আত্মসমালোচনার আয়নায় 'অন্য'কে দেখার রাজনীতি নিয়ে কথা বলে নৃবিজ্ঞান। এই 'অন্য' ক্রমশ: হয়ে ওঠে লেখকের ঋজু কন্ঠে প্রান্তিকের স্বর, যা ধ্বনিত হয় সমকালীন সামাজিক ইতিহাসে। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র অথবা সমগ্র সভ্যতার ইতিহাস যখন দখলদারীর বয়ান তখন সামরান লিখছেন তার নিজস্ব দেশগাঁয়ের স্বাদকাহন এক নিভৃত আলাপচারিতায়। গৃহকর্মে নিপুণা, রন্ধনশিল্পে পটু কিছু চরিত্রের খোঁজে উড়াল দিয়ে ধরে আনা অলীক স্বাদের কিছু উদাসীন, বৃক্ষপাগল, জলজ বদ্ধ উন্মাদ, বাজীকর ওঝা, ভুলে যাওয়া রান্নার খাতালেখা অন্তঃপুরবাসিনীর কথা। নারীর বিরুদ্ধে ক্রম বর্ধমান সহিংসতা বোঝা ও মোকাবিলা করার আখ্যান স্বাদ সঞ্চয়িতা। এই বই খেত-খামারে ঘুরে বেড়ানো মানুষের, মাঠের ধুলোয় সাতরাঙা সতরঞ্চির মত বর্ণিল চড়ুইভাতি বা নিছকই রান্নাবাটি খেলার দিনগুলির ওপর জলছবি হয়ে ফুটে উঠেছে গভীর নৃতাত্বিক পাঠ।
এটি সামরানের চতুর্থ বই। প্রকাশ করছে ৯ঋকাল। এই পথচলায় সামরানের নৃতাত্বিক সফরসঙ্গী এই মুহুর্তের উপমহাদেশের সর্বাধিক আলোচিত শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান। কাঁটাতারের দুপাশে বসে দুইজন আঁক কাটলেন ছয়রসের স্মৃতির সংসার।
পড়া শুরু করতেই রিয়াজুদ্দিন বাজারের ঘিঞ্জি গলি, নিউমার্কেটের বিচিত্রা বুকশপ আর সেভয় বেকারির কেক! নস্টালজিক হয়ে গেলাম রে ভাই! উফফফ, সেভয় বেকারি! আম্মু অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসতো ওখান থেকে, চিটাগাং এর বেস্ট পাঁউরুটি! নুসিলা বা জেলি ছাড়াই খেয়ে ফেলতাম, এতো নরম, তুলতুলে! এখনো মুখে লেগে আছে স্বাদ! উঠে গেছে বেকারিটা।
ফুড এনথ্রোপলজির প্যারামিটার কী জানি না, শেষ করে বলতে পারব হয়তো৷ কিন্তু বিষন্ন সন্ধ্যায় প্রিয় শহরের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সামরান মন জিতে নিলেন শুরুতেই...
শুধু স্বাদই নয়, সামরান হুদা যেন সঞ্চয় করে রাখতে চাইলেন তার ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের কিছু অংশকেও! বইটিকে লেখিকার প্রথম বই ‘অতঃপর অন্তঃপুরে’ এর সিক্যুয়েল বলা যেতে পারে। সেই বইটির মত এই বইয়েরও মূল বিষয়বস্তু ‘খাবার’, ইন্ডিজেনাস খাবার। এমন অনেক বাংলাদেশি খাবার, ডেলিকেসির বর্ণনা বইটিতে আছে যেগুলো এখন বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায়। লিরিকালের এমন ধারা অ্যানথ্রপলজিক্যাল বইগুলো ভালো লাগে বরাবরই।
বইয়ের মূল আলাপের বিষয়বস্তু খাদ্য হলেও, এরই মাধ্যমে লেখিকা আশি-নব্বই দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে মধ্যবিত্ত দৈনন্দিন জীবনের চিত্রও তুলে ধরেছেন খুবই ‘subtly’. সামরান হুদার লেখার মধ্যে একটা চাপা নস্টালজিয়ে টের পাওয়া যায় তবে সেটা বেশীরভাগ সময়ে ব্যাকড্রপেই থাকে, লেখা পড়তে গিয়ে পাঠক নস্টালজিয়ার ভেলায় কখনো ওভারইনডালজেন্ট হবে না ঠিকই তবে লেখিকার মনোভাব ছুঁতে পারবে সহজেই।
লিরিকালের অন্যান্য বইয়ের মতোই, এই বইয়েরও প্রোডাকশন চমৎকার। তবে রয়্যাল সাইজের বইয়ে, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে চার পাশে দেড় ইঞ্চিখানেক জায়গা ফাঁকাই রাখা হয়েছে; তা না করে যদি স্বাভাবিক সাইজ করা হতো, অথবা রয়্যাল সাইজেই চারপাশে এত ফাঁকা অংশ না রেখে আরেকটু বিস্তৃত করে ছাপানো হতো, তাহলে পৃষ্ঠাসংখ্যা কমে গিয়ে দামও কমে আসতে পারতো অনেকটাই।