অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান রচিত বই 'সত্য সাদ্দাম হোসেন ও 'স্রাজেরদৌলা। এখানে স্রাজেরদৌলা বলতে, সিরাজদ্দৌলাকে বুঝানো হয়েছে। চিচিত্র নামের এই বইটি মূলত সাম্রাজ্যবাদ নিয়া লেখা একটা পুস্তক। যেখানে ইতিহাসের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট দিয়ে দেখিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদ আসলে কতটা নোংরা হতে পারে।
সর্বমোট ৯ টি লেখা, যার মধ্যে ৭ টি মূল লেখা, বাকি দুটো অনুবাদ করা হ্যারন্ড পিন্টারের কবিতা এবং নিউ সিঙ্গারের প্রবন্ধ।
বইয়ের প্রথম লেখা 'ইরাক, আরব জাতীয়তাবাদ আর সাদ্দাম হোসেন' শিরোনামে। খুবই উপভোগ্য এই রচনায় তিনি প্রথমেই সাদ্দাম কি 'জাতীয়তাবাদী না একনায়ক' এই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি আরব জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ও এর বিরুদ্ধে নানা চক্রান্তগুলো বর্ণনা করেন। লেখক ইরাক যুদ্ধ কে 'জনযুদ্ধ' আখ্যায়িত করে সাদ্দাম হোসেনকে দাঁড় করান মুক্তিযুদ্ধার কাতারে দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন, "সাদ্দাম হোসেনের প্রকৃত অপরাধ তাঁহার আরব জাতীয়তাবাদ বা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতি।” যদিও লেখক পুরো আলোচনায় সাদ্দাম কীভাবে নিজেকে আরব জাতীয়তাবাদের সাথে যুক্ত করেন, সেই ব্যাখ্যা অনুপস্থিত রেখে দেন। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেন, সাদ্দসাম হোসেন একনায়কবাদী নন, তার মূল অপরাধ ছিল তিনি সাম্রাজ্যবিরোধী।
দ্বিতীয় প্রবন্ধও সাদ্দামকে নিয়েই। এখানে তিনি একহাত নেন যারা সাদ্দামকে একনায়ক বলে সমালোচনা করেন তাদের। তার মতে এরা সাম্রাজ্যবাদকে সহনশীল করে তোলেন, পশ্চিমা আগ্রাসন করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন অথবা ভিত্তি তৈরি করে দেন। এরপর তিনি ক্রমান্বয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের রাজনীতির ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “সাদ্দাম হোসেনের আসল অপরাধ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, তার ‘অপশাসন’ নয়।” এবং দাবি করেন “সাদ্দাম হোসেন আরব জাতীয়তাবাদী, কমসে কম ইরাকি জাতীয়তায় তার পক্ষপাত থাকবেই।”
সাদ্দামের সূত্র ধরে তিনি মঞ্চে আনেন সিরাজুদ্দোলাকে। সিরাজকে যেভাবে ক্ষমত্যাচ্যুত করা হয়েছে, তার সাথে মিল খোঁজার চেষ্টা তৎকালীন সাদ্দামের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের। আবারো সাদ্দাম ও সিরিজুদ্দোলার জাতীয়বাদের বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরকে অপরিষ্কার রেখেই লেখক তুলে ধরেন কীভাবে পুঁজিপতি সমাজ ও আমলাতন্ত্র তাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছিল। কিন্তু কেন তৎকালীন বাংলার পুঁজিপতি সমাজ সিরাজের বিরুদ্ধে গেল? তার কি মানুষ হিসেবে খারাপ ছিল নাকি দেশপ্রেমিক ছিল না? এখানেও সলিমুল্লাহ খান ঘোলাটে করে ছেড়ে দিয়েছেন।
স্বাধীনতা অর্থ দাসত্ব লেখায় তিনি তুলে আনেন তৎকালীন সরাসীদের মিসর দখলের প্রেক্ষাপট। সাম্রাজ্যবাদীরা কীভাবে নন ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে আগ্রাসন চালায় লেখক তা তুলে আনেন বিস্তারিত ভাবে।
নীতির নতুন জামাঃ এয়ুরোপে বর্ণবাদ, এই প্রবন্ধে তিনি বলেন, "মানুষের অধিকার আর নাগরিকের অধিকার এই দুই আওয়াজ পুঁজি করেই তো ফরাসি বিপ্লব আর মার্কিন বিপ্লব ইতিহাস হয়েছিল। আর আজ এয়ুরোপ আর আমেরিকা এই দুই অধিকারের নামে কোন অপকর্মটা নাই যা করছে না?"
ফরাসি দার্শনিক, সমাজচিন্তক বাদিয়ু আর জাক জেরিদা নিয়ে আলোচনা আছে বেশকটি প্রবন্ধে। এদের নিয়ে আমার নিজেরই ভাসাভাসা জ্ঞান, তাই কথা বলছি না। তবে প্রবন্ধ শেষে লেখক বলেন, "বর্তমান দুনিয়ার সমস্ত দোষ এসলামের ঘাড়ে চাপানো এয়ুরোপের অসুখের মধ্যে পড়ে।"
সলিমুল্লাহ একজন অসাধারণ বক্তা, আর মন্ত্রমুগ্ধকর লেখক। উনার জ্ঞানের গন্ডি এতই ব্যাপক যে, রীতিমত যে কারোই ঈর্ষা হবে। পুরো বইতে, প্রতিটা লাইনে তিনি ছাপ রেখে গিয়েছেন। আমার মত আম পাঠকের জন্য যদিও অনেক কথা বেশ দুর্বোধ্য মনে হবে। দুই তিনবার পড়ার পরে ক্লিয়ার হবে। পুরো লেখনি চিন্তার খোরাক জোগাতে বাধ্য।