১৯৩৪ সালের ১৯ আগস্ট বাগেরহাটের গোটাপাড়া মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন আবুবকর সিদ্দিক। পিতার চাকরিসূত্রে ১৯৩৫ থেকে হুগলি শহরে এবং ১৯৪৩ থেকে তিনি বর্ধমানে বসবাস করেন। সাতচল্লিশের দেশভাগের পরের বছর তাঁরা স্বদেশে ফিরে আসেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে মাধ্যমিক, বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজ থেকে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে উচ্চমাধ্যমিক এবং একই কলেজ থেকে ১৯৫৬-তে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
আবুবকর সিদ্দিক মূলত কবি। কিন্তু তাঁর কবিসত্তা অত্যন্ত সচেতনভাবে কথাশিল্পীসত্তার ওপর প্রভাব আরোপ করা থেকে বিরত থাকতে পেরেছে। আবুবকর সিদ্দিকের গল্পগ্রন্থের সংখ্যা দশ। ভূমিহীন দেশ (১৯৮৫), চরবিনাশকাল, মরে বাঁচার স্বাধীনতা, কুয়ো থেকে বেরিয়ে, ছায়াপ্রধান অঘ্রান, কান্নাদাসী, বামাবর্ত, মুক্তিলাল অভ্যুদয়, কালোকুম্ভীর, হংসভাসীর তীওে (২০০৮)। লেখকের উপন্যাসসমূহ হলো: জলরাক্ষস (১৯৮৫), খরাদাহ, একাত্তরের হৃদয়ভস্ম, বারুদপোড়া প্রহর (১৯৯৬)। এসব গল্প ও উপন্যাসে বিষয়ের বহুমাত্রিক বিন্যাস কথাশিল্পীকে সমকালীন অন্যান্য কথাসাহিত্যিক থেকে স্বতন্ত্র করে দিয়েছে।
তাঁর কবিতার জগৎ বিষয়বৈচিত্র্যে ও ক্রম রূপান্তরে ঋদ্ধ। প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে থেকে শুরু করে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু পর্যন্ত অনেক কবির ব্যক্তিগত সান্নিধ্যে এসেছেন তিনি। তবে কারও দ্বারা প্রভাবান্বিত হননি। তাঁর কবিতার ভাষা, উপমা, চিত্রকল্প, প্রতীকের রয়েছে স্বতন্ত্র মেজাজ।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পরপরই শুরু হয় তাঁর শিক্ষকতা পেশা। পর্যায়ক্রমে তিনি চাখার ফজলুল হক কলেজ, দৌলতপুর বিএল কলেজ, কুষ্টিয়া কলেজ, বাগেরহাট পিসি কলেজ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এরপর কুইন্স ইউনিভার্সিটি এবং ঢাকার নটর ডেম কলেজে অধ্যাপনারত ছিলেন।
সাহিত্যে অবদানের জন্য আবুবকর সিদ্দিক ভূষিত হয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ কথাশিল্পী সংসদ পুরস্কার, ঋষিজ পদকসহ দেশি-বিদেশি বহু পুরস্কার ও সম্মাননায়।
এত ক্ষুদ্র সময়কে এতটা বিস্তৃত ভাবের মাধ্যমে বর্ণনা করতে হলে হিম্মত লাগে। ভাষার সাথে ভাবের অভূতপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে বলতেই হবে। বন্যাদুর্গত অঞ্চলের এত অসাধারণ শেষ কোথায় পড়েছিলাম মনে নেই। একটানা পড়ে ফেলার মতো দারুণ লেখনী।
দক্ষিণবঙ্গবাসী ভাগ্যের দোষ(!) দিয়ে থাকলেও মূলত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এ তল্লাটের জনপদের কাছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতি পরিচিত ঘটনা। তেমনই এক দুর্যোগ ঘিরে জলরাক্ষসের প্রেক্ষাপট। দুর্যোগকালীন মানুষের দুর্দশা, মতিভ্রম, মনুষ্যত্ব বিসর্জনের করুণ কাহিনি খুব দক্ষতার সাথে ফুটে উঠেছে এ গল্পে। লেখকের মোহনীয় গদ্যে মনে হতে পারে দুর্যোগের ওই রাতে পাঠক স্বয়ং উপস্থিত ছিল সেখানে, দেখেছে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি এবং মানুষের নিদারুণ দুর্দশা।
অতি অনালোচিত চমৎকার এ বইটা পড়তে পেরে আনন্দিত বোধ করছি।
আবুবকর সিদ্দিকের ‘জলরাক্ষস’ উপন্যাস প্রাকৃতিক দুর্যোগ—ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস—এবং সেই দুর্যোগকে পুঁজি করে সুবিধাবাদী মানুষের শোষণের কাহিনি। দক্ষিণবঙ্গের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে গোনজোরালি ও জরিনের ট্র্যাজিক জীবনের মাধ্যমে শ্রেণিশোষণ, মানবিক অবক্ষয় ও প্রতিবাদের রূপ ফুটে উঠেছে। এখানে প্রকৃতির রাক্ষুসে খিদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের হাতে মানুষের নির্যাতন—রিলিফ পাচার, নারীর প্রতি লালসা ও ক্ষমতার অপব্যবহার। প্রকৃতি ও মানুষের এই দ্বিমুখী নিপীড়নের ভেতর দিয়ে লেখক মানুষের সংগ্রামকে মহৎ দেখালেও শেষ পর্যন্ত নিয়তির কাছে সবাইকে আত্মসমর্পণ করতে হয়। এই কাহিনিতে মানুষের ইচ্ছা বা কর্মের চেয়ে প্রাকৃতিক ও সামাজিক শক্তিই বড় হয়ে দেখা দেয়। নিয়তিবাদের (fatalism) বহুল ব্যবহারে লেখা এই উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন, সংগ্রামী মানুষের মৃত্যু আপাত দৃষ্টিতে আমাদের কাছে পরাজয় মনে হলেও তা বৃহত্তর মানবপ্রতিরোধের প্রতীক—মৃত্যুর মাঝেই রয়েছে ভবিষ্যৎ জাগরণের ইঙ্গিত।