#Binge Reviewing all my past Reads:
অবধূত রচিত বাংলা সাহিত্যের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চকর এবং দার্শনিক গভীরতাসম্পন্ন উপন্যাস পড়ার বহু আগেই আমি উত্তম-সাবিত্রী অভিনীত ছবিটি দেখেছিলাম ছেলেবেলায়। এই বইটি কেবলমাত্র এক অরণ্যপথে যাত্রার বর্ণনা নয়, বরং মানুষের অন্তর্জগতের অনুসন্ধান, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সংঘাত এবং আত্মপরিচয়ের সন্ধানও বটে।
‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ মূলত একদল তীর্থযাত্রীর কাহিনি, যারা পবিত্র হিংলাজ মাতার মন্দিরে পৌঁছানোর সংকল্পে এক অনিশ্চিত মরুপথে পা বাড়ায়। পাকিস্তানের বালুচিস্তানে অবস্থিত হিংলাজ মন্দির হিন্দুদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এই তীর্থযাত্রা কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিতে নয়, চরিত্রগুলোর জন্য এক অভ্যন্তরীণ উপলব্ধির পথও হয়ে ওঠে।
যাত্রাপথে নানা প্রতিকূলতা, দুর্যোগ, মরুর নিষ্ঠুর রূপ এবং তীর্থযাত্রীদের মানসিক ও শারীরিক পরীক্ষা উপন্যাসটিকে এক বিশেষ মাত্রা দেয়। প্রত্যেক চরিত্রের মধ্যে বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং আত্মিক জিজ্ঞাসা লক্ষ্য করা যায়।
অবধূতের গল্প বলার দক্ষতা এবং চরিত্রচিত্রণের সূক্ষ্মতা উপন্যাসটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের মানুষ—কেউ ধর্মে গভীর বিশ্বাসী, কেউ সংশয়বাদী, কেউ নিছক অভিযাত্রিক, আবার কেউ আত্মগবেষণার পথিক। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সংঘাত ও ভাবনাচিন্তা মানবসমাজের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
তীর্থযাত্রার পথের প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এবং মানবিক সম্পর্কের ওঠাপড়া আসলে মানুষের জীবনের নানা সংগ্রামের প্রতীক। উপন্যাসে মরুভূমির প্রতিকূলতা শুধুমাত্র ভৌগোলিক বাধা নয়, বরং তা মানুষের মানসিক ও আত্মিক পরীক্ষাও।
এই উপন্যাস কেবলমাত্র ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং তা এক দার্শনিক আলোচনাও বটে। অবধূত এখানে ধর্ম, বিশ্বাস, নিয়তি, মনের শক্তি, আত্মত্যাগ এবং মানবিক দুর্বলতার গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। যাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে চরিত্ররা নতুন উপলব্ধি লাভ করে, যা পাঠকের জন্যও এক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। অবধূতের ভাষা সহজ-সরল, অথচ ব্যঞ্জনাময়। বর্ণনার বিশদতা এবং চিত্রকল্পের ব্যবহারে মরুভূমির নিষ্ঠুর সৌন্দর্য, ক্লান্ত তীর্থযাত্রীদের মানসিক অবস্থা এবং সময়ের নির্মমতা অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের গতি কখনো মন্থর, কখনো দ্রুত—যা একে বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
আজ এই ২০২৫ সালে এসেও কেন পড়বেন এই বই? পড়বেন কেননা ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রার বর্ণনা নয়, এটি এক আত্মসন্ধানের প্রতিচিত্র!! আরও পড়বেন কারণ:
১. এটি ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।
২. মানুষের মানসিক সংকট এবং অস্তিত্বের প্রশ্নকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
৩. ধর্ম, বিশ্বাস, এবং যুক্তির সংঘাতে এক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
৪. ভ্রমণসাহিত্য এবং দার্শনিক কথাসাহিত্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।
এই উপন্যাস পাঠকের মনোজগতে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিচ্ছবি এঁকে দেয়। এটি সেই বিরল উপন্যাসগুলোর মধ্যে পড়ে যা একদিকে যেমন কাহিনির রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে তেমন গভীর দার্শনিক ভাবনায় নিমগ্ন হতে বাধ্য করে। যারা আত্মজিজ্ঞাসা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব, এবং অভিযানের রোমাঞ্চ ভালোবাসেন, তাদের জন্য এ এক অপরিহার্য পাঠ।
পড়ুন ও অন্যদের পড়তে উৎসাহিত করুন।