আনোয়ার পাশা একজন বাংলাদেশী কবি, কথা সাহিত্যিক, এবং শিক্ষাবিদ। তাঁর পিতার নাম হাজী মকরম আলী আর মা সাবেরা খাতুন। তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর মোহকুমার রাঙ্গামাটি চাঁদপাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ডবকাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৪৬ সালে মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে কৃতকার্য হন। কিন্তু ১৯৪৮ সালে আবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেন। তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক পাশ করেন ১৯৫১ সালে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যেই স্নাতকোত্তর সম্মাননা অর্জন করেন। মানিকচক হাই মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে আনোয়ার পাশার কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি ১৯৫৪ সালে ভাবতা আজিজিয়া হাই মাদ্রাসায় এবং ১৯৫৭ সালে সাদিখান দিয়ার বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে এই কলেজেরই বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকেন। ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি জৈষ্ঠ্য প্রভাষক পদে পদোন্নতি পান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এখানেই কর্মরত ছিলেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম: উপন্যাস: নীড় সন্ধানী (১৯৬৮), নিশুতি রাতের গাথা (১৯৬৮), রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭৩) কাব্য: নদী নিঃশেষিত হলে (১৯৬৩), সমুদ্র শৃঙ্খলতা উজ্জয়িনী (১৯৭৪), অন্যান্য কবিতা (১৯৭৪) সমালোচনা: সাহিত্যশিল্পী আবুল ফজল (১৯৬৭), রবীন্দ্র ছোটগল্প সমীক্ষা (প্রথম খন্ড-১৯৬৯, দ্বিতীয় খন্ড-১৯৭৮) গল্পগ্রন্থ: নিরুপায় হরিণী (১৯৭০)
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ঢাকার মিরপুরের বধ্যভূমিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সহযোগী আল বদর বাহিনীর সদস্যদের হাতে তিনি নিহত হন। ১৯৭২ সালে তিনি মরণোত্তর বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হন।
কাহিনী মূলত ৪৭ পরবর্তী একটা সময় কিন্তু মূল ঘটনার শুরুটা ১৯৫০ সাল থেকে। ভারতবর্ষ তখন আর অখণ্ড নাই, তা ভেঙে তখন পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে। রবিউল হাসান চৌধুরী র জন্ম এবং বেড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গে। দেশ ভাগের পর অন্যান্য অনেকের মতো তারাও পশ্চিমবঙ্গ থেকে সম্পত্তি বিনিময় করে পাকিস্তানে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। একসময় রাজশাহী কলেজে ভর্তিও হয়ে যায়। রাজশাহী কলেজ থেকে পাশ করার পর সে আর পাকিস্তানে থাকতে চাইলো না। তার মনে হলো - যে দেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামমোহন রায়ের মত মনিষীরা জন্ম নিয়েছেন সেখানে আর যাই হোক সম্প্রীতি সহমর্মিতার অভাব হবে না। সে আবার প্রেসিডেন্সি কলেজে গিয়ে ইতিহাসে পড়ালেখা শুরু করে। কিন্তু যেমনটা ভেবেছে তেমনটা ঘটলো না। কলেজ হোস্টেলেই শুরু হলো মুসলমান ছাত্রদের থাকা নিয়ে নানা ঘটনা।
একটা সময় এসে হাসান বুঝতে পারলো তার ভালো থাকা মন্দ থাকার অনেকটাই নির্ভর করছে তারই হিন্দু সহপাঠী দিপার উপর। দুজনে এক সাথে সময় কাটানো কলেজ স্ট্রিটে ঘোরাঘুরি করে জীবনটা সহজ ভাবে আর চলতে পারলো না।
আনোয়ার পাশা'র "নীর সন্ধানী " বইটা মূলত ১৯৫০ সাল থেকে ভারতের নির্বাচন পরবর্তী সময় পর্যন্ত নিয়ে লেখা। প্রগতিশীল, শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে থাকা হিন্দু সামাজের বিপরীতে মুসলমানদের অনগ্রসরতা এখানে লেখক স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তুলেছেন একই সাথে হিন্দু মুসলমানদের পরস্পরের উপর তিব্র বিদ্বেষ স্পষ্ট।
বইটাতে মূলত দুইটি ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-- প্রথমে পড়তে গিয়ে মনে হবে বইটা একটা প্রেমের উপন্যাস। দুটি ছেলে মেয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক এবং তার পরিনতি। তবে এটা এখানে গৌণ বিষয়, লেখক দেশ ভাগ এর পরবর্তী সমাজ ব্যবস্থা, হিন্দু মুসলমানদের দ্বন্দ্ব এবং মুসলমানদের পিছিয়ে পড়া বিষয়গুলো এখানে তুলে ধরেছেন।
দেশ ভাগ নিয়ে অনেক বই আছে তার বেশীর ভাগ বইয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এদেশের হিন্দুদের নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে যাওয়া ও তাদের প্রতি যে অবিচার এটা নিয়ে কিন্তু খুব ই কম বইয়ে আছে( আমি মাত্র তিনটা বই পড়ছি) যেখানে ভারতের মুসলমানদের এদেশে চলে আসা এবং ভারতে তাদের উপর হওয়া বৈষম্য নিয়ে। দেশভাগ নিয়ে এবং ভারতের মুসলমানদের নিয়ে চমৎকার একটা বই " নীড় সন্ধানী "। ভালো একটা বই পড়ার তৃপ্তি টাই আলাদা। বইটা যে কতোটা চমৎকার তা না পড়লে বলে বোঝানে যাবে না।
একটা বই খুবই বাজে, সাহিত্য গুণ বা মান নাই --এটা বোঝাতে গিয়ে তার যে পরিমান প্রচার হয়, একটা বই ভালো বলে তার অতোটা প্রচার কখনও হয় না। আর এই প্রচার না হওয়ার কারনে অনেক ভালো বইয়ের কথা জানাই হয়ে ওঠে না। এই বইটা তেমনই একটা বই।
আনোয়ার পাশার লেখার সাথে প্রথম পরিচয় হয় ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত' বইটির মাধ্যমে। পড়া শেষ করার পরও বইটি ভালো লাগার রেশ অনেক দিন মনে লেগে ছিল। সেই ভরষায় গত বই মেলায় নিড় সন্ধানী উপন্যাসটি কেনা। 'নীড় সন্ধানী' বইটি ৪৭ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে লেখা। রবিউল হাসান চৌধুরী নামক এক তরুন দেশভাগের পর সম্পত্তি বিনিময় করে পৈত্রিক ভূমি পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে (তৎকালীন) পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এখানে এসে রাজশাহী কলেজে ভর্তিও হয়ে যান। কিন্তু যে সমাজে রবীন্দ্রনাথ, রামমোহনের মতো লোকেরা জন্ম নিয়েছেন সে সমাজ কতটুকুই অনুদার হতে পারে,- চিন্তা করে নিজ জন্মভুমিতে আবার ফিরে যান।সেখানে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাসে পড়তে থাকেন।উপন্যাসের শুরুতেই প্রেসিডেন্সি কলেজের হিন্দু সহপাঠী দিপার সাথে হাসানের প্রণয় লক্ষ করা যায়। ধর্মীয় অসমতাকে অস্বীকার করে প্রণয়কে পরিণয়ে রূপ দিলে কী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, লেখক তা দক্ষতার সাথে দেখিয়েছেন ! উপন্যাসে প্রগতিশীল, শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে থাকা হিন্দু সমাজের বিপরীতে অনগ্রসর মুসলিম সমাজের দুরবস্থা, হিন্দু-মুসলিমের পরস্পরের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তথা পঞ্চাশের দশকের একটি পূর্ণ সমাজচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেশ ভাগের ফলে সকল হিন্দু যেমন পাকিস্তান ছেড়ে চলে যেতে পারে নি, তেমনি ভাবে সকল মুসলিমও ভারত ছাড়ে নি। সংখ্যালঘুদেরকে টিকে থাকার জন্য কীভাবে প্রায়ই সংখাগুরুর বেশভূষা-আচার-আচরন পর্যন্ত অবলম্বন করতে হয় তার খানিকটা ধারণা উপন্যাসটিতে পাওয়া যায়।