কেন আকবর আলি খান এ বই লিখেছেন, তার কৈফিয়তে লিখেন,
"বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি। "
যে দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলই ৪১টি, সেদেশের জনগণ রাজনৈতিক সচেতন নয়! মানতে কষ্ট হয় (কিন্তু কথা সত্য)
প্রথমার বইটির গায়েরদাম ৭শ' টাকা আর ২০% ছাড়ে মূল্য দাঁড়ায় ৫শ' ৬০ টাকা মাত্র!
এদেশে বইপড়ুয়া জনসংখ্যার বিচারে অস্বাভাবিক কম। আবার পড়লেও বেশিরভাগ পাঠক থ্রিলার ধরানার লেখা পছন্দ করেন।সেই পরিস্থিতিতে ৫শ' ৬০ টাকা দিয়ে বই কিনে লোকে রাজনৈতিক সচেতনতা লাভ করতে খুবএকটা উৎসাহী হবে বলে মনে হয় না (বইটা কিন্তু খুব বিক্রি হচ্ছে) ।যাইহোক, রাজনীতিগত সচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হতো যদি পেপারব্যাক এডিশন বের হতো!
বইটিতে মূলত ১৪ টি প্রবন্ধ রয়েছে বহুবিধ বিষয়ে।এবার আলোচনায় আসি-
বিশ্বে প্রতি ৫০ জনে ১ জন বাংলাদেশি অথচ এদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনকালেই ছিল না। কিন্তু তারপরেও অর্থনৈতিক সাফল্য এসেছে। লেখকের ভাষায়,"১৯৭০ সালে প্রায় ৭০% জনগোষ্ঠী দারিদ্রসীমার নিচে ছিল।আজ এ হার ২৫% নিচে নেমে এসেছে।"
অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এদেশের সাফল্য প্রভাব ফেলে নি।
"গত চারদশকে বাংলাদেশে সুশাসনের ক্রমঅবনতি ঘটেছে। " কিন্তু কুশাসনও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।
উপমহাদেশে জাতিরাষ্ট্র তিনটি যথা-ভারত,পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। এদের মধ্য বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কেননা -
১.বাংলাদেশের জন্ম হঠাৎ নয়।
২.বেশিরভাগ লোকজনের ভাষা একই।
৩.বাংলাদেশের লোকজন ধর্মীয় দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ (মুসলিম)।
ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রবন্ধটি অতিমনোরম। লেখক লিখেছেন,
"যে দেশে গণতন্ত্র রয়েছে,সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।গণতান্ত্রিক মানুষ সব সময়ই ধর্মনিরপেক্ষ।"
সংবিধানে একইসাথে রাষ্ট্রধর্ম আর ধর্মনিরপেক্ষতা কতখানি সাংঘর্ষিক তা বলতে ভোলেন নি প্রাবন্ধিক। একইসাথে লিখেছেন,
"আইনে ধর্মনিরপেক্ষতার অধিকার থাকতে হবে, কিন্তু আইন কখনো ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারে না। "
মোটকথা, ধর্মনিরপেক্ষতা যতটা না আইনের বিষয় তারচে তা বহুলাংশে চর্চার বিষয়।
'৭২ এর সংবিধানের সমাজতন্ত্রেরর সংজ্ঞা সামরিক একনায়ক জিয়া বদলে দিয়েছিলেন। ফলে তা এক অদ্ভূত "সমাজতন্ত্রে"র রূপ পায়।
আসলে,বাংলাদেশে সরাসরি সমাজতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয় তা বোঝাতে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সাহায্য নিয়েছেন।
বলা হচ্ছে,দেশে বেকারত্ব হ্রাস পাচ্ছে অথচ এটি কতখানি ভিত্তিহীন দাবি তা প্রমাণ করেছেন আকবর আলি খান।
প্রাচীন গ্রিসে যখন গণতন্ত্রের পত্তন ঘটে, তখন সরাসরি সবার মতামত নেয়া হতো। কিন্তু এখন সে যুগ নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রেই বিপুল জনসংখ্যা। যার জন্য উদ্ভব ঘটেছে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের।
লেখক বলেন,
"যেসব দেশে এত ভোট বেশি পেলে কেউ নির্বাচিত বলে গণ্য হয়, সেসব দেশে সংখ্যালঘুদের ভোটে নির্বাচিত সরকারের পক্ষে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।"
এখানে আকবর আলি খান আনুপাতিক হারে নির্বাচনের কথা সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই সিস্টেমে টোটাল ভোটের ৫১% পেতে হবে সরকার গঠন করতে। অথচ এদেশে কোনো দলই মোট ভোটের ৪০% এরবেশি কখনো পায়নি। সমাধান হতে পারে কোয়ালিশন সরকার।দৃষ্টান্ত হিসেবে ভারতসহ নানা দেশের কোয়ালিশন সরকারের কথা তুলে ধরেছেন।
এখানে আমি আকবর আলি খানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবো । এদেশে আওয়ামীলীগ আর বিএনপি কী কখনো একসাথে কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিবে?
আপাতদৃষ্টে, কখনোই না। দুইদলের মূল নীতিই মিলবে না। ফলাফল ভাঙন, আবার নির্বাচন। আর জাতীয় নির্বাচন কতব্যয় সাধ্য তা কে না জানে! উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ৭শ' কোটি টাকা ( ইভিএম বাদে)।
আনুপাতিক নির্বাচনের পক্ষে আরোএকটি জোরালে যুক্তি হিসেবে আকবর আলি বলেছেন,
"তিনলাখ ভোট জাল করতে হবে জিততে হলে। "
৩০ শে ডিসেম্বরের 'চমৎকার' নির্বাচনের পর নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না মাত্র ৩লাখ ভোট জাল করা কোনো বিষয়ই নয়। আকবর আলি খানের যুক্তি এখানেও ধোপে টিকল না। এদেশের প্রক্ষাপটে প্রয়োজন শক্তিশালী (প্র্যাক্টিক্যালি) নির্বাচন কমিশন। এখানে আনুপাতিক হারে নির্বাচন অবাস্তব।
এখন তো উন্নয়নের বান ডেকেছে৷ অনেকেই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য গণতন্ত্রের শাপ-শাপান্ত করেন৷ যারা দাবি করেন উন্নয়ন আর গণতন্ত্র একসাথে চলতে পারে না, তাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন আকবর আলি। লি কুয়ান ইউ আর অমর্ত্য সেনসহ নানা তাত্ত্বিক আর বাস্তবভিত্তিক আলোচনায় তাই প্রতীয়মান হয়।
এদেশের সকল ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। রাষ্ট্রপতি "ঠুটো জগন্নাথ " মাত্র। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ -
"ক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ফ্রান্সের বুরবন সম্রাট, রাশিয়ার জার ও মোগল বাদশার সঙ্গে তুলনীয়। "
এর বিপক্ষে রয়েছে চমৎকার যুক্তি। খান সাহেব বলেন,
"প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। কিন্তু এ ক্ষমতা বাড়িয়ে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করা চলবে না। "
এ সমস্যার সমাধান হতে পারে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। রাষ্ট্রপতি এক্ষেত্রে প্রাধান্য পেতে পারেন। তৃণমূলে ক্ষমতায়ন গণতন্ত্রকে বেগবান করবো যা সময়ের দাবি।
বিচারবিভাগ নিয়ে আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে কোট করে বোঝাতে চেয়েছেন বাস্তবতা কতখানি ভয়াবহ। কেন অতিসত্বর বিচারবিভাগকে নির্বাহীবিভাগ থেকে পৃথক করবার সিদ্ধান্তটি পালন করা দরকার তা এই প্রবন্ধটি পড়লে আরো পরিষ্কার হবে । রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান ও অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগের প্রস্তাবটি যথাযথ মনে হয়েছে।
মন্দ সিস্টেম সংস্কারের চেয়ে নতুন সিস্টেম প্রতিষ্ঠা সহজ। এদেশের আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি আর রাজনীতি ঢুকে গিয়েছে। ফলাফল যেখানে দরকার ৫ টি পদ, সেখানে রাজনৈতিক স্বার্থে সরকার আমলাদের খুশী করতে তৈরি করছে ১৫ টি পদ। আর তাতে ব্যয় বাড়ছে, জনগণ হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকায়ন থামাতে সংস্কার অথবা নতুন সিস্টেম প্রতিষ্ঠা আশুকর্তব্য।
আকবর আলি খান এদেশে প্রাদেশিক সরকার সিস্টেমের উপজীব্যতা তুলে ধরেছেন।
কিন্তু এদেশে প্রাদেশিক সরকারের তুলনায় সরকারের ওপর হস্তক্ষেপ বন্ধ করে তাদের প্রকৃতই ক্ষমতায়িত করলে ক্ষমতার যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ হবে বলেই আমার মনে হয়।
তত্ত্বাবধারক সরকারের বিকল্প হিসেবে তিনি বলেছেন,
"যদি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, তাহলে এ সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে। "
সেই নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যা বর্তমানে বিরাজমান সমস্যার সমাধান হতে পারে।
চমৎকার বই।বাংলাদেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পন্থা বুঝতে এই বইয়ের বিকল্প নেই।