স্বকৃত নোমান (Swakrito Noman) ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর ফেনীর পরশুরাম উপজেলার সীমান্তবর্তী বিলোনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞানার্জন ও লেখালেখিকে জীবনের প্রধান কাজ বলে মনে করেন। স্বভাবে অন্তর্মুখী, আবেগপ্রবন, যুক্তিবাদী ও প্রকৃতিমনস্ক। প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে রাজনটী, বেগানা, হীরকডানা, কালকেউটের সুখ, শেষ জাহাজের আদমেরা উল্লেখযোগ্য। গল্পগ্রন্থের মধ্যে নিশিরঙ্গিনী, বালিহাঁসের ডাক। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার ২০১১, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল হুমায়ূন আহমেদ তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার ২০১৫, শ্রীপুর সাহিত্য পুরস্কার ২০১৫, এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬।
ব্যবহারে শব্দের অর্থ বদলে যায়। শাব্দিক অর্থ থেকে দূরে সরে যায় খানিক। যেমন বেগানা বলতে আমরা বুঝি পরপুরুষ, পরনারী। কিন্তু বেগানা অর্থ অচেনা, অজানা কিংবা অনাত্মীয়। স্বকৃত নোমানের এই উপন্যাসে অনাত্মীয় বলেই ধরা যায় বেগানা শব্দটাকে।
উপন্যাসের বিষয়বস্তু 'রোহিঙ্গা সংকট'। আরাকানের মুসলমানদের ওপর মায়ানমারে৷ জান্তা ও স্থানীয়দের জোর জুলুমের কথা কারো অজানা না। আর আজকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশের গলার কাঁটা। কিন্তু সেই ঘটনা মূলধারায় আসে ২০১৫-১৬ সালের পর। এদিকে স্বকৃত নোমানের বেগানা প্রথম প্রকাশ হয় ২০১১ সালে।
রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছিল বহুদিন ধরেই। একটা সময় স্রোত কম ছিল। সেটা বাড়ার পরই বিষয়টা নিয়ে গণমাধ্যমে তোলপাড়, চায়ের দোকানে আলাপ। এসব শুরু হওয়ার আগেই বেগানা বলেছিল তাদের কথা। আরাকান থেকে নৌকায় চড়ে আসা কয়েকটা পরিবারকে নিয়ে যে গল্প শুরু হয়, তা এসে পরিণতি পায় বাংলাদেশের উপকূলীয় রোহিঙ্গা ক্যাস্পে। এখনকার মতো তখনো এতো বেশি রোহিঙ্গা ছিল না সেখানে৷ তবে ক্যাস্পের জীবন তখনো ছিল কষ্টকর৷ সেই কষ্টের মধ্যে বেঁচে থেকে স্বপ্ন দেখে সুরুজ, বিয়ে করে শেফালি। কাজের আশায় মালয়শিয়া পাড়ি দেয় রোহিঙ্গা তরুণ। তার মা রোজ সন্ধ্যায় বিলাপ করতে বসে। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া নিয়ে নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়, তারা তবু বাঙালিদের লবণের খামারে কাজ করার চেষ্টা করে। জীবন বদলাতে চায়। তবে জীবন বদলায় হয়ত এমন কারো, যে মক্কা মদিনায় গিয়ে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা বলে দুই বছরে কামাই করে কোটি কোটি টাকা। উপন্যাসে রোহিঙ্গাদের নিয়ে চলা রাজনীতি আর ব্যবসার কথাটিও বাদ দেননি লেখক।
এই উপন্যাসের শক্তিশালী দিক মূলত এর বিষয়বস্তু। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ভাষা। স্বকৃত নোমান তার উপন্যাসে প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ভাষার যোগ রাখেন। এখানেও রোহিঙ্গাদের মুখের ভাষা, চট্টগ্রামের মানুষের মুখের ভাষা এসেছে। তবে বেশি ভালো লাগা তৈরি করে রোহিঙ্গাদের লোককথা, কিংবদন্তির উল্লেখ। তবে সেটা গল্পের মতো করে আনেন না লেখক। সুরুজ, সোবান বলী, মোহাম্মদ আলীদের জীবন যেন জাফর কাওয়ালের সঙ্গে মিলে যায়। পোয়া হাজী, মোস্তফা, মাদু সেই সবের সঙ্গে একটা করে গল্প হয়ে ওঠে।
অন্য সব নির্বাস মানুষের গল্পের মতো বেগানার চরিত্ররাও নিজেদের জন্য জমি খোঁজে। থিতু হতে চায়। কেউ হয়ত ফিরেও যায় জন্ম ভিটায়। কিন্তু সেখানেও তার জন্য কিছু থাকে না। সে যেন দুনিয়ারই অনাত্মীয়।