Shawkat Ali (Bangla: শওকত আলী) is a major contemporary writer of Bangladesh, and has been contributing to Bangla fiction for the last four decades. Both in novels and short stories he has established his place with much glory. His fiction touches every sphere of life of mass people of Bangladesh. He prefers to deal with history, specially the liberation war in 1971. He was honored with Bangla Academy Award in 1968 and Ekushey Padak in 1990.
মানুষ যখন জানতে পারে, যে মাটিতে তার জন্ম, যে ভূমিতে তার বেড়ে ওঠা, যে পথে সে হেঁটেছে বহুকাল; সেই মাটি তার নিজের না। সেই ভূমি তার জন্মভূমি না। তবে কেমন অনুভূতি হয়? কেবল ধর্মের ভিন্নতার কারণে যে জন্মভূমি বদলে যেতে পারে, এটা কে-ইবা ভাবতে পারে?
১৯৪৭ সালে এমনই ঘটনা ঘটেছিল। ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে গেল নিমিষেই। হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান নামে এই ভাগ শুধু দেশের হলো না, হলো ধর্মেরও ভাগাভাগি। এতকাল যে ভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করেছে, সুখ দুঃখে এক অপরের সাথে থেকেছে; তারাই আজ হয়ে উঠেছে এক অপরের শত্রু।
ফলে নিজ দেশের মাটিতে থাকা হচ্ছে। আগে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সহজে যাওয়া যেত। এখন দেশ বিভাগের বর্ডার পার হয়ে ভিনদেশে যাত্রা করতে হয়।
হেনু, মনি-রা তাই নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে পাকিস্তান মুল্লুকে যাত্রা করছে। মা পাকিস্তান চাইতেন। কিন্তু পাকিস্তানের দিকে এই যাত্রা তিনি দেখে যেতে পারেননি। যদিও জীবনের শেষদিকে চাননি যার পরিবার পাকিস্তানে থিতু হোক। কেননা যে প্রত্যাশা নিয়ে দেশভাগের এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দুই অঞ্চলেই ধর্মের দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের উপর যে নির্যাতন শুরু হয়েছে, একজন মানুষ হিসেবে তা মেনে নেওয়া যায় না।
অন্যদিকে বাবা ছিলেন দেশভাগের ঘোর বিরোধী। তিনি চাননি বিশাল এই দেশের মাঝখানে বর্ডার আলাদা করুক দুই জাতিসত্তাকে। তিনি পাকিস্তানেও যেতে চাননি। কিন্তু অত্যাচারের মাথা যখন বেড়ে যায় তখন সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। শুধু অত্যাচার নয়, জমির বেদখলের মতন ঘটনা ঘটে অহরহ।
তাই ভারত থেকে বাঙাল মুল্লুকে এ যাত্রায় সন্তানদের পাঠিয়ে দিলেও নিজে ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকার চেষ্টা করেন তিনি। হয়তো ভাবেন সবকিছু স্বাভাবিক হলে আমার পুরো পরিবার মিলে এখানেই থাকবেন। কিন্তু যখন বিভেদের সুর উঠেছে, তা কি আর স্বাভাবিক হয়?
মনি আর হেনু এখনো পরিণত হয়নি। তবুও ভাই-বোনদের নিয়ে ট্রেনে চেপে দিনাজপুরের পথে যাত্রা শুরু করে। এই চলতি পথে কত মানুষের সাথে পরিচয় হয়। কত ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়! অত্যাচারিত হয়ে যারা ভিনদেশে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কত যে শঙ্কা কাজ করে!
একসময় একই দেশ ছিল। অথচ এখন বর্ডারের নামে কাস্টমস চেকিং হয়। সুবিধাবাদী মানুষেরা সব জায়গায় সুযোগ খুঁজে। নিজেদের সম্পদও না-কি নিয়ে যাওয়া যাবে না। তাতে এক দেশের সম্পদ অন্যদেশে পাচার করা হয়। অথচ কিছুদিন আগেই এই কড়াকড়ি ছিল না। দেশটা বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষ। মনুষ্যত্ব উঠে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠেছে ভিন্ন চিত্র।
শওকত আলীর “বসত” বইটিকে আমি তিনটি ভাগে ভাগ করি। প্রথম ভাগে এই ট্রেন যাত্রা। কিংবা বলা চলে, নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য বিভূঁইয়ের পথে অনিশ্চিত এ পথ। উপরেই তার বর্ণনা করেছি। পিঠেপিঠি দুই ভাইবোন মনি ও হেনু যেন এক নিমিষেই কয়েক বছর বেড়ে উঠেছে। বয়স তো নিতান্তই এক সংখ্যা। জীবনের কিছুই না বোঝা দুই ভাইবোন যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তাতে অভিজ্ঞতার বয়সটাই আসল।
দ্বিতীয় ভাগ তাদের বাঙাল মুল্লুকে থিতু হওয়ার। বড় কেউ নেই সাথে। তবুও জীবনের লড়াই চলে। সেই লড়াইয়ে জিততে গিয়ে জেতা হয় না অনেক সময়। আবার কখনও ভাগ্য সাহায্য করে। সৃষ্টিকর্তা এতটা নির্মম কখনোই হতে পারে না। ফলে ভাগ্যের অন্বেষণে মনি যেমন স্কুলে চাকরি পায়, অন্যদিকে পানির দামে নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ঠিকই মেলে।
সময় তো থেমে থাকে না। এই চলমান সময় নানান ঝুটঝামেলা, বিপদ মাথায় নিয়ে বাবা অবশেষে ফিরে আসে। কিন্তু এই যে দেশ বদলে গেল, সময় বদলে গেল; পরিবারটাও বদলে যায়। বদলে যায় বাবা। এক ভাই ম্যালেরিয়ার দংশনে হারিয়ে গেল। বদলে গেল সবকিছু। যে প্রত্যাশায় নিজেদের বসতভিটা ত্যাগ, তার কতটা পাওয়া হলো? না-কি সব হারিয়ে যাওয়া! একেই হয়তো বলে — জীবন।
এই গল্পের তৃতীয় ভাগে কেবল হেনুর গল্প করা যায়। হেনু যখন বড় বোন মনির হাত ধরে দেশ ছাড়ে তখন তার বয়স বেশি না। অথচ এই বয়সে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার সাথে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। সংসার বড় বোন সামলায়। বড় ভাই কোথায় আছে, জানে না। নিজের মেধা ও পড়াশোনায় সে অতুলনীয়।
ভালো ফলাফলের পাশাপাশি লেখালেখির হাতও ভালো। প্রচুর বই পড়ে। সাহিত্য নিয়ে থাকতে পছন্দ করে। সেই সাথে জড়িয়ে পড়েছে রাজনীতিতে। সরকার বিরোধী রাজনীতি করলে ফল যে ভালো হয় না, তার যেন চাক্ষুষ প্রমাণ হেনু।
বদলে যাওয়া বাবা, সংসারের একমাত্র অভিভাবক বড় বোনকে পেছনে ফেলে তাই জেলে যেতে হয়। এরপর থেকে কেবল জেলের গল্প! এখানে লেখক তৎকালীন সময়ের রাজনীতির বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনীতির বিভেদ যেন ফুটে উঠেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক দল, সরকারি দলের মধ্যে যে আদর্শিক মতভেদ, তার রূপরেখা যেন লেখকের লেখায় ফুটে উঠেছিল।
তবে সাধারণ অপরাধী ও রাজবন্দীদের মধ্যে যেপার্থক্য থাকে, এখানে তার চিত্র তুলে ধরা হয়। কেউ সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে ফেলে, কেউ সন্তানদের একলা করে, কেউ প্রেমিকাকে ছেড়ে এই কারাগারে দিন কাটায়। কারো কাছে পরিবারের চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। পরিবারের অসহায়ত্বে পাশে না থাকার মতো আক্ষেপ কি কোনোদিন দুর হয়? এমন রাজনীতির কি আদৌ প্রয়োজন আছে, যেখানে পরিবারের পাশেই থাকা যায় না?
প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কেটে যায়। কেউ জানে না কবে তাদের মুক্তি মিলবে। একসাথে থাকতে থাকতে জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর যখন কেউ জানে, তার পাশে থাকা রাজনৈতিক কর্মী ছাড়া পেতে চলেছে, কিন্তু সে নিজে বন্দী থাকবে আরও কিছুদিন। তখন কেমন অনুভূতি হয়?
শওকত আলীর “বসত” বইটি তৎকালীন সময়ের এক চিত্র ধরে নেওয়া যায়। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে সীমান্তের দুই পারে যে অরাজকতা হয়েছিল, তাকেই লেখক উপজীব্য করেছেন। পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান গঠনের প্রভাব এখানে মূল ভিত্তি। যে আদর্শের ভিত্তিতে দুই দেশের জন্ম, সেই আদর্শ কি পরিপূর্ণ হয়েছিল? না-কি এক শোষণের থেকে আরেক শোষণে পদার্পণ করেছিল বাঙাল মুল্লুক?
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, শাসকদের গর্জন, তৎকালীন সময়ে যুক্তফ্রন্ট বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ, তাদের কর্মকাণ্ড ও এর পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে “বসত” বইটি সম্পর্কের বন্ধনকে ফুটিয়ে তুলেছে। জীবনের ছুটে চলার গল্প লিখেছে আপন মনে। মানুষ প্রতিনিয়ত বদলে যায়। ছোটো থেকে বড় হয়। নিজের দায়িত্ববোধের সাথে পরিচিত হয়। কখনও প্রেম আসে। তবে প্রেমের চেয়ে বিপ্লব সত্য হয়ে ওঠে। তারচেয়েও বড় সত্য পরিবার। যার জন্য কিছু করতে না পারার আক্ষেপ জীবনকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। আর কিছু যদি করতে পারা যায়, জীবন তখন সার্থক মনে হয়। কিন্তু সেই সুযোগ কি পাওয়া যাবে?