” বাঙলা আর বাঙালীর ইতিহাস বিচিত্র আর বহুবর্ণ। এই জাতির গড়ে ওঠার নানা পর্যায়ে আছে উত্থান-পতন, গৌরব-গর্ব আর লাঞ্চনা- অপমানের নানা ঘটনা। আজকের বাঙালীর দুর্দশার জন্য তার উপর চলা অবিচার আর অত্যাচারের একটা ভূমিকা আছে। কিশোর-তরুণদের উপযোগী করে লেখা এই বইটিতে বাঙলার সেই বহুবর্ণ ইতিহাসের একটা অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে পিতা আর পুত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে। চেপে রাখা অনেক ইতিহাসের জীর্ণ হয়ে যাওয়া দলিল-দস্তাবেজ থেকে প্রকৃত ইতিহাসকে বের করে আনার প্রয়াসের কারনে লেখক সাধুবাদ পাবেন নিশ্চিত ।এখানে বাঙলা বলতে অবিভক্ত বৃহৎ বঙ্গকে বোঝানো হয়েছে। এই গ্রন্থ আগামী প্রজন্মের কাছে বাঙালীর ইতিহাসের এক নতুন দিক উন্মোচন করবে নিঃসন্দেহে।”
প্রথমত বইটি সহজপাচ্য। দ্বিতীয়ত, বইটিতে আমি পড়েছি সব পুরনো সব অজানা ইতিহাস। বাংলায় নজিক অনূদিত বিজ্ঞানের বইগুলো এখন শতাব্দীর সেরা গোখাদ্য। এদিক থেকে ইতিহাস, আলোচনা, গল্পগ্রন্থগুলো মোটামুটি পাঠ্য। এই বইটির জন্য আমার রেটিং ওভাররেটেড। হয়তো বাবা-ছেলের কথোপকথনের ফ্রেমে বইটি সহজ হয়েছে। কিন্তু, আমার চোখে বইটি তার জহুরিয়ানা খুইয়েছে। থাকতে পারত আরো গভীর বিশ্লেষণ যেটি লেখক এড়িয়ে গিয়েছেন বা করেন নি বা দেন নি-- যাই হোক সেটা। জোর করে কথোপকথনে বইটি এমন করে লিখেছেন যে ব্যাপারটি আমি পছন্দ করতেই পারছি না। কারণ, ছেলের মুখে এমন এমন পটু শব্দে বাবাকে প্রশ্নে বসানো হয়েছে যে ছেলেটার বয়স কি ৭ না ১৭ কি ২৩ আমি ধরতে পারি নাই। এর আগেও চিন কাটুম বই তিনি এই ফ্রেমে লিখেছেন। পরের কথা জানি না। আমাদের বইগুলো এখনও লেখকরা ছেলেপাঠ্য করে লিখছেন। আশা তো করেছিলাম এমন বই গবেষণাপাঠ্য হয়ে যাবে। "হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি" বলে ফেনা তুলে ফেলি, অথচ সংস্কৃতিরসমগ্রটা যে কোথায় তাই এখনো কোটি বাঙালির থেকেও অর্জিত হল না। পিনাকী ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ অন্তত পরিচয় করিয়ে দেয়ায়। জলের উপর ওড়াউড়ি করছি আমরা বহুকাল ধরে। এবার তো একটু গভীরে যাওয়া চাই! বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে, ওভাবে দেশীয় হালকা জ্ঞানে, বিদেশী আমদানিকৃত দক্ষতায় আর বাঙালির সময় আসবার না। রূপালী কথা অতীত, ধূসর কথা হবে ভবিষ্যত। তবে বইয়ের কাগজ আর ডিজাইন এত অসাধারণ যে তার জুড়ি নাই। বাতিঘরের জন্য ভালবাসা।
এই বইয়ের সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো এর সহজ করে ইতিহাস বলার ভঙ্গিমা। বাবা তার কিশোর বয়সী ছেলেকে ইতিহাস শেখাচ্ছেন এমন ভঙ্গিতেই লিখা। বাংলার ইতিহাসের প্রাথমিক ধারণা মিলবে এতে। সে হিসেবে কিশোরদের জন্য বিরক্তিকর ইতিহাসকে উপভোগ করতে চাইলে এই বই ভালো অপশন।
কিন্তু এই বইতে একটা আবছা ধারণাই মিলবে কেবল। অবশ্য এর বেশি চাওয়াটাও অনুচিত। ছোটখাটো একটা বইতে কিভাবেই বা গোটা ইতিহাস তুলে দেয়া সম্ভব? তাই কৌতুহলের জানালা খুলেই ক্ষান্তি দিয়েছেন লেখক। এবার জানালার ওপাশের দৃশ্য দেখার প্রয়াসটা পাঠককে নিজেই চালাতে হবে।
বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসটা টানা হয়েছে বেশ দ্রুততায়। সে হিসেবে ইংরেজ শাসনামলে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন লেখক। ঠিক শাসনামল না বলে বলা উচিত ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের গল্প।
এই বইটা হল ‘ইতিহাসের এক অন্যপাঠ’। প্রচ্ছদ দেখে চোখে পরেছিলো বইটা। নিরাশ হতে হয়নি। এই ভূখণ্ডে শান্তি খুব সহজে ধরা দেয় না। শত শত বছর ধরে আন্দোলন চলে এসেছে। দিল্লীর প্রতাপশালী সম্রাটকেও চোখ রাঙিয়ে কর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এই বাংলার শাসকেরা। অথচ এই জাতিটার কোথায় কী সমস্যা আল্লাহ আলম!!! কেমন যেন কুঁকড়ে থাকে এখন।
লেখকের ইতিহাসের পাঠ নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু বইয়ের কথক ছেলে নাকি মেয়ে, বয়স কত এসব বুঝতে ব্যর্থ আমি।
কিশোর-তরুণদের জন্য উপযোগী করে লেখা হলেও আমার ধারনা যে কোন বয়সী কেউ বইটি পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। ইতিহাস সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান সম্পন্ন পিতা আর জ্ঞানপিপাসু পুত্রের মধ্যে কথপোকথন আর ভ্রমণের মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো বাঙলার এবং বাঙলার মাটির ইতিহাস।
এখানে বাঙলা বলতে অবিভক্ত পুর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গ-কে বোঝানো হয়েছে যা আগে একই ভুখন্ড ছিলো। এই বাঙলা আর বাঙালীর ইতিহাস বিচিত্র আর বহুবর্ণ। অসংখ্যবারের উত্থান-পতন, গৌরব-গর্ব আর লাঞ্চনা-অপমানের মধ্য দিয়ে গিয়েছে বাঙলার ভুমি এবং এই ভুমিতে লালিত বাঙালি সন্তানেরা। স্বাধীন হতে হাজারবার দিতে হয়েছে সাহসীকতা, বিদ্রোহী চেতনা আর সহ্যের চরম পরীক্ষা। এই বাঙলার মাটি শত শত অত্যাচারীর নির্মমতা যেমন দেখেছে তেমনই দেখেছে বিদ্রোহী দেশপ্রেমিকের চেতনাকে। এই নিরিহ বাঙালী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ ও জাতির শাসকদের সাথে সহৃদয়তা দেখালেও তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে দেশের মাটি এবং মানুষের উপর চালিয়েছে নির্মমতার ভয়াবহতা। যতবার বাঙালী শোষিত হয়ে চরম পর্যায়ে গিয়েছে, ততবারই এই বাংলায় বিদ্রোহী সন্তানের জন্ম হয়েছে। আজকের এই বাংলা শুধু পাকিস্তানের কাছে স্বাধীন হওয়া বাংলা নয়। এই বাঙলার ইতিহাস বহুকাল আগের গৌরবময় ইতিহাস। সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাথে কিঞ্চিত করে হলেও পরিচয় করে দিতে এই মূল্যবান রচনাটি করেছেন জনাব পিনাকী ভট্টাচার্য।
প্রাচীন চর্যাপদ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত সকল বড় বড় আন্দোলন এবং বিদ্রোহের গল্প রয়েছে এই বই-এ। এর মাঝে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন রাজবংশ যেমন পাল, গুপ্ত, জমিদার, বারো ভুঁইয়া, নবাবী, মুঘল - এসব শাসনামল, বিভিন্ন বিদ্রোহ যেমন ফকির-সন্নাসী বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, ওয়াহাবী আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহের মত ঐতিহাসিক সব বিদ্রোহী কাহিনির বর্ননা রয়েছে বইটিতে।
বইটি যে কারনে বিশেষভাবে উল্লেখ্য : এর সমগ্র কাহিনীটি পিতা ও পুত্রের কথোপকথন এর মাধ্যমে বর্নিত হয়েছে। এই কথপোকথনের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে যেতে দেখা যায়। বগুরার ইতিহাস বর্নিত হয় বগুরায় সেই স্থানগুলোর পাশে হাটতে হাটতে। তেমনি পুরান ঢাকাসহ অন্যান্য সকল স্থানেও তাদের কথোপকথন চলে ঐ এলাকার ইতিহাস নিয়েই। আর সমগ্র ব্যাপারটা ধারাবাহিক ভাবেই চলে, ঠিক যে ধারাবাহিকতায় সব কিছু ঘটে গিয়েছে।যে কাউকেই রেকমেন্ড করবো বইটি।
বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে ছোট্ট একটি রাস্ট্র। কিন্তু তার রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অতীত যা নিয়ে বাঙালি জাতি গর্ব করতে পারে,আবারো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাসের পরতে পরতে লেখা যেন বাঙালী জাতির সোনালী দিনগুলো। দিনের পর দিন বছরের পর বছর ঔপনিবেশিক শক্তির দ্বারা নিষ্পেষিত হয়েছিল আমাদের মানুষগুলো। কিন্তু মাথা নত করেনি। বাংলাদেশে এমন কিছু ছিল যা পৃথিবীর কোথাও ছিল না।যদি বলি মসলিন শাড়ির কথা তা কেবল বাংলাদেশেই ছিল।
বইটিতে বাঙালি জাতি শুরু থেকে ১৯৪৭ এর দেশভাগ পর্যন্ত সমাজ, ইতিহাস,সাহিত্য,দর্শন,রাজনীতি প্রমুখ বিষয়ের বিস্তারিত প্রাণবন্ত বর্ণনা আছে।বাবা ও কৌতুহলী ছেলের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের ইতিহাসকে বাস্তবিক বর্ণনার চেষ্ঠা করেছেন।বইটিতে কেবল বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাস কেবল নয়,সেই সাথে প্রকাশ পেয়েছে বইয়ের লেখকের অসাধারণ চিন্তনীয় দক্ষতা।এই বইটিকে বাঙালি জাতির ইতিহাসের অভিধান বললেও হয়তো ভুল বলা হবে না।যারা বাঙালি জাতির ইতিহাস গভীর থেকে গভীরতর পর্যায়ে জানতে ইচ্ছুক তারা বইটি পড়তে পারেন।
ইতিহাস আমাকে টানে, বিশেষ করে বাঙলার ইতিহাস! কেননা এ সেই সভ্যতা যা আজ থেকে বিশ বছর আগে পত্তন হয়েছে তবে তার ইতিহাস লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ হতে শুরু করেছে আজ থেকে মাত্র আড়াই হাজার বছর আগে!!!
বাংলা এবং এর সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে অনেক বই পড়েছি। কিন্তু “সোনার বাঙলার রূপালি কথা” বইটি আমার মনে আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে। কেননা ইতিহাস হলো এক বহতা নদী এবং এ নদীতে না ডুবে লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য খুবই অসাধারণভাবে তার বইয়ে পিতা ও পুত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে বাঙলার ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন।
মন খারাপ হয়ে গেছে। বাঙালিরা শুধু বীরের জাতি নয় বাঙালি অনেক উদার এবং মহান। আমাদের এখন উচিত অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্ম নিরপেক্ষ হওয়া। তাহলেই আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক পথে চালিত করতে পারব।