Tarashankar Bandyopadhyay (Bangla: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) was born at his ancestral home at Labhpur village in Birbhum district, Bengal Province, British India (now West Bengal, India). He wrote 65 novels, 53 story-books, 12 plays, 4 essay-books, 4 autobiographies and 2 travel stories. For his novel Arogyaniketan, he received the Rabindra Puraskar in 1955 and the Sahitya Akademi Award in 1956. In 1966, he received the Jnanpith Award for his novel গণদেবতা. He was honoured with the Padma Shri in 1962 and the Padma Bhushan in 1969.
Tarasankar is one of those writers of the third decades of the twentieth centuries who broke the poetic tradition in novels but took to writing prose with the world around them adding romance to human relationship breaking the indifference of the so called conservative people of the society who dare to call a spade a spade. Tarasankar’s novels, so to say, do not look back to the realism in rejection, but accepted it in a new way allowing the reader to breathe the truth of human relationship restricted so far by the conservative and hypocrisy of the then society.
He learned to see the world from various angles. He seldom rose above the matter soil and his Birbhum exists only in time and place. He had never been a worshipper of eternity. Tarasankar’s chief contribution to Bengal literature is that he dared writing unbiased. He wrote what he believed. He wrote what he observed.
His novels are rich in material and potentials. He preferred sensation to thought. He was ceaselessly productive and his novels are long, seemed unending and characters belonged to the various classes of people from zaminder down to pauper. Tarasankar experimented in his novels with the relationships, even so called illegal, of either sexes. He proved that sexual relation between man and women sometimes dominate to such an extent that it can take an upperhand over the prevailing laws and instructions of society. His novel ‘Radha’ can be set for an example in this context.
His historical novel ‘Ganna Begum’ is an attempt worth mentioning for its traditional values. Tarasankar ventured into all walks of Bengali life and it’s experience with the happenings of socio-political milieu. Tarasankar will be remembered for his potential to work with the vast panorama of life where life is observed with care and the judgment is offered to the reader. and long ones, then any other author. He is a region novelist, his country being the same Birbhum. He mainly flourished during the war years, having produced in that period a large number of novels and short stories.
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় শেষজীবনে যে সমস্ত বৃহৎ উপন্যাস রচনা করেছিলেন তার মধ্যে 'কীর্তিহাটের কড়চা’ সর্ববৃহত্তম ও সুদীর্ঘ। শুধুমাত্র বৃহত্তম রচনা বললেও ভুল হবে- তার পরিণত জীবনের শেষাংশের শ্রেষ্ঠতম ও মহত্তম রচনাও এটি। এপিক উপন্যাস বলতে যা বোঝায় তার সমস্ত শর্তই এতে পালিত হয়েছে। প্রায় ২০০ বছর সময়ের পৃষ্ঠপটে, জমিদারি প্রথা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত এর কাহিনীতে একটি বংশের সাত পুরুষের ইতিহাস বিধৃত। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে লর্ড কর্ণওয়ালিসের শাসনকক্ষ থেকে মেদিনীপুর জেলার কংসাবতী বারি-বিধৌততট বনছায়াশীতল গ্রাম কীর্তিহাট পর্যন্ত এর কাহিনী প্রসারিত।
কুড়ারাম ভট্টাচার্য ওরফে কুড়ারাম রায় ভট্টাচার্য থেকে অধস্তন সপ্তম পুরুষ সুরেশ্বর রায় পর্যন্ত এর কাহিনী। সাত পুরুষের কাহিনী। যার আরম্ভ কীর্তিহাটে আর শেষ মধ্য কলকাতার জানবাজারে। সাতপুরুষে রায়বংশে মানুষ কম নয়। পুরুষ স্ত্রীলোক ধরে প্রায় পঞ্চাশজন। রায়বংশের সাতপুরুষের এই প্রায় পঞ্চাশ-জন মানুষকে ঘিরে এর কাহিনীর অবর্তনরত। এই কাহিনীর কেন্দ্রস্থলে, এদের মাঝখানে রেখে আরও অন্তত শতাধিক চরিত্র উপন্যাস ও কাহিনীর অংশ হয়ে উপন্যাসের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণ করছে। এরই সঙ্গে আরও অন্তত পঞ্চাশজন পুরুষ, যারা ঐতিহাসিক মানুষ, সত্য মানুষ,যাদের আমরা জানি চিনি, তারা একই সঙ্গে এই রচনার পৃষ্ঠাকে উজ্জ্বল করেছেন।
এই দুশোর উপর সত্য ও কাল্পনিক, অলীক ও ঐতিহাসিক মানুষের সম্মেলনে ও সমবায়ে এ উপন্যাসের সৃষ্টি। সত্যের সঙ্গে কল্পনার, ইতিহাসের সঙ্গে অলীকের মিলনে যা সৃষ্টি হয়েছে তার ক্রিয়া বিচিত্র। এই মিলনের ক্রিয়ায় কল্পনাকে ও অলীককে আরও সত্য বলে মনে হয়। মনে হয়,যাদের কথা এখানে বলা হয়েছে তারা আমার আপনার মতই নিজের নিজের সত্য মূর্তিতেই বেঁচেছিল।প্রতিবারেই মনে হয়েছে, এ রচনায় তারাশঙ্করের বহু-অভিজ্ঞ ও পরিণত শিল্পীমন পাকা রসেরভয়েনে নিজেকে উত্তীর্ণ করেছেন, করতে পেরেছেন। তবে আমার বিচার করার প্রয়ােজনইবা কি? ব্যঙ্গনের পরিচয় তাে তার আস্বাদেই। পাঠক নিজেই সে বিচার করতে পারবেন।
আরেকটু উৎসাহী হয়ে "কীর্তিহাটের কড়চা"কে ৩.৫ বা ৪ তারকা দেওয়া যায়। সচেতনভাবেই দিলাম না। বিষয়বস্তু ও ভাব দুইদিক থেকেই মহাকাব্যিক বিস্তৃতিসম্পন্ন এ আখ্যানে অতিকথন ও অপকথন প্রচুর। এজন্য বেশকিছু জায়গায়(বিশেষত ৩য় খণ্ড) পড়তে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে।
মূলতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা জমিদারি প্রথা আর এর ভালোমন্দ বিশ্লেষণ হচ্ছে লেখকের প্রাথমিক উদ্দেশ্য।যদিও তারাশঙ্কর জমিদারি প্রথা, প্রজা নির্যাতন, জমিদারবাড়ির মানুষদের লালসা, অপকর্ম, নির্যাতনের বিস্তৃত বিবরণ পেশ করেছেন কিন্তু নিজে ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির সন্তান হওয়ায় এ প্রথার প্রতি তার আবেগ গোপন থাকে না।কীর্তিহাটকে কেন্দ্র করে পলাশী যুদ্ধের আগে থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতালাভ ও জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি পর্যন্ত গল্প টেনেছেন লেখক। অর্থাৎ প্রায় দুইশো বছর ও কীর্তিহাটের রায়বাড়ির কয়েক প্রজন্মের মানুষ উপন্যাসের নায়ক ও প্রতিনায়ক হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। সেকালের সমাজ বাস্তবতা মেনে নারী চরিত্ররা অভাগী, বঞ্চিত, অবহেলিত ও "মহান।" তারা বিদ্রোহী হতে চাইলেও হয়ে উঠতে পারে না;সমাজ ও কিছুক্ষেত্রে লেখকের অনিচ্ছায়। কাহিনির পটভূমিকায় ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়া, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, সিপাহী বিদ্রোহ, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ গঠন, বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ আন্দোলনসহ ঐতিহাসিক অনেক ঘটনা থাকলেও এসব ঘটনা সম্বন্ধে নতুন বা অন্তর্ভেদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় না। ইংরেজদের শোষণ ও নির্যাতনও লেখকের কলমে ঠিকমতো ধরা পড়ে না। তারাশঙ্করের অন্য অনেক উপন্যাসের মতো, এখানেও নিখুঁতভাবে ধরা আছে গ্রাম্য কুটিল রাজনীতি। রায় পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বও লেখক সার্থকতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। বইয়ের বেশ কিছু অংশ জমজমাট। তবে ১০৮৮ পাতা দৈর্ঘ্যের একটা উপন্যাসের প্রতি যে প্রত্যাশা থাকে তা পূরণ হয়নি। এই এক বই পড়তে যে সময় লাগবে, সেসময় তারাশঙ্করের প্রধান উপন্যাসগুলো অনায়াসে পড়ে ফেলা যাবে ( গণদেবতা, কবি, হাসুলীবাঁকের উপকথা, ধাত্রীদেবতা, নাগিনী কন্যার কাহিনী ইত্যাদি।)
দীর্ঘসময় নিয়ে পড়লাম তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর চার খন্ডের বিশাল উপন্যাস কীর্তিহাটের কড়চা। বারোশো পৃষ্ঠার একটা বই শেষ করে ফেলছি ভেবে নিজেই নিজেকে সাবাশী দিতে ইচ্ছা করছে। বড় রকমের একটা তৃপ্তি কাজ করছে। সেই সাথে একটা বিষণ্ণতাও ঘিরে আছে এখন আমাকে। যারা বই পড়েন তারা হয়তো সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন এই বিষণ্ণতার স্বরুপ।
তারাশঙ্করের শেষজীবনে লেখা বইটা তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। তারাশঙ্করের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলেও অনেকে উল্লেখ করে থাকেন এটিকে।
কীর্তিহাটের কড়চা উপন্যাসের সময়কাল প্রায় দুইশো বছর। ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পুরো সময়টাকে ধারণ করে আছে এই গল্প। ব্রিটিশভারতের এক জমিদারবংশের উত্থান থেকে শুরু করে রাজত্ব, অবশেষে পতনের মাধ্যমে উপন্যাসের শেষ।
মধ্যযুগের শেষ থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত সময়কে ধারণ করে আছে যে উপন্যাস ঐতিহাসিক দিক থেকেও তার গুরুত্ব আছে। প্রথম খন্ডে সিরাজউদ্দৌলা-ক্লাইভ-হেস্টিংস এর সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা পড়ে যেমন ঐতিহাসিক উপন্যাস মনে হয়েছিল পরবর্তী তিন খন্ডে সেভাবে পাওয়া যায় না। এরপর উপন্যাসের কাহিনী এক জমিদারবংশকে ঘিরে আগালেও নানা সময়ের অসংখ্য ঐতিহাসিক চরিত্রে সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। বাংলার মধ্যবিত্তের বিকাশের ইতিহাসকে জানতে হলে জমিদারীর ইতিহাসকে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দেওয়ানের এক সামান্য পাটোয়ারী কুড়ারাম ভট্টাচার্য কিভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে এ থেকে বোঝা যায় সেই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইংরেজদের লুট করা সম্পদের পরিমাণ কতো বিস্ময়কর ছিল। আর সেই সময়েই ইংল্যান্ডে ঘটে যায় শিল্পবিপ্লব। ধীরে ধীরে ইংরেজদের অনুগত সম্পদশালী এই সকল জমিদারদের মাধ্যমেই এদেশে চালু হয় আধুনিক শিক্ষা সংস্কৃতির চর্চা। শিক্ষিত হলেও তাদের মধ্যে লম্বা সময় থেকে যায় ইংরেজ আনুগত্য আর ভক্তিশ্রদ্ধা। পরবর্তীতে সিপাহী বিদ্রোহের সময় এই অনুগত জমিদারকূলের সাহায্যেই ভারতবর্ষে ইংরেজের সাম্রাজ্য বেচে যায় আর আরও শক্তিশালী রুপ ধারণ করে।
কুড়ারাম ভট্টাচার্য থেকে তার নাতি বীরেশ্বর রায় পর্যন্ত প্রজাদের অবস্থা ছিল দাসপ্রকৃতির। পরবর্তীতে শুরু হয় জমিদার প্রজার মামলামোকদ্দমার আমল। এই সময় ছিল জমিদারবংশের রাজত্ব। এরপর শুরু হয় পতন। ক্রমশো সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার ফলে তৈরি হয় সচেতনতা আর আত্মসম্মানবোধ। একই হারে কমতে থাকে জমিদারের প্রভাব প্রতিপ্রত্তি।
তারাশঙ্কর নিজে ক্ষুদ্র জমিদার বংশের সন্তান। উপন্যাস পড়ে খুব সহজেই জমিদার বংশের প্রতি তারাশঙ্করের দুর্বলতা বোঝা যায়। এজন্য হয়তো তাদের অত্যাচ��র নির্যাতনের চেয়ে বেশি মাহাত্ম্য চোখে পরে।জমিদারদের অত্যাচার সম্পর্কে তারাশঙ্কর অজ্ঞাত ছিল এই কথা বলা মূর্খতা। এজন্যই উপন্যাসের চরিত্রের মুখে আমরা শুনতে পাই বিস্ময়বাক্য রবিঠাকুরের মতো মানুষ কিভাবে জমিদারবংশে জন্মগ্রহণ করেন।
কি অসামান্য উপাখ্যান। সাধু! সাধু! জমিদার বংশের সাত পুরুষের কীর্তি-কাহিনী নিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস, কল্পনার চরিত্রের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অসংখ্য বাস্তব চরিত্র। যারা সুনীলের সেই সময় পড়েছেন তারা কিছুটা ধারনা করতে পারবেন এর স্বাদ।
একই ঘটনা বারবার বর্ণিত হয়েছে বইতে পাঠক হিসেবে এই নিয়ে ছোট্ট একটা অভিযোগ থাকলো। তবে উপন্যাস হিসেবে একে অসাধারন না বলে উপায় নেই। তারাশঙ্করবাবু ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী ছিলেন তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে, তিনি নিজে জমিদার ছিলেন তাই এসবের ঘাতঘুত ভালোই জানতেন সেই জানার সব কিছু যেন উজার করে দিয়েছেন এই উপন্যাসে।
পলাশীযুদ্ধের আগের সময় থেকে কাহিনী শুরু হয়ে তা শেষ হয়েছে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরের ঘটনা দিয়ে। কোড়ারাম রায় ভট্টাচার্য মেদিনীপুরের কীর্তিহাটে যে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারই উত্তরাধিকারী সাত পুরুষের উপাখ্যান এই কীর্তিহাটের কড়চা। তারাশঙ্করবাবু মানব চরিত্রের কি চমৎকার বিশ্লেষণ যে তুলে ধরেছেন এই বইতে।
কিছু কিছু বই পাঠকের মনে চিরস্থায়ী ঝাপ রেখে যায় যার ঘোর সারাজীবনেও কাটে না। এই উপন্যাসও ঠিক তেমনি ঘোর লাগানিয়া।
প্রায় দুশো বছর সময়ের পৃষ্ঠপটে,জমিদারী প্রথার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত এর কাহিনীতে একটি বংশের সাতপুরুষের ইতিহাস বিধৃত। ইংরেজদের সাথে নবাবের পরাজয়ের পর ইংরেজরা বাংলা প্রদেশে জমিদারী প্রথার চালু করে নিজেদের রাজ্যচালনার সুবিধার্থে।কোম্পানিকুঠির স্থাপনের সময়কাল থেকে যারা ইংরেজদের ফাই ফরমাশ খাটতো তারাই ধীরে ধীরে নবাবদের অধীনস্থ রাজা বা তালুকদারদের নিলাম হওয়া তালুক কিনে জমিদার বনে যেতে লাগলো। কুড়ারাম ভট্টাচার্য তেমনই এক জমিদার,যে জমিদারী কিনে নিজের পদবী বদলে "রায়" বংশের গোড়াপত্তন করেছিলেন।১৯৫৩সালে স্বাধীন ভারতের বিধানসভায় জমিদারী প্রথার উচ্ছেদের প্রস্তাবনা পাশ হওয়ার দিনে কুড়ারাম রায়ের বংশধর সুরেশ্বর রায় নিজের আঁকা ছবির মাধ্যমে তার সাতপুরুষের জমিদারীর ইতিহাস রচনা করছেন।যে ইতিহাসে গৌরব আছে,কলঙ্ক আছে। জমিদার জীবন যেমন চাকচিক্যময় ক্ষমতাপূর্ণ তার অন্ধকার দিকও কম নয়।এক পুরুষ সম্পদ অর্জন করে তার পরের কয়েক পুরুষ আলোকিত জলসা-ঘরে সুরায় মত্ত হয়ে বাঈজী নাচিয়ে তা শেষ করে।তার ওপর সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে কোদল তো নিত্য বিষয়। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় নিজে জমিদার বংশের সন্তান ছিলেন।তাই এদের ভেতরের কাহিনী তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন।উপন্যাসে জমিদারি সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা,দেবোত্তর,সেবায়েত,জমির পত্তনি,জমির মামলার ধরণ,খরচের হিসেব,আয়ের উৎস সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা দেয়া আছে।বিত্তহীন জমিদারদের ঐতিহ্যসর্বস্ব জীবনের পুরাতন মহিমাকে আঁকড়ে ধরে থাকার সকরুণ প্রয়াসও এই কড়চায় উঠে এসেছে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলায় স্থায়ী হয়ে গিয়েছে পাঁচ বছর হলো। কোম্পানির দেওয়ান গঙ্গা গোবিন্দর খাস গোমস্তা কুড়ারাম রায় ভট্টাচার্য নিজের গ্রাম কীর্তিহাট সহ আরো ৪-৫ গ্রাম কিনে পত্তনী করেন কীর্তিহাটের রায় চৌধুরী জমিদার বংশের।
কাহিনী শুরুটা অবশ্য আরো প্রায় দেড়শ বছর পরে, ১৯৫৩ সালে। সরকারি আইনে সেদিন বাতিল হচ্ছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আর তার সাথে সাথে উঠে যাচ্ছে প্রায় দেড়শ বছরের জমিদারী, সাথে তাদের ইতিহাস, আভিজাত্য। রায়চৌধুরী বংশের সপ্তম পুরুষ সুরেশ্বর রায় চৌধুরী সেদিন প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুলতা ঘোষ এর কাছে রায় পরিবারের ১৫০ বছরের জবানবন্দি দেওয়ার জন্য। যে সুলতা ঘোষের সাথে ১৮ বছর আগে বিয়ে হতে গিয়েও থমকে যেতে হয় সুরেশ্বরকে, বাধা হয়ে দাঁড়ায় রায় চৌধুরী বংশের পাপের ইতিহাস।
কম বেশি ২০০ বছরের বিস্তৃতি, ৭ টি প্রজন্ম, ১৫ এর অধিক মূল চরিত্র, আর শতের অধিক চরিত্রে সমন্বয়ে তারাশঙ্কর রচনা করে গিয়েছেন সেই অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য, রোমাঞ্চকর আর রোমহষর্ক পাপের কড়চা, যে পাপের উৎসস্থল নারী, ভূমি, আর সম্পত্তি; কাম, লোভ আর রক্তপাত।
রয়াল সাইজের বইয়ে, প্রায় ১১০০ পৃষ্ঠার সুবিশাল বই কীর্তিহাটের কড়চা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলোর মতই বিপুল আয়তনের এই বই তারাশঙ্করের সর্ববৃহৎ উপন্যাস, এবং সর্বশ্রেষ্ঠও বটে। কিন্তু প্রথম আলোর তুলনায় কীর্তিহাটের প্রচার ও প্রসার বেশ কমই। অনেকেই এর নামও জানেন না। অবশ্য এর কারণটাও অনুমেয়, বইটি লেখকের জীবদ্দশায় যেমন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় নি, তেমনি এর তৃতীয়, চতুর্থ খন্ডও বেশ অনেকদিনই বাজারে ছিল না। এমন অমূল্য একটি উপন্যাসের প্রথম অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশিত হলো কেবল ২০২৩ সালে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্য অনেক বই পড়া থাকলেও সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক ঋদ্ধ পাঠকের তালকায়ও কীর্তিহাটের কড়চা নেই। অনেকে জানেনও না যে, তারাশঙ্করের এত বৃহদায়তনের উপন্যাস রয়েছে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য প্রতিভা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু সেই প্রতিভা যে কতটা বিস্তৃত, সূক্ষ্ম, সুপরিশালিত, তা কীর্তিহাটের কড়চা না পড়া থাকলে ঠিক ভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
কীর্তিহাটের কড়চা পড়তে পড়তে আমি চলে গিয়েছিলাম নিজের বই পড়ার সোনালী দিন গুলোতে। যখন নাওয়াখাওয়া ছেড়ে, ঘুম বাদ দিয়ে, দিন রাত এক করে শুধু বই-ই পড়তাম। পর পর কয়েকদিন রাত ৩:৩০/৪ টায় যখন বাধ্য হয়ে বই রেখে ঘুমুতে যেতাম, এবং ঘুমুতে যেতে হবে ভেবে বিরক্ত লাগতো, তখন বেশ আনন্দিতই লাগছিলো এই ভেবে, যে নিজের ভেতরের পাঠক সত্তটা এখনো বেশ ভালোভাবেই বেঁচে আছে। সেই পাঠকটাকে জাগিয়ে তুলতে শুধু দরকার চমৎকার একটি বই।
আপাতত আমার অবস্থা হলো, চেনা পরিচিত যত ভাই বন্ধু পাঠক আছেন, সবাইকে ঘাড় ধরে কীর্তিহাটের কড়চা পড়তে বাধ্য করা, তাহলে যদি একটু শান্তি পাই। জনে জনে কথা হলেই এ কয়দিন শুধু "ভাই, কীর্তিহাটের কড়চা পড়েন" চলবে বেশ কিছুদিন। 😇 বিশেষত বীরেশ্বর রায় চৌধুরী আর বিমলার প্রেম, বিবাহ থেকে শুরু করে রত্নেশ্বর রায় চৌধুরীর জন্ম সংক্রান্ত রহস্য, আর তাদের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাওয়া তান্ত্রিক শ্যামাকান্তের জীবনী, এর দুর্দান্ত, অভূতপূর্ব কাহিনি নিয়ে কারও সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা বকবক করতে না পারলে, উচ্ছ্বাসটা প্রকাশ করতে না পারলে শরীরে ঠিক জুৎ পাচ্ছি না।
বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জগত একটি বিস্তৃত আঙ্গিনা, যেখানে নানা ধরনের চরিত্র ও কাহিনী মিলিত হয়। এই প্রসঙ্গে ‘কীর্তিহাটের কড়চা’ উ��ন্যাসটি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করছে, যা রায় বংশের সাত পুরুষের আখ্যানকে কেন্দ্র করে রচিত। কুড়ারাম রায় ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সুরেশ্বর রায় পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপন্যাসটি পাঠকদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যেখানে বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটেছে।
কুড়ারাম রায় ভট্টাচার্যের জীবন কাহিনী আমাদের সামনে তুলে ধরে এক বিশাল জমিদারির উৎপত্তির গল্প। তিনি পাটোয়ারী থেকে জমিদারিতে রূপান্তরিত হন এবং বাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেন।
তাঁর উত্তরসূরী বীরেশ্বর রায় জমিদারির শক্তিকে দৃঢ় করেন, কিন্তু একই সঙ্গে প্রজাদের উপর শোষণের মাত্রাও বাড়িয়ে দেন। লেখক অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে এই অন্ধকার দিকটিকে তুলে ধরেছেন, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জমিদারি কেবল ঐশ্বর্যের উৎস নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী নিপীড়ন ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করে।
তবে, রত্নেশ্বর রায় চরিত্রটি নিম্নবর্গের মানুষের জন্য ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি কখনোই ভোগ-বিলাস ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে আপস করেননি। তাঁর সংযমী জীবন এবং নৈতিকতা তাঁকে জমিদারদের মাঝে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছিল।
রায় বংশের শেষ উত্তরসূরী সুরেশ্বর রায় স্বাধীনতার পর জমিদারির বিলোপ প্রত্যক্ষ করেন, যা কাহিনির শেষ অংশকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে। এখানে জমিদারির পতন কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চিহ্ন নয়, বরং এটি একটি সামাজিক বিবর্তনেরও প্রতীক। শিক্ষার প্রসার, মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান এবং প্রজাদের আনুগত্যের হ্রাসের ফলে জমিদারি ব্যবস্থার পরিবর্তনের ইতিহাস এখানে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
অতএব, ‘কীর্তিহাটের কড়চা’ কেবল একটি পারিবারিক উপাখ্যান নয়, এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ। যারা ঐতিহাসিক ঘরানার উপন্যাস পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই কাহিনিটি নিঃসন্দেহে অবশ্যপাঠ্য।
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা'র মত উপন্যাস যে তারাশঙ্কর লিখেছেন আবার তিনিই এই কড়া কীভাবে লিখেছেন বুঝতে পারছি না। খুবই বিরক্ত হয়েছি। প্রথম দুখন্ড ভাল করে পড়েছিলাম কিন্তু তৃতীয় খণ্ড থেকে বিরক্তি বাড়লো। লেখক এক একটি গৌণ চরিত্র তার তিন-চার পুরুষ থেকে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আসছেন, যা হঠাৎ করেই শুরু করেন, অনেকে দূর পড়ার পর বুঝতে পারি যে ওহ কড়চার মধ্যেই আছি তাহলে। কিন্তু ততক্ষণে বিরক্তি মাথায় জায়গা করে নিয়েছে। এক বংশের সাত জেনারেশন কুড়ারাম থেকে সুরো (কুড়া-সোমেশ্বর-বীরেশ্বর-রত্নেশ্বর-দেবেশ্বর-যোগেশ্বর-সুরেশ্বর) এতগুলো পুরুষের মানে সাতপুরুষের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া বাহুল্য হয়েছে। ইভেন সুরেশ্বর পুত্র মানবেশ্বরের উল্লেখ আছে, আবার কুড়ার বাবা শিবরামের(?) উল্লেখও আছে । সেই সময় পড়ে যে অনুভূতি হয়েছিল তার সিকিভাগও পাইনি। দুঃখজনক। হয়তো তারাশঙ্করের অন্যান্য উপন্যাসগুলো পড়ে এক্সপেক্টেশন বেড়ে গিয়েছিল। প্রথম দুই খণ্ডে শেষ হলেও ৪ দিতাম তবে সেক্ষেত্রে কাহিনী অসম্পূর্ণ থাকতো। আর গল্প বলার ধরন পছন্দ হয়নি মোটেই অর্থাৎ সুরেশ্বর তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে সব ঘটনা দু'দিন ধরে বলেই যাচ্ছে relentlessly, মানতে পারলাম না। ২/৫.
A masterpiece by Tarashankar Bandyopadhyay. A comprehensive tale of a Zamindar family starting from rising to falling, brick-by-brick and how old fellows try to maintain the show-ups despite of declining glory. Strong blend of history in logical scenario has made the novel more attractive, informative and ultimate pleasure for the reader. Strongly recommended!
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কীর্তিহাটের কড়চা’ – এক মহাকাব্যিক উপন্যাসের বিশ্লেষণ
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যসত্তা দীর্ঘকাল ধরে বাংলা সাহিত্যে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে এসেছে। তাঁর শেষ জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি কীর্তিহাটের কড়চা নিঃসন্দেহে বাংলা উপন্যাসের এক বিস্ময়কর অর্জন। প্রায় দুইশো বছরের বিস্তৃত কাহিনির আবর্তনে, জমিদার প্রথার উত্থান ও পতনের ইতিহাসের নিরিখে, উপন্যাসটি একাধারে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক অনবদ্য প্রয়াস।
এই উপন্যাসের অন্যতম বিশেষত্ব এর মহাকাব্যিক বিস্তৃতি। জমিদারি প্রথার সূচনা থেকে তার ক্রমশ অবসানের মধ্য দিয়ে একটি বংশের সাত পুরুষের কাহিনি এতে উঠে এসেছে। কাহিনির কেন্দ্রস্থলে রায় বংশ, যার আদি পুরুষ কুড়ারাম ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সপ্তম পুরুষ সুরেশ্বর রায় পর্যন্ত বিস্তৃত এক বর্ণাঢ্য জীবনগাথা। জমিদারি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সময় থেকে শুরু করে ১৯৫৩ সালে জমিদারি প্রথা বিলোপের মধ্য দিয়ে কাহিনির পরিসমাপ্তি ঘটে। এই বিশাল বৃত্তের মধ্যে ইতিহাসের বাস্তব চরিত্র ও কল্পিত চরিত্র এমনভাবে মিশে গেছে যে, উপন্যাসের কল্পনাজাত অংশও বাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়।
---
🔴 জমিদারি প্রথার উত্থান ও কুড়ারামের উত্থান
উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কুড়ারাম ভট্টাচার্য, যিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুযোগ নিয়ে এক সাধারণ পাটোয়ারী থেকে এক বিশাল জমিদারির মালিক হয়ে ওঠেন। বাংলার ইতিহাসের আলো-আঁধারি সময়কে তিনি শুধু দেখেননি, বরং সেই সময়ের এক বড় অংশের নির্মাতা ছিলেন। ইংরেজ শাসনের ছত্রছায়ায় কুড়ারাম রায় বংশের গোড়াপত্তন করেন, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে সমৃদ্ধির শীর্ষে অবস্থান করে। তবে জমিদারি শুধু অর্থ ও ক্ষমতার উৎস ছিল না, ছিল তার অন্ধকার দিকও।
---
🔴 জমিদারি শাসনের রূপ ও বীরেশ্বর রায়ের কঠোর শাসন
কুড়ারামের উত্তরসূরী বীরেশ্বর রায় জমিদারির শক্তিকে আরও প্রসারিত করেন। কিন্তু তার শাসনের সময়ই প্রজাদের ওপর শোষণের মাত্রা বাড়তে থাকে। জমিদারি রাজত্ব যে কেবল ঐশ্বর্যের বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, বরং ক্ষমতার লড়াই, ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের এক অন্ধকার জগত—তারাশঙ্কর সেটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জমিদারের শাসনে প্রজারা দাসপ্রকৃতির জীবন যাপন করত, যা ধীরে ধীরে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করে।
---
🔴 রত্নেশ্বর রায় – রায় বংশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ
উপন্যাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র রত্নেশ্বর রায়, যিনি রায় বংশের সবচেয়ে শুদ্ধ ও ন্যায়পরায়ণ জমিদার হিসেবে পরিচিত। তিনি কঠোর শাসক হলেও ছিলেন ন্যায়ের প্রতীক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থেকেছেন এবং প্রজাদের প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন।
রত্নেশ্বর রায় তার পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভোগ-বিলাস, নারী আসক্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। যদিও মনে মনে তিনি একজনকে ভালোবেসেছিলেন, তবু নিজের নৈতিকতা ও প্রতিজ্ঞার কারণে কেবল একজন নারীতেই আবদ্ধ ছিলেন। জমিদারির জৌলুসের মধ্যেও তিনি সংযমী জীবনযাপন করতেন। তার ব্যক্তিত্বের কারণে রায় বংশের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ও নীতিনিষ্ঠ পুরুষ হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়।
---
🔴 পতনের পূর্বসূচনা ও সুরেশ্বর রায়ের উপলব্ধি
সাত পুরুষ ধরে গড়ে ওঠা এক বিশাল সাম্রাজ্যের শেষ উত্তরসূরী সুরেশ্বর রায়, যিনি স্বাধীনতার পরে বিধানসভায় জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সাক্ষী হন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুহূর্তে তিনি তার সাত পুরুষের ইতিহাস এক ক্যানভাসে আঁকতে থাকেন—যেখানে একদিকে রয়েছে গৌরব, অন্যদিকে কলঙ্কের ছায়া। তারাশঙ্কর জমিদারি ব্যবস্থার পতনের এই ধ্বনিকে শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখাননি, বরং একটি সামাজিক বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফুটিয়ে তুল��ছেন। শিক্ষার প্রসার, মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান, জমিদারদের প্রতি প্রজাদের আনুগত্য হারানো—সবকিছু মিলে জমিদারি প্রথার পরিণতির এক বাস্তব ও গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে।
---
🔴 উপন্যাসের সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
‘কীর্তিহাটের কড়চা’ শুধুমাত্র একটি পারিবারিক উপাখ্যান নয়, এটি ইতিহাস ও কল্পনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জমিদার শ্রেণির অন্দরমহলের জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার লড়াই, শোষণ এবং মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন চিত্রিত করেছেন।
যদিও উপন্যাসের কিছু অংশে ঘটনাবলী পুনরাবৃত্তি হয়েছে, তবে সেটি ইতিহাসের বিশদ চিত্র অঙ্কনের জন্য প্রয়োজনীয় মনে হয়। উপন্যাসে থাকা ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর উপস্থিতি কাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। সিরাজউদ্দৌলা থেকে লর্ড কর্নওয়ালিস, ব্রিটিশ দেওয়ানি থেকে সিপাহী বিদ্রোহের প্রভাব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি—এসবের উল্লেখ উপন্যাসের বস্তুনিষ্ঠতা আরও সমৃদ্ধ করেছে।
---
🔴 উপসংহার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কীর্তিহাটের কড়চা’ বাংলা সাহিত্যের এক মহাকাব্যিক সৃষ্টি, যা শুধু জমিদারদের উত্থান-পতনের দলিল নয়, বরং বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের এক অসামান্য উপাখ্যান। এটি একদিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস, অন্যদিকে একটি বাস্তবতার নির্মোহ চিত্রায়ণ। জমিদারির জাঁকজমক ও তার অন্তর্নিহিত দুঃখ-বেদনা, ক্ষমতার লোভ ও পতনের নির্মমতা—সবকিছুকে ছুঁয়ে গেছে তারাশঙ্করের পরিণত কলম।
উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—ক্ষমতার শীর্ষে উঠলেও শুদ্ধতা ও নৈতিকতা ধরে রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। রত্নেশ্বর রায় ছিলেন সেই আদর্শ পুরুষ, যিনি তার পূর্বপুরুষদের অনেক অন্যায় থেকে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম সেই শিক্ষাকে ধরে রাখতে পারেনি। এই উপন্যাস পাঠকের মনে স্থায়ী রেশ রেখে যায়, যেমনটি রেখে গিয়েছে বাংলার ইতিহাসে জমিদার শ্রেণির দীর্ঘ ছায়া। এটি শুধু পড়ার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য এক অনন্য সাহিত্যসৃষ্টি।