পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এপিক মহাভারত। এই মহাসৌধের অলিন্দে অলিন্দে ধূসর, সূক্ষ্ম কিন্ত সম্ভাবনায় পূর্ণগর্ভ সহস্র ইঙ্গিত ছড়ানো। আদিপর্বের এক পরিচিত আখ্যান ও চেনা কিছু চরিত্রকে নতুন ভাবনায় উদ্ভাসিত করেছেন সৌরভ মুখোপাধ্যায় তাঁর 'প্রথম প্রবাহ' উপন্যাসে, দিয়েছেন যুক্তির নির্মাণ।
না এরা তো শুধু নিমিত্ত,শুরুর শেষ করেছে মাত্র। দীর্ঘ দিনের বহিরঙ্গের প্রতিশোধলিপ্সা আর ভেতরের গাঙ্গেয়ের প্রত্যাখিত প্রেমের তুষের আগুনের দগ্ধ এক ধীবরকন্যার ধৈর্য ধরে আর্য রক্তে অনার্য ধারা প্রবাহের প্রারম্ভের পরিচালিকা মহাভারতের অষ্টাদশের প্রথম নায়িকা সত্যবতী র ভূমিকা ভূভারতে যারা কভু এই অদ্ভুত ধ্রুপদসম সৃষ্টি পড়েনি তাদের কাছে অজ্ঞাত,রূপকথা।
অপ্সরা গর্ভে জন্ম রাজনকন্যার ভাগ্যলিপির লেখা বড্ড দূরহ, কন্টকাকীর্ণ পরিহাসরত সর্বদা।ধীবরদুহিতার পরিচয়ে মৎস্যগন্ধা অনন্য অসাধারণ কিন্তু স্বভাবে রাজকীয় ধারার পুরোটাই বহন করেছেন শৈশব থেকেই।ভরাযৌবনার তরী তীরে ভেড়ানোর পরিকল্পনায় পিতার কাছে ব্যক্ত হয়ে পড়ে দেবব্রতের প্রতি অনুরক্ততা।শিউরে উঠেন পিতা;শঙ্কায় আশঙ্কায় সত্যবতীর ভবিষ্যতে কি আছে?দেবভোগ্যাযোনীজাত বলে দেবব্রত যাকে করেনি গ্ৰহন,তবে কি অদ্রিকাপুত্রীর কাছে অস্পৃশ্য থাকবে রাজসুখের স্বীকারোক্তি শান্তি সন্তানের সাথে সম্ভোগের সম্ভাবনা?
কিন্তু মহাকাল লিখছেন যা নিজহস্তে,করেছেন যেখানে সব আয়োজন,দিয়েছেন বারংবার ভাগ্যপীড়িতা সত্যবতীকে সুযোগ সম্ভবনা ক্ষেত্র সেখানে সাম্রাজ্যের সাম্রাজ্ঞী হতে বাধাই বা কোথায়?
যা নিজে পাননি তা কাশিরাজের কন্যা অম্বার আলিঙ্গনে ও বাঁধা পড়তে দেননি,আজন্ম দাসরূপে অপুত্রক থাকার অচিন্তনীয় সত্য আদায় করেছেন ভীষ্মের হতে।নদীর জল গড়ে মিশেছে অন্য মোহনায়,পট পরিবর্তনের পালায় প্রকান্ড পাহাড়ের ধাক্কায় ডুবেছে সত্যবতীর সাধ সংকল্প কিন্তু ধ্বংসস্তূপ থেকেই আগেরবারের চেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক হয়েছে তার প্রতিঘাত। ভেঙেছেন কিন্তু ভাঙ্গেননি গঙ্গাপুত্রকে দেওয়া তার শপথের শেকল।
দৃঢ়তা মিশ্রিত দুর্দমনীয় আশার আলো অন্ধকারের আবক্ষে আঁকার অকল্পনীয় শক্তি সত্যবতী আখ্যান যুগে যুগে শুধু বেদব্যাসের বাকে্য লম্বোদরের কলমে নয় বরং মহাভারতের মহাআখ্যানের সমাপ্তিবিহীন শব্দে সাজানো থাকবে অনাদিকাল ধরে।
পড়ার আগে সুধীজনের প্রতি নিবেদন; সাধু ভাষায় রচিত বহুযুগ ধরে সঞ্চিত এই কল্পে কদাচিৎ ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেও দিনশেষে ধনবান নিজেই হবেন।
এই উপন্যাস নিয়ে অল্প কথায় কিছু লেখা অসম্ভব। আবার বিষয়ের ব্যাপ্তি ও জটিলতা, তথা এই কাহিনির বহুমাত্রিক প্রকৃতিকে মাথায় রেখে লিখতে গেলে ব্যাপারটা হয় রিসার্চ পেপারের চেহারা নেবে, নয় লেখনী ও বিষয়বস্তু, দুয়ের কারো সঙ্গেই সুবিচার করা হবে না। সংক্ষেপে শুধু এটুকু লিখি: ১] মহাভারতের আদিপর্ব নিয়ে শুধু বাংলায় নয়, ভারতের প্রায় সব ভাষাতেই সাহিত্যিকেরা নিজের মতো করে লিখেছেন। তাতে চেনা কাহিনি অচেনা হয়েছে সংলাপের বৈচিত্র্যে, চরিত্রচিত্রণের ভিন্নতায়, আবার 'পর্ব' বা 'যুগান্ত'-র মতো ক্লাসিকের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কাহিনিটির এক অনন্য বিনির্মাণে। এবং আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, এই উপন্যাস উপরোক্ত তিনটি বিচারেই ধ্রুপদী, কালোত্তীর্ণ, এবং অদ্বিতীয়। শুধু বাংলায় নয়, সম্ভবত ভারতীয় ভাষায় রচিত সাহিত্যের মধ্যেই এই লেখা, মহাভারতের তথাকথিত ডেরিভেটিভ কথন হয়েও, অনন্য। ২] উপন্যাসটি শুধুমাত্র রিপুতাড়িত কিছু মানুষের সংঘাত, প্রেম, প্রীতি, অসহায়তা, বা ঔদার্যের আখ্যান নয়। এতে প্রায় থ্রিলারের মতো করে এসেছে রহস্য, এসেছে মোচড়, এসেছে এক নারীর প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলেপুড়ে একটি মহাবল বংশ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার গতিময় ঘটনাপ্রবাহ। থ্রিলার পড়ে-পড়ে বিরক্ত হয়ে যাওয়া আমাকেও থ্রিলারের চেয়ে কিছু বেশির সন্ধান দিয়েছিল এই মহাকাব্যিক উপন্যাস। ৩] যৌনতা এই উপন্যাসের সর্বাঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু কখনও তা প্রক্ষিপ্ত বা আরোপিত মনে হয়নি। কখনও মনে হয়নি যে সস্তা পাঠকের কাছে সুলভ প্রমোদের বন্দোবস্ত হিসেবে লেখা হচ্ছে কথাগুলো। এতটা আদিরসাত্মক-অথচ-শিল্পসুষমাণ্বিত উপন্যাস বাংলায় অতিবিরল।
আমি উপন্যাসটি থেকে নয়, বইটি থেকে একটি তারা খসালাম তার অকথ্য প্রচ্ছদের জন্য। উপন্যাসটা খাঁটি ফাইভ-স্টার মেটিরিয়াল। যদি এখনও না পড়ে থাকেন, তাহলে অবিলম্বে ত্রুটি-সংশোধন করুন।
নিত্যদিনের ব্যস্ততায় অনেকদিন কোনো বই পড়তে পারিনি। সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের আলোচিত-সমালোচিত 'প্রথম প্রবাহ' একবসায় পড়ে ফেললাম। মহাভারতনির্ভর এই উপন্যাস পড়ার অনুভূতি হলো মিশ্র কিংবা খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেছি কেমন লেগেছে তা বুঝতে।
উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাশয় সংস্কৃতে শ্লোক লিখেছেন। সেই শ্লোককে লিপিবদ্ধ করার গুরুভার পড়লো গণপতি গণেশের ওপর। শুরু হলো 'প্রথম প্রবাহ'-এর কাহিনি প্রবাহ।
ভারতবর্ষ নামকরণ যে মহান ভরত রাজার নামে, সেই রাজা ভরতের বংশধর হলো হস্তি। এই হস্তির রক্তধারা বইছে হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনুর ধমনিতে। তখন শান্তনুর বানপ্রস্থে যাওয়ার মোক্ষম সময়। গঙ্গায় গর্ভে জন্ম দেবব্রতকে তিনি ইতোমধ্যে মঈনুস সুলতান তথা যুবরাজ ঘোষণা করেছেন। দেবব্রতের বিয়ে প্রায় নিশ্চিত কাশীরাজের বড়ো মেয়ের সাথে। ড্যাশিং যুবা দেবব্রত নিয়মিত অস্ত্রচালনা অনুশীলন করতে যেতেন বনের ভেতর নদীর পাড়ে। তাকে দেখে মুগ্ধ হয় মৎসজীবির পালিত কন্যা সত্যবতী। কিন্তু দেবব্রত হেলাভরে প্রত্যাখ্যান করেন মৎসগন্ধী সত্যবতীকে। সেই প্রত্যাখ্যান সইবার মতো শক্তি সত্যবতীর ছিল না। দেবব্রতকে 'নাশ' করতে এক অমোঘ খেলায় মেতে ওঠেন সত্যবতী। কিন্তু তাতে কী শেষ রক্ষা হলো?
মহাভারত সাধারণ কোনো গ্রন্থ নয়। তাই জনতার চোখে মহাভারতের পাপ-পুণ্যি বিচার করতে গেলেই গোল বাঁধে।
মহাভারতের আখ্যানকে ভিন্ন চোখে দেখতে চেয়েছেন সৌরভ মুখোপাধ্যায়। সেই চাওয়ার মূল উপজীব্য হচ্ছে দেবব্রতকে না পেয়ে সত্যবতীর হাহাকার এবং ক্রোধান্ধ হয়ে নেওয়া পদক্ষেপ। এখানে কাহিনির প্রয়োজনে যৌনতা এসেছে। কাব্যিক ঢঙে দেহসৌষ্ঠব বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন ঔপন্যাসিক। আমি হয়তো 'রুচিবাগীশ ভদ্দরনোক'। তাই লেখকের যৌনতার হরেদরে আমদানির কারণে উপন্যাসটি উপভোগ করতে সফল হইনি। খানিকটা বাড়াবাড়িও মনে হচ্ছিল। তবু বলব মহাভারতের সত্যবতী, শান্তনু আর গাঙ্গয়িন দেবব্রতের ভীষ্ম হয়ে ওঠার প্রথাবিরোধী গল্প পড়তে একদম খারাপ লাগেনি। যে কোনো ধরনের নতুনত্ব সাহিত্যের সৌন্দর্য বাড়ায় বটে।
মহাভারত,সে যত খন্ড চিত্রেই তাকে ধরা হোক না আমায় বিস্মিত করে,ভাবায়৷এই অদ্ভুত মহাকাব্য নিয়ে পৃথিবীতে যত সহস্র ব্যাখ্যা আছে,মনে হয় পড়ে শেষ করি এ জন্মে (অসম্ভব যদিও)৷ শুরু থেকে মাঝ বরাবর অবধি বিষয় পুনরাবৃত্তি,শ্লথ গতি প্রায় তিন (মোটামুটি) স্টারে এনে ফেলছিল উপন্যাসটিকে৷তবু শেষ অবধি "মহাভারত" এর অনুবীক্ষণ বলেই চার দিয়ে ফেলা গেল৷
সবচেয়ে অদ্ভুত উপলদ্ধি হলো গোটাকথনে সবচেয়ে বেশি মানুষ একজন দেব, তাও তিনি গজমস্তক। বাকি যে চরিত্ররা নিজনিজ ফিকশন আঁকড়ে প্রায় অতিমানব হওয়ার চেষ্টায়। স্বয়ং কথক ব্যাসও। এ যেন আমার চেনা ক্রিপ্টনপুত্র আর বাকি লীগের গল্প। এক ডেমিগডই সবচেয়ে বেশি মানুষ। আর মানুষরা তাদের গল্প নিয়ে, ধারণা নিয়ে, ভয় নিয়ে হয়ে ওঠে ন্যায়, তেজ বা আলোর একএকটি আইকন। তবে আমার জ্ঞান আর বোধ নিয়ে মহাভারতের ব্যাখ্যা বা সমান্তরালে নাই বা গেলুম। যা পেলুম তার কথা হোক:
ভাষা; শুধু অপ্রচলিত শব্দ নয়, প্রথমে ডিকশনারিইন্সটল ও পরে ধুত্তোরি হয়ে পড়ে যাওয়া তো আছেই কিন্তু তা পেরোতে পারলে আছে হাল্কামাটনঝোলের গদ্য। নলীহাড়, পাঁজরচ্যাপ্টাহাড়, শক্তহতাশগ্রন্থীহাড় তো আছেই কিন্তু তুলতুলে আর চর্বি-পেঁয়াজের উম্মম টেনে নিয়ে আমায় একদিনে গোটাটা মস্তিষ্কোদরে চালান হয়েছে।
স্বাধীনতা; নিশ্চয়ই আমি মূল বা শাখামূল মহাভারত পড়িনিই বলা যায়, তাই কোনটি স্বাধীনতা কোনটি নয়, আমি বলতে পারিনা, তবে নদীতে ভাসমান ভুর্জপত্র দেখে যা যা মনে হয়েছে তা সবই গায়ে কাঁটা দেওয়ার মত। সত্যবতী-ভীষ্মের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ বা শেষ সাক্ষাৎ, চিত্রাঙ্গদমৃত্যুরহস্য বা ভীষ্মের রাজী হওয়া। গঙ্গাপুত্রের যুক্তিশর যখন সিনে'মা' বর্ম ভেদ করে সত্যি বলছি মাথা আমিও নিচু করে ফেলেছিলুম।
প্রচ্ছদ; ইতিউতি বা লেখক নিজেও মনে পড়ে যেন দেখেছি প্রচ্ছদের ওপর খড়গহস্ত, কিন্তু আমার প্রচ্ছদটি দারুন লেগেছে। ভাষা আর বিষয়ের মতই, আনেপলোজেটিক। গাঢ় লালের মধ্য থেকে ক্ষীণসাদায় আঁকা দেহ, যেন প্রকট আর উচ্চকিত ভীষ্মচরিত্রের মধ্যে জেগে ওঠা সত্যবতী। পরিধান উদ্দেশ্যনিয়োজিত, গল্পের মূল চরিত্রের মতই। ভঙ্গী অমার্জিত আর আড়ষ্ট, সত্যবতীর বাহির আর ভেতরের মত।
এইবার ভাল না লাগা: ফোরশ্যাডোইং; সত্যবতীর রাজঅলিন্দ কল্পনা।
প্রকৃতির সমাপতন; মন বিক্ষুব্ধ হলেই আকাশে ঝড় বা বৃষ্টি এরকম আবহ সৃষ্টিতে আমার ব্যক্তিগত এলার্জি আছে।
কুঁড়েমি; বইয়ের ইনসাইড ফ্ল্যাপে আর পশ্চাৎপ্রচ্ছদে একই লেখা দেখে কুঁড়েমির গন্ধ পেলুম। --- আর কি, পেলে পড়ে ফেলুন, এমন বই ক্ষিদে বাড়িয়ে দেয়। বানান আর ব্যাকরণ ভুল ধরিয়ে দিলে আপনাদের রোববারের মাটনে নুন ঠিকঠাক হবে।
প্রথমেই বলি, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্ক উপন্যাস । মহাভারতের ‛আদি পর্ব’কে দারুণ ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই উপন্যাসে ।
মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস এই মহান উপাখ্যানের শ্লোক রচনা করেছেন এবং পার্বতীনন্দন গণেশ তা লিপিবদ্ধ করেছেন । লিখতে লিখতে গণেশ বুঝতে পারেন অনেক অসহনীয় নির্মম সত্য লিপিবদ্ধ হয়েছে । তাই তিনি বেদব্যাসকে অনুরোধ করেন রচিত অংশের কিছু পাতা বর্জন করে সহনীয় রূপ দিতে । বেদব্যাস কিছু পাতা নদীর জলে ভাসিয়ে দিলেন এবং আবিষ্ট কন্ঠে বললেন - “...এই যে কয়েকটি পৃষ্ঠা বর্জিত হল, বহু যুগ পরে কোনো আখ্যাতা তার আশ্চর্য কল্পনায় ভর করে সেগুলিই আবার বিবৃত করে ফেলবেন ।”
অপ্সরা তনয়া সত্যবতী, পালিত হয় ধীবরের ঘরে । নদীর ধারে অস্ত্র্যাভ্যাস করতে আসা যুবরাজ দেবব্রতর প্রতি তিনি অনুরক্ত হয়ে পড়েন । কিন্তু আর্যরক্তজাত দেবব্রত অনার্য সত্যবতীকে প্রত্যাখ্যান করেন । এই প্রত্যাখ্যানই গোটা ভারত-কথার মোড় ঘুরিয়ে দেয় । প্রতিহিংসাপরায়ণা সত্যবতী হস্তিনাপুরের রাজপরিবারে নিজের দাসরক্ত প্রবাহিত করার জন্য যা করেন, তা পড়তে পড়তে শিহরিত হয়ে উঠতে হয় ।
এই উপন্যাসে সত্যবতীর চরিত্রের যে দৃঢ়তা, জেদ এবং একাগ্রতা লেখক দেখিয়েছেন তার জুড়ি মেলা ভার । শেষে সত্যবতীর পরিণতির বর্ণণা পড়তে গিয়েও চোখ ভিজে আসে । “আর তিনি ভারত রাজনীতির নিয়ন্ত্রনকারিনী নন, জরাগ্রস্ত ন্যুব্জ শরীরে প্রাসাদের একটি কোণে দিন কাটে অবহেলায় । ‘যে প্রাসাদে গর্বোদ্ধত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যুবতী রাজ্ঞী একদা বহুযুগ আগে প্রবেশ করেছিলেন, সেই প্রাসাদ থেকে নতশির উপেক্ষিতা বৃদ্ধার ম্লান নিস্ক্রমণেই প্রকৃত সমাপ্তি ।’”
পিতার জন্য কাতর দেবব্রতকে আমরা সবাই দেখেছি, কিন্তু মায়ের জন্য কতটা আকুল ছিলেন তিনি? এই উপন্যাসে দেবব্রত চরিত্রটিকে এক অনণ্য উচ্চতায় উপস্থাপিত করা হয়েছে ।
সুপরিকল্পিত শব্দচয়ন এবং সমাপ্তিহীন পরিসমাপ্তি এই দুটি বিষয়ের জোরেই তরতর করে এগিয়েছে এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাস । লেখক সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য লেখনী এবং নিজস্ব যুক্তির নির্মাণ এই মহাকাব্য-নির্ভর উপন্যাসটিকে অবিস্মরণীয় করে তুলেছে ।
নাম : প্রথম প্রবাহ লেখক : সৌরভ মুখোপাধ্যায় প্রকাশনা : মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনী
সম্প্রতি পড়া শেষ করলাম সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস প্রথম প্রবাহ। বহুলচর্চিত এই উপন্যাসের ভাষার গঠনশৈলী খুবই মনোমুগ্ধকর এবং সুখপাঠ্য। এমন অসাধারণ লেখনীর পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখা অতি কঠিন। সংক্ষেপে পাঠ অনুভূতি ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থ মহাভারত। মহাভারতে সাধারণ সুখ-দুঃখ, উচিত্য-অনৌচিত্য প্রভৃতি অনুভূতির মানদণ্ড অচল। এমনই বিচিত্র এই মহাকাব্য যে এখানে পাপপুণ্যের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই জন্যেই অনায়াসে দেবী গঙ্গার পুত্রঘাতী চরিত্রকেও অষ্টবসুর অভিশাপের অবসান হিসাবে মহিমান্বিত করা যায়। আবার রাজমাতা সত্যবতীর প্রথম পুত্র চিত্রাঙ্গদ যখন মারা গেল, তখন স্বয়ং রাজমাতা সত্যবতীই সেই পুত্রের প্রকৃত হত্যাকারী কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। গল্পের শুরু মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস এবং মহাভারতের লিপিকার পার্বতীনন্দন বিনায়ককে নিয়ে। বিনায়ক এবং কৃষ্ণদ্বৈপায়নের কথোপকথন এই উপন্যাসের খুব আকর্ষণীয় বিষয়। বিশেষ করে সেই অংশে শিহরণ জাগে যখন বিনায়ক স্বগতোক্তি করেন দেবব্রতর আগে শান্তনুর বাকি সাতজন সন্তানের অকালমৃত্যু বিষয়ে। সেই মতামত এককথায় বিতর্কিত হলেও সেই বিশ্লেষণ অভুতপূর্ব এবং যৌক্তিক যা আমাদের মহাকাব্যটিকে নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার অবকাশ প্রদান করে। প্রথম প্রবাহ গ্রন্থটির নায়ক এবং নায়িকা উভয়েই হল সত্যবতী। ধীবরকন্যা সত্যবতীর প্রকৃত জন্মরহস্য দিয়েই উপন্যাসটি শুরু হয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে তার মনোজগতের বিভিন্ন ঘাতপ্রতিঘাত উন্মোচিত হয়েছে। যখন সত্যবতী জানতে পারলো যে সে ধীবরকন্যা নয়, উপরন্তু সে রাজবংশজাত, তখন সে আত্মসচেতন হল এবং এই আত্মসচেতনাকে কাজে লাগিয়েই কিভাবে সে তার স্বার্থসিদ্ধি করলো সেই নিয়েই এই উপখ্যান। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু ভীষণভাবে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। সত্যবতী, যাকে স্বয়ং পরাশর মুনি কামনা করেছিলেন তাকে যখন দেবব্রত প্রত্যাখ্যান করেন তখন তখন তার মানসিক অবস্থা, মৎস্যগন্ধা থেকে যোজনগন্ধা হয়ে ওঠার কাহিনী, এবং অতি সুকৌশলে কুরু রাজবংশে প্রবেশ করার কাহিনী প্রত্যেকটি কাহিনী বারবার পড়তে ইচ্ছা করে। আবার বিপরীত দিকে আমরা জানি দেবব্রত যে ভীষণ প্রতিজ্ঞা করে ভীষ্ম নামে অভিহিত হন তা কি প্রকৃতপক্ষে ওনার ত্যাগস্বীকার, নাকি এই আপাত ত্যাগস্বীকারের উদ্দেশ্য ছিল আসলে আর্যসমাজে নিজের মহিমাকে ছড়িয়ে দেওয়া? দেবব্রতর সত্যবতীকে মাতা হিসাবে সম্বোধন করার মধ্যেও কি ছিল কি গভীর প্রতিহিংসাবোধ যে প্রতিহিংসাবোধ দিনের পর দিন আসলে কুরে কুরে আহত করেছিল সত্যবতীর অহংবোধকে ? হয়তো দেবব্রতর আপাত ক্ষুদ্র কোনও স্বার্থত্যাগই সৃষ্টি করেছিল এই বিশাল মহাকাব্যিক ইতিহাস... উপন্যাসটির মধ্যে যে আখ্যানগুলি রয়েছে, সেই প্রত্যেকটি আখ্যান নবচেতনার উন্মেষ ঘটায়, কিছু কিছু ধারণা বিতর্কের সৃষ্টি করে, তেমনই উন্মেষ ঘটায় প্রাচীন মহাকাব্যিক চেতনার উন্নত নবনির্মাণের। ধরে নিতে পারি মহাকাব্য রচনার সময় বিশেষ কয়েকটি ভুর্জপত্র নদীর জলে ভেসে গিয়েছিল। এই ভেসে যাওয়া ভুর্জপত্রগুলিকে যখন পাওয়া গেল তখন সেগুলিকে একত্রিত করে চেষ্টা করা হল মহাকাব্যের পরিচিত কাহিনীর নবনির্মাণকরণের। অথবা এমনও হতে পারে যে হারিয়ে যাওয়া ভুর্জপত্রগুলিতে যে কাহিনী লেখা ছিল তা এতটাই নির্মম, এতটাই করুণ ছিল যে বাধ্য হয়ে সেই কাহিনীকে পরিমার্জিত করা হয়েছিল, যে পরিমার্জিত কাহিনীকে আমরা মূল মহাভারত হিসাবে গণ্য করি। প্রথম প্রবাহের কাহিনী নির্মাণে এরকম অনেক সম্ভাবনা থেকে যায়। এককথায় বলতে পারি এই গ্রন্থ বারবার পড়া যায়, এই গ্রন্থকে সংগ্রহ করা যায় এবং এই গ্রন্থের প্রতিটি চেতনাকে আত্মস্থ করা যায়। এই গ্রন্থ যুগান্তকারী এবং বাংলা সাহিত্যের জগতে একটি বিশেষ মাইলফলক হয়ে ওঠার ক্ষমতা ধারণ করে। সর্বোপরি এই উপন্যাসটি পাঠ করার পরে পাঠক জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার দিক থেকেও সমৃদ্ধতর হবেন এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পরিশেষে লেখক সৌরভ মুখোপাধ্যায়কে আন্তরিক শ্রদ্ধা এবং প্রণাম জানিয়ে এই পাঠ অনুভূতি লেখা শেষ করলাম।
মহাভারত' শব্দটি বাংলা সাহিত্য অনুরাগীদের কাছে হীরের খনির মত। কত কি যে অজানা, অদেখা রয়ে গেছে এর মধ্যে তা সত্যি আমাদের ধারণা নেই। মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্রকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন লেখক-লেখিকার কলমে জন্ম হয়েছে বিভিন্ন উপন্যাসের। পাঠক মহলে সেই সব উপন্যাস জনপ্রিয় হয়েছে 'মহাভারত আশ্রিত উপন্যাস' হিসাবে। লেখক সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'প্রথম প্রবাহ' সেই ঘরানারই এক অনবদ্য পরিবেশন। বেদব্যাস ও বিনায়কের কথোকপথন দিয়ে শুরু এই উপন্যাস ধীরে ধীরে এগিয়েছে মূল কাহিনীর দিকে। আবির্ভাব হয়েছে বেশ কিছু নতুন চরিত্রের। শান্তনু, অম্বা, দেবব্রত ও সত্যবতীর সাথে সাথে কাহিনীতে দেখা গেছে নতুন কিছু মোড়, যা একঝটকায় বদলে দিয়েছে তিল তিল করে গড়ে ওঠা ধ্যানধারণাকে। সময়ের সাথে সাথে কাহিনী যত এগিয়েছে, সম্পর্কের জটিলতা আর কূটনীতি ততই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে কাহিনীকে। আবির্ভাব হয়েছে নতুন নতুন চরিত্রের, অপেক্ষা করে থেকেছে নতুন কোনও চমক। পৃথিবীর প্রাচীন মহাকাব্যকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠা এই উপন্যাস পরিপুষ্ট হয়েছে লেখক সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ভাবনা ও কল্পনার মাধ্যমে। মহাভারতের একটি অনধিক চর্চিত অধ্যায়কে লেখক তাঁর বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে পাঠকের সামনে নিবেদন করেছেন নতুন এক মোড়কে। তাই মহাকাব্য আশ্রিত উপন্যাসের পাঠককুল এই 'প্রথম প্রবাহ' উপন্যাসকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে আপন করে নিতে কোনও কার্পণ্য করেননি।
অবশেষে পড়লাম বহুল আলোচিত ও কিছুটা বিতর্কিত এই প্রাপ্তমনস্ক উপন্যাস। একে ঘিরে অসংখ্য পাঠপ্রতিক্রিয়া আর সমালোচনার ভিড়ে নিজের নাম আর যোগ করতে চাই না। শুধু বলব এখনো পড়া না থাকলে শুরু করে দিন। সৌরভবাবুর কলমের যাদুতে কখন শেষপাতায় পৌঁছে যাবেন, টের পাবেন না। পড়ার সময় গল্পের সত্যতা বা ঘটনাপ্রবাহের ন্যায্যতা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগবে আমার মতো। কিন্তু লেখক এক অসাধারণ কৌশলে যবনিকা পতন করেছেন শেষে, সব প্রশ্নের উত্তর সেখানেই পেয়ে যাবেন।
বই ~ প্রথম প্রবাহ লেখক ~ সৌরভ মুখোপাধ্যায় প্রকাশক ~ মিত্র ও ঘোষ ফর্ম্যাট ~ হার্ডকভার প্রচ্ছদ ~ ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য পাতার সংখ্যা ~ ১৭৫ মুদ্রিত মূল্য ~ ২০০ টাকা
মহাভারতে যে প্রবাহ চলেছিল অষ্টাদশ পর্ব ধরে, বা আজও চলছে, তার প্রথম প্রবাহ আজ প্রত্যক্ষ করলাম। দেবব্রত শেষ পর্যন্ত যে সত্যবতী মধ্যেই তার হারানো মাকে খুঁজে পেল সেটাও প্রত্যক্ষ করা গেল। আর দেখা গেল ইতিহাসের চাকাকে জোর করে ঘোরাতে গেলে, চাকাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কাল নয়। কাল তার নিজের অমোঘ নিয়মেই ঘুরে চলে। মহান কুরু বংশ যার শুরুও একটা ভুল থেকেই। সেটা আস্তে আস্তে একটা সমরাঙ্গন তৈরি হয়ে গেল।
এই লেখক বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে এই বই টিকে ধরাই যেতে পারে। মহাভারতের প্রারম্ভিক ঘটনাকে যে দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যে মুন্সিয়ানার সঙ্গে উনি লেখনীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন তা অনবদ্য। উচ্চমানের সাহিত্য যারা পছন্দ করেন তাদের জন্য অত্যন্ত সুখপাঠ্য।
প্রথম প্রবাহ উপন্যাসটি সৌরভ বাবুর দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস। এটিতে মহাভারতের আদি পর্বের গল্পটিকে নতুন প্রাপ্তমনস্ক রূপে উপস্থাপিত করা হয়েছে। এই উপন্যাসের সূত্রধর গজানন ও বেদব্যাসের কথোপকথন। এটিতে প্রধানত বর্ণিত হয়েছে সত্যবতী ও দেবব্রতের মনস্তাত্বিক ক্রীড়া বা দ্বন্ধ যা মহাভারতের মূলগতি পথ বারবার পরিবর্তন করে গিয়েছিলো। আমার পড়ে বেশ ভাল লেগেছিলো।
এই উপন্যাস পড়লে সর্বপ্রথম যে কথাটা মাথায় আসে তা হলো "মহাভারতের" ব্যাপ্তি ... এত বছর পরও মানুষকে ভাবাচ্ছে এবং লেখার উপাদান যুগিয়ে যাচ্ছে.. ভীষ্মকে এখানে নায়কের চরিত্র দেওয়া হয়েছে...তিনি মানুষ থেকে মানুষ-উত্তর চরিত্রে উন্নীত হয়েছেন তার ত্যাগ ও তিতিক্ষার জন্য...কিন্তু মূল কাহিনীর গতি নির্ধারণ করছেন একজন নারী চরিত্র-সত্যবতী..নিয়তির বাধা ভেঙে যিনি ইতিহাসকে নিজের খুশি মতো চালিত করছেন এই উপন্যাসে..তার প্রতিশোধের আগুনে ছারখার হয়ে যাচ্ছেন ভীষ্মের মতো মহামতি
উপন্যাসটি লেখকের কল্পনার ও তার লেখার কায়দায় অবশ্য পাঠ্য হয়ে উঠেছে... তবু দুটি কথা বলতেই হয় একটি তারা কেটে নেওয়ার কৈফেয়ৎ স্বরূপ 1>বিষয়বস্তু ভীষণ সম্ভাবনাময় ছিল তাই আমি আরেকটু বেশি আশা করেছিলাম..কাহিনীর যেনো মাঝখানেই ছেদ পড়েগেলো..সত্যবতী ও ভীষ্ম এক ছাদের তলায় ছিলেন বহু বছর সে ক্ষেত্রে তাদের কথোপকথনে আরেকটু কল্পনার রং কি লাগানো যেত না...কারণ প্রত্যাশা অনুযায়ী খুব একটা বেশি কিছু পেলাম না... 2>যৌনতা এর এক অবিচ্ছেদ্দ অঙ্গ তাই তাকে বাদ দেবার প্রশ্নই উঠতেপারে না...কিন্তু এতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কি প্রয়োজন ছিল
শেষে অবশই বলবো যারা এখনও পড়েন নি, তারা অবিলম্বে ত্রুটি-সংশোধন করুন...
প্রায় বছর খানেক ধরেই পড়ার ইচ্ছে ছিল। তারও আগে বই আউট অফ প্রিন্ট থাকায় বইই জোগাড় হচ্ছিল না। নতুন বই হতে পেয়েও ধুলো খেল কত দিন। অবশেষে শুরু করেই শেষ করে ফেললাম অসাধারণ এই উপন্যাস। কথক কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, লিপিকার লম্বোদর, গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম আর এই উপন্যাসের নায়িকা সত্যবতীর কী অদ্ভুত চরিত্রচিত্রণ। রেশ থেকে যাবে বহুদিন।