর ইকবাল স্যার তা বাংলায় অনুবাদ করেছেন তাই লেখাও অনেক সাবলীল।
বেশ কয়েক মাস আগে ড. ইয়াসমিন হক ম্যামের লেখা 'সাস্টে ২২ বছর' বইটা পড়েছিলাম। তিনি সেখানে বাংলাদেশে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঘটে চলা ঘটনাগুলোর স্মৃতিচারণা করেছেন। অদ্ভুত সুন্দর একটা বই। ১৯৯৫ সালে জাফর ইকবাল স্যার ও ইয়াসমিন হক ম্যাম তাঁদের দুই সন্তানদের নিয়ে চলে আসেন বাংলাদেশে এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।
২২ বছর বেশ দীর্ঘ একটা সময়। বইয়ের প্রতিটি ঘটনাই শুরু হয়েছে দিন-ক্ষণ দিয়ে। লেখকের প্রতিটি ঘটনা তারিখসহ মনে থাকার কারণ হলো একদিন আড্ডার সময় লেখককে নোটবুক আর এক ডজন কলম উপহার দিয়ে এই বাইশ বছরের স্মৃতি লিখতে বলা হয়। যার ফলে আমরা এই বইটা হাতে পাই।
সেই ২২ বছরের কর্মজীবনে ম্যাডামের জীবনের নানা মধুর অভিজ্ঞতার সাথে অনেক তিক্ত ঘটনাও ঘটে যায়৷ তাই তাঁর মনে হয়েছিল নিজেকে ভালো একটা অনুভূতি দেয়ার জন্য জীবনের ঘটনাগুলো লিখে রাখা দরকার।
বইটা শুরু হয়েছে কীভাবে তাঁরা সাস্টে যোগ দিলেন সেই ঘটনা দিয়ে। এরপর প্রতিটা অধ্যায়ে দীর্ঘ ২২ বছরের ছোট-বড় নানারকম অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। সব স্মৃতি মধুর ছিল না, ভয়ংকর এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞতাও তাঁর স্মৃতির ঝুলিতে ছিল।
পুরো বইটা ইয়াসমীন হকের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। হলের প্রভোস্ট হওয়ার ঘটনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি, জাহানারা ইমাম হলের নামকরণ, একমুখী শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা, গণিত অলিম্পিয়াড, তাঁর প্রফেসর হওয়া, পিকনিক, ছাত্রদের সাথে বৈরী সম্পর্ক, হলে ইন্টারনেট সংযোগ, ভালোবাসা দিবসের বিতর্ক, SMS পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার নিবন্ধন, বিভিন্ন সময়ে তার কাজগুলো খুব প্রাণোচ্ছল ছিল সেটা পড়লে বোঝা যায়।
অত্যন্ত সুখপাঠ্য এবং মান-অভিমানে পূর্ণ একটা স্মৃতিকথা। বইটা ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করে বিভিন্ন কাহিনী লেখা হয়েছে। যার জন্য লেখার ধরন বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। আমি জাফর ইকবাল স্যারের অনুবাদটা পড়েছিলাম, উনার লেখা নিয়ে নতুন কিছু আর বলার নেই। তবে একটা ব্যাপার বলবো, বইটা এক বসায় শেষ করবেন না, এক বসায় শেষ করলে ভালো নাও লাগতে পারে৷ . . বইয়ের কিছু কিছু ঘটনা এত মজাদার৷ যেমন: "...সেই শিক্ষক, তখনো কাঁপছেন, কাঁপতে কাঁপতে বললেন, " আজকে আমি সবচেয়ে বিচিত্র একটা জিনিস দেখেছি। আমি দেখলাম একজন মহিলা এই দুটি ছাত্রকে ধাওয়া করে নিয়ে যাচ্ছে।" আমি হেসে বললাম, "ওই মহিলাটি হচ্ছে আমার স্ত্রী।"
"...অবশ্য এটা অস্বীকার করা যাবে না যে এই নাচানাচির সাথে সত্যিকারের নাচানাচির সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না। মেয়েরা জাফর আর আমাকে টেনে নিয়ে এল এবং আমরা দু'জনও একটু হাত-পা নেড়ে, মিউজিকের সঙ্গে সঙ্গে নাচের ভঙ্গি করলাম। সেই নাচের ভিডিওটি তুলে কেউ ইন্টারনেটে দিয়ে দিয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল যে "জাফর ইকবাল মেয়েদের সঙ্গে সারারাত ধরে নাচানাচি করেছে।" খুবই কায়দা করে তারা অবশ্য সেখানে একটা তথ্য গোপন করে রাখলো সেই সময়টিতে আমি-তার স্ত্রী তার পাশে ছিলাম, অন্যান্য অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রভোস্টরাও ছিল, শুধু তা-ই না, সেই নাচের অনুষ্ঠানে সেখানে বার'শ মেয়ে ছিল।"
এই ভিডিওটা আমাকে বেশ আগে আম্মু দেখিয়ে বলছিল, "দেখ তোর জাফর ইকবাল স্যার আসলে কেমন।" অনেকদিন পর সেই ঘটনার আসল কাহিনী জানতে পারলাম, আর জেনে আবারও সেই ভিডিওটা দেখে আসলাম :p
Though she isn't a professional writer but she has written well. She and Zafar Iqbal Sir have sacrificed a lot for SUST. They have faced such difficult situations which cannot be described in words. What I remember most is that she said she had to see dead bodies of several of her students, went to police station, hospitals for them and these were really painful for her. She said this wasn't in her job description, she wasn't prepared for this. Really, being a good and honest teacher in public university of Bangladesh is not an easy task! Another thing I remember is that a teacher said to Zafar Iqbal that he saw two students chasing each other with arms and a woman chasing both of them! This woman was Yasmeen Haque and the students were leaders of two opposite parties, fortunately/unfortunately her direct students! :P I always knew though all of us love and know about accomplishments of Zafar sir, her wife isn't any less than him. I am glad that she have written this book and I have read it. She is really a hardworking, brave and nicely dangerous person!
খুব সহজ ইংরেজিতে লেখা ২২ বছরের ঘটনাবলী। যারা ইংরেজি খুব অল্প জানে তাঁদের পড়তে খুব আরাম হওয়ার কথা। ইতিহাসকে কেউ যদি রাজ রাজড়ার কথা আর মোটা দাগের কয়েকটা যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে ধরে (ধরাটা ভুল), তাহলে এই বইটা তেমন একটা ব্যাক্তিগত উপাখ্যান, যেগুলো শুধু মোটা দাগের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। ২২ বছর আর বৃহৎ পরিসর দাবি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়ান যদি বর্ণা করতে হয় তাহলে এটি প্রয়োজন বৈকি। ভার্সিটির উত্থান পতনের গল্প মোটা দাগে উঠে এসেছে। ব্যাক্তিগত সংযোগ অনেক ক্ষেত্রে লেখক এড়িয়ে গেছেন। ভাষার দক্ষতা ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে ইংরেজি নয়, বাংলা পড়ছি।
জাফর ইকবাল স্যারের প্রতি মুগ্ধতা ছিল অনেক আগে থেকেই, প্রথমে তার বইগুলো পড়ে, এরপর ধীরে ধীরে বই লেখা ছাড়া ভিতরের মানুষটাকে একটু হলেও চিনতে পেরে। ইয়াসমীন হক ম্যামের সম্পর্কে খুব ছাড়া ছাড়া ভাবে জানতাম। এজন্য মানুষটা কেমন, কী, কোন আন্দাজ ছিল না। এই একটা বইয়ে হয়তো বোঝা যাবে না মানুষটা কেমন, তবে যেটুকু বুঝেছি তাও কম না। সাস্টে পড়তে চাওয়ার অন্যতম কারণ ছিলেন জাফর ইকবাল স্যার কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওখানে না গিয়ে আসলে বেশ কিছু জিনিসই মিস করেছি। :'(
একজন সাস্টিয়ান হিসেবে বইটা পড়ার সময় অবশ্যই মানসিক টানাপোড়েন এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ভালো লাগার বিষয় হলো একটি সাহসিকতার বাস্তব উদাহরন দেখলাম, আর খারাপ লাগার বিষয় কিছু অপ্রিয় সত্য জানা। And it took me only 4 and a half hour.......
মূল বইটি ইংরেজিতে লেখা। ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বইটিকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
পূর্ব কথাঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল আমার একজন প্রিয় লেখক। কৈশোরে উনার প্রবাস জীবন নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই থেকে উনার স্ত্রী ইয়াসমীন হক, পুত্র নাবিল এবং কন্যা ইয়েশিমকে চিনেছি। তখন থেকেই পুরো পরিবারের প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিলো। যখন দেখলাম ইয়াসমীন হক বই লিখেছেন, তখন অবশ্য পাঠ্য হিসেবে সেটা কিনে ফেললাম। তার উপর বইটা যেহেতু উনার এক প্রকার জীবনী, তাই সেখানে মু.জা.ই. সম্পর্কে অনেক তথ্য থাকবে। এটা কি মিস করা যায়?
আমার পাঠকানুভূতিঃ এক কথায় জানতে চান? - অসাধারণ।
বইটা এতটা ভালো লাগবে, চিন্তাও করিনি। বইয়ে বাক্য গঠনে সমস্যা আছে, ভাব প্রকাশে সমস্যা আছে, যতি চিহ্নের সমস্যা আছে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে অসম্ভব শক্তিশালী লেখনী। ডঃ ইয়াসমীন হক যে পরিমাণ নির্ভীকভাবে বইয়ে বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করেছেন, আমি মুগ্ধ। সহজ,সরল, সাবলীল লেখার সাথে উনার রসিকতাও মুগ্ধ করেছে বৈকি।
অনেকেই আমরা প্রতীকের সাহায্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সম্পর্কে কথা বলি, বা উহ্য রাখি তাদের নাম। পাঠক অনুমানে বুঝে নেন আমরা কাকে লক্ষ্য করে সারকাজম করছি, বা কাদের মন্দ দিক তুলে ধরছি। কিন্তু ডঃ ইয়াসমীন এত সাহসী যে, তিনি সবার নাম ধাম তুলে খারাপ কাজের কথা বলে দিয়েছেন। সেটা আওয়ামী লীগ হোক, বিএনপি হোক, কিংবা হোক সাস্টের ভাইস চ্যান্সেলর। শুধু নাম হলেই তো হল না, তাই দিন তারিখসহ সবকিছুই উনি উল্লেখ করেছেন। পাঠকের মনে ঐসব কাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আসলে তিনি যাচাই করে নিতে পারবেন।
পুরো বইয়ে ছোট ছোট চ্যাপ্টারে ভাগ করে বিভিন্ন কাহিনী লেখা হয়েছে। এতে আমার একটা উপকার হয়েছে। মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়েছে, এবং লেখার ধরন বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ছোট ছোট চ্যাপ্টারে লেখা হলেও তাতে ডঃ ইয়াসমীন যেভাবে বিভিন্ন চরিত্রকে বর্ণনা করেছেন, তাতে ঐসব চরিত্রের সাথে আপনার একাত্ম হয়ে যেতে কোনো সমস্যাই হবে না। একই কাণ্ড হয়েছে আমার ক্ষেত্রেও। "ফাহমিদা"-র জন্য যেভাবে ঝরঝর করে চোখের পানি পড়েছে, তাতে আমি নিজেই অবাক! ফাহমিদাকে নিয়ে মাত্র কয়েকটা লাইন লিখে লেখক যেভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছেন, তাতে অবাক না হয়ে উপায় নেই।
জামাতের দাবীর কাছে আওয়ামী লীগের নত মস্তক, মোসলেহ উদ্দিন নামক অশৈলী একজন ভাইস চ্যান্সেলর, বিএনপি সরকারের কুকীর্তি, কিংবা জামাত শিবিরের তাণ্ডব সম্পর্কে লেখক এত খোলামেলা আলোচনা করেছেন যে, আমি ক্রমাগত টাশকি খেয়েছি। সাস্টের বর্ণাঢ্য (কালো + ঝলমলে) ইতিহাস, কিংবা রাজনীতি, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এফেয়ার, সর্বোপরি একজন শিক্ষক কিংবা একজন সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের জীবন সম্পর্কে জানার জন্য বইটা সবার পড়া উচিৎ।
শেষ কথাঃ জাফর ইকবাল অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন ইয়াসমীন হককে তাঁর ২২ বছরের স্মৃতিকথা লেখার জন্য। ইয়াসমীন হক লিখেছেন এবং সেটা থেকে আমরা জানতে পেরেছি, কী দারুণ ব্যক্তিত্বই না তিনি! একজন জাফর ইকবালের সাথে একজন ইয়াসমীন হক থাকলে সঠিক পথে হাঁটার রাস্তা অনেক সহজ হয়ে যায়। আমরা যারা সাস্টে লেখাপড়া করিনি, তারা হয়তো জাফর ইকবালের পেছনে ইয়াসমীন হকের শক্ত অবস্থান সম্পর্কে খুব একটা জানতাম না। কিন্তু এই বই পড়ে অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম, ইয়াসমীন হক কী দৃঢ় চরিত্রের একজন মানুষ! জাফর ইকবাল প্রকাশ্যে লেখালেখি করেন বলে তাঁর মতামত আমরা জানতে পারি, তাকে এত পছন্দ করি। কিন্তু ইয়াসমীন হকও একই রকম মানুষ, শুধু তাঁর লেখালেখির অভ্যাস নেই বলে তাঁর অনেক উদ্যোগ সম্পর্কেই আমরা অসচেতন ছিলাম। যা হোক, এই বইটা এজন্যেই অনেকের আই ওপেনার হিসেবে কাজ করবে।
লেখকের দিন তারিখ মনে থাকার কারণে একদিন আড্ডার সময় লেখককে নোটবুক আর এক ডজন কলম উপহার দিয়ে এই বাইশ বছরের স্মৃতি লিখতে বলা হয়। যার ফলাফল হচ্ছে এই বইটা।
১৯৯৫ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়াসমীন হক এবং মুহাম্মদ জাফর ইকবাল কীভাবে যোগ দিলেন সেই ঘটনা দিয়ে ইয়াসমীন হক বইটা শুরু করেন। এরপর প্রতিটা অধ্যায়ে দীর্ঘ ২২ বছরের ছোট-বড় নানারকম অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। বলাই বাহুল্য, সব স্মৃতি মধুর ছিল না, ভয়ংকর এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা যা আমরা চিন্তাও করতে পারি না, সেসব ঘটনারও উল্লেখ আছে।
হলের প্রভোস্ট হওয়ার ঘটনা এবং বিভিন্ন সময়ে তার কাজগুলো খুব প্রাণোচ্ছল ছিল সেটা পড়লে বোঝা যায়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাব কেমন প্রভাব ফেলে সেটার বর্ণনাও মন খারাপ করে দেয়।
জাহানারা ইমাম হলের নামকরণ, একমুখী শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা, SMS পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার নিবন্ধন ইত্যাদির প্রক্রিয়া তারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং এই বইয়ে এসব নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছেন।
পুরো বইটা ইয়াসমীন হকের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফাঁকে ফাঁকে হালকা মজার কাহিনী ছিলো যা বেশ আনন্দদায়ক। ঘটনা তিনি তাঁর অবস্থান থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করে লিখেছেন।
বইটা ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করে বিভিন্ন কাহিনী লেখা হয়েছে। যার জন্য লেখার ধরন বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। তবে ঘটনার ক্রমবিন্যাসে সামঞ্জস্যতার হালকা অভাব ছিল।
বইয়ের প্রচ্ছদ সুন্দর। তবে বানানের অবস্থা ভয়ংকর খারাপ। শব্দের বানান তাও মানা যায়, সংখ্যার বানান ভুল হলে বুঝতে হবে, আসলেই অবস্থা খারাপ। এই বইয়ে সংখ্যার ভুল যেমন ছিল, শব্দের ভুলও মাত্রাতিরিক্ত ছিল যেটা খুব হতাশাজনক। আর মুদ্রাদোষের মতো "কাজেই", "আসলেই", "আমার মনে আছে" এরকম কিছু শব্দ বারবার ব্যবহার করার জন্য পড়তে বিরক্তি লেগেছে।
আমি জাফর ইকবালের অনুবাদ পড়েছি। পড়ার সময় খুব কম সময়ই মনে হয়েছে জাফর ইকবালের না, ইয়াসমীন হকের বই পড়ছি!
পাবলিক ইউনিভার্সিটির ভেতরে অনেক কমপ্লিকেটেট সিস্টেম এটা আমি জানতাম কিন্ত নতুন করে আবার সব কিছু জানলাম ইয়াসমিন ম্যাডামের সাস্টে ২২ বছর বইটা পড়ে। ম্যাডামের সাথে অনেক আগে একবার একটা দাওয়াতে দেখা হয়েছিলো তখন কথা বলেই বুঝতে পারছিলাম উনি অনেক মন খোলা একটা মানুষ এবং যে কাউকে খুব সহজেই আপন করে নিতে পারেন যা বইয়ের মাঝে আরো ভালোভাবে ফুটে উঠেছে এবং এই বইটা না পরলে আমি অনেক কিছুই জানতে পারতাম না আমাদের রাজনীতি, শিক্ষানীতি এবং দেশপ্রেমের অনেক কিছুই। এত বাঁধা পেরিয়ে উনাদের জায়গায় অন্য কেউ হলে অনেক আগেই দেশ ছেড়ে চলে যেত! ম্যাডাম এবং স্যারের মত শিক্ষক পাওয়াটা আসলে ভাগ্যের ব্যাপার। বইটা পড়তে পড়তে কখনো জোরে হেসে উঠেছি আবার অনেক সময় খুব মন খারাপ করেছি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা যে ইচ্ছা করে ধ্বংস করে দেয়ার একটা পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করে আসছে সেটা আবার পরিস্কার ভাবে জানলাম ম্যাডামের মাধ্যমে। সবকিছু মিলিয়ে বইটা আমার কাছে অসাধারন লেগেছে! অনেকের কাছেই হয়ত ভালো নাও লাগতে পারে তবে আমি বলব যারা এখনো পড়েনি পরে ফেলতে পারেন । ধন্যবাদ। #হ্যাপি_রিডিং
এমন সত্যিকার অর্থে শক্ত, কোনো অন্যায়ে মাথা নত না করা মানুষ আমাদের মধ্যে অত্যন্ত কম। আমি দেখি না।
শুধু নারী নয়, যে কোনো মানুষের একটা প্রচন্ড অনুপ্রেরণার উৎস হবার মতো ব্যক্তিত্ব ইয়াসমীন হক। মুহম্মদ জাফর ইকবালকে সবাই খুব ছোটবেলা থেকে আমরা চিনেছি কিন্তু আমার এর আগে ইয়াসমীন হক এর নাম জানা ব্যতীত আর কোনো ধারণা ছিলো না। তার স্বকীয় কর্ম ও দীপ্ততার ব্যপ্তি আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা দুজন একেবারে আলাদা ভাবে স্বীয়কর্মের মাধ্যমে নিজ নিজ অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন, তবু জাফর ইকবালের জাফর ইকবাল হয়ে ওঠার পেছনে ইয়াসমীন হক এর উপস্থিতি অনেকাংশই প্রাসংগিক এ কথা বললে হয়তো অত্যুক্তি করা হবে না।
এ বইটি অনেকটা টাইমলাইনের মতো তার সাস্টে থাকাকালীন ছোট ছোট ঘটনার সম্মিলন। শুধুই কিছু ঘটনা বলা, তাতেই এক দৃঢ়চেতা মানুষিকতার যে একটা সত্যিকার দৃষ্টান্তের লিখিত রূপ প্রকাশিত হয়েছে, তা অবাক হয়ে দেখতে হয়।
বইটা দুদিন আগে শেষ করেছিলাম। ব্যস্ততার জন্যে রিভিউ দেয়া যায় নি!
জাফর ইকবাল স্যারের অনুবাদে উনার স্ত্রী স্মৃতিচারণ মূলক বই, প্রবন্ধ ধরনের। প্রবন্ধ আমার প্রিয়। সেই অর্থে ভাল লেগেছে। বইয়ের সেন্স অব হিউমার অনেক বেশি জোস! হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গিয়েছিল, কিছু কাহিনীর টুইস্টে।
বইটা কী আত্মজীবনী ? : বলা যায়, অনেকটা।
বইটার শেষ প্রবন্ধটা আমার কাছে ভাল লাগে নি। বেশিই অন্ধভক্ত মনে হয়েছে। আওয়ামীলীগ আমিও পছন্দ করি, অন্তত বিএনপি এর থেকে, তবে তাদের খারাপটা বলতে হবে না ? মানুষের খারাপটা যদি সে নাই-ই জানে, তবে শোধরাতে কীভাবে? কিছু ক্ষেত্রে গান্ধীজির নীতি খুবই বিরক্ত লেগেছিল। তাছাড়া হলগুলোর উন্নতির জন্যে ইয়াসমীন হক অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার!
লেখিকার লেখনী তেমন পছন্দ হয় নি। পুরোটা সময় ধরে বোঝা যাচ্ছিল অপরিপক্ক হাতের লেখা। তবে লেখিকা যা নিয়ে লিখেছেন তা বেশ আকর্ষণীয়, অন্তত আমার কাছে। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কিভাবে চলে, শিক্ষকদের নিজেদের ভিতরের রাজনীতি এবং ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা সম্পর্কে হালকা জ্ঞান পেলাম। তার জন্য লেখিকাকে ধন্যবাদ।
নয়টা বাজে ঘুম থেকে উঠে মুখটুখ না ধুয়েই পড়া শুরু করেছিলাম, আর হাত থেকে নামাতে পারি নাই। নিজের ভার্সিটি বলেই বোধহয় এত ভাল লেগেছে, প্রায় প্রতিটি ক্যারেক্টার কেই চিনি ! একটা ড্রব্যাক, স্যার অনুবাদ করায় বইটায় স্যারের লেখনী গন্ধ টা বড় বেশি লাগে। ম্যাম যদি অনুবাদ কাজটা করতেন, আমার মনে হয় বইটা আরো বেশি উপভোগ্য হতো।
অধ্যাপক ইয়াসমীন হক, স্ব নামেই ভাস্বর হলেও সবসময় জাফর ইকবাল স্যারের সুর্যালোকে ঢাকা পড়ে থাকেন। কিন্তু এই বই পড়ে আরো অনেক বেশি করে চিনলাম এক সাহসী মহিলা কে, যিনি নির্দিধায় আমেরিকার সুখী জীবন ছেড়ে বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত জেলা শহরে চলে এসেছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে। যেখানে ওনার ছেলে মেয়ের পড়া শোনার জন্য ভাল স্কুল নেই বলে, নিজে স্কুল গড়েছেন। তবে যে মহিয়সী রামদা হাতে কোপাতে আসা ছাত্র কে খালি হাতে পালটা ধাওয়া দিয়ে বলতে পারেন,”তোমরা এটা করতে পারনা” তার সাহস নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর। তার নাকি রামদা দেখে খুব মেজাজ গরম হয়েছিল। ঘরে বোমা পড়ার পরে নিজের সন্তান দের থেকে দূরে থেকেও হাল ছেড়ে দেন নি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কে কিভাবে শুন্য থেকে শুরু করার সময় থেকে সাথে ছিলেন, কিভাবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন হয়ে এক সময় মনঃকষ্ট সাথে নিয়ে অবসর গ্রহন করলেন, এর মাঝে ২২ বছর এর বিভিন্ন দিনলিপি নিয়ে এই বই “সাস্টে ২২ বছর”। অদক্ষ প্রশাসনে সাথে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ শিক্ষার্থীদের মেলে না, তখন বোঝাই যায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে চলছে। তাই ইয়াসমীন হক বলেন, “এটা মনে হয় সত্যি যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণ ভাষা বোঝে না, তাদের সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলতে হয়”। জাহানারা ইমাম হলের নামকরণ, একমুখী শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা, SMS পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার নিবন্ধন, দাবা অলিম্পিয়াড ইত্যাদি নানা ঘটনার ভিতরটা কেমন ছিল, কিভাবে এর শুরু হল বা পরিচালিত হল সেসব সম্পর্কে অনেক অসাধারন তথ্য জানলাম । গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফাঁকে ফাঁকে হালকা মজার কাহিনি গুলো ছিলো বেশ আনন্দদায়ক। তবে শহীদ জনণী জাহানারা ইমাম এর নামে হলের নাম করণ কে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত এর সন্ত্রাস দেখি, আবার ভিসি কে রক্ষা করার আন্দোলনে ছাত্রলীগ দ্বারা শিক্ষক দের উপর আক্রমণ ও দেখি। তুমুল বৃষ্টির মাঝে জাফর ইকবাল স্যার এর শহীদ মিনার এর বেদী তে বসে থাকার সেই ছবি আজ ও চোখে লেগে আছে। বিএনপি-জামায়াতের জংগী হামলা আর আওয়ামীলীগের সন্ত্রাসের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখি না। নারায়ে তকবির বলে চাপাতির কোপ এর সাথে পিঠের উপর জয়বাংলা হকিস্টিকের ব্যথা একই। “আমি আবার বলতে চাই যে আমি সাস্টে যত দিন আছি, আমার সব থেকে সুন্দর সময় কেটেছে একটা কারণে, সেটি হচ্ছে আমি আমার হলের মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারতাম।” বার বার এই বই এ ছাত্রী দের কে পরিচয় দিয়েছেন নিজের মেয়ে বলে। জাহানারা ইমাম হলের প্রভোস্ট থাকা কালীন সময়ে বার বার মেয়েদের পক্ষে লড়াই করেছেন। হলের খাবার থেকে ময়লা পরিস্কার করা, পরীক্ষা হলে নিজে নিয়ে যাওয়া এসব বার বার এসেছে। হলের মেয়েরাও যে ওনাকে পছন্দ করত তার প্রমান এসেছে ওনাকে সরিয়ে দেবার পর ছাত্রীদের আন্দোলনে। নিজের ছাত্রীদেরকে 'আমার মেয়ে' মুখে বলা সহজ কিনা জানি না। কিন্তু সবার বলাতে আন্তরিকতা বোঝা যায় না। ইয়াসমিন ম্যা'ম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মেয়েকেই 'আমার মেয়ে' বলেন এবং সেটাতে আন্তরিকতার এক তিল পরিমাণ কমতি নেই। জাফর ইকবাল স্যার অনুবাদ করেছেন বলে সেই শৈশব কৈশোর এর পরিচিত ভাষা রীতি কে আরো বেশি আপন লেগেছে। কি প্রানোচ্ছল ভাবে গল্প বলে গেলেন ওনারা ২২ বছর এর। তবে বই এর শেষে দেখা যাচ্ছে ক্রমশ অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওনাদের প্রাণ প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় টি। ক্রমেই অপরিচিত হয়ে উঠছিল, তাই তিনি বলেন “এটা দেখতে ঠিক আগের মতনই আছে। কিন্তু তার পর মুহূর্তেই মনে হয় এটি আসলেই কত ভিন্ন একটি ক্যাম্পাস”! তবে তিনিও জাফর ইকবাল স্যার এর মতই চির আশাবাদী মানুষ। তাই বার বার ধাক্কা খাওয়ার পরেও তার আশা “ছাত্রদের ওপর আমাদের যে বিশ্বাসটুকু আছে সেই বিশ্বাসটুকু আমাদের পথ চলায় প্রেরণা জোগায়। আমি সব সময়েই অনুভব করেছি যে, এই ক্যাম্পাসে কী হচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা তার সবকিছু জানে এবং বুঝে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ভবিষ্যতে সাস্টকে মাথা উঁচু করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে” । পাচ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার পরেও এখনো দেখতে পাই, ছাত্র ছাত্রী দের অনশন ভাংগার জন্য এই চিরসবুজ স্যার-ম্যাম ছাড়া আর কেউ এগিয়ে আসে না। তখন এই আশা টুকুও আর থাকে না।
This entire review has been hidden because of spoilers.
সাস্টে ভর্তি হই ১ ডিসেম্বর, ২০১০। ২ তারিখ প্রথম রাস্তায় দেখি জাফর স্যার আর 'তাঁর স্ত্রী' কে। তখন জানতাম মুহম্মদ জাফর ইকবাল অনেক প্রিয় লেখক। আর তাঁর স্ত্রী ও নাকি ফিজিক্স এর প্রফেসর। ম্যা'ম কে নিয়ে অত কিছু মাথায় আসে নাই তখন। যেদিন থেকে হলে থাকা শুরু করলাম তখন থেকে জানতাম কিছুদিন আগেও ইয়াসমিন ম্যা'ম ছিলেন হল প্রভোস্ট। এখন আর নাই। সিনিয়র আপুদের মুখে শুনতাম উনি কি ছিলেন। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবতাম এত সাহসী মানুষ হয়? এভাবে হলের মেয়েদেরকে নিজের মেয়ের মত আগলে রাখে কোন প্রভোস্ট? এটা সম্ভব? নিশ্চয়ই জাফর স্যার এর স্ত্রী বলেই সবাই বাড়িয়ে বলছে। ধীরে ধীরে হল লাইফের বিভিন্ন সমস্যা , নিজের পরিবার ছেড়ে একা একটা মেয়ে দূরে থাকার নানা বিড়ম্বনা যখন আসা শুরু করলো তখন ও সিনিয়র আপুদের কাছে একটা কথাই শুনতাম ইয়াসমিন ম্যা'ম হলে এটা এভাবে ঠিক করতেন। ম্যা'ম থাকলে এই সমস্যা হতো না । অথবা যে কোন সমস্যার প্রথম আর একমাত্র সমাধান ইয়াসমিন ম্যা'ম এর কাছে যাওয়া। এরপর সরাসরি নিজের যখন কিছু ত��ক্ত অভিজ্ঞতা হওয়া শুরু করলো, তখন ভাবতাম ম্যা'ম এর কাছে সত্যি যদি যাই ম্যা'ম তো চিনেন ও না আমাকে; যদি রাগ হন? অনেক চিন্তা ভাবনার পর কয়েকজন সাহস করে গেলাম একদিন ম্যা'ম এর রুমে; কার সাথে যেন আলাপ করছিলেন। আলাপের মাঝে ম্যা'ম এর বক্তব্য ছিল "একটু দাঁড়ান , আমার মেয়েরা এসছে, কথা বলে নেই ওদের সাথে।" এরপর আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন "তোমরা কি একা কথা বলবে?" ওই মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলাম শোনা কথাগুলা একবিন্দুও বেশি ছিলনা। এরপরের যে কয় বছর সিলেট ছিলাম প্রতিটা পদে পদে ম্যা'ম এর হেল্প ছিল। মনে হত মাথার উপর একটা ছায়া আছে। সমস্যা যাই হোক সমধান ইয়াসমিন ম্যা'ম। এই বইতে লিখা বেশিরভাগ ঘটনা হলের সিনিয়র আপুদের মুখে শোনা। শুনে শুনে মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। তারপরে ম্যা'ম এর লিখায় পড়ে মনে হয়েছে সব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। নিজের ছাত্রীদেরকে 'আমার মেয়ে' মুখে বলা সহজ কিনা জানি না। কিন্তু সবার বলাতে আন্তরিকতা বোঝা যায় না। ইয়াসমিন ম্যা'ম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মেয়েকেই 'আমার মেয়ে' বলেন এবং সেটাতে আন্তরিকতার এক তিল পরিমাণ কমতি নেই।
স্মৃতিরোমন্থনের বিষয়টা আমার কাছে সবসময়ই আনন্দদায়ক। তাই ইয়াসমীন হকের ভাষায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো তাঁর ঘটনাবহুল দিনগুলোর গল্প পড়তে ভালোই লাগছিলো। ইয়াসমীন ম্যাম সম্পর্কে সেভাবে কখনোই কিছু জানা হয়ে ওঠে নি। জাফর ইকবাল স্যারের পাশে তাঁকে অনেকবার অনেক জায়গায় দেখেছি, ব্যাস! কিন্তু এই বই থেকে আমি ভীষণ সাহসী একজন নারীকে চিনলাম। রামদা হাতে ছাত্র কোপাতে আসা কাউকে পাল্টা ধাওয়া করতে আসলেই যথেষ্ট সাহস লাগে কিন্তু! আমি ইয়াসমীন ম্যামের সাহসিকতা এবং বিচক্ষণতার গল্পে মোটামুটি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি!ভালোমন্দ সবরকম গল্প মিলিয়ে বই পড়ার সময়টা বেশ ভালোই কেটেছে। তবে জাফর ইকবাল স্যারের করা বাংলা অনুবাদটা পড়েছি বলে মনে হয়েছে আসলে ইয়াসমীন ম্যামের না, জাফর স্যারের লেখাই পড়ছি! আর ঘটনাগুলো বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার কিছুটা ঘাটতি ছিল এবং কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে মনে হয়েছে। এছাড়া যথেষ্ট উপভোগ্য ছিল পুরো বই। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অনেক কিছু জানবার সুযোগ হয়েছে।