বইয়ের লেখক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যে একজন আশা জাগানিয়া মানুষ - এটা সকলেই জানেন। শিক্ষক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল কিংবদন্তীতুল্য। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানগুলো ছিল দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হল- ষাটের দশকে সাহিত্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ও পরবর্তীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যাকে কেন্দ্র করে তৈরী হয়েছে বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বই পড়া কর্মসূচী।
"ভাঙো দুর্দশার চক্র" এই বইটি প্রকাশিত হবার পেছনে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের অবদান অনস্বীকার্য। এই ফাউন্ডেশনটি দীর্ঘদিন ধরে আত্মিক উন্নয়ন, মানসিক মুক্তি, মেডিটেশন, রক্তদান কর্মসূচির মতো জনহিতৈষী কাজ করে আসছে। প্রায় দেড় দশক ধরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সেখানকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছেন। তার সেসব বক্তৃতার বিষয়বস্তু কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ইতিবাচক কাজগুলোর মূলবার্তার সাথে কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত ছিল। আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কথা মানেই যে অফুরন্ত জ্ঞানের প্রবাহ, সে নিয়ে বলার কী-ই বা আছে? একসময়, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন চিন্তা করল তার দেয়া শিক্ষা/জ্ঞান/বার্তা গুলোকে পুস্তকাকারে লিপিবদ্ধ করে রাখলে সেটা ফাউণ্ডেশনের বাইরের মানুষগুলোর কাছেও পৌছে দেয়া যাবে৷ সেই ভাবনা থেকেই তারা বক্তৃতাগুলোর পুরনো অডিও,ভিডিও রেকর্ড গুলো সংগ্রহ করে তা পুস্তকাকারে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বক্তৃতার কথা কী বইতে সরাসরি ছেপে দিলে সামঞ্জস্য থাকে? তাই, সায়ীদ স্যারকে দিয়েই সেই পান্ডুলিপি সম্পাদনা করানো হয় এবং ২০১৭ এর অমর একুশে বইমেলাতে প্রকাশ করা হয়।
মানব জীবনের আমাদের সবাইকে বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে, দুঃখ, শোক, অশান্তির মুখোমুখি হতে হয়৷ কারণ যেটাই হোক না, এই অভিজ্ঞতাগুলো ভালো হয় না। এমন-ও হয় যে, বেঁচে থাকার ইচ্ছে থাকে না। কখনো নিজের ভুলে আমরা কূল হারাই। আবার কখনো নিজে সৎ থাকলেও অন্যদের কূটচালে অসহায় হয়ে পরি। একঘেয়ে,আনন্দহীন,দুর্ভাবনাময় এ সময়গুলো হতাশায় জর্জরিত থাকে। ফুরিয়ে যেতে থাকা কুপীর আলোর মত এ সময়টা আমাদের সবার-ই পরিচিত। যখন আমরা বুঝতে পারি এই প্রতিকূলতাকে জয় করার সামর্থ্য আমাদের 'মধ্যে'ই আছে, কিন্তু সেই সক্ষমতার কবাটের ছিটকিনি খুলতে যে ধাক্কা দেবার প্রয়োজন অনভ্যাসের কারণে সেটা আমরা দিতে পারি না। লেখক এই বইটির মাধ্যমে সেই ধাক্কাটি ই যেন আমাদের দিতে চেয়েছেন। তার প্রতিটি বার্তাতেই ছিল আশার ফোয়ারা…
লেখক বলতে চেয়েছেন আমাদের আশাহত, দুর্দশাময় এই অবস্থার পেছনে আছে আত্মবিশ্বাসের অভাব। এই অভাবের কারণ চ্যালেঞ্জকে ভয় পাওয়া আর যথেষ্ট প্রচেষ্টা না দেয়া৷ এই যে ভয়, সেটা আমাদের চিন্তাকে ওলটে পালটে দেয়, ভেতরের শক্তিকে নিস্ক্রিয় করে দেয়। তাহলে উপায়?
উপায় একটাই- কাজ!!! কাজের মধ্যে মাতালের মতো বুঁদ হয়ে থাকতে হবে। লেখকের ভাষায়, "কাজ হচ্ছে গঙ্গাজল, কাজের মধ্যে বাঁচা মানে জীবনের মধ্যে বাঁচা"। চেষ্টা, প্রশিক্ষণ, কৌশল, সাধনা, একাগ্রতা সমস্ত ইতিবাচকতা দিয়ে আমাদের 'ভয়' কে আক্রমণ করতে হবে। তাহলে কী হবে? তাহলে আমরা সাহসী কয়ে উঠব, ফিরে পাব আমাদের আত্মবিশ্বাস।
এ পর্যায়ে বলে রাখা দরকার, লেখকের মতে কাজ করার পাশাপাশি কিসের জন্য কাজ করছি সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছেন, এখন মানুষের সবচেয়ে বেশী আরাধ্য জিনিষ হল 'সাফল্য'- কারণ ওতেই মেলে নারী,বাড়ি,গাড়ি… অন্তরে এরূপ বাসনার তৃষ্ণায় হারিয়ে ফেলছে মনুষ্যত্ব৷ লেখকের ভাষাতেই শুনুন, " যে যাই বলুক, সাফল্যকে একটা পর্যায়ের পর আমি বড় কিছু মনে করি না। কারণ সাফল্য একটা বৈষয়িক বিষয়, স্থুল জিনিষ। আমি বড় মনে করি সার্থকতাকে"। অর্থাৎ সাফল্যের পেছনে না ছুটে আমাদের খোজা উচিত সার্থকতাকে। এজন্য কী করতে হবে?
'দিতে' হবে। একটা মোমবাতির সার্থকতা কোথায়? শুধু স্থবির হয়ে দাড়িয়ে থাকায়, না জ্বলে জ্বলে আলো দিয়ে নিঃশেষ হওয়াতে? সুতরাং, দিতে পারতে হবে৷ দিতে শেখো, দেওয়া মানেই বাঁচা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "আমার যত বিত্ত, প্রভু; আমার যত বাণী, সব দিতে হবে"। তবে এই যে দান, তা যেন লোভের জন্য বা কিছু পাওয়ার আশায় না হয়৷ লোভ খুবই নিম্নমানের বিষয়। বরং আনন্দের জন্য দিতে পারতে হবে। এভাবে কাজের মাধ্যমে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারলে, অন্যের জন্য নিজে ত্যাগ স্বীকার করতে পারলে, তবেই আসবে সার্থকতা। আর এটাই হল আমাদের যাবতীয় দুর্দশা, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার পাথেয়।
বইয়ের কিছু উল্লেখযোগ্য উক্তিঃ
♦" উপদেশ দেবার ব্যাপারে আমার আগ্রহ নেই। যে উপদেশ দেয় সে আসলে উপদেশ শোনায় অন্যকে,কিন্তু দেয় নিজেকে"।
♦" উত্তেজনা আর শক্তি এক নহে। ইহারা পরষ্পরবিরোধী" - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
♦" প্রত্যেকটা মানুষ বাসনার আগুনে জ্বলছে। এই নরক যন্ত্রণা থেকে বাঁচার উপায়ঃ লোভ কমিয়ে ফেলা" -গৌতম বুদ্ধ।
♦" সফল সেই মানুষ- যে পৃথিবীর কাছ থেকে নেয় বেশী আর সার্থক সেই মানুষ- যে দেয় বেশী "।
♦" যেভাবে পার এই ক্ষণজীবনে সজ্জনের সঙ্ঘ গড়ে তোলো " - শঙ্করাচার্য
♦ তুমি তোমার যৌবনের সমান, আমি সারাজীবনে সমান।
♦" প্রিয়ার গালের কালো তিলের জন্য আমি সমরখন্দ ও বুখারা বিকিয়ে দিতে পারি" - কবি হাফিজ (কবিদের কথা… সিরিয়াসলি নিয়েন না 🤐)
♦ শীর্ষে মানুষ সবসময়ই একা। ওখানে যেতেও হয় একা, বাঁচতে ও হয় একা।
বইটা পড়ার আমন্ত্রণ রইল। সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন।