এই সুরে কাছে দূরে (দৈনন্দিন জীবনের হাসি আনন্দ দুঃখ বেদনা নিয়ে একটি সামাজিক উপন্যাস) ইব্রাহিম মিয়া একজন ভিক্ষুক। অত্যন্ত প্রতিকুল পরিবেশে জীবন কাটলেও জীবন সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ইতিবাচক। রহমান সাহেব অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারী কর্মকর্তা। মধ্যবিত্ত এই ভদ্রলোকের বড় ছেলে রফিক ভার্সিটির মেধাবী ছাত্র হলেও সমাজের দূষ্টচক্রের প্রভাবে সন্ত্রাসী হয়ে গেছে, বড় মেয়ে বীথিকে ভাল বিয়ে দিয়েছেন, ছোট মেয়ে তিথীও বেশ মেধাবী, ভার্সিটিতে পড়ছে। ইরফান চৌধুরী একজন বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, কোটিপতি। তবে তার জীবনের শুরুটা সুখকর ছিল না। অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় ভার্সিটিতে পড়ার সময় আবেগের বশবর্তী হয়ে বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করে বড় সমস্যায় পড়ে যান। শারমিনও একসময় তার ‘ভুল’ বুঝতে পারে কিন্তু ততদিনে সে অন্তঃস্বত্বা হয়ে গেছে। নিজের সন্তানকে ত্যাগ করে সে নির্দ্বিধায় আরেকজনের সাথে আমেরিকা চলে যায়। চৌধুরী সাহেব তার অসামান্য মেধার কারণে পূর্ণ স্কলারশীপ পেয়ে আমেরিকায় পড়তে যান। তার মেয়ে অহনার কথা ভেবেই তিনি আর বিয়ে করেন নি। বাবা আর মেয়ের সম্পর্কটা অত্যন্ত আবেগময় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। অহনা তার বাবার মতোই অত্যন্ত সহজ সরল একজন মানুষ, মানুষের কষ্টে যে ব্যথিত হয়, সহযোগিতা করতে চায়। তিনটি সামাজিক/ অর্থনৈতিক অবস্থানের এই তিনটি পরিবারের জীবনের সূখ, দূঃখ, আনন্দ, বেদনার গল্প এই উপন্যাসে উঠে এসেছে। তিনটি পরিবারের অবস্থান ভিন্ন হলেও তাদের চিন্তাধারণা জীবন সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় একই রকম। এই তিনটা পরিবারের সদস্যদের একের সাথে অন্যের যোগাসূত্র স্থাপনের মাধ্যমেই উপরোক্ত বিষয়টা লেখক তুলে ধরেছেন। রফিকের সাথে অহনার প্রেম অসম এবং অবাস্তব মনে হলেও, এটাকে অসম্ভব বলা যায় না। তিথীর সাথে তারই ডিপার্টমেন্টের সফিকের প্রেমটা সে তূলনায় অনেক স্বাভাবিক মনে হয়। অহনার এতো বিত্ত-বৈভবের মাঝে কাটানো জীবনটা কতোই না সরল। সবার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েও শেষপর্যন্ত নিজের জন্য কী পেল সে?
উপন্যাসটি তিনটি পরিবারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার গল্প। পরিবার তিনটির একটি হতদরিদ্র, একটি মধ্যবিত্ত, আর একটি উচ্চবিত্ত। জীবনের পথ পরিক্রমায় পরিবারগুলোর সদস্যদের দেখা হয়। সৃষ্টি হয় সহানুভূতি আর ভালোবাসার কিছু মন ছুঁয়ে যাওয়া গল্প। বদলে যায় তাদের জীবনের গতিপথ।
উপন্যাসের গল্পটা বেশ হৃদয়গ্রাহী। আর লেখকের লেখকের লেখনীর প্রশংসাও না করলেই নয়। বাহুল্যবর্জিত, ঝরঝরে লেখা উপন্যাসটিকে পূর্ণতা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এক বসায় পড়ে ফেলার মতো উপন্যাস।
তিনটি ভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবারের গল্পকে এক সুতোয় গেথেছে দারুণ এই উপন্যাসটি। ভিক্ষুক ইব্রাহিম মিয়া, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ইরফান চৌধুরী এবং রহমান সাহেবের সংসারের গল্পের মাঝে কখন যে এক ভিন্ন গল্প শুরু হয়ে যায় তা টেরই পাওয়া যায় না। যেই গল্পে আছে ভালোবাসা, মানবতা এবং একই সাথে হারানোর ভয়। সাবলীল লেখনশৈলী এবং দুর্দান্ত স্টোরি টেলিং উপন্যাসটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যে-কোনো বয়সী পাঠকের কাছেই বইটি ভালো লাগবে।
নতুন বছর ২০২৫-এ এই বইটি আবারও পড়ে শেষ করলাম, যদিও প্রথমে ভেবেছিলাম এই বইটা আগেও পড়েছি এখন কি আর আগের সেই ফিল'টা পাব? কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও পড়া শুরু করার পর থামতেই পারছিলাম না; আমি যা ভাবতাম যে, একটি ভালো বই কখনো পুরনো হয় না, যতবারই পড়ি না কেন সবসময়ই নতুন মনে হয় এবং ঠিক আগের মতোই আনন্দ এবং উত্তেজনা নিয়ে পড়ি। বইটা শেষ করে শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে, জীবন কি ভয়ংকর সুন্দর এবং বেদনাদায়ক! আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কত ধরণের পরীক্ষায় নিক্ষেপ করেন, কেউ সফল হয় কেউ হয় ব্যর্থ তবুও জীবন থেমে থাকে না, উপন্যাসের প্রধান এবং প্রিয় চরিত্র রফিক এর শেষটা মানা যায় না কিন্তু জীবন এমনই, বাস্তবতা আমাদের হৃদয় ভেঙে দেয় এবং কোনোরকম তোয়াক্কা না করেই জীবন আমাদের সাথে মজা নেয়, মজা নেয় বলাটা ঠিক হবে না, আসলে জীবনের রীতি নিয়মই এমন, প্রকৃতি কিংবা স্রষ্টা মানুষকে নিয়ে রহস্য করে!রহস্যে রাখতে পছন্দ করে☘️🤍🖤