‘...তাজমহলের পিঙ্গল শুভ্রতার দিকে তাকালেও বোঝা যায় সব কটুক্তিই পিছলে গড়িয়ে যায় তার গা থেকে। আর বহু বিদ্রূপেও যে তার মুখে অবসাদহীন রহস্যের হাসি, তার কারণ সে জানে যতদিন পৃথিবী ততদিন বিরতি ঘটবে না তার স্তবে, গুণগানে, গৌরবগাথায়।’ – পূর্ণেন্দু পত্রী তাজমহলকে দেখার সময় তার সৌন্দর্যে আমরা ভুলে যাই এটি একটি স্মৃতি-সৌধ, কবরস্থান। এতো সৌন্দর্য সত্ত্বেও তাজমহলকে ঘিরে রহস্য আর বিতর্কের শেষ নেই । কে এর স্রষ্টা? কার নক্সায় তাজের নির্মাণ – নানা মিথ, কল্পকাহিনি-তাজমহলকে ঘিরে সত্যমিথ্যার জালে আটকে থাকা রহস্য উন্মোচন আর শিল্পী, আর্কিটেকের চোখ দিয়ে প্রিয় তাজমহলকে ফিরে ফিরে দেখা।
তাজমহল দেখার পর বহু মানুষ স্তব্ধবাক হয়ে পড়েন। ক্রমে, ফটো তোলার ও তোলানোর উন্মাদনা কমে যাওয়ার পর তাঁরা যখন আবার স্থাপত্যটিকে দেখেন, তাঁদের মনের মধ্যে তৈরি হয় একটা আবেগ, কিছু ব্যাখ্যাতীত অনুভূতি, এবং অজস্র প্রশ্ন। তার সঙ্গে যোগ হয় গাইডের মুখে শোনা নানা গালগল্প, জনশ্রুতি, এবং হাল আমলে কিছু সুপরিকল্পিত অপপ্রচার। বাঙালি পাঠকের মনে তাজমহলের গঠনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জাগা প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন নারায়ণ সান্যাল। "লা জবাব দেহলী, অপরূপা আগ্রা" তাঁর অননুকরণীয় লেখনী, নিবিড় গবেষণা, এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই "আশ্চর্য" স্থাপত্য নিয়ে অনেক সংশয়ের অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু ওই সাম্প্রতিক অপপ্রচার, তথা তাজমহলকে "তেজো মহা আলয়" নামক শিবমন্দির বলে চালানোর চেষ্টার কী হবে? আমরা কি আইটি সেলের ধূর্ত প্রচারক, এবং তাদের সুরে গলা মেলানো গড্ডলিকাপ্রবাহকে চুপচাপ মেনে নেব? স্থাপত্যশৈলী এবং ইতিহাস নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তের অন্যতম ভালোবাসার জায়গা হল রহস্য। আগাথা ক্রিস্টি ও হিচকককে নিয়ে বাংলায় প্রামাণ্য বই লেখার পাশাপাশি সাহিত্যজগতের গোয়েন্দাদের নিয়েও লিখেছেন তিনি। তাই তাজমহলের 'আসল পরিচয়' নিয়ে ওঠা বিতর্কের একটি যৌক্তিক উত্তর তাঁর কাছ থেকেই প্রত্যাশিত ছিল। সেই উত্তরটিই হল এই নাতিদীর্ঘ ক্ষুদ্রকায় বইটি। এতে শিরোনামবর্জিত যে অধ্যায়গুলোতে লেখাটিকে ভাঙা হয়েছে, আমার মতে, তারা হল:- ১. তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ২. মেহতাব বাগ ও তথাকথিত কৃষ্ণতাজ ৩. রোমান্সের রঙিন চশমা খুলে তাজদর্শন ৪. চিত্রশিল্পীর চোখে তাজমহল ৫. তাজমহলে ক্যালিগ্রাফি ৬. বন্ধ দরজা ও কবরের রহস্য ৭. তাজমহলের রক্ষণাবেক্ষণ ৮. তাজের স্থাপত্য কতটা ইসলামীয়? ৯. পি.এন.ওক এবং 'তাজের স্বপ্ন' মাত্র ৮৮ পৃষ্ঠার, তথ্যপঞ্জি ও ১৬টি ফটো দিয়ে সাজানো এই ডেভিডের মতো বইটি কি অপপ্রচার ও অজ্ঞতার গোলিয়াথের মোকাবিলা করতে পারবে? আরও অনেক প্রশ্নের মতো এটিরও উত্তর দেবে ভাবীকাল। পাঠকের কাছে অনুরোধ, দয়া করে ইতিহাস নিয়ে গুজব ছড়াতে দেবেন না, গুজবে কান দেবেন না, এবং সত্যিকারের তথ্যনিষ্ঠ বই পড়ার চেষ্টা করবেন। তাজমহলের 'স্বরূপ' নিয়ে প্রশ্ন জাগলে এই বইটি পড়ুন। অশ্বিন সাংঘি-র সাংঘাতিকরকম বাজে বইয়ের তুলনায় এই "অতি অল্প হইল" বইটি অনেক বেশি সুখপাঠ্য, এবং তথ্যানুগ। পাঠ শুভ হোক।