শেষ কবে এমন দুর্দান্ত ভ্রমণ সাহিত্য পড়েছি, বলতে পারবো না। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে ইংরেজী ভাষার ভ্রমণ-সাহিত্য গুরুদের যে কোন সৃষ্টির পাশে এই বই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে। ব্রুস চ্যাটউইন বা পল থেরু বা কলিন থাব্রোন এমন চমৎকার একটা বই পাঠকদের উপহার দিয়ে খুশী-মনে ঘুমোতে যেতে পারতেন। সামান্থ সুব্রামানিয়ানের লেখা এই প্রথম পড়ছি - গতকালই জানতে পারলাম যে শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধ নিয়ে লেখা তার দ্বিতীয় বই ইতিমধ্যে স্যামুয়েল জনসন পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছে। ইংরেজি নন-ফিকশন সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার স্যামুয়েল জনসন প্রাইজ, সামান্থ এই নোমিনেশন পেয়েছেন শুনে বিন্দুমাত্র আশ্চর্য হলাম না। উইলিয়াম ড্যালরিম্পেলের সাথে আমিও একমত - "ভারতীয় নন-ফিকশনের উদীয়মান নক্ষত্র" এই তরুণ সাংবাদিক।
শুরুতেই বলে রাখি যে ভারতবর্ষে ইংরেজী ভাষায় "সাহিত্যচর্চা" নিয়ে আমার ঢের সন্দেহ আছে। "ইন্ডিয়ান" বইয়ের কিছু প্রচ্ছদ দেখলেই বোঝা যায় - অরিয়েন্টালিজমের প্রবণতা সেখানে কি প্রবল! সেই একই রং-বেরঙের শাড়ি, কপালে-টিপ চোখে-কাজল সুন্দরী নারী, লাল-হলুদ মশলার ক্লোজ-আপ শট আর একই রাস্তা ভাগাভাগি করে নেয়া গরু আর গাড়ি। ভেতরে খুললেও একই যৌতুক প্রথা, "oppressed Indian woman", মজার মজার "customs", হেনতেন। কাহাতক সহ্য হয়? ভদ্র ভাষায় বললে - সাদা লোকের কাছে নিজের চামড়া, নিজের exotic কৃষ্টি-কালচার বেঁচার থার্ড-ক্লাস তৎপরতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। আরো সংক্ষেপে বললে - দালালী। হাতে-গোণা কয়েকজন লেখক পড়েছি যারা এই ট্রেন্ডের ব্যতিক্রম - তবে সত্যি বলতে যথেষ্ঠ পড়িনি। আগ্রহ হয়নি। পড়ার মত সাহিত্য নিয়মিত বেরুচ্ছে আরো পাঁচটা মহাদেশ থেকে - একই চর্বিত চর্বণ পড়ার চেয়ে অজানা নতুন পথে পা বাড়ানো অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং।
আর লেখার মান নিয়ে তো এখনো বলিইনি। চলনসই ইংরেজী থেকে শুরু করে এক কথায় জঘন্য মানের ইংরেজি পড়ারও দুর্ভাগ্য হয়েছে। বছর দুই আগে একটা বুক রিভিউ লেখার প্রস্তাব এসেছিল এক পত্রিকা থেকে - লেখক বা বইয়ের নাম উহ্য থাকুক কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় পাঠস্মৃতি ছিল, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। বিশ পাতা পড়ে সম্পাদক মহাশয়কে ইমেইল করেছিলাম - "দাদা আর পারছি না যে!" তারপরও লেগেছিলাম তার বিশেষ অনুরোধে, কিন্তু আর দশ পাতা ঠেলে-ঠুলে এগোবার পর ঢাল-তলোয়ার সব যুদ্ধের ময়দানে ফেলে রেখে মহানন্দে রণে ভঙ্গ দিয়েছিলাম সে যাত্রা। তখন যেটা ভাবছিলাম, এখনো তাই বিশ্বাস করি - Life is just too fucking short. যেখানে চেতন ভগতের মত রদ্দি লেখক অনায়াসে বেস্ট-সেলার হয়ে যায়, সেখানে ইংরেজি বইপত্র হিসেব করে পড়াই ভালো। বরং আমার নিজের ভাষায় এর চেয়ে হাজার গুণ ভালো লেখক আছেন - পড়বোই যদি, তাদের লেখাই পড়ি না হয়।
আর সমাজঘনিষ্ঠতার প্রশ্নটাও এড়ানো অসম্ভব। ভারতের লেখকদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই, তবে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের "ইংরেজি সাহিত্যিক" অবধারিতভাবেই সমাজের বহু উঁচুতলার মানুষ। দানিয়াল মুইনুদ্দিন বিরাট জমিদার, মহসিন হামিদ ওয়াল স্ট্রিটের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, কামিলা শামসি বিশিষ্ট সাহিত্যিক ঘরের মেয়ে, আতিশ তাসিরের বাপ ছিল প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, অন্তত তালেবানের গুলি খেয়ে মরার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। এদের কেউ অপেক্ষাকৃত ভালো লেখেন, কেউ অপেক্ষাকৃত মন্দ। বাংলাদেশের প্রায় সবাই (নাম বলার দরকার নেই, মোটামুটি মুখ-চেনা এনারা) সেই একই গুলশান-বনানী-বারিধারা গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের বিত্তশালী অধিবাসী, আর সবারই এক ঠ্যাং বা দুই ঠ্যাংই রাখা আছে বিদেশে, স্বল্পকালীন বা দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে। এদের থেকে আর যাই পাই না কেন, সমাজ-সম্পৃক্ততা বা মাটির কাছের মানুষের বস্তুনিষ্ঠ জীবনচিত্র আশা করা যায় না।
*
সামান্থ সুব্রামানিয়ান আমার ধারণা (বা প্রেজুডিস) অনেকটা ভেঙ্গেছেন, তাই আমি বেজায় খুশী। ইলিশের মতই সুস্বাদু-মসৃণ তার গদ্য। স্থানীয় পাঠাগারের শেলফে চোখ বুলাতে গিয়ে প্রথমেই নজর কেড়েছিল বইয়ের কৌতুহল-জাগানিয়া শিরোনাম। প্রচ্ছদে দক্ষিণ ভারতের সৈকতে জেলে-নৌকার ছবি, আর ট্যাগলাইন "Travels Around the Indian Coast" দেখে লোভ আর সম্বরণ করতে পারিনি। মনে হচ্ছিল ভিন্নধর্মী হতে পারে এই বই। ভারত ভ্রমণের গতানুগতিক নকশা - অর্থাৎ সেই একঘেঁয়ে আগ্রা, তাজ, বান্দর, বস্তি, মুঘল, আইটি - সেসব থেকে যোজন দূরে নিয়ে যাবার হাতছানি ছিল প্রচ্ছদে। অনুমানে ভূল করিনি - উপমহাদেশের অচেনা রূপ চিনলাম বইয়ের পাতায় পাতায়।
সামান্থের বইয়ের কনসেপ্ট অত্যন্ত সহজ। ভারতের পূর্ব কোণে কোলকাতা থেকে শুরু করেন, তারপর উপকূল বেয়ে নেমে যান, অন্ধ্র/হায়দ্রাবাদ হয়ে তামিল নাডু পর্যন্ত। তারপর একদম দক্ষিণ বিন্দুতে পৌঁছে আবার সাগরতীর ধরে উঠে যান, কেরালা ব্যাকওয়াটার্স ঘুরে গোয়া-মাঙ্গালোর হয়ে সোজা মুম্বাই। এমন সহজ-সরল (এবং আগাগোড়া চমৎকার) একটা আইডিয়া কেন এতদিন ভারতের ভ্রমণ-লেখকদের মাথায় খেলেনি, সেটাই বিস্ময়। মোটা দাগে উত্তর ভারত - অর্থাৎ তাজ আর বান্দর - নিয়ে অজস্র বই আছে, সেই তুলনায় উপকূলের ভারত প্রায় পুরোটাই অবহেলিত। (অথবা আমার চোখে পড়েনি।) মোটামুটি খালি মাঠে গোল দিয়েছেন সামান্থ, কিন্তু তবুও সেই গোল সিম্পেল ট্যাপ-ইন দিয়ে সারেননি - অপূর্ব কারুকাজ দেখিয়েছেন তার পায়ে কলমে।
*
বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম - "On hunting the hilsa and mastering its bones" - অন্তত এই বাঙালি পাঠকের মন জয় করেছে। পশ্চিমবঙ্গের ইলিশ সংস্কৃতির রসালো বর্ণনা দিয়ে শুরু করেছেন - এতই বিখ্যাত "মাছলি" বাঙ্গালির ইলিশ-প্রেম যে মাদ্রাজের তামিল ছেলে সামান্থও কোলকাতাকেই বেছে নিয়েছেন তার দীর্ঘ ভ্রমণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে। হাওড়া ব্রিজের পাইকারী মাছ বাজার, গঙ্গা আর পদ্মার ইলিশের চারিত্রিক গুণাবলী, সর্বোপরি সর্ষে ইলিশ আর ইলিশ পাতুরি রান্না এবং ভোজনের শিহরণীয় বিবরণ লিখে নস্টালজিয়া উস্কে দিয়েছেন প্রবলভাবে।
অত:পর অন্ধ্র। হায়দ্রাবাদের বাতিনী গৌড় পরিবারের ঐতিহ্যবাহী, অভিনব এবং বহুল জনপ্রিয় অ্যাজমা ট্রিটমেন্টের গল্প। প্রতি বছর বর্ষা-বরণের পার্বনে শোল মাছের জ্যান্ত পোনা গিলিয়ে দেয়া হয় হাজার হাজার মানুষের মুখে, শ্বাসকষ্ট রোগের নিরাময় হিসেবে। এই কাহিনী কিছুই জানতাম না, পড়ে বিস্মিত হয়েছি। তারপর তামিল নাডু - তুতিকোরিন অঞ্চলের জেলেদের ক্যাথলিক ধর্মচর্চার পাঁচশো বছরের ইতিহাসের বয়ান। আমার অন্যতম প্রিয় অধ্যায় ছিল পরেরটি - কেরালা ব্যাকওয়াটার্স ঘুরে ঘুরে গ্যালন গ্যালন toddy বা তাড়ি খেয়েছেন লেখক। এতদিন কেরালার ক্লিশে ছিল কথকলি নৃত্য আর হাউজবোটে করে সবুজে ঘেরা নদী-খাল ঘুরে বেড়ানো। র���স্তার ধারে টডির দোকানে টাটকা তাড়ি আর মুখে-আগুন ধরানো মাছের ঝাল কারি খাওয়াও যে আঞ্চলিক সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ, সামান্থের বই পড়ে জানলাম।
ভ্রমণ বইয়ের প্রকৃত স্বার্থকতা ফুটে উঠেছে এই অধ্যায়গুলোতে। সেই ভ্রমণ বই-ই সফল, যা পাঠকের মনে তৎক্ষনাৎ পথে নেমে পড়ার অদম্য বাসনা জাগিয়ে তোলে। সামান্থের গদ্যে তামিল নাডুর রূপালী সৈকতের বর্ণনা পড়ে মনে হয়েছে আমিও ছুটে যাই সেই পেজা তুলো ভরা নীল্ আকাশের নীচে, নিজ চোখে দেখি আদিগন্ত সৌম্য সমুদ্র। মনে হয়েছে ব্যাকওয়াটার্সের জলজ-সবুজ গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাই আমিও।
আরেকটা ভাবনা কাজ করেছিল। ভারত-বিভাগের ভালো-মন্দ অত্যন্ত জটিল প্রশ্ন, এবং সাত দশকের ব্যবধানে হয়তো এখন অপরিবর্তনীয়। কিন্তু এই বিপুল সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য এবং ভৌগোলিক সৌন্দর্যে আমাদেরও যে ভাগ ছিল একদা, সেটা আমরা একেবারেই হারিয়েছি। প্রতি ১০ জনে ৯ জন বাঙালি মুসলমান অধ্যুষিত আধুনিক বাংলাদেশে যে অসহিষ্ণু মনোকালচার গড়ে উঠেছে, তার বিপরীতে ভারতবর্ষের জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের বড্ড দরকার ছিল। আর ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চেপে চেন্নাই আর গোয়া, কন্যাকুমারী আর কাশ্মীর, এমনকি লাহোর-করাচিও দেখে আসা সম্ভব ছিল আমাদের নানা-দাদাদের পক্ষে, অথচ আমাদের বরাতে জুটলো শুধু সংকীর্ণতা, একাধিক পরিসরে।
*
যাকগে। বইয়ের কাছে ফিরে আসি। তাড়ি খেয়ে সামান্থের পরবর্তী গন্তব্য কর্নাটক। উদ্দেশ্য মাঙ্গালোর-এর বিখ্যাত ফিশ কারি চেখে দেখবেন। কিন্তু এই ডিশের ভালো স্যাম্পেল খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়, এরই মধ্যে প্রেমে পড়ে যান "রাওয়া ফ্রাই" নামে আরেকটি মাছের তরকারির। মহারাষ্ট্রের উপকূল অঞ্চলের বিখ্যাত সেইলফিশ (sailfish) ধরার লক্ষ্যে এক সকালে জেলে নৌকায় চেপে রওনা হন, কিন্তু এত দুর্লভ মাছ কি আর এত সহজে ধরা দেবে? এই জায়গায় এসে হেমিংওয়ের সান্তিয়াগোর কথা স্মরণ করেন লেখক-পাঠক দুজনেই। (সামান্থের লেখাপড়ার পরিধিও ঈর্ষণীয় - প্রুস্ত থেকে হপার হয়ে লীব্লিং, সবার সাথেই পরিচয় আছে তার।) আধুনিক সভ্যতার বিধ্বংসী ক্ষমতার মুখোমুখি হন গোয়া পৌঁছে। একদিকে পর্যটন শিল্প পর্যুদস্ত করছে উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবেশকে, অপরদিকে সাগর-গভীরে বেশুমার হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে মাছ-ধরা ট্রলার - ফলে অথৈ সমুদ্রও ক্রমশ মাছ-শুন্য হয়ে পড়ছে। বইয়ের সুরও ক্রমশ ঋণাত্মক। বাকি রইলো বোম্বে - শহরের সবচেয়ে পুরনো অধিবাসী কোলি সম্প্রদায়ের জেলেদের খুঁজে বেড়ান লেখক। গোমন্টক ঘরানার রান্না বনাম মাল্ভানি ঘরানার রান্না সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান এখানে পাবেন পাঠক। বইয়ের শেষ স্টপ গুজরাটের মাংরোল শহর - মাছ-ধরা জাহাজ নির্মানের অন্যতম প্রাদেশিক কেন্দ্র। বোট-ইয়ার্ডে বসে ইয়ার্ডের মালিকদের সাথে গল্প-গুজবে জেনে নেন এই অঞ্চলে জাহাজ নির্মানের ইতিহাস - কিছু কায়দা-কানুন আর তরিকার রেকর্ড রেখে গিয়েছিলেন মার্কো পোলো স্বয়ং, আজ অব্দি চলছে নিরবধি।
*
এই হলো ফলোইং ফিশ-এর রূপরেখা। বাংলার ইলিশ দিয়েই শেষ করি না হয়, লেখকের নিজের ভাষায়?
"Shorshe ilish, perhaps Bengal's most popular hilsa dish, involves simmering and serving cuts of the fish in a mustard sauce so pungent that its wallop reaches right into your sinuses. The sauce is a marvellous assembly of grainy mustard, curd, chillies, turmeric and lemon, achieving the sort of bright yellow that is otherwise only found in pots of poster paint. But its very power always leaves room for regret that it might be masking the natural creamy taste of the fish.
The first time I ate shorshe ilish, however, I thought no such thing; I was too focussed on making sure that the bones didn't kill me."
জিভে যে পানি চলে আসে, সেটা কি ইলিশের লোভে নাকি লেখকের মুখরোচক গদ্যে, তাই বোঝা দায়!