বিভাবরীঃ এক তরুণ দম্পতি নূতন একটা বাসায় ওঠার পর ঊর্মী ঘর গোছানোর সময় একটা অনেক পূরাতন ডায়রি খুঁজে পায়। ডায়রিটা পড়ার সময় সে বিষ্মিত হয়ে লক্ষ্য করে, ডায়রির প্রায় সব ঘটনাই তার জীবনের সাথে মিলে যাচ্ছে! পরবর্তিতে ওতে যা লেখা আছে সেটা পড়ে সে আতঙ্কে হীম হয়ে যায়। পরের ঘটনাগুলোও কী তার জীবনে ঘটতে চলেছে? ওগুলোর মতো শাহেদও কী একই ধরণের আচরণ করবে?
দ্বৈতসত্বাঃ বিয়ের পর প্রথম তারা কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে। কাপ্তাই থেকে বেড়িয়ে ঢাকায় ফেরার পথে তাদের বাসটি ভয়াবহ এক দূর্ঘটনায় পড়ে। জ্ঞান হারানোর আগে নাসের রিশার রক্তাক্ত মুখটা দেখতে পায়। জ্ঞান ফেরার পর ‘সে’ নিজেকে সম্পূর্ণ এক অন্য পরিবেশে, অন্য জায়গায়, অন্য পরিচয়ে আবিষ্কার করে। মেয়েটার চেহারা তার অতি পরিচিত হলেও এর নামও ভিন্ন! তাদের একটা মেয়েও আছে। কিছুই বুঝতে পারছে না সে!
নিঃসঙ্গ যাত্রীঃ শফিকের পরিচয় কেউ জানে না। সে নিজেও জানেনা তার বাবা মা পরিবার কে, কোথায় থাকে। সে শুধু ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়ায়। অনেকবছর আগে একবার সে বজ্রপাতের শিকার হয়েছিল, তার পর থেকে সে লক্ষ্য করে, সে অন্যের মনের কথা, চিন্তা পরিষ্কার শুনতে পায়। তার এই ক্ষমতাটা কাজে লাগিয়ে একদল ভয়ঙ্কর নারীপাচারকারীদের ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টাকালে তার নিজের জীবনই বিপন্ন হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ অন্য আর দশটা দিনের মতোই আতিক সাহেব ঘুম থেকে উঠে ডাইনিংরুমে এসে চা দিতে বললেন। তার কাছে বাসাটা এবং অন্যান্য সবকিছুই ভীষণ অপরিচিত লাগে, এমনকি তার স্ত্রীকেও তিনি চিনতে পারেন না, তাকে অনেক বয়ষ্ক মনে হচ্ছে। তিনি কিছুই বুঝে পাচ্ছেন না! তার বন্ধু নিউরো সার্জন, যাকে অনেক বয়ষ্ক লাগছে, এসে তাকে জানালেন, গতকাল নয়, প্রায় দশবছর পর তিনি কোমা থেকে ফিরে এসেছেন। তার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছে!
স্বপ্নীল ভালবাসাঃ প্রিয়ন্তি শুধু তার স্বপ্নেই আসে। কিন্তু স্বপ্নের প্রতিটা ঘটনা, প্রতিটা দৃশ্য মামুনের কাছে এতো বাস্তব মনে হয়, মেয়েটাকে বাস্তবে না চিনলেও তাকে তার এতো চেনা আর আপন মনে হয়, সে প্রিয়ন্তির দেখা পাওয়ার আশায় রাতের পর রাত স্বপ্নের প্রতিক্ষায় থাকে। স্বপ্নের প্রিয়তমাকে কি সে বাস্তবে পাবে কোনদিনও?
অন্যজীবনঃ জাভেদ ভাবছে, আসলে তার কী হয়েছে? তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? নাকি, সে একটা খুব সুন্দর স্বপ্ন দেখছে, যেটা ভেঙ্গে গেলেই সে দেখবে সে তার সেই উত্তরার ছোট্ট এপার্টমেন্টের আগোছালো পরিবেশে আছে, যাকে অদক্ষতার জন্য চাকুরী থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, যার আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তার স্ত্রী কেয়া তার সন্তানদের নিয়ে চলে গেছে! নাকি ওই জীবনটাই একটা স্বপ্ন ছিল, এটাই তার আসল জীবন, যেখানে সে একজন সফল মানুষ, একজন ভালো বাবা, একজন আদর্শ স্বামী, যে স্বচ্ছল এবং সবার কাছে খুবই জনপ্রিয়!
নিঃসীম শুন্যতাঃ কায়েস দেখছে, সে আদিগন্ত বিস্তৃত একটা বিশাল মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। যতদুর দেখা যায় সবুজ ঘাস বাতাসে দুলছে, মাঝে মাঝে অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে রয়েছে নানা রং এর বুনো ফুল। পেছনে তাকাতেই সে দেখলো একটা বড় গাছের নীচে শরিফা দাঁড়িয়ে হাসছে। শরিফা এগিয়ে এসে কায়েসের পা ধরে কদমবুসি করে হাসিমুখে বলে উঠলো, ‘ভাইজান আমি মনে হয় ভুল বলছিলাম। আপনে আসলে তখনো মারা যান নাই। ভালোই হইলো, এখন আর কোন কষ্ট পাইবেন না। কষ্টের শেষ হইছে।‘ বলে শরিফা একটা পায়ে চলা পথ ধরে হাঁটা শুরু করলো। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার সময়ে সম্ভবতঃ শরিফার সাথে তার টেলিপ্যাথিক বা কাল্পনিক কথপোকথন হয়েছিল। এখন সে চলে এসেছে অন্য এক জগতে, যেখানে দুঃখ, কষ্ট, চিন্তা কিছুই আর তাকে কোন দিনও স্পর্শ করতে পারবে না…
(রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কায়কোবাদের শাহিনাকে উদ্ধার প্রচেষ্টার সময় গ্যাস সিলিন্ডার বিষ্ফোরণে দুঃখজনক মৃত্যু নিয়ে লেখা কাল্পনিক গল্প। এই বইটি কায়কোবাদকে উৎসর্গ করা হয়েছে)
অসাধারণ এক গল্প সংকলন।কি সুন্দর প্লট এবং কি সুন্দর লেখনী। মোট সাতটা গল্প নিয়ে রচিত এই সংকলনে প্রত্যেকটা ডিফারেন্ট স্টাইলের গল্প।বৈচিত্রতা এই সংকলনের বৈশিষ্ট্য।নানান বৈচিত্রময় গল্পে ভরপুর গল্পসংকলন টি।এক বসায় শেষ করেছি বইটা
"বিভাবরী" বইটি মূলত একটি পরাবাস্তব গল্প সংকলন, যাতে সর্বমোট সাতটি গল্প রয়েছে। বদরুল মিল্লাত স্যারের লেখায় সবচেয়ে ভালো লাগার যে বিষয়টি সেটা হচ্ছে তিনি সহজভাবে গল্প লিখতে পছন্দ করেন৷ সামাজিক হোক বা থ্রিলার, সহজ ও সাবলীল লেখাই তার বৈশিষ্ট্য। এই বইতেও এই ব্যাপারটা পরিলক্ষিত হয়েছে। যার ফলে বেশ দ্রুত পড়া গিয়েছে, তবে সবচেয়ে বড় সুবিধাটা হয়েছে ভিজুয়ালাইজ করতে৷ গল্পটা কোথায়, কেমন পরিস্থিতিতে ঘটছে, চরিত্রগুলো কেমন, তাদের পারিপার্শ্বিক ও মানসিক অবস্থা এই সম্পর্কিত ইমেজটা খুব দ্রুতই তৈরি করতে পেরেছি।
গল্পগুলো পরাবাস্তব হলেও, আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, লেখক পজেটিভিটিকে বেশ প্রাধান্য দিয়েছেন। কিছু কিছু গল্প হয়তো কাউকে মোটিভেট করতে সক্ষম বলেও আমার বিশ্বাস। অন্ধকারের মাঝখানে থাকতে থাকতে যখন কেউ ফিকশনের মাঝেও খানিকটা আলো দেখান, তখন আসলে বেশ ভালোই লাগে। অনেকটা যেমন দেখেছি, পাওলো কোয়েলহোর "দ্য আলকেমিস্ট" বইতে। এর আগে লেখকের "আলোকের এই ঝর্ণাধারায়" বইটি পড়েও আমার এরকমটাই মনে হয়েছিল।
ওভার অল, বেশ ভালো একটা বই। যেকোনো পাঠকের কাছেই ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। বিশেষ করে যারা রিডার্স ব্লকে আছেন, কিংবা ব্যস্ততার মাঝে কঠিন টাইপের ফিকশনে ডুব দিতে পারছেন না, তাদের কাছে এই বইটা বেশ ভালো লাগবে।