Jump to ratings and reviews
Rate this book

ধুলোখেলা

Rate this book
কৃষিজমি-রক্ষা-আন্দোলনের ঝোড়ো ঘূর্ণিতে জড়িয়ে যায় কিংশুক। তমালকে টেনে নেই টেবিল । চারপাশে আরো অনেক মুখের মিছিল। প্রেমে-অপ্রেমে-হর্ষে-বিষাদে সবাই ভাসছে-ডুবছে সেই অতল এবং বহুবর্ণিল তরঙ্গমালায়- যার নাম জীবন। ধুলো থেকে উঠে এসে ফের ধুলোয় মিশে যাওয়া- এটুকু মাত্র জীবন?

149 pages, Hardcover

Published January 1, 2014

2 people are currently reading
31 people want to read

About the author

Sourav Mukhopadhyay

50 books44 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
4 (21%)
4 stars
8 (42%)
3 stars
5 (26%)
2 stars
1 (5%)
1 star
1 (5%)
Displaying 1 - 3 of 3 reviews
Profile Image for Preetam Chatterjee.
6,878 reviews371 followers
July 10, 2025
পত্রলেখা
প্রাপক: শ্রী সৌরভ মুখোপাধ্যায়
প্রেরক: প্রীতম চট্টোপাধ্যায়
স্থান: বেহালা
তারিখ: জুলাই, ১০, ২০২৫

প্রিয় সৌরভ দা,

নমস্কার।

‘ধুলোখেলা’ তৃতীয়বাবের মতো পড়ে শেষ করলাম ঠিক কাল রাতেই। বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত রকম সাড়া পড়ল। আজ সকালে হাতে এক কাপ গরম চা, জানালার ধারে বসে, বাইরের ধুলোমাখা পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এই চিঠিখানা লিখতে বসা। কে বলবে উপন্যাসের নাম ‘ধুলোখেলা’! সৌরভবাবু, আপনার লেখা যেন ধুলোর মাঝেও রৌদ্রের গন্ধ—অদৃশ্য, অথচ অনিবার্যভাবে উপস্থিত।

এই চিঠি নিছক পাঠ প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একধরনের পাঠান্তিক প্রতিধ্বনি। একে অনুভূতি বললেও ঠিক পুরোটা বলা যায় না, এটি একরকম মানসিক বিপ্লব—ধুলোতে গড়িয়ে গড়িয়ে ওঠা এক ছায়াচিত্র, যেখানে প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি ক্ষয় অথবা প্রত্যয় আমার ভেতরটাকে হালকা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।

শুরুতে ভেবেছিলাম, আপনার ইনবক্সে ছোট্ট করে একটা “ধন্যবাদ” লিখে দায়িত্ব শেষ করব, কিন্তু না... এমন কিছু বই থাকে—যেগুলো শুধু পড়া যায় না, সেই বইগুলো পাঠকের ভেতরে হেঁটে বেড়ায়, প্রশ্ন তোলে, নিজের চেনা অভ্যাসগুলোকে নাড়িয়ে দেয়। ‘ধুলোখেলা’ তেমন এক বই। এই বইয়ের লেখককে চুপিচুপি পাশ কাটিয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

বিপ্লব আর স্বপ্নের নামধারণে যে নান্দনিক বলিষ্ঠতা থাকে, আপনার উপন্যাসে তার প্রকাশ অনবদ্য। কৃষিজমি স্থানান্তরের অস্থিরতায় গড়ে ওঠা একটি নির্লিপ্ত স্বপ্নের ক্যানভাস। যেখানে সাধারণ মানুষের রক্ত দিয়ে আঁকা হয় "পরিবর্তন", অথচ সে পরিবর্তন কোনোদিন সম্পূর্ণ হয় না। একমুঠো স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখা ছাড়া কিছুই তাদের হাতে আসে না। কিংশুক সেই চেষ্টাই করেছিল—তার একাকীত্বে, তার জেদে, তার আপোষহীন ভালোবাসায়—কিন্তু অশেষ চেষ্টা সত্ত্বেও আমরা যেন বারবার অনুভব করি, লড়াইটা ঠিক পথেই চলেছে কিনা তা কেউ জানে না।

তমালের মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম খানিকটা। আপনার কলমে ওর জীবন যেন একটা পরিস্রুত আত্মজৈবনিক খসড়া হয়ে ওঠে—একজন ক্লান্ত, গুটিয়ে রাখা স্কুলশিক্ষক যে কাগজে কলমে নিজেকে গড়তে চায়। তমালের সেই “স্বপ্ন ও সাহিত্যের প্রতিবিম্ব” হয়ে ওঠা পথটা আমার কাছে বিশেষ করে স্পর্শকাতর হয়ে ধরা দিল। নিজের অস্তিত্বকে চিনে নেওয়ার যে লড়াই, তার ভাষ্য রচনার চেষ্টা, তার ব্যর্থতা, তার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে সে এক অন্যরকম নির্মাণ।

আর আপনার চরিত্রদের মানসিক গতিপ্রকৃতি? যেন প্রতিটি মানুষ একেকটা ছায়া। সম্পর্ক, অপ্রেম, হর্ষ, বিষাদ, দ্বন্দ্ব, হতাশা—মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার এমন ঘনসন্নিবিষ্ট বিন্যাস আজকাল বাংলা সাহিত্যে খুব কম দেখি। ‘ধুলোখেলা’ সেই ঘোর লাগা বাস্তবতার রঙে লেখা, যেখানে চরিত্রেরা হেরে গিয়ে জিতে যায়, আবার জিতে গিয়েও কোথাও শূন্যতায় হারিয়ে যায়। জীবন এখানে কোনও সাদা-কালো binary নয়, বরং আবছা ছায়ায় মাখা অস্থায়ী রূপরেখা।

একেকটা চরিত্র একেকটা ধুলোর গন্ধ বয়ে আনে। তরুলতার দাঁড়িয়ে থাকা, নৈঋতার দ্বন্দ্ব, রাকার ছিন্নদৃষ্টি, উন্মেষের বোহেমিয়ানি, তিমিরের নির্মম বাস্তবতা—সব মিলিয়ে আপনার উপন্যাসটি যেন আমাদের চারপাশে ভেসে থাকা চেনা-অচেনা মানুষদের মনস্তত্ত্বের টালমাটাল উপস্থাপনা।

আপনার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বোধহয় এই যে, আপনি চেনা পাত্রে ভরেছেন অচেনা আলো। গল্প বলার কোনও আড়ম্বর নেই, নেই সচেতন নাটকীয়তা, বরং একটি গদ্যতরঙ্গ—যা ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে পাঠকের মনে ঢেউ তোলে।

‘ধুলোখেলা’ শেষ করে মনে হল—বইটি কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, এটি একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক আত্মজিজ্ঞাসার দলিল। রাজনীতি এখানে একটা প্রেক্ষাপট, কিন্তু প্রশ্নগুলি বৃহত্তর—জীবন কী, পরাজয় মানে কী, অস্তিত্বের অর্থ কোথায়, আর কীভাবে একজন মানুষ অন্তর্গত ধ্বংস থেকে নিজেকে রক্ষা করে?

আপনার লেখার সৌন্দর্য ঠিক এইখানেই—একটা পুরনো কথা আবার বলছেন, কিন্তু এমনভাবে বলছেন যেন আগে কখনও শোনা হয়নি। কোনও "হাজার ভোল্টের স্পার্ক" নেই, অথচ ধীরে ধীরে অনুভব করলাম—এই আলোয়ও জ্বলে ওঠা যায়, এই আলোগুলোরও প্রয়োজন ছিল।

সৌরভ দা, উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল — এটা কাহিনি নয়, যেন জীবনের অন্তর্গত কম্পন কেউ সহসাই শুনে ফেলেছে। কেউ গল্প বলেনি এখানে, কেউ বিশ্লেষণও করেনি — বরং কেউ যেন কানের কাছে এসে ধীরে ধীরে বলে গেছে "এই তো, এভাবেই তো হেরে যাওয়া যায় না!" প্রথম পাতায় ছিল একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙনের ছায়া, আর শেষ পৃষ্ঠায় এক চিলতে প্রতিরোধ। মাঝখানে ছিল অগুনতি মানুষের, মনস্তত্ত্বের, সময়ের লক্ষাধিক স্তর।

তরুলতা দেবীর অনমনীয়তা, কিংশুকের নির্জনতায় জন্ম নেওয়া প্রতিবাদ, তমালের নিঃশব্দ লেখার খাতা, উন্মেষের আত্মবিক্ষিপ্ততা কিংবা রাকার অব্যক্ত প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে যেন এক আভ্যন্তরীণ ভূমিকম্পের উপন্যাস, যার প্রত্যেকটা পাতায় মানুষের ব্যর্থতা আর প্রত্যয়ের খেলা। ধুলোর স্তরে স্তরে আগুন জ্বলছিল, আপনি শুধু তা টের পাওয়ালেন।

আপনার এই উপন্যাসকে আমি বিশ্বসাহিত্যের পাঁচটি স্মরণীয় কাজের সঙ্গে তুলনা করেই পড়েছি। না, বিষয়বস্তু নয়—তুলনা করছি আত্মদর্শী প্রবাহ ও মনস্তাত্ত্বিক নিবিড়তায়, সেই অনন্য লেখাগুলোর সঙ্গে যেগুলো মানুষের অন্তর্জগত, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতিকে একই ক্যানভাসে আঁকতে পেরেছে।

প্রথমেই থাকবে The Brothers Karamazov — Fyodor Dostoevsky। যেভাবে দস্তয়েভস্কি পরিবার, বিশ্বাস, ঈশ্বর, বিবেক, হিংসা, ভালবাসা আর মৃত্যুর উপরে তিন ভাইয়ের মাধ্যমে একটা মরাল ফিলোসফি বুনেছিলেন, তেমনই ‘ধুলোখেলা’য় আমরা দেখতে পাই এক পুরোনো বাড়ির ছায়ায় চার-পাঁচটি চরিত্রের মাধ্যমে জীবনের বহুস্তরীয় জিজ্ঞাসা। কিংশুক আর ইভান করামাজভ, উভয়েই আত্মসন্দেহ আর ন্যায়বোধের যন্ত্রণায় পোড়ে।

এরপর A Fine Balance — Rohinton Mistry। মিস্ত্রির উপন্যাসেও যেমন দেখা যায় স্বাধীনতার পরবর্তী ভারতের বঞ্চিত মানুষের সংগ্রাম ও স্বপ্নভঙ্গ, ‘ধুলোখেলা’ তেমনই প্রান্তিকতা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে পিষ্ট মানুষের একটি দলিল। জমি রক্ষা আন্দোলনের অব্যর্থ রাজনীতি, রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি—সবটাই এক সাহসী টোনে বলা।

থাকবে The Grapes of Wrath — John Steinbeck। স্টেইনবেকের জোড পরিবার যেমন মহামন্দার সময় কৃষিজমি হারিয়ে রাস্তায় নামে, সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসেও ঠিক সেই ধরনের অচলায়তনের বিরুদ্ধে মানুষ হয়ে ওঠার প্রয়াস দেখতে পাই। ‘ধুলোখেলা’ তার মাটির ঘ্রাণ নিয়ে এক আধুনিক ভারতীয় প্রতিধ্বনি।

চার নম্বরে রইবে To the Lighthouse — Virginia Woolf। আপনার লেখার মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্জিজ্ঞাসা ও সময়ের অস্থিরতা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে উলফের স্ট্রিম-অফ-কনশাসনেস পদ্ধতিকে। একটা ক্ষীণ গতি—কিন্তু তাতে লুকিয়ে থাকে টানটান মানসিক উত্তেজনা। রাকা, নৈঋতা, এমনকি অদিতির দৃষ্টিভঙ্গি যেন সময়কে নিজের মতো ছেঁচে নেয়।

আর সব শেষে থাকবে Seethakaathi (Tamil novel & film analogy)। একজন মানুষ কীভাবে শিল্প বা ন্যায় রক্ষায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়, সেই আখ্যানকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে কিংশুক চরিত্রটি। কিংশুক ঠিক রঙ্গমঞ্চে নেই, কিন্তু সে একেবারে জীবনের প্রান্তস্থলে দাঁড়িয়ে রক্তে লিখে চলে এক মৌন প্রতিবাদ।

‘ধুলোখেলা’ সেই বিরল বইগুলোর মধ্যে পড়ে যা চুপচাপ হাঁটে, কিন্তু পায়ের শব্দ থেকে যায়। যে লেখক চরিত্রদের গায়ে ধুলো মেখে তাদের চলতে দিতে জানেন, যিনি বোঝেন জীবন গল্প নয়, একটা গলিপথ—সেই লেখকই লিখতে পারেন এমন উপন্যাস। সৌরভ দা, আপনি সেটাই লিখেছেন। ধুলোখেলা পড়া মানে শুধু এক উপন্যাস পড়া নয়—এ যেন নিজের মুখোমুখি বসে পড়া।

এবং আমি নিশ্চিত, সময় যত যাবে, এই বই আরও জ্বলে উঠবে—নীরব অথচ অনড় একটা আলো হয়ে।

‘ধুলোখেলা’-র চরিত্রেরা যেন কাগজে আঁকা নয়, ধুলোর রাস্তা ধরে হেঁটে চলা রক্তমাংসের মানুষ — যাদের রক্তে জ্বলে ওঠে আদর্শ, সম্পর্ক, এবং অস্তিত্বের রণক্ষেত্র। তাদের মধ্যে কিংশুক চট্টোপাধ্যায় এমন এক চরিত্র, যাকে মনে হয় জীবন নিজের হাতে গড়ে তুলেছে। একেবারে সাধারণ ঘরের ছেলে, কিন্তু তার ভিতরে গেঁথে বসে আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়ার এক পরিশুদ্ধ আদর্শ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠরুমে তার যাত্রা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত সেই পথ গিয়ে মেশে জমি রক্ষা আন্দোলনের খরস্রোতায়। বিপ্লবী মানুষ হওয়া যে কেবল মিছিল আর পতাকার কথা নয়, তা কিংশুককে দেখলেই বোঝা যায়। ঠিক যেমন The Iron Heel-এর আর্নেস্ট এভারহার্ড প্রথমে নিঃশব্দ আদর্শবাদী ছিলেন, পরে হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের মুখ। কিংশুকের মধ্যে একই সঙ্গে আছে হেমিংওয়ের সান্তিয়াগোর লড়াইয়ের জেদ—"মানুষ ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু হার মানে না", আবার আছে স্টাইনবেকের The Grapes of Wrath-এর জিম কেসির মতো কৃষিজীবী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ এক গভীর চেতনা।

তমাল চট্টোপাধ্যায়ের ছায়াও কম উজ্জ্বল নয়, বরং অন্য এক মায়াবী আলোয় দীপ্ত। তমাল নিঃসঙ্গ, অন্তর্মুখী, এবং এক নিঃশব্দ বিপ্লবের পথিক। স্কুল শিক্ষক হিসেবে তার জীবন যতই একঘেয়ে হোক, তার ভিতরে লেখা ও সাহিত্যের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ তাকে নতুনভাবে জীবনের মানে খুঁজতে শেখায়। এই অভ্যন্তরীণ সংগ্রামে কখনো সে জয়ী হয়, কখনো হার মানে। কিন্তু তার যাত্রাপথ একেবারেই আত্মজৈবনিক—এ যেন লেখকের নিজেরই কোনও এক ছায়া। এ দিক থেকে সে অনেকটাই জেমস জয়েসের স্টিফেন ডেডালাস, যে লেখালিখির মাধ্যমেই নিজের সত্তা নির্মাণে ব্রতী। কখনো কখনো সে মনে করিয়ে দেয় কাফকার গ্রেগর সামসাকে—যার অস্তিত্ব নিয়ে সমাজের সঙ্গে তার এক নিরব দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। আবার সল বেলোর Herzog–এর মতোই তমালও নিজের ভেতরের এক গোপন দুনিয়ায় ঢুকে গিয়ে লেখার মাধ্যমে আশ্রয় খোঁজে।

উন্মেষ এক অলীক বাস্তব। সে সাহিত্যের পরিধির বাইরের এক অদ্ভুত আলো। তার বোহেমিয়ান প্রবৃত্তি, প্রেমে বিশ্বাস, ও নিজের প্রতি এক নির্ভার আত্মসম্মান তাকে অদ্বিতীয় করে তোলে। এমন একটি চরিত্র, যার উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয় স্যালিনজারের হোল্ডেন কলফিল্ডকে—এক অসামান্য ভাঙনের ভিতরেও যে নিঃস্ব হয় না। কিংবা স্কট ফিট্‌জেরাল্ডের The Great Gatsby-এর গ্যাটসবির মতো, উন্মেষের প্রেমও নীরব, অতীতমুখী, এবং তার অন্তর্গত বিস্ময় এক করুণ দৃশ্যে এসে ফুরোয়—ভিক্টোরিয়ার ফোয়ারায় এক নিঃশব্দ হেঁটে যাওয়া। পাঠকের গলায় কাঁটার মতো আটকে থাকে এই বিদায়।

উপন্যাসের হৃদয় অবশ্যই তরুলতা। তিনি মাটি, মা, এবং মৌলিকতাকে নিজের শরীরের ভিতরেই ধারণ করে আছেন। সন্তানদের হিসেবি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক অনড় প্রতিবাদ তিনি—যার মধ্যে একইসঙ্গে রয়েছে Beloved-এর সেথের আদর্শময় মাতৃত্ব ও A Doll’s House-এর নোরার মতো নিজস্ব সত্যের সন্ধান। জমি বাঁচানোর লড়াইয়ে তাঁর উপস্থিতি যে কেবল কাহিনির পটভূমি নয়, বরং কিংশুকের আদর্শিক ভিত্তির স্থপতিও বটে।

নৈঋতা এবং রাকা, এই দুই নারীচরিত্র যেন একে অপরের ছায়া হয়েও আলাদা আলাদা পথ ধরে হাঁটে। নৈঋতার প্রেমে ভাঙন আছে, বিশ্বাস আছে, আর আছে নিজের ভিতর থেকে নতুন করে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। এলিজাবেথ বেনেটের মতো তারও আত্মসম্মানের সঙ্গে প্রেমের টানাপোড়েন চলে, আবার সিলভিয়া প্লাথের এসথারের মতো তার মধ্যে একটা গভীর সত্তার সন্ধান চলে। রাকা তার বিপরীতে শান্ত, একরোখা, ধীরগতির আগ্নেয়গিরির মতো। বাইরে থেকে নিরীহ, কিন্তু ভিতরে প্রচণ্ড শক্তি। সাহিত্যে এমন মেয়ে চরিত্র আজকাল বিরল, যারা ভালোবাসার বাইরে থেকেও নিজেকে গড়ে তোলে, ঠিক যেভাবে এসথার নিজেকে তোলেন ছেঁড়া পরিচয়ের ভেতর থেকেও।

তিমির চট্টোপাধ্যায়, উপন্যাসের একমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিকৃতি। দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও একরকম প্রান্তিক। সে কখনো ঠুনকো, কখনো ভয়ংকর, আবার কখনো যেন করুণ। মিলে যায় উইলি লোম্যানের সঙ্গে, যিনি নিজেকে অনেক কিছু ভেবে এসেছিলেন কিন্তু শেষে জীবনের কাছে হেরে যান। অথবা টু দ্য লাইটহাউস-এর মিস্টার র‍্যামসের মতো, যিনি কর্তৃত্ব আর করুণার মাঝখানে দুলতে থাকেন।

‘ধুলোখেলা’ আদতে হোমারিক কোনও মহাকাব্য নয়, বরং একটি মানবিক অন্তর্দৃষ্টির গভীর নকশা। এখানে চরিত্রেরা লড়াই করে বীরত্বের খোলসে ঢুকে নয়, বরং ভেতরের টানাপোড়েন, ভালবাসা, বিশ্বাস আর অস্তিত্বের প্রশ্নে। তাদের পথচলার তুলনা করা যায় বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ চরিত্রগুলোর সঙ্গে—তাদের লড়াইয়ে, ব্যর্থতায়, কিংবা দীপ্তিতে। সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের লেখা কেবল বাংলা সাহিত্যের অন্দরেই সীমাবদ্ধ নয়, এই উপন্যাস বৃহত্তর মানব সাহিত্যের পরিসরে অনায়াসে নিজের জায়গা করে নেয়।

আর আপনি—আপনি নিজেই উপস্থিত আছেন সৌরভ দা, তমালের 'ক্লান্ত-কিন্তু-কী-বলবো' অভিব্যক্তিতে, উন্মেষের 'বিদায়-ছায়ায়', কিংশুকের 'রক্তচাপা উচ্চারণে'। আপনি সেই লেখক, যিনি পাঠককে ‘ধুলো’তে ফের ডুবিয়ে দিয়ে বলেন—“এই তো জীবন... এবার হাঁটো।”

তবে সবচেয়ে বেশি যেটা আপনাকে কুর্নিশ জানাতে চাই, তা হল—আপনার অভূতপূর্ব সংযম। এই উপন্যাসে কোথাও একফোঁটাও বাড়াবাড়ি নেই। নেই চটকদার বাক্যে চমক জমানোর চেষ্টা, নেই অকারণে জিগির তোলা কোনও অলঙ্কার। আপনার কলম জানে, কখন থামতে হয়—যতটা দরকার, ঠিক ততটাই। ভাষা এখানে বাহুল্যের নয়, বোধের বাহক। চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সংলাপ, বর্ণনা, এবং সংবেদন—সবই এমনভাবে নির্ঝর বয়ে গেছে যেন লেখকের একান্ত সাধনার ফল।

আপনার লেখায় বারবার মনে হয়েছে, আপনি পাঠকের বোধকে সম্মান করতে জানেন। পাঠককে কিছু না বুঝিয়ে গিলিয়ে দেওয়ার কোনও তাড়াহুড়ো নেই। বরং আপনি বরাবর বিশ্বাস রেখেছেন সেই প্রাচীন সাহিত্যিক সূত্রে—

“Brevity is the soul of wit.” — William Shakespeare, Hamlet অর্থাৎ, সংক্ষেপই মেধার আসল প্রকাশ।

আরও মনে পড়ে Antoine de Saint-Exupéry-র সেই বিখ্যাত বাণী— “Perfection is attained not when there is nothing more to add, but when there is nothing more to take away.”

‘ধুলোখেলা’-তে এই মেজাজ স্পষ্ট। আপনি গল্পকে সাজিয়েছেন যত্নে, কিন্তু অতিরিক্ত সাজে ভারী করে তোলেননি। অনেকেই গল্পের শরীরে অলংকার চাপাতে গিয়ে আত্মাকে ভুলে যান—আপনি সেটা করেননি। আপনি যে লেখার শিল্পে "প্রত্যাহার"–এর সৌন্দর্যও কদর করেন, তা এই উপন্যাসে প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদেই বোঝা যায়।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই পরিমিতিবোধই একজন লেখকের শ্রেষ্ঠ গুণ বলে মনে করি। আমরা এক এমন সময়ে আছি, যেখানে তথ্যের আধিক্য আর বাক্যের বাহারে লেখালেখি প্রায়শ ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে। সেখানে ‘ধুলোখেলা’ এক অভূতপূর্ব ব্যতিক্রম—যা গতি ও গভীরতার ভারসাম্যে অনন্য।

এই পরিমিতি, এই সংযম—এই হল সেই আত্মনির্ভরতা যা সাহিত্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে। এবং আপনি এই গুণে, নিঃসন্দেহে, আমাদের সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কথাকার হয়ে উঠেছেন।

আপনার উপন্যাসে জমি আন্দোলন এসেছে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এসেছে, দলাদলি এসেছে, কিন্তু আপনি কিচ্ছুটি চেঁচাননি। বরং ভেতরের যন্ত্রণার মতো, আপনার প্রতিবাদটাও নিঃশব্দে। ঠিক যেন মাঠের ধারে সন্ধে নামা, যেখানে কেউ চেঁচিয়ে বলে না ‘রাত হচ্ছে’, অথচ আলো নিভে আসে—ধীরে ধীরে, অনিবার্যভাবে। এই শিল্প আপনার আছে।

সৌরভ দা, আর একটা কথা না বললেই নয়। আজকাল সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করলেই কেউ না কেউ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে বসেন—“এখন আর রাজনৈতিক উপন্যাস কেউ লেখে না”, “আধুনিক লেখকেরা সমাজব��চ্ছিন্ন”—এমনই সব বকধার্মিক ভাষ্য। আমি তাঁদের বলি—‘ধুলোখেলা’ পড়ে দেখুন। এখানে কোনও দলদাসত্ব নেই, নেই বুলির বন্যা, নেই শ্লোগান-নির্ভর সাহিত্য। আছে মাটি ছোঁয়া জীবন, আছে চুপচাপ রক্তাক্ত হয়ে ওঠা জমি, আছে টানাপোড়েনের রাজনীতি, আর আছে একশোটা কিংশুকের মতো নির্ভীক তরুণ, যারা সময়ের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে।

এই উপন্যাসে রাজনীতি আছে, তবে মুখে নয়—মজ্জায়।

আপনার ‘ধুলোখেলা’ একেবারেই সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি, যা বিশ্বসাহিত্যে বড় রাজনৈতিক উপন্যাসগুলো রেখে গেছে। যেমন ধরুন—

১) George Orwell-এর 1984 — যেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা ঢুকে পড়ে মানুষের মগজে।

২) Ngũgĩ wa Thiong’o-র Petals of Blood — যেখানে স্বাধীনতার পরেও শোষণ পাল্টায় না, কেবল পোশাক বদলায়।

৩) Chinua Achebe-র Anthills of the Savannah — যেখানে বিপ্লবের নামে তৈরি হয় নতুন এক স্বৈরাচার।

৪) Arundhati Roy-এর The Ministry of Utmost Happiness — যেখানে রাষ্ট্র, লিঙ্গ, ধর্ম, কষ্ট—সব মিলিয়ে এক ব্যথিত ভারতবর্ষ।

এই সব উপন্যাসে রাজনীতি কোনও পরিপূরক প্রসঙ্গ নয়—এগুলো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের শিরায় শিরায় মিশে থাকে। আপনি *‘ধুলোখেলা’*য় ঠিক সেই জিনিসটাই করেছেন, তবে নিজের ভাষায়, নিজের শহরে, নিজের কাঁদা মাখা জমিতে দাঁড়িয়ে।

আপনার উপন্যাসে তৃতীয় চিন্তা-র মতো আন্দোলনগুলোর রাজনৈতিক রূপান্তর, আদর্শের অবক্ষয়, এবং সেই ছেঁড়া কাগজে লেখা স্বপ্ন—সব একাকার হয়ে গেছে। আবার তা এমনভাবে বলছেন, যেন পাঠক একদিন নিজের চোখেই সেই সভায় ছিল, কিংবা সেই মিছিলে হাঁটছিল... আর তারপর সন্ধের ট্রামে বাড়ি ফিরছিল হতাশ চোখে।

‘ধুলোখেলা’ আসলে প্রমাণ করে দেয়—রাজনৈতিক উপন্যাস এখনও লেখা হয়। এবং তা এমনভাবে লেখা যায়, যেখানে কোনও বুলির গন্ধ নেই, কেবল মানুষের কথা আছে।

এই উপন্যাস শব্দে নয়, চিন্তায় রাজনৈতিক।

এবং, একেবারেই বিশ্বমানের।

আপনার কাছে একটা অনুরোধ রইল, সৌরভ দা—উন্মেষকে নিয়ে কখনও আলাদাভাবে কিছু লিখবেন কি? একটা উপন্যাস নয়, হয়তো একটা উপন্যাসিকার মতো, অথবা শুধুই তার চোখ দিয়ে দেখা কোনও লম্বা চিঠি, একটা ডায়েরির পাতা, একটা স্বগতোক্তি... যেভাবেই হোক, ওর কাহিনি অসম্পূর্ণ রয়ে গেল বলে মনে হয়। আর এই অপূর্ণতাটুকুই এত তীব্র, এত আত্মমগ্ন, যে তা পাঠকের মনে ছায়ার মতো আটকে থাকে।

কেন উন্মেষ? কারণ, উন্মেষ এই উপন্যাসের কোলাহলবর্জিত একাকী সুর। ও আছে, অথচ নেই। ও আসে, আবার সরে যায়। কিন্তু এই আসা-যাওয়ার ভেতরে যে সত্তার আলো জ্বলে, তা নিভে যায় না উপন্যাস শেষ হলেও।

উন্মেষকে ভালো লাগে কারণ:

১) সে সরল—আজকের সাহিত্যে যেখানে প্রত্যেক চরিত্র যেন একেকটা থিসিস হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে উন্মেষ প্রায় ক্লাসিকালের মতো সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত, মানবিক।

২) সে আস্থাবান—নৈঋতার প্রেমে ওর একরোখা আস্থা, একরকম দুর্ভাগ্যজনিত অবিশ্বাসের যুগে দাঁড়িয়ে এক পরম নির্ভরতার নাম। আজকের সাহিত্যে এ রকম বিশ্বাস অচিরেই ক্লিশে হয়ে ওঠে, কিন্তু আপনি সেটা হতে দেননি।

৩) সে বোহেমিয়ান, অথচ ভীষণ ‘বাস্তব’—ওর কাছে জীবনের লক্ষ্য কোনও স্থির পাথরের মত কিছু নয়, ওর জীবন নৌকার মত—ভাসে, ডুবেও না। কিন্তু এই ভেসে যাওয়া, এই দিকহারা অস্তিত্বের মধ্যেই আমরা দেখি এক আশ্চর্য প্রজ্ঞা, এক নির্লোভ অনুভব।

৪) সে শিল্পমনস্ক, অথচ বিপ্লবী নয়—উন্মেষ বিপ্লবের ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে মেগাফোন হাতে স্লোগান তোলে না। কিন্তু সে কারও পাশে দাঁড়াতে জানে, বিনা শব্দে। সে বিপ্লবের ‘আইকন’ নয়, কিন্তু মানবিকতার এক প্রমাণপত্র।

৫) তার প্রস্থান—ভিক্টোরিয়ার সেই শেষ দৃশ্য! পাঠক হিসেবে আমরা সবাই জানি, কেউ না কেউ চলে যাবে। কিন্তু উন্মেষের চলে যাওয়া যেন এক আত্মাভিসার... নিজের অজান্তেই ও পাঠকের নিজের কোনও পুরোনো বন্ধুর রূপ নিয়ে নেয়। এমন বন্ধু, যে হয়তো ভিড়ের মধ্যেই হারিয়ে গেছে, কিন্তু কোনও এক শীতের সন্ধ্যায় তার কথা মনে পড়ে, বুকের ভিতরটা ভার করে দিয়ে যায়।

আপনার উপন্যাসে অনেক চরিত্র ছিল, কিন্তু উন্মেষ যেন এক অনুচ্চারিত দার্শনিকতার প্রতিনিধি। ওর উপস্থিতি যেন একটা অক্ষত কবিতা—যার কিছু লাইন আমরা পেয়ে যাই, আর কিছুটা থেকে যায় পাঠকের নিজস্ব ব্যাখ্যার জন্য।

তাই বলছি দাদা, উন্মেষকে ফিরিয়ে আনুন। ওর গল্প এখনও বাকি আছে—হতে পারে তার কোনও বিছিন্ন ভ্রমণ, হতে পারে সেই সময়ের একটা রেজিস্টার, হতে পারে কলেজে নৈঋতার সঙ্গে কোনও না-বলা কথা।

আপনি লিখবেন, আর আমরা খুঁজে নেব আমাদের হারিয়ে যাওয়া উন্মেষকে। এ উপন্যাসের মতোই, সে ফিরে আসবে ধুলো মেখে, আলো ছুঁয়ে।

চিঠিটা একটু দীর্ঘ হয়ে গেল, জানি। হয়তো খানিকটা এলোমেলোও। কিন্তু সৌরভ দা, সেই এলোমেলোটুকুই তো ‘ধুলোখেলা’-র প্রকৃত পাঠ-প্রতিক্রিয়া।

এই উপন্যাস কেবল একটা বেঁধে রাখা কাহিনি নয়—এ যেন একটা ধুলোর ঝাপটা, যা মনে জমে থাকা স্তব্ধতা উড়িয়ে দেয়। গায়ের উপর, আত্মার গায়ে বসে থাকা থিতিয়ে-যাওয়া ক্লান্তির ধুলো একদম ঝেড়ে ফেলে দেয়। এই ধুলো মানে ধ্বংস নয়, বরং উর্বরতার ইঙ্গিত—একটা নতুন ভাবনার জমি।

আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রইল, সৌরভ দা।

আপনার সংযম, সংলাপ, চরিত্র নির্মাণ—সব মিলিয়ে যা গড়েছেন তা কোনও তড়িৎচমক নয়, বরং ধীরে-জমে-ওঠা গভীরতা।
যার প্রভাব চট করে কেটে যায় না।

আপনার পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় রইলাম। এই সময়টাকে আমরা যে ধুলোখেলার মধ্য দিয়েই পার করে দিচ্ছি, সেই সময়ের ভাষ্য হোক আপনার কলমে।

আপনার পাঠক
প্রীতম চট্টোপাধ্যায়
বেহালা, শকুন্তলা পার্ক।

(পুনঃশব্দ: এই চিঠি কেবল মুগ্ধতার নয়, এটা কৃতজ্ঞতারও। কৃতজ্ঞতা—একটি সৎ, নির্ভীক, আত্মবিস্তারী উপন্যাসের জন্য। এমন উপন্যাসের জন্য, যা আমাদের আবার সৎ পাঠক করে তোলে।)
Profile Image for Mohana.
100 reviews8 followers
April 16, 2023
উপন্যাস শুরু হয় এক যৌথ পরিবারের মাথা সিতাংশুর শ্রাদ্ধের কাজ দিয়ে যেখানে পরিবারের বাকি মানুষেরা ঠিক করে তাদের আদি বাড়ি ভাগ করে ফ্ল্যাট তোলা হবে, প্রতিবাদ করেন তাদের সদ্য বিধবা, বৃদ্ধা মা তরুলতা। এরপর উপন্যাস গড়াতে থাকে এই পরিবারের প্রত্যেকের জীবনের গল্পকে নিয়ে। তবে মূল ফোকাসে থাকে কিংশুক ও তমাল। কিংশুক, যে কিনা একটি সাধারণ কলেজ ছাত্র, যার বাবা একরোখা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারী কর্মচারী, সে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে ভোগে, সে তার এই পৃথিবীতে উপস্থিতির কারণ খুঁজে পায় না। অন্যদিকে তমাল যে সারাজীবন কোনদিনই নিজের জীবনের কোনো মানে খুঁজে পায়নি শুধু সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হারতে হারতে হেঁটে চলেছে মাত্র, সেও বুঝে পায় না তার এই হতাশ জীবনের মানে কি। এরা দু'জনেই জীবনের পথে চলতে চলতে অবশেষে খুঁজে পায় দু'জনের উদ্দেশ্য। একজন নিজের জীবনকে নিয়ে যায় বাস্তবের বৈপ্লবিক রণক্ষেত্রে আরেকজন নিজের সবটুকু উজাড় করে লিখে ফেলতে থাকে পাতার পর পাতা।

বইটা পড়ার ইচ্ছা ছিল আমার অনেকদিনের। লাইব্রেরীতে যখন দেখি বইটা রয়েছে তখন আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করিনি। তবে বইটা পড়ে মিশ্র অনুভূতি হয়েছে।

প্রথমেই বলি, অনেকেই বলেন আজকাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো উপন্যাস লেখা হয় না তাদের প্রত্যেকের এই বইটা পড়া উচিৎ। আদিবাড়ি ভেঙে ফেলা, প্রমোটরের হাতছানি এসব তো আজকালকার জীবনে রোজকার ব্যাপার। তাই এই দৃশ্যগুলি পড়ার সময় মনেই হয় না যে বই পড়ছি, বরং মনে হয় বাস্তব দৃশ্য দেখছি। এই যে চরিত্ররা বারংবার নিজেদের জীবনের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করছে এটাও আমার কাছে ভীষণ রিলেটেবল। আমি এই প্রশ্নগুলো নিজেকে প্রায় রোজই করে থাকি। কিছু চরিত্রের গঠন, তাদের ব্যাপ্তি, তাদের যেভাবে লেখক গড়ে তুলেছেন তা আমার বেশ ভালো লেগেছে, তার সাথে ভাষার সাবলীলতা উপন্যাসটিকে আরো বাস্তবিক করে তুলেছে। উন্মেষের চরিত্রটির সাথে রিলেট করতে পারি অনেকটা।

এবার আসি যেটা ভালো লাগেনি সেই বিষয়ে, (কারুর খারাপ লাগলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী, এগুলি সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত মতামত)। উপন্যাসটা খুবই ধীর গতির। কিছু কিছু জায়গায় অতিরিক্ত বেশি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, এত বেশি প্রত্যেকটা দৃশ্য, প্রত্যেকটা জিনিস বর্ণনা করার, আমার মনে হয়েছে, কোনো দরকার ছিল না। এছাড়া মহিলা চরিত���রদের মধ্যে কেবলমাত্র বৃদ্ধা তরুলতা ও তৃতীয় চিন্তার দলে থাকা মেয়েগুলি ছাড়া, বাকিদের অর্থাৎ নৈঋতা, রাকা, তমালের স্ত্রী অনুশ্রী, অদিতি (অর্থাৎ যারা মূল ফোকাসে আছে) এদের প্রত্যেককে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা একজন মেয়ে হিসেবে আমার ভীষণ খারাপ লেগেছে। যদিও তৃতীয় চিন্তা দলে থাকা মেয়েদের চরিত্র নিয়ে বিশেষ বিবরণ নেই। নৈঋতা ও রাকা প্রেমের জন্য পাগল, তাদের কোনো একটি ছেলের সাথে জুড়ে দিতেই হবে, সেটা কখনো উন্মেষ, কখনো জয়জিৎ, কখনো দেবদত্ত, কখনো রাকার কেমিস্ট্রি টিউটর। একটা মেয়ের সম্পূর্ণ জীবন জুড়ে শুধুই প্রেম? তার জীবনের আর কোনো ব্যাপ্তি নেই? কোনো ইচ্ছা নেই? কোনো কিছু হয়ে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা নেই? শুধু প্রেম, শরীর, কামনা আর ভালোবাসা ব্যাস? আর শেষ মুহূর্তে এসে কান্না ব্যাস? অথচ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে কিংশুক, বিধান, তমাল, তীর্থ, উন্মেষ এদের চরিত্রের ব্যাপ্তি দেখলে মন প্রাণ জুড়িয়ে যায় এদের জীবনটা তো শুধুই প্রেম, ভালোবাসা, কামনায় আটকে নেই তাহলে মেয়েরাই শুধু এসবে আটকে আছে এমনটা দেখানোর কি মানে আমি জানি না। আবার অনুশ্রী ও অদিতি, দুই বিবাহিত মহিলা, কেবলই টাকা বোঝেন, নিজেদের আখেরটা গুছিয়ে নেন খালি, এটাও যথেষ্টই অপ্রীতিকর। তাদের কাছে তাদের স্বামীর ভালো থাকার কোনো মানে নেই? নিজেদের পরিবারের সদস্যদের কথা ভাবার কোনো অবকাশ নেই? এই একই লাইমলাইটে দেখানো হয়েছে কিংশুকের বাবা তিমিরকেও, কিন্তু তার একরোখা, বদমেজাজি, নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া গায়ে লাগে না কারণ তিনি ভেতরেও যা মুখেও তাই, অর্থাৎ তিনি যে খারাপ সেটা তিনি মুখেই বলেন এবং সেই খারাপকেও শেষে গ্লোরিফাই করা হয় ব্যর্থ বাবার হেরে যাওয়ার দৃশ্য দিয়ে। কিন্তু অদিতি ও অনুশ্রীকে দেখানো হয়েছে এমনভাবে যে তারা ভেতরে খারাপ কিন্তু মুখে একেবারে আদর্শ মেয়ে বা বউ। আমি বলছি না বাস্তবে এমনটা হয় না, হয়। কিন্তু প্রত্যেকটা চরিত্রকেই যদি এভাবে লেখা হয় তখন মেয়ে হিসেবে গায়ে লাগে। এখানে একটা লাইন আমি উল্লেখ করবো বইটা থেকেই -

দেবদত্ত বলছে নৈঋতা কে -
" আরে ধুর! বাইশ বছর পর্যন্ত একটা মেয়ে কোথাও কিচ্ছুটি করেনি, এটা আবার সম্ভব? তোমার সঙ্গে যদি আমার নার্সারিতে আলাপ হত, তবে হয়তো একটা চান্স ছিল ... যে হ্যাঁ, একেবারে ল্যাপাপোঁছা স্লেট এর মতো, এখনও খড়ির দাগ পড়েনি।..."

নৈঋতা বলছে "ডোন্ট ইউ ফিল জেলাস?"

উত্তরে দেবদত্ত বলছে, "অন দ্য কনট্রারি আই ফিল সিকিয়র্ড যে যাক বাবা এই মেয়ের হৃদয়বৃত্তি আছে।....সত্যিই যদি একটা বাইশ বছরের মেয়ে কখনও প্রেমে না পড়ে থাকে, কোথাও মন দেওয়া নেওয়া না করে থাকে, তবে সেই ব্রহ্মবাদিনী কিংবা আলুর বস্তাটিকে নিয়ে আমিই বা কি করব?"

ভীষণই মজার ভঙ্গিতে উপরের অংশটা হয়তো লেখা হয়েছে কিন্তু অত্যন্ত সৎভাবে জানাচ্ছি আমার মজা লাগেনি। একটি বাইশ বছরের মেয়ে কেন তিরিশ বছরের এমনকি তারও বেশি বয়সের মেয়েও প্রেম ভালোবাসা ও বিয়ে ছাড়া অবিলম্বে জীবন কাটাতে পারে, সেটা সম্পূর্ণ তার ইচ্ছা বা চয়েস, তার জন্য তাকে 'আলুর বস্তা' হতে হয় না। এই যে সুন্দরভাবে লেখক দেবদত্তকে একটা প্রায় ঈশ্বরের দূতের মতো পারফেক্ট চরিত্র করে নৈঋতার জীবনে আনলেন আর তারপর এরকম একটা অত্যন্ত নিম্নমানের ডায়লগ গুঁজে দিলেন তার মুখে তারপর আবার সেটাকে হাসির ছলে উড়িয়েও দিলেন নৈঋতার দ্বারা, এই পুরো ব্যাপারটা পড়ে আমার কোথাও যেন মনে পড়ে গেল 'এইজন্যই বোধহয় একমাত্র মহিলা চরিত্রদের পুরোপুরি জাস্টিস দিতে পারেন মহিলা লেখিকারাই'। নয়তো এরকম একটা সম্পর্ক বাস্তবে হলে সেই মেয়েটির জীবনই নষ্ট।

আরেকটা জায়গা উল্লেখ করছি বইটা থেকে,

"অদিতি জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে। প্রকৃতির শোভা দেখছে, না মুখেচোখে বিষন্নতা ফুটিয়ে রাখার প্রস্তুতি শুরু করেছে, ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না মনিশঙ্কর। অদিতি এই ব্যাপারটা বেশ পারে। যে কোনও শোকের পরিবেশে গিয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চকিতের মধ্যে বেশ মানানসই রকমের অশ্রুসিক্ত অভিব্যক্তি এনে ফেলার ক্ষমতা আছে ওর। ....."

এই অংশে অদিতি হচ্ছেন সিতাংশুর মেয়ে এবং মনিশঙ্কর তাঁর জামাই। একটা মেয়ের বিয়ের পর তার বাবা শেষ বয়সে যতই ভুগে থাকুক, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভিতর থেকে কোনো কষ্ট হবে না? তাকে মুখের উপর ফুটিয়ে তুলতে হবে তাৎক্ষণিক যন্ত্রণা? মহিলারা এতটা নিষ্টুর বা ক্রুর হয়ে উঠলেন কবে থেকে?

আরেকটি জায়গা বলি, এটা তিমির বলছেন একজন মেয়ে সম্পর্কে যে নিজের ট্রান্সফারের জন্য অ্যাপ্লাই করতে এসেছেন তার কাছে -

"কে তোমাকে এই ব্লক টু ব্লক ঠোক্কর খাওয়ার চাকরি নিতে মাথার দিব্যি দিয়েছিল, মা জননী? বাড়ির কাছাকাছি গার্লস স্কুলে মাস্টারনি হয়ে যেতে পারতে। সবক্ষেত্রেই তোমরা ছেলেদের সমান, এটা লাফিয়ে উঠে প্রমাণও করতে যাবে, আবার লেংচে লেংচে নাকি সুরে কান্নাও জুড়বে - এ কেমন সাম্যবাদ হে বীরাঙ্গনা? এমনিতে মেয়েদের চাকরি করতে বেরোনোটাকে খুব একটা ভালো চোখে কোনওদিনই দেখে না তিমির। বিশেষত ডাবল ইনকাম ব্যাপারটা, এই বেকারির জমানায়, একটা টোটাল ওয়েস্টেজ মনে হয় তার। কত ফ্যামিলিতে একটা চাকরির জন্য হাহাকার, একটা করে মাঝারি মাপের চাকরি পেলে কত হাজার বেকার ছেলের জীবন দাঁড়িয়ে যেতে পারে, আর এই মহিলারা স্রেফ শখের বশে আর মেকি স্বনির্ভরতার বুলি আউড়ে সেসব পোস্ট আটকে রেখেছে....."

তিমির চরিত্রটা একটা আদ্যোপান্ত নেগেটিভ চরিত্র, কিন্তু উপন্যাসটা শেষ করে মনে হয়েছে যেন তিমিরই লিখলো উপন্যাসটা। মানে মহিলাদের যেভাবে লেখা হয়েছে তাতে আর কি বলি!

পুরো উপন্যাসে এক তরুলতা ছাড়া আর কোনো দৃঢ় মহিলা চরিত্রই নেই, মহিলাদের বিপ্লব লড়তে হয় না? অদিতিকে এই যে নিজের গানের স্কুলটা অ্যাডজাস্ট করে ড্রয়িংরুমে চালাতে হয় এটা লড়াই নয়, নিজের স্বামীর উল্টোপাল্টা মন্তব্যের সাথে লড়াইটা লড়াই নয়? অনুশ্রীকে যে পুরো সংসারটা চালিয়ে নিতে হয় একা হাতে যখন তমাল লেখায় পাগল হয়ে ওঠে, কিংবা ছন্নছাড়া হয়ে ওঠে সেটা লড়াই নয়? নিজের স্বামীর রাতের পর রাত জেগে লেখায় তার যদি সহমত ও আশকারা না থাকতো তবে কি তমালের এত কিছু লেখা হয়ে উঠতো? সেগুলোর বিবরণ নেই কেন? রাকা জীবনে প্রেম ছাড়াও একটা বড় মানুষের মত মানুষ হতে চায়, তার সাহিত্যপ্রেম, লড়াই এসবের উল্লেখ কই? নৈঋতা উন্মেষ আর দেবদত্তর মাঝে গড়িয়ে যেতে যেতেও নিজের দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে গড়ে তুলতে চায় না এটা কি সম্ভব?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর আমি পাইনি, তাই এই উপন্যাস আমার কাছে একটা মিশ্র অনুভূতিযুক্ত পাঠ হয়েই থেকে যাবে চিরকাল।

শেষে প্লটের ব্যাপারে এলে, জমি লড়াইয়ের বিষয়টা প্রথমদিকে ভীষণ একপেশে লাগলেও শেষে যখন দেখানো হল যে আদতে কোনো বিপ্লবই যে পথে চলবে বলে দাবী করে সে পথে কোনোদিন চলে না। তৃতীয় চিন্তা, নকশাল বা পরিবর্তন সবই আদতে এক, সাধারণ গরীব খেটে খাওয়া মানুষের কোনদিনই কোনটায় লাভ হয়নি আর হবেও না, তাদের শুধুই রক্ত যাবে, প্রাণ যাবে কিন্তু দিনের পর দিন তারা গরীবই থেকে যাবে। আর বিপ্লবেও হিংসা যে দুপ্রান্ত থেকেই চলে, আর কিছু মানুষ সবসময় বাইরে বসে মজা নেয়, এই সম্পূর্ণ ব্যাপারটা দেখানোয় আমি খুব খুশি হয়েছি। যদিও কিংশুকের শেষ সিদ্ধান্তের আরো কিছু অদল বদল হতেই পারতো। প্রচ্ছদটি বেশ সুন্দর। রাজনৈতিক সামাজিক উপন্যাস পড়ার ইচ্ছে থাকলে পড়ে দেখতে পারেন এই বইটা।
Profile Image for Azahar Hossain.
55 reviews9 followers
August 31, 2021
ধুলোখেলা ~ সৌরভ মুখোপাধ্যায়
আনন্দ পাবলিশার্স
৩০০ টাকা।

বছর খানে��� আগে, তখন একটা বেসরকারি হাসপাতালে ট্রেনি ফার্মাসিস্ট হিসেবে জয়েন করেছি। প্রথম মাসের বেতন নিয়ে, কলেজস্ট্রিট গিয়ে বেশ কিছু বই কিনলাম। তার মধ্যে একটা বই ছিল 'প্রথম প্রবাহ'। ওটাই আমার পড়া সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম বই। মহাভারতের আদিপর্ব নিয়ে লেখা চমৎকার একটা লেখা। যেমন ভাষা, তেমনই বর্ণনা - পড়ার পর বইয়ের প্রথম পাতায় লিখে রেখেছিলাম, - "আমার প্রথম স্যালারিতে কেনা বই।"

আজকে পড়ে শেষ করলাম সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের আরও একটি উপন্যাস - "ধুলোখেলা"
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপর রচিত সুন্দর একটা উপন্যাস। বিশাল কোন দর্শন নেই, সাধারণ কিছু ঘটনা নিয়ে খুব সাধারণ ভাবে লেখক প্রত্যেকটা চরিত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পড়তে নিজেকে কখনো কিংশুক মনে হয়েছে, কখনো উন্মেষ, আবার কখনো তমাল।
কিছু মানুষ নিজের জীবনের মানে খুঁজে বেড়াচ্ছে, জীবনের সার্থকতা খুঁজছে। জমি অধিগ্রহণ, জমি রক্ষাকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে - রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা।
তমালকে লিখতে গিয়ে লেখক যেন নিজের কিছুটা অংশ রেখেছেন - স্কুল শিক্ষক, যিনি স্বল্প ভাষী, খুব কম লেখেন। গল্পের লেখার ব্যাপারে খুব যত্নশীল।

"আমার মনে হয়, নাস্তিক হওয়া একটা টাফ ব্যাপার। খুব বিরাট, খুব ষ্ট্রং একটা ফিলোজফিক্যাল বেশ দরকার হয় নাস্তিক হওয়ার জন্য, দারুণ মজবুত একটা মেন্টাল মেক-আপ, না হলে ওই প্রবল "না" -এর ধাক্কা তোমাকে গুঁড়িয়ে দেবে!'......
..... ভগবান নেই, ফলে এই দুনিয়ায় তোমার কোনও গাইড নেই। তুমি একা। মৃত্যু তোমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে যাবে। কারণ, তুমি জানো, যাকে হারালে সে আর অবশেষ নেই, সে আর কোনওদিন কোনওভাবে আসবে না! এই যে বিরাট শূন্যতা, একটা সর্বব্যাপী "না", যত এটা নিয়ে গভীরে ভাবতে যাবে ততই তুমি ডিপ্রেসড হবে। কোথাও কোনও আলো নেই, আশা নেই। নাস্তিক দর্শন খুব সাংঘাতিক, টুলু!"

এবার সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের ছোট গল্প পড়ার ইচ্ছে আছে। তাই ওনার গল্পের বই চৈত্রমাস ও সর্বনাশের গল্প অর্ডার করলাম।
Displaying 1 - 3 of 3 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.