Shawkat Ali (Bangla: শওকত আলী) is a major contemporary writer of Bangladesh, and has been contributing to Bangla fiction for the last four decades. Both in novels and short stories he has established his place with much glory. His fiction touches every sphere of life of mass people of Bangladesh. He prefers to deal with history, specially the liberation war in 1971. He was honored with Bangla Academy Award in 1968 and Ekushey Padak in 1990.
উপন্যাসটা পড়ার পর একটা শব্দ কেবল কোনমতে মুখ দিয়ে বের হয়েছে। 'ওহ মাই গড' আমি স্তম্ভিত, হতবাক, বিস্মিত, মুগ্ধ! শওকত আলীর 'প্রদোষে প্রাকৃতজন' ছাড়া অন্য কোন বই পড়া হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই বইটা যখন হাতে নেই 'নাঢ়াই'-ব্যাপারটা যে কী ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বই পড়তে থাকি, এগিয়ে যেতে থাকে ঘটনা...মাঝামাঝি এসে বুঝতে পারি নামকরণের মাহাত্ম্য।
গল্পটা হতে পারে একজন বিধবার একলা বেঁচে থাকার লড়াই কিংবা হতে পারে গ্রামের শোষিত শ্রেণীর অধিকার আদায়ের কিংবা দুটোই। দশ/এগারো বছরের ছেলে আবেদালি আর সুন্দরি তরুণি বধূ ফুলমতিকে রেখে নিঃশব্দে ওপাড়ে পারি জমায় আহেদালি। স্বামীর মৃত্যুতে ঠিক মতো শোক করার সময়ও পায় না ফুলমতী। নিজের ও সন্তানের দিকে তাকিয়ে জড়িয়ে পড়তে হয় জীবন যুদ্ধে। লড়াইটা তার একলার, গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে। শুরু হয় অন্য রকম এক যুদ্ধ।।
ঘটনার শেষ হয়তো হয়ে যেত এখানেই। কিন্তু না, বাকি রয়ে যায় আরও কিছুর। ফুলমতী কিভাবে রক্ষা করে নিজেকে? এরপর কী পরিণতি হয় তার। এগিয়ে যেতে থাকে উপন্যাস... যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন চরিত্র... মহাজন, জোতদার, মুনশি, দোকানদার আব্দুল মালেক, তার গজুয়া এসিস্ট্যান্ট কুতুবালি, দেলবর, মহিন্দর, ডাক্তার অভিমন্যু কিংবা রহস্যময় হেডমাস্টার।
আঞ্চলিক ভাষায় লেখা সম্পুর্ন উপন্যাস। প্রথম প্রথম একটু পড়তে অসুবিধা হলেও শওকত আলীর অসামান্য লেখনীতে সেটা নিয়েছে অন্য রকম এক মাত্রা। তেভাগা আন্দোলন, দেশভাগ-সব মিলিয়ে সে সময়কার একটা প্রতিচ্ছবি বলা যায়।
বাংলাদেশের যে কয়জন সাহিত্যিক প্রান্তিক মানুষের কথা ভেবেছেন এবং লিখেছেন, শওকত আলী তাদের মাঝে অগ্রগণ্য। এমনকি ঐতিহাসিক উপন্যাস 'প্রদোষে প্রাকৃত জন' উপন্যাসেও তিনি প্রান্তিক মানুষের কাছে গেছেন।
'নাঢ়াই' শব্দটাকে আমি 'ঠাইনাড়া' ধরনের কিছু ভেবে নিয়েছিলাম। আসলে 'নাঢ়াই', লড়াইয়ের অপভ্রংশ।
গল্পের নায়িকা ফুলমতি। নয় দশ বছরের ছেলে আবেদালিকে রেখে ফুলমতির স্বামী মারা গেলো। চাষ যাদের পেশা, সে সংসারে পুরুষ না থাকলে সংসার টেকে না। রাতে ঘরের আশেপাশে মানুষ ঘোরে, পুরুষ মানুষ। কখনও নিশির ডাক আসে, কখনও দিনমানে পথ আগলে দাঁড়ায়।
কতকতা সময় সাহস করে এসবের মুখে দাঁড়িয়ে যুবতী ফুলমতি বুঝতে পারে, জমিনে লাঙল দিতে, মাটি আগলে রাখতে যেমন একজন পুরুষ লাগে, সংসারেও তাই। কিন্তু শরীর আর জমিন বাদে ফুলমতি আর আবেদালিকে আপন করে নেওয়ার মতো পুরুষ কই?
হাটের দোকানদার আবদুল মালেকের সাগরেদ কুতুবালির সাথে এই পরিবারের পরিচয়। বুদ্ধিসুদ্দি কম লোকটার। কিন্তু আবেদালি অপহৃত হলে, সেই খুঁজে আনে। এ পরিবারের সাথে যোগাযোগ হলেও সে না বোঝে ফুলমতির যৌবন, না বোঝে কিছু।
সময় পাল্টে যাচ্ছিলো। দেশভাগের স্রোত এসে লেগেছিল প্রান্তিক পর্যায়ে। কংগ্রেসের কর্মীরা এসে ঢুকেছিল গ্রামের পাঠশালায়। কিন্তু তারা না পারে নিরক্ষন চাষাদের দেশ বোঝাতে, না পারে তাদের সঙ্গে মিশতে। এরই মাঝে 'লাঙল যার, ফসল তার' বোল ওঠে।
কিন্তু মহাজনেরা ছাড়বে কেন? কুতুবালিকে বিয়ে করার পর ফুলমতির আশা যদিও তারা ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু জমিনের আর ফসলের দাবী তারা ছাড়বে না। আর রক্ত জল করা ফসলের ভাগ ছাড়বে না কৃষাণ।
শওকত আলীর অসামান্য লেখনীতে ফুটে উঠেছে মানুষের কথা, ভুমির কথা, অধিকার আর স্বাধীনতার কথা। উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা সংলাপের কারনে একালের পাঠকদের এ বই পড়ে বুঝতে কষ্ট হতে পারে, কিন্তু এই ভাষার ব্যবহারই এ বইয়ের চমৎকার দিক।
নাঢ়াই মানে লড়াই। এ লড়াই তেভাগা আন্দোলনের, কৃষকদের অধিকার আদায়ের লড়াই। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ গভর্নর কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করলে বাংলার কৃষকেরা একের পর এক জমির মালিকানা হারাতে থাকে। নিজের মাটি হারিয়ে তারা পরিণত হয় আধিয়ার কৃষাণে। আধিয়ার কৃষাণ মানে বর্গাচাষী ─ লাঙল চালিয়ে গতর খাটিয়ে ফসল ফলাবে যারা আর বিনিময়ে পাবে অর্ধেক ফসল, আর এই চাষ ব্যবস্থার নাম আধি ব্যবস্থা। অন্যদিকে কৃষাণ আর নৃপতিদের মাঝে বিস্তর ব্যবধানের সুযোগে নতুন এক শোষক শ্রেণীর উত্থান ঘটে ─ জোতদার নামে একটি মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী আবির্ভূত হয় যারা জমিদারদের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে কৃষকদের মাধ্যমে চাষ করায় এবং খাজনা আদায় করে। আধিয়ার কৃষাণ আর জোতদারদের মাঝে ফলন বন্টন হয় এভাবে ─ উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুই ভাগ জোতদাররা নেবে আর বাকি একভাগ থাকে কৃষাণের নামে। যেই একভাগ থেকে কিনা আবার 'দেড়িয়া' সুদ সহ এটা-ওটা নানান ছুতোয় ফলন কেটে রাখা হতো ─ ফলে শেষমেশ কৃষাণ পেত তার সারা বছরের মেহনতের সিকিভাগ বা তারও কম। ১৯৪৬ সালে ফলন ভাগ করার এই প্রচলিত ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে যখন কৃষাণ এই অন্যায্য বন্টন ব্যবস্থার ব্যাপারে সচেতন হয়। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে "লাঙল যার, ফসল তার" এই আদর্শে এবং দাবি জানায় ─ ফসলের তিন ভাগই হবে, কিন্তু একভাগ পাবে জোতদার আর বাকি দুই ভাগ আধিয়ার কৃষাণের। এটাই 'তেভাগা' আন্দোলন, আর এর জন্যই লড়াই।
নাঢ়াই উপন্যাস মোট তিনটি অংশে ─ 'হাল-গিরস্তি', 'ঘর-সংসার' এবং সবশেষে 'নাঢ়াই'। তেভাগার গল্প কিন্তু উপন্যাসের শুরু থেকে শুরু হয় না। প্রথম অংশে কোনো উল্লেখ নেই। দ্বিতীয় অংশে কিছু allusion দিয়ে তৃতীয় অংশে তেভাগার premise প্রকট হয়। অর্থাৎ তেভাগার কাহিনী বইয়ের এক-তৃতীয়াংশ। বাকি কাহিনী তবে কিসের? সহজ উত্তর ─ 'নাঢ়াই' অর্থাৎ লড়াইয়ের, সংগ্ৰাম। বইয়ের শুরু থেকে শেষ অবধি সংগ্ৰাম চলেছে গ্ৰাম-বাংলার মাটির, কৃষাণের, বা বলা যায় তার প্রতীকের।
কাহিনী শুরু হয় যখন আবেদালির বাপ আহেদালি এক বর্ষায় হঠাৎ মারা যায়, আর অকূল পাথারে ফেলে যায় তার যুবতী বউ ফুলমতি আর বাচ্চা ছেলে আবেদালিকে। যথারীতি আসে দারিদ্র্য ─ ফুলমতির সংগ্ৰাম শুরু হয়। উদরের জ্বালা তবুও কষ্টেশিষ্টে পান্তাভাত খেয়ে দূর করা যায়, কিন্তু ফুলমতির আসল বিপদ অন্যদিকে। সদ্য বিধবা হওয়ায় এখন গ্ৰামের সকলের লোলুপ দৃষ্টি তার দিকে। দেখতে সুন্দর সে তা নিজেও বোঝে, আর সহায়-সম্বলহীন রূপবতী দরিদ্রার দিকে গ্ৰামের লোক বদ নজর দেবে না কেন? মৃত স্বামীর বন্ধু, দূরের আত্মীয়, রাস্তার ছেলেপিলে, গ্ৰামের মহাজন, এমনকি মসজিদের মুনশি অবধি নোংরা আহ্বানে তাকে কাছে ডাকে। রাত হলেই দুয়ারের ওদিক থেকে অশ্লীল ডাকাডাকি শুরু হয়। বেচারী করবে কি।
যুবতী মন এদিক ওদিক হেলে, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের বিবেচনায় বুঝতে পারে ─ এরা সকলে তার সর্বনাশ করবে। তার ছেলেকে মেরে ফেলবে, স্বামীর সম্পত্তি লুটে খাবে, আর তাকে সর্বশান্ত করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে কোথাও। তাই সে রাতে দা-বটি-কোদাল কাছে রেখে শোয়। নিজেকে আর নিজের ছেলেকে রক্ষা করতে হবে। দূর্বল হলে চলবে না, বাঁচতে হলে সংগ্ৰাম করতে হবে।
কিন্তু বাহ্যিক এই সংগ্ৰামের ভেতরেও অন্তরে চলে অনন্য এক সংগ্ৰাম, এক অপরূপ দ্বন্দ্ব। যে দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয় সকলকে। সে এক আদিম পাশবিক কামনা ─ সঙ্গী খোঁজার, জোট বাঁধার। জৈবিক, শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক। নিতান্ত সহজ, অত্যন্ত জটিল, এবং একই সাথে ভীষণ গোপনীয়। সকলে জানে, সকলে বোঝে, কিন্তু কারো মুখে উচ্চারিত হবে না। ফুলমতি সেই আদিম কামনায় ভোগে। বিধবা হয়েছে তো কি হয়েছে ─ মর��� তো যায় নি? তার দেহে যৌবনের তরঙ্গ লুকোচুরি খেলে, মন দুলবে না কেন?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি' পড়েছিলাম যখন অনেক আগে, তখন মানিকবাবুকে নিয়ে একটা নালিশ ছিলো আমার। ওনার 'কুবের' চরিত্রটাকে মনেপ্রাণে ঘেন্না করতাম। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত মানবিকতা বিবর্জিত একটা মানুষ, আগাগোড়া কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা, কামনা-লালসা, ক্রোধ-আলস্য দিয়ে গড়া একটা চরিত্রকে উপন্যাসের protagonist ভাবলে গা বিজিবিজ করতো। তখন অবুঝ ছিলাম। এখন বুঝি। মানুষের পরিচয়ে ভেতরের ঐ পশুটিকেই দেখাতে চেয়েছিলেন মানিকবাবু। খিদে-তেষ্টার মতো জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণের তাগিদ যে মানব সভ্যতার জ্বালানি, তা স্বপ্ন-কল্পনার মদে বিভোর হয়ে আমরা তথাকথিত সভ্যেরা বুঝি না, বুঝলেও মানতে চাই না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চোখে আঙুল দিয়ে হয়তো নয়, ইশারা ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে খিদে তেষ্টা ক্রোধ কামনার গোলাম মানেই মানুষ ─ প্রকৃত এবং ধ্রুপদী অর্থে মানুষ। 'নাঢ়াই' উপন্যাসে শওকত আলীর একই বার্তাবাহী আঙুলটা চোখে এসে লাগে।
উৎকৃষ্ট উপমা দিয়ে তিনি ফুলমতির পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। উপন্যাসে দেখা যায়, ফুলমতির মাঝিলা বকরিটা অস্থির হয়ে উঠছে। বহুদিন যাবৎ সে কোনো পাঁঠার সঙ্গ পাচ্ছে না ─ দূরের একটা বকরার জন্য বকরিটা পাগলামি করছে, রশি ছিঁড়ে পালিয়ে যেতে চাইছে, দপাদপি করছে, ম্যা-ম্যা করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। ফুলমতি বকরিটার ওপর রাগ করে না। সে বকরিটার পিঠে হাত বোলায়, সান্তনা দেয়। সঙ্গীহীন থাকার যন্ত্রনা সে চেনে, এবং সে উপলব্ধি করে ─ তার আর এই অবোধ পশুটির মাঝে খুব বেশি ফারাক নেই। ভেতরে ভেতরে সে-ও তড়পাচ্ছে জন্তুটির মতো, একই সুরে। মানব আর পশুর, মানবতার আর প্রকৃতির বিভেদ এভাবেই মুছে যায়।
লোকে একে বেহায়াপনা বলতে পারে। বলুক। বাস্তবতা যদি বেহায়া হয় তবে বেহায়াপনাকে গালি দেয়া মানে নিজেকে গালি দেয়া।
নিজের সাথে এবং সমাজের সাথে সংগ্ৰামের যবনিকাপতন চায় ফুলমতি। অবশেষে একটি মানুষের ওপর গিয়ে আস্থা স্থীর হয়। কিন্তু সে মানুষটিও ধোঁকা দেয় ─ তার স্বামীর রেখে যাওয়া অমূল্য স্মৃতি মুছে ফেলতে চায়। আর কোনো পথ দেখে না যখন ফুলমতি, তখন তার পাশে এসে দাঁড়ায় অপ্রত্যাশিত এক চরিত্র ─ 'আবাং গজুয়া' (মানে প্রচন্ড বোকা) কুতুবালি। কুতুবালির প্রতি মমতা, ফের মায়া, অবশেষে ভালোবাসা জন্ম নেয় তার মনে।
কিন্তু সমাজ কেন মানতে যাবে গাঁয়ের বিধবার সাথে অচেনা কোনো বিদেশী বেকুবের সম্পর্ক। ফুলমতির ওপর যাদের নজর ছিলো তারাই বা কেন মানবে। এমনি এমনি তো কেউ কিছু মানে না। সংগ্ৰাম করতে হবে। আবার করতে হয় সংগ্ৰাম। দূরত্ব ঘোচানোর পর বৈধতা অর্জনের সংগ্ৰাম।
তেভাগা আন্দোলন আর আধিয়ার কৃষাণের লড়াই নিয়ে লেখা উপন্যাসে একটি নারী চরিত্রের তার সমাজ ও নিজের কামনার সাথে সংগ্ৰামের গল্প পাঠকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। এমনটা মনে হলে তা পাঠকের অপ্রাপ্তি হবে। ফুলমতি, কুতুবালি আর আবেদালির কাহিনী তেভাগা আন্দোলনে কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়, বরং কৃষাণের লড়াইয়ের বিমূর্ত মূর্তি। এবং তা লেখক হিসেবে শওকত আলীর গৌরবান্বিত সার্থকতা। এরা রক্তমাংসের মানুষ না, কলমের আঁচড়ে তৈরি চরিত্রও না ─ জীবন্ত উপমা এরা।
উপমার মর্ম যতোটা গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায় উপন্যাসের ঘটনাবলির প্রাসঙ্গিকতা ততোটা প্রখর হয়ে চোখে ধরা দেয়। ফুলমতি এখানে উর্বরা কিন্তু শস্যহীনা ধরিত্রীর মতোন নিপীড়িত। আবেদালি নিষ্পাপ ─ ধরিত্রীর পুষ্প নদীনালা ও আসমানের মেঘের মতো স্বাধীন, এবং ঐ নিয়ে তার জগৎ। কুতুবালি আলাভোলা নির্ভেজাল মাটির মানুষ ─ বাংলার মেহনতি কৃষাণের মতো। সংসারের সকল কাজে পারদর্শী, সমাজের কূটচাল তার মাথায় খেলে না ─ কিন্তু অন্যায় হতে দেখলে নিসংকোচে বাধা দেবে। সমস্ত সংগ্ৰামের পর এই তিনটি চরিত্র এক হয় ─ ধনধান্য ও সুখে মহিমান্বিত পরিবার হয় তাদের। আদিম কামনার জাদুকাঠিতে সেই উপমা হয় আরো মহিমান্বিত। লেখকের নিজের বর্ণনায়─
"বাধা বিঘ্ন পরাহত করে প্রকৃতিতে পুরুষের উপগমন হয় বলেই প্রাণ ও জীবন ধারার সূচনা হয় এবং তা প্রবাহিত হয়। জীবনের বিকাশেও ঐ একই প্রকৃয়া, বাধা বিঘ্ন এবং বৈরিতাকে পরাহত এবং অতিক্রম করতে হয়। জ্ঞাতে হোক, অজ্ঞাতে হোক, জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে মানুষ এই প্রকৃয়াতে বাহিত হয়ে চলে।"
চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের চিত্রশৈলীর বর্ণনা দিতে গিয়ে আহমদ ছফা লিখেছিলেন─
"সুলতানের কৃষকেরা জীবনের সাধনায় নিমগ্ন। তারা মাটিকে চাষ করে ফসল ফলায় না। পেশির শক্তি দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গম করে প্রকৃতিকে ফুলে-ফসলে সুন্দরী সন্তানবতী হতে বাধ্য করে........ এ মানুষগুলো পাখা থাকলে দেবদূতের মতো আকাশের অভিমুখে উড়াল দিতে পারতো। কিন্তু একটি বিশেষ ব্রতে, একটি বিশেষ অঙ্গীকারে আবদ্ধ বলেই তারা মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে আছে। সে অঙ্গীকারটি, সে ব্রতটি মাটিকে গর্ভবতী ও ফসলশালিনী করা"
'ঘর-সংসার' শেষ করে 'নাঢ়াই' অংশটি যখন শুরু হয় তখন আধিয়া আর জোতদারদের বিরোধ জোরালো হচ্ছে। একদিকে সারাদেশে চলছে ইংরেজ খ্যাদানোর আন্দোলন, অন্যদিকে জিন্নাহ'র অনুসারীদের মুসলিম রাষ্ট্রের আন্দোলন। কৃষকদের দুরবস্থায় নজর অল্প ক'জনারই। চিরকাল রাজনীতিবিমুখ বাঙালি জনসাধারণ দেশীয় রাজনীতি নিয়ে তেমন মাথা ঘামাচ্ছে না ─ দেশে আংরেজ রাজা রইবে না গান্ধী রাজা আসবে তা নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু নিজেদের অধিকার নিয়ে তারা সোচ্চার, এবং তাদের দাবী একটাই ─ তেভাগা, ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ আমাদের প্রাপ্য।
নানান রাজনৈতিক মতাদর্শের রেষারেষি দেখা যায় উপন্যাসের এই অংশে। যেমন একটি ছোট্ট ঘটনা খুব চমকপ্রদ। এক গ্ৰাম্য ডাক্তার অশিক্ষিত চাষীদের কৃষক ইউনিয়ন করতে উৎসাহিত করছিল। তো বিরোধী মতবাদে বিশ্বাসী পাঠশালার এক হেডমাস্টার সেই চাষাদের জমায়েত করে বলে ─ তোমরা কৃষক ইউনিয়নের ঝামেলায় জড়িয়ে যেও না, কমিউনিজম বিদেশীদের সর্বনাশা চক্রান্ত, কমিউনিস্টরা ভালো না, তোমরা ঐ কমিউনিস্ট ডাক্তারের কোনো কথা শুনবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
এর মধ্যে এক মূর্খ চাষী দাঁড়িয়ে বলে, বাবু, ঐ ডাক্তার যে বললেন তোমরা জল সেদ্ধ করে খেও, সেদ্ধ জল খেলে কলেরা হবে না ─ তবে আমরা কি জল সেদ্ধ করে খাবো না? ডাক্তার বাবুর কথা শুনবো না?
হেডমাস্টার পড়লেন বিপাকে। জল সেদ্ধ করে খাবার দরকার নেই ─ এই ভয়ানক কথাটাও তিনি বলতে পারছেন না। আবার এই মূর্খদের ডাক্তারের কথা শুনে সেদ্ধ জল খেতে বললে ঐ কমিউনিস্ট ডাক্তারের জয় হচ্ছে। উনি মধ্যিখানে আটকে গেলেন কাঁদায় পড়া ষাঁড়ের মতো।
কোনো কোনো সময় শওকত আলীর লেখনভঙ্গি একটু বেশিই straightforward হয়ে ওঠে, চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থা আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ মনে হয় রস-গন্ধহীন। এর কারণ উনি নিজেই কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করে পরমুহূর্তে নিজেই তার সরাসরি উত্তর ছেপে দিচ্ছেন, যার কারণে পাঠক নিজের প্রচেষ্টায় কিছু figure out করার সুযোগ পায় না। শুরু শুরুতে এটা বিরক্তিকর লাগলেও ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায়।
উপন্যাসের আঞ্চলিক dialect-এ চরিত্রদের সংলাপ খুব আন্তরিক আর সারা উপন্যাস জুড়ে consistent. এ dialect ছাড়া বোধহয় চরিত্রগুলোর মধ্যে অতোটা সরল মাধুর্য্য আসতো না। একবার মনে ধরলে সেখানেই গেঁথে যাবে, ভোলা মুশকিল।
উপন্যাসের সমাপ্তি তড়িঘড়ি মনে হতে পারে, তা হবার সঙ্গত কারণ আছে। ২০০ পৃষ্ঠার উপন্যাসের পরিসমাপ্তি কয়েকটিমাত্র অনুচ্ছেদে। তবে আমি ব্যাক্তিগতভাবে অসন্তুষ্ট নই। আর এই দ্রুত উপসংহার টানার পেছনে কোনো সুপ্ত কাব্যিক অর্থ আছে কি নেই তা লেখকই ভালো জানেন।
এক কথায়, বইটা অসাধারণ। অনেকটা "জননী" এবং "আগুনপাখি" বইয়ের মত। তবে এই বইটার প্রেক্ষাপটটা একটু ভিন্ন। সময়টা দেশভাগের আগের। ব্রিটিশদের তাড়িয়ে স্বাধীনতা দাবী এবং মুসলমানদের জন্যে আলাদা রাষ্ট্রের দাবীর লড়াইয়ের দাবানল যখন পুরো ভ��রতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন ই গ্রামে গ্রামে চলছে মহাজন, জোতদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের লড়াই। যুগ যুগ ধরে মহাজনরা সবসময়ই কৃষকদের উপর অন্যায়ভাবে জুলুম করে আসছে, শোষণ করছে। কৃষকদের ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার, লড়াই করার গল্পই বলেছেন লেখক বইটিতে।
মাহীগঞ্জের আধিয়ার কৃষাণ আহেদালি যুবতী বউ,নাবালক ছেলে আর সংসারে অভাব রেখে হুট করে মরে গেলো।একদিকে অভাবী সংসার,ছেলে আবেদালি আর নিজেকে নিয়ে অকূল পাথারে পড়লো সদ্য বিধবা ফুলমতি। শুধু নিজেদের খাওয়ার চিন্তা করলেই তার দিন চলে না,নিজেকে রক্ষা করতে হয় লোভী নজর থেকে।প্রতিবেশী পুরুষ,স্বামীর ভাই,বন্ধু সবাই ছেঁকে ধরে তাকে।বাদ যায় জোতদারের ছেলে এবং মসজিদের মৌলভী।রাতে বটি,দা,কুড়াল নিয়ে ভাঙা বেড়ার ঘরে সভয়ে দি কাটায় ফুলমতি। কিন্তু এভাবে কতদিন চলে?? হঠাৎ করে পরিচয় হওয়া মালেক দোকানদারকে ভালো লাগলেও দেখা গেলো সে লোভী।শুধু গরু,আর একখন্ড জমির লোভে সে ফুলমতিকে চেয়েছে।সেই দোকানের কর্মচারী গো-বেচারা,গজুয়া,অনাথ কুতুবালি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আবেদালি আর ফুলমতিকে রক্ষা করে।সেই দেখে কুতুবালিকে নিকা করে ফুলমতি।তারপর তাদের সংসারের হাল ফেরে।সুখের মুখ দেখে তারা। কিন্তু ওদিকে দেশভাগের তোড়জোড় চলছে।সেই হাওয়া অজপাঁড়াগা মাহীগঞ্জেও লাগে।সাথে যোগ হয় তেভাগার দাবী।"লাঙ্গল যার,জমি তার" এই রন।জোতদার মহাজনদের বিরুদ্ধে অনেক এলাকার আধিয়ার কৃষক আন্দোলন করে,গড়ে তোলে কৃষক সমিতি।মহাজন-রাও অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে আর শুরু হয় দু পক্ষের "নাঢ়াই"। গ্রামীণ প্রাত্যহিক জীবন,কৃষকের দুঃখ,জোতদার মহাজনের অত্যাচার,গ্রামীণ রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে বেশ সুখপাঠ্য একটা উপন্যাস।
মৃত্যুকালে আহেদালি এই পৃথিবীতে তার একমাত্র স্ত্রী ফুলমতি ,একমাত্র পুত্র আবেদালি , একমাত্র অসুস্থ গরু , কয়েকটি ছাগল , কিছু হাঁস মুরগি আর নিজের বিঘাখানেক জমি জমা রেখে যান । সংসারে স্বামী ও পিতার ভূমিকা যে কত গুরত্বপূর্ণ তা আহেদালির পরলোকগমনের পর ফুলমতি ও আহেদালি খুব ভালো মতো বুঝতে পারে । সেইসাথে বুঝতে পারে গৃহপালিত পশুপাখি গুলো । বেঁচে থাকতে পরিবার নিয়ে যে খুব সুখে শান্তিতে আবেদালি ছিলেন তা নয় কিন্তু তার মৃত্যুর পর এক ছেলেকে আর নিজের ‘’এইতো কদিন এলাম,পরে ধীরেসুস্থে যাবো’’ টাইপ যৌবন নিয়ে ফুলমতি মহা অশান্তির মধ্যে পড়লো । ছেলেটার বয়স কম , তাকে দিয়ে জমিজমার কাজ হবে না ; সুতরাং যা করার ফুলমতিকেই করতে হবে । কিন্তু ফুলমতি কি করবে ! তাছাড়া আহেদালির মৃত্যুর পর অনেক বিকৃতমনস্ক মাছি ফুলমতির চারপাশ দিয়ে উড়াউড়ি করতে শুরু করেছে তাই বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে এক প্রকার আতঙ্কের মধ্যেই ফুলমতির থাকতে হয় । সামাজিক প্রথা মেনে চলতে গেলে এবং কুশিল সমাজকে কাঁটা কম্পাস দিয়ে খোঁচাতে না চাইলে স্বাভাবিকভাবেই স্বাভাবিক নারীদের একটা স্বাভাবিক অবলম্বন লাগে । সবাই তসলিমা নাসরিন হইতে পারে না । ফুলমতিও পারছে না । ফুলমতি কে প্রতিবেশীরা আবার বিয়ে করতে বলে । গ্রামে চটকদার চরিত্রের বিজ্ঞাপন ওয়ালা পুরুষমানুষের অভাব নাই কিন্তু এদের মধ্যে কে যে খাঁটি সরিষার তেল তা ফুলমতি ঠিক বুঝতে পারে না । দিনগুলা মার্বেলের মতো গড়ায়ে গড়ায়ে এদিক সেদিক চলে যায় । একদিন ভাগ্যের পাকচক্রে এক বেকুব লোক ফুলমতি আর আবেদালির জীবনে প্রবেশ করে । লোকটা নিরীহ গোছের এবং সে সর্বদা নিজেই নিজেরে নির্বোধ প্রমানিত করতে ব্যস্ত থাকে তবে তার যে কোন বদ উদ্দেশ্য নাই সেটা বুঝা যায় । বিধবাটির নাঢ়াই করার জন্য একজন সঙ্গী জুটলেও সে সঙ্গীটির এই খাপছাড়া ভালোমানুষী তাকে মাঝেমধ্যে বড় চিন্তায় ফেলে আর সাথে সাথে সে এটাও আবিষ্কার করে যে, ঈশ্বরের নির্মম তামাশার পাত্রী হওয়ার পর নারীরা সাধারনত সেসব পুরুষদের পছন্দ করে যাদের চেহারায় একটা মুরগি ভাব থাকে আর আচার আচরনে থাকে ছাগসুলভ সারল্য
বইটা পড়ার পর বার বার শুধু আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের "খোয়াবনামা" উপন্যাসটির কথা মনে পড়েছে। যদিও খোয়াবনামার বিষয়বস্তু ব্যাপক।
'নাঢ়াই' শব্দটাকে আমি 'ঠাইনাড়া' ধরনের কিছু ভেবে নিয়েছিলাম। আসলে 'নাঢ়াই', লড়াইয়ের অপভ্রংশ।
গল্পের নায়িকা ফুলমতি। দশ বছরের ছেলে আবেদালিকে রেখে ফুলমতির স্বামী আহেদালি মারা গেলো। চাষাবাদী সংসারে পুরুষ না থাকলে সংসার টেকে না। রাতে ঘরের আশেপাশে মানুষ ঘোরে, পুরুষ মানুষ। কখনও নিশির ডাক আসে, কখনও দিনমানে পথ আগলে দাঁড়ায়। এসবের মুখে দাঁড়িয়ে যুবতী ফুলমতি বুঝতে পারে, জমিনে লাঙল দিতে, মাটি আগলে রাখতে যেমন একজন পুরুষ লাগে, সংসারেও তাই। কিন্তু শরীর আর জমিন বাদে ফুলমতি আর আবেদালিকে আপন করে নেওয়ার মতো পুরুষ কই? তাও ডাংগুয়া!
বইয়ের দোকানদার আবদুল মালেকের সাগরেদ বুদ্ধিসুদ্দি কমওলা গোজুয়া কুতুবালির সাথে এই পরিবারের পরিচয়। এ পরিবারের সাথে যোগাযোগ হলেও সে না বোঝে ফুলমতির যৌবন, না বোঝে কিছু।
সময় পাল্টে যাচ্ছিলো। দেশভাগের স্রোত এসে লেগেছিল প্রান্তিক পর্যায়ে। কংগ্রেসের কর্মীরা এসে ঢুকেছিল গ্রামের পাঠশালায়। কিন্তু তারা না পারে নিরক্ষন চাষাদের দেশ বোঝাতে, না পারে তাদের সঙ্গে মিশতে। এরই মাঝে 'লাঙল যার, ফসল তার' বোল ওঠে।
শওকত আলীর অসামান্য লেখনীতে ফুটে উঠেছে মানুষের কথা, ভুমির কথা, অধিকার আর স্বাধীনতার কথা। উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা সংলাপের কারনে একালের পাঠকদের এ বই পড়ে বুঝতে কষ্ট হতে পারে, কিন্তু এই ভাষার ব্যবহারই এ বইয়ের চমৎকার দিক। আর এ কারণেই বইটি মনে হয় আধুনিক! এভাবেই শেষ করাটা সম্পূর্ণ ভিন্নতা এনে দেয়, দ্রুত এমনি উপসংহার টানার পেছনে কোনো সুপ্ত কাব্যিক অর্থ আছে কি নেই তা লেখকই ভালো জানেন। 'খোয়াবনামা'-র শেষে যেভাবে ভাবায় ইহাও তেমনই।
নাঢ়াই (লড়াই এর উত্তর বাংলা ভিত্তিক আঞ্চলিক শব্দরূপ) সমাজের প্রান্তিক মানুষদের লড়াই এর গল্প- অল্পবয়সে স্বামী হারানো ফুলমতির রক্ষণশীল সমাজে নিজের মত করে বাঁচার লড়াই, জোত্দার জমিদারদের অত্যাচারে নিপীড়িত আধিয়ার কৃষকদের লড়াই।
শওকত আলীর তৎকালীন কৃষি সমাজের বর্ণনা, আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ প্রশংসনীয়। তেভাগা আন্দোলন যেমন ভিন্ন জাতির হিন্দু, মুসলিম ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের একত্রে হয়ে লড়া এক আন্দোলন সেটাও খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। এছাড়াও স্বাধীনতার প্রাগ্ মুহূর্তে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও বামপন্থী দের আলাদা আলাদা পথ নেওয়া, ধর্ম নির্বিশেষে গরীব (বিশ��ষত নিম্ন জাতির) মানুষের আসল স্বাধীনতা কোথায়, এই ব্যাপারগুলো যেভাবে আলোচনা করা হয়েছে সেটাও আমার খুব ভালো লাগলো।
দুটো সামান্য সমালোচনা - এক, উপন্যাসের তৃতীয় অংশটা আরও একটু সম্প্রসারিত হলে ভালো হতো; দুই, ঐতিহাসিক দিক দিয়ে তেভাগা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম, সেটা হয়তো আরও ভালোভাবে বাস্তবায়িত করা যেতো এই গল্পে।
সবশেষে নাঢ়াই এক অদম্য সাহসী নারী ফুলমতির কাহিনী, ��বং ওর জীবনের ঘটনা প্রবাহ, মূলত প্রথম দুই অংশে, খুবই দক্ষতার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যই recommend করব।