ইমতিয়াজ মাহমুদের জন্ম ১৯৮০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতক। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিতে এক বছর কাজ করার পর ২০০৬ সাল থেকে সিভিল সার্ভিসে কর্মরত। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় পাক্ষিক শৈলী পত্রিকায় ১৯৯৯ সালে।
প্রকাশিত বইয়ের মাঝে আছে অন্ধকারের রোদ্দুরে (২০০০), মৃত্যুর জন্মদাতা (২০০২), সার্কাসের সঙ (২০০৮), মানুষ দেখতে কেমন (২০১০), নদীর চোখে পানি ও অন্যান্য কোয়াটরেন (২০১৩), পেন্টাকল (২০১৫), ম্যাক্সিম (২০১৬), কালো কৌতুক (২০১৬) প্রভৃতি। পেন্টাকল কাব্যগ্রন্থের জন্য তাঁর ঝুলিতে এসেছে কলকাতার কৃত্তিবাস পুরস্কার।
সাহিত্যের যতোগুলো ধরন আছে: গদ্য, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ-সেগুলোর মধ্যে বোধহয় পদ্যই নিজের রূপ সম্পর্কে সবথেকে সচেতন।
রূপ মানে আক্ষরিক অর্থেই রূপ। বা আকৃতি, ইংরেজিতে যাকে বলে ফর্ম। কবিতার লাইন কীভাবে ভাঙা হচ্ছে, এক লাইনে কতোগুলো শব্দ রাখা হচ্ছে-এসবের ওপর ভিত্তি করে শুধু অর্থ বা শব্দের দিক থেকে নয়, রূপের দিক থেকেও কবিতাকে সাজানো সম্ভব। এই পদ্ধতিতে কবিতাকে ভেঙেচুরে ছবির আকৃতি দেওয়া যায়। সাদা পৃষ্ঠায় শব্দগুলোকে সেভাবে তুলে ধরা হয় যেভাবে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয় চিত্রকর্ম। এই পদ্ধতিকে বলে ক্যালিগ্রাম।
ফরাসি কবি আর পেইন্টার গিউম অ্যাপোলোনেয়ার (যাকে মোনালিসা পেইন্টিং চুরির দায়ে একবার গ্রেফতার করা হয়েছিলো) ক্যালিগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী। এবং অ্যাপোলোনেয়ারের তীব্র প্রভাব লক্ষ করা যায় ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখায়। তার It's Raining কবিতাকে সরাসরি ওমাজ দিয়েছেন মাহমুদ নিজের ‘কান্নার ক্বাসিদা’ পদ্যে। অ্যাপোলোনেয়ার ফরাসি সাররিয়েলিস্টদের সমসাময়িক ছিলেন। মাহমুদের কবিতাতেও সাররিয়েলিজম স্পষ্ট। সাররিয়েল কবি ও চিত্রশিল্পীরা কাঠখোট্টা যুক্তির সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে নতুন একধরনের শিল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন। যে শিল্পের অর্থ অনুধাবন করবে অবচেতন মন, সচেতন চিন্তা নয়। যেখানে বাস্তব আর স্বপ্ন মিলেমিশে নতুন এক রূপে সত্যকে উপস্থাপন করে। এই বিষয়টাও মাহমুদ চমৎকার দক্ষতার সাথে করতে পেরেছেন।
কালো কৌতুকের যে কবিতাগুলো বিশেষভাবে ভালো লেগেছে সেগুলো হচ্ছে:
চোখ। ক্যালিগ্রামের দারুণ উদাহরণ। ছোট্ট এই কবিতায় শব্দ, অর্থ আর রূপ সব একই হারমনিতে কাজ করেছে। চোখের আকৃতিতে লেখা পদ্যের বিষয়বস্তু হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি। মাত্র তের লাইনের মধ্যে সাবজেক্ট-অবজেক্টের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির যে বিভেদ, যে দেখছে আর যা দেখা হচ্ছে এই দুয়ের মধ্যে চিরন্তন যে দ্বন্দ, তা তুলে ধরা হয়েছে। ‘দর্শন’ শব্দের সবগুলো অর্থ যেন প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতায়।
হারুণ। একইসাথে মজার এবং বিষাদের, এই কবিতায় যন্ত্রণায় আবদ্ধ একজন মানুষের জীবনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। হারুণের অন্তহীন যন্ত্রণার সাথে মিল রেখে কবিতাটাকে একটা লুপ হিসেবে পড়া যায়। শেষ থেকে শুরুতে আসা যায়, বারবার, অসংখ্য বার।
ঈদ। এই কবিতাটা ক্যালিগ্রাম নয়, তবে প্রায় সব বাংলাদেশির জীবনের একটা ছোট্ট কিন্তু দুঃখজনক সত্য উঠে এসেছে এখানে। ঈদ (আসলে যেকোনো উৎসবের) আনন্দটা যে বয়স একটু বাড়ার সাথে সাথে দমে আসে, উল্লাসটা যে খাঁটি থাকে না আগের মতো-এমন কেন হয়? ইনোসেন্স হারানোর সাথে এই অনুভূতির সম্পর্ক আছে, দেখিয়েছেন কবি।
শূন্যস্থান। মাহমুদ কবিতায় মেটাফিকশন পছন্দ করেন। বেশ কয়েকটা কবিতায় চরিত্রেরা জানে তারা কবিতার চরিত্র। কোথাও কোথাও কবি নিজেই কবিতার চরিত্র। শূন্যস্থানকে তার মেটাফিকশনাল কবিতার সবথেকে ভালো উদাহরণ বলে মনে হয়েছে আমার। এখানে কবিতার লাইনের মাঝে যে সাদা শূন্যস্থান, সেই ইমেজারি, সেই রূপকের মাধ্যমে কবি বারবার কবিতার অধ্যায় বদলে দিয়েছেন, প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছেন, অর্থ বদলে দিয়েছেন। না পড়লে এই কবিতার ইমপ্যাক্ট বোঝানো খুবই কঠিন।
সবশেষে কিছু কথা: আমি কিছুদিন আগে জীবনানন্দের রূপসী বাংলা পড়লাম। সেটা মাস্টারপিস ছিলো সন্দেহ নেই, আর আমি তুলনায় যাচ্ছি না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে যদি বলি: আমি শহরের মানুষ, একবিংশ শতাব্দীর মানুষ। আমি যে সময়ে বসবাস করি, সেই সময় নদীতীরে অলস ভঙ্গিতে শুয়ে থাকার সুযোগ পায় না। মোটরগাড়ির চাকা হয়ে, জ্বলন্ত রকেট হয়ে তীব্র গতিতে ছোটে। আমার ইতিহাস ছোট্ট গ্রামের দৈনন্দিন জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, আমার ইতিহাস হচ্ছে সারাবিশ্বের ইতিহাস। এই বিষয়গুলোর জন্যে ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতাকে মনে হয়েছে আমার জন্য কবিতা। আধুনিক জীবনের বিভ্রান্তি, দুঃস্বপ্ন, ক্লান্তি আর যন্ত্রণার জন্য কবিতা।
ইমতিয়াজ মাহমুদের সাথে পরিচয় প্রথম ফেইসবুকে। কেউ একজন উনার পোস্ট শেয়ার করেছিলো। ম্যাক্সিম নামে দুই লাইনের কবিতার মতো কোন একটা লেখা। লেখাটা পড়ে ফেইসবুক স্ক্রল করা বন্ধ রেখেছিলাম কতক্ষন। দুই লাইনেও এতো কিছু বলা যায়! এতো গভীর ভাবনা, চিন্তা প্রকাশ করা যায়! এক কথায় আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর প্রায় উনার দুই একটা লিখা ফেইসবুকে পড়েছিলাম, এবং প্রায় প্রতিবারই মুগ্ধ করেছে। অবশেষে বই কিনে ফেললাম। কিছু কিছু কবিতা তেমন ভালো লাগেনি। কিন্তু কিছু কবিতা পড়ে অনেকক্ষন স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। এরকম কিছু কবিতা নিয়ে কিছু না বললেই নয়।
বই কিনে বাসে বসে বই খুলেই প্রথমে পড়ি সুখী আর অসুখী কবিতাটা,
যাদুকর আমারে পাথর বানিয়ে রেখে দিয়েছে কালো পাহাড়ে এই গল্প শুনে ঝর্না বলে উঠল, আহারে!
Surrealistic কবিতা খুব বেশি পড়া হয়নি। কিন্তু এই কবিতার বিমূর্ত ভাব আমাকে অন্যরকম একটা ঘোরে নিয়ে গেলো। ভালো লেগেছে সফলতা কবিতাটা।
আকাশের কাছে গেলে জানা যায় আকাশ বলে কিছু নাই।
কত সাধারণ কিন্তু নির্মম এ সত্য, কত সহজ কিন্তু সত্য এ প্রকাশ। ভালো লেগেছে বাজার কবিতাটা,
আমি একা জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি সবজি বাজারে। এখানে অনেক লালশাক উঠেছে আজ অনেক বাঁধাকপি। ঐপাশে সবুজ ঢেঁড়স। আর তার পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি আমি এক নিঃস্ব মানুষ; - আমাকে কিনুন।
এই লাইনগুলো পড়ে Peaky Blinders সিরিজের Thomas Shelby এর বিখ্যাত ডায়লগ মনে পড়েছিলো,
Everyone's a whore, Grace. We just sell different parts of ourselves.
ভালো লেগেছে শখ কবিতাটি, দুই লাইনে এতো সুন্দর রোমান্টিক কথা লিখা সহজ কাজ নয়।
জলের উপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকা বক তোমায় দেখে বাড়ে আমার নদী হবার শখ।
ভালো লেগেছে জীবনের প্রকার কবিতাটি, নিজের জীবনের বর্তমান অবস্থা থেকে অন্য আরেকটা অবস্থাকে সবসময় উৎকৃষ্ট ভাবার এবং দেখার যে প্রয়াস আমাদের মাঝে দেখা যায়, তাই প্রকাশ হয়েছে এই কবিতায়।
বইয়ের নাম কবিতাটাও ভালো লেগেছে। মানুষের লোভ, অন্ধের মতো জীবনের পেছনে(নাকি ক্ষমতা, অর্থ, বিত্তের পেছনে?) ছুটে চলাকে কবি ব্যাঙ্গাত্নকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
লাইভ কবিতায় কবি নর্দমার নোংরা থেকে বের হওয়া নির্যাসকে রঙ বানিয়ে তুলি দিয়ে বর্তমান সাংবাদিকদেরকে মুখ একেছেন, খুবই যত্নে এবং নিষ্ঠার সাথে।
আরো ভালো লাগার কিছু কবিতা ছিলো। দুই বসায় দুইবার বইটা শেষ করেছি। ভালো লাগা কবিতাগুলো হয়তো মাঝে মাঝেই পড়া হবে।
উনার বাকি বইগুলোও পড়ার ইচ্ছা রইলো। উনার মতো আরো কবির জন্ম হোক।
সব মিলায়ে চমৎকার একটা বই। ইমতিয়াজ মাহমুদ চমৎকার লিখেন, বাংলায় ইদানীং কবিতার ফরমে কাউকে গল্প বলতে দেখি না আমি, তারে ছাড়া। অবশ্য বাংলা কবিতা পড়াও হয় কম।
আমার আসলে কবিতা পড়াই হয় কম, বাংলা বলে কথা না, ভালো লাগে গল্প, লিখিও ঐ জিনিস, পড়িও তাইই। এর ফাঁকে পুরনো আমলের কিছু বড় বড় নামের কবিতা পড়ে ফেললেও ইদানীংকালের কবিতা পড়া হয় না, কবিতারে সাহিত্যের মহত্তম রূপ বলে বিশ্বাস করতেও প্রবৃত্তি হয় না। এর মানে এই না যে কবি���াবিদ্বেষী আমি, না। ইমতিয়াজ মাহমুদের এই বইয়ের বেশিরভাগ লেখা অসাধারণ, বিশ্বযুদ্ধ বিষয়ে যেটা, শিল্পী বিষয়ে আছে আরেকটা, ঐটা, আর হারুন নামে একটা আছে, একটা আছে জীবনের প্রকার নামে, এগুলো প্রায়শই আড্ডায় উঠে আসে। কিছু কবিতা ভালো লাগে নাই, স্বাভাবিক, কবিতার বইয়ে এত বেশি কবিতা ঠেসে দেয়া থাকে, যে এর মাঝে সবাইকে ভালো লাগলে আপনার নামটা পরের সংস্করণে জুড়ে দেয়ার অধিকার আপনি অর্জ্জন করে নিয়েছেন। এই বইয়ের হয়ত শতকরা চল্লিশ ভাগ লেখাই আমার ভালো লাগে নাই, বাকী বিশ ভাগ মাঝারি দরের লেগেছে, কিন্তু আর চল্লিশ, আগুন, কী নিদারুণ আগুন।
আমি সুপারিশ করবো পড়তে। এইখানে লেখকের পঁচিশটা কবিতা পাবেন, তার মাঝে আছে এই বইয়ে সঙ্কলিত পাঁচটা, শূণ্যস্থান, একদিন, হারুন, ঈদ আর উন্মাদ। উন্মাদ-শূণ্যস্থান বাদে বাকী তিনটা, আমাকে যদি বলেন, দাগ বসিয়ে যাওয়ার মতন।
কবিতার বই নিয়ে আমি রিভিউ লিখতে পারিনা। কিছু লিখতে গেলেই মনে হয় কবিতা নিয়ে সম্যক ধারণা আমার যথেষ্ট কম। এই বইয়ের আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো কবিতাগুলোকে তারই আকৃতি বা ক্যালিগ্রাফি রূপে উপস্থাপনের ব্যাপারটা। "চোখ" কবিতাকে সাজিয়েছেন চোখের আকৃতিতে, গাছ কবিতাও দেখতে গাছের মতোন, বৃষ্টি কবিতায় দেখা যায় বৃষ্টি আকারে অক্ষর সাজিয়েছেন।
“একদিন সব অবহেলা দ্বিগুন করে ফিরিয়ে দেব... ” অথবা “আমি যেখানে পা রাখি সেখানেই তৈরি হয়ে যায় কবর।”
এই টাইপের সুন্দর গদ্যরূপী কবিতা(!) নিয়ে এই বইটার জন্ম। অনেকগুলো বই একসাথে পড়ছি। ব্যস্ততার কারণে কোনোটাই ইতি টানা হচ্ছে না। আজকে ইতি টানতে সমর্থ হলাম এই বইটা। গদ্যরূপী সব কবিতা, এর মধ্যে দেখা দিয়েছে পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা, জীবনবোধ কিন্তু আর দশটা কবিতার বইয়ের সাথে এই কবিতাগুলোর পার্থক্য হল এখানে কোনো অহেতুক জটিলতা নেই, একেবারে সহজ ভাষায় বলা হয়েছে কথাগুলো। বইয়ের প্রত্যেকটা লেখাই ভালো লেগেছে। এককথায় ইমতিয়াজ মাহমুদে আমি মুগ্ধ।
কবিতার কাজ কী? জীবনানন্দ বলে গেছেন, কবিতা অনেক রকম। ফলে, স্বাভাবিকতই কবিতার কাজও অনেক। “না পারে বুঝাতে আপনি না বুঝে মানুষ ফিরিছে কথা খুঁজে খুঁজে কোকিল যেমন পঞ্চমে কূজে মাগিছে তেমন সুর, কিছু ঘুচাইব সেই ব্যাকুলতা কিছু মিটাইব প্রকাশের ব্যাথা বিদায়ের আগে দুচারিটি কথা রেখে যাবো সুমধুর। ”
রবীন্দ্রনাথের পুরষ্কার কবিতায় কবিকে স্বীয় কর্ম সম্পর্কে এ ছন্দিত বাক্যগুলো বলতে শোনা যায়। ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতার দিকে তাকালে তার সংগে পুরষ্কার কবিতার ঐ কবির অনেকটা সাযুজ্য নজরে পড়ে, পুরোটা নয়। আংশিক সাযুজ্য, কেননা প্রথমত ইমতিয়াজ মাহমুদ রবীন্দ্রনাথ নন, দ্বিতীয়ত ইমতিয়াজ মাহমুদ কাজ করেন দুঃখবোধ নিয়ে, সুমধুর কথার কবিতা রচনা তিনি করেন না। ভাষা যখন আর মানবের বিচিত্র অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারে না, তখন কবিতা এসে সে দায়িত্ব নেয়।
মানুষের হৃদয়ের ভেতরে পুষে রাখা বেদনা, দীর্ঘশ্বাসকে কোনরূপ পরিবর্তন না করে ভাষায় অনুবাদ করলে যা পাওয়া যায়, ইমতিয়াজ মাহমুদ তাই লেখেন। তবে অন্য সব কবির মতো তিনি প্রেম, বিরহকে বেছে নেননি কবিতার মূল বিষয় হিসেবে। সব কবিতার পরিসংখ্যান করলে, বিরহের উপস্থিতি অতি অল্প সংখ্যক কবিতায় পাওয়া যাবে। তার কবিতা মূলত: হৃদয়ের অকৃত্তিম উচ্চারণ।
বইটিতে মোট চৌত্রিশটি কবিতা আছে। বইটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থগুলোর একটি।
বেশ ভালো বই। লেখকের লেখা বছর দুয়েক ধরে নিয়মিত পড়ি। এরকম কবিতাই হয়তো দরকার ছিলো, যখন অহরহ ফরাসি কবিতার বানে বিপর্যস্ত পাঠক কোথাও কবিতা নিয়ে কথা বলতে গেলেই বলে বসে, "কবিতা বুঝিনা"। ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা উন্নাসিক না, পাঠককে অপমান করে না, বরং তালপাতার ভেলায় ভাসায়, আর মাঝে মাঝে বজ্রপাতের শব্দ ভেসে আসে। যদি কেউ পড়তে চান, নেটে সার্চ দিলেই তার কিছু কবিতা পাবেন। আর ধুমধাম পড়ে ফেলবেন। এই বইটা পড়তে আমার লেগেছে আটচল্লিশ মিনিট, এত জলদি কোন কবিতার বই শেষ হয়? হয়, হয়, ইমতিয়াজ মাহমুদ এরকমটা লেখতে পারেন।
মানুষকে দিয়ে বেড়াবার মতন বই। নকশা কবিতাগুলাও চমৎকার ছিলো। কিছু কবিতা দুর্বল লেগেছে, তা লাগাই স্বাভাবিক। একটা কবিতার বইতে কী সব কবিতাই ভাল্লাগবে? কুড়ি ভাগ ভাল হলেই সার্থক বলা যায় মনে করি, এতে তো সত্তুরভাগ দারুণ কবিতা।
কীভাবে একটা কবিতার বই বিচার করা যায়? সম্প্রতি বৈভব প্রকাশিত মৃদুল মাহবুব বিরচিত 'কবিতাকলা ভবন' কিনেছি। পড়া শুরু করলে বুঝতে পারব হয়তো। তবে নানান সময়েই কবিতা আমার মনে দাগ কেটেছে। স্থান যেখানে অল্প, কবিতা সেখানে বিস্তৃত। 'কালো কৌতুক' এর গদ্যকবিতাগুলোর কিছু কিছু বুঝেছি, ভালো লেগেছে। সবচেয়ে বড় কথা কবি বর্তমান সময়কে পাশ কাটিয়ে স্বপ্নরাজ্যে বিচরণের চেষ্টা করেন নি। বিষণ্ণতার ছোঁয়া আছে ত���ঁর কবিতায়। 'আমেরিকা' কবিতাটা ভালো লেগেছে। এক সময়ে প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরকে প্রেমের কবিতা উপহার দিত। আজ সে চর্চা ক্ষীয়মান। তবে অন্তর্জালে নিজের প্রচ্ছদ চিত্রের ক্যাপশনে বা নিছক পোস্টে কবিতার চর্চা আছেই।
This book took less than an hour to finish. But one can go through the pages for a thousand days without getting bored. What a poet Imtiaz Mahmood is! Some words are born to be used by him!
ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা 'কালো কৌতুক' বইটি পড়লাম। ছোটোবড়ো মিলিয়ে মোট ৩৪টি কবিতা (ম্যাক্সিমসহ) আছে এই বইটিতে। সহজ ও অর্থবহ হওয়ায় বেশিরভাগ কবিতাই ভালো লেগেছে। তন্মধ্যে ঈদ, হারুন, একদিন, আত্মজীবনী, দহন, বাবা দিবসে, আমেরিকা, রুচি, সম্পর্ক এবং শুন্যস্থান আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে।
আমি মূলত আমার পোষাকের বাহন, এরকমই একটা লাইন দিয়ে পরিচিত হয়েছিলাম ইমতিয়াজ মাহমুদের সঙ্গে। এতদিন পরে উনার বই পড়তে এসে দেখলাম কি সর্বনাশ! ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে, অধিকাংশ অ্যাস্থেটিক পোস্টের ক্যাপশানে যে 'ভালো লাগার মতো' লাইনগুলো এতদিন পড়েছি, বিশ্বাস করেছি সবই দেখি ই.মা'রই কোনো না কোনো কবিতার অংশ কিংবা হুবহু পঙক্তি ছিল! "কালো কৌতুক" ইমতিয়াজ মাহমুদের ২০১৮ সালের একটি বই, অর্থাৎ ঠিক যেই সময়ে আমার কবিতা পড়ার অভ্যাস যাব যাব করছে ঠিক ওই সময়েই ইমতিয়াজ লিখছেন, "জলের উপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকা বক/ তোমায় দেখে বাড়ে আমার নদী হবার শখ।"
বইটা তখন হাতে/চোখে/ মনের কাছে পেলে খুব উপকার হোত। এই বইয়ের কবিতাগুলো দীর্ঘ এবং প্রভাবশালী। অনেকদিন নিজের সঙ্গে নিয়ে চলার মতো একটি বই।
কবিতা নাকি গল্প, কোনটা প্রিয়? কেমন হয় কবিতার মাঝে একটা বিশাল গল্পের জায়গা করে দিলে? সার্থক কবিতা তখনই বলা যায় যখন তাতে বিশেষ ভাব থাকে, অনুভূতির রঙের মিশেল থাকে, একটা লুকায়িত গল্প থাকে। কখনো শব্দের যুগুল মিলিয়ে, কখনোবা শুধু মনের ঝাঁঝ উড়িয়ে লেখা কিছু বাক্য। তবে উপভোগ্য হওয়া চাই। ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা 'কালো কৌতুক' বইয়ের কবিতাগুলো ছিলো দারুন উপভোগ্য। সমাজের চিত্র বলি কিংবা মানুষের দুঃখ, সুখের কলতান বলি বা সিস্টেমের সার্কাস, সবটাই উঠে এসেছে নিখুঁতভাবে। তবে আপনি যদি ছন্দের খেলা পছন্দ করেন বলে অথবা সাধারণ প্যাটার্নে লেখা কবিতা পড়তে গিয়ে বইটা হাতে নেন, তবে আগেই বলে রাখি, বইটা তেমন নয়। এখানে কবিতাগুলো ভিন্ন রকমের, ভিন্ন প্যাটার্নে লিখা। এর কোনো না কোনো একটা কবিতায় পাঠক নিজের সাথে সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাবেন বলে আমার নিশ্চিত ধারণা।