PAWDER KOUTOR TELESCOPE A novel by Swapnamoy Chakraborty
প্রচ্ছদ – দেবাশিস রাহা
মাটির পৃথিবীতে এক কৌতুহলী ছাত্র আর এক সমর্পিত শিক্ষক। উপরের অনন্ত আকাশে ব্যাপ্ত জিজ্ঞাসা। এক প্রান্তিক গ্রামের দরিদ্র বালকের মহাকাশ বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার সংগ্রাম-মথিত কাহিনীর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, লোককথা...। অনন্ত আকাশে একটা প্রবল জিজ্ঞাসা চিহ্ন এঁকে রেখেছে - আমরা এলাম কোথা থেকে? এই বিশ্বসৃষ্টির রহস্যটা কি! একটা গান শুনেছিলো নয়ন __ 'অসীম কালের যে হিল্লোলে/জোয়ার ভাঁটায় ভুবন দোলে...'।
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর জন্ম ২৪ আগস্ট, ১৯৫১ সালে উত্তর কলকাতায়। রসায়নে বিএসসি (সম্মান), বাংলায় এমএ, সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করেছেন। লেখকজীবন শুরু করেন সত্তর দশকে। প্রথম দিকে কবিতা লিখলেও থিতু হয়েছেন গল্প ও উপন্যাসে। তাঁর লেখা গল্পের সংখ্যা প্রায় ৩৫০। প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। পাঠক মহলে সাড়া ফেলেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ এবং কলাম কিংবা রম্যরচনাতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর রচিত ‘হলদে গোলাপ' উপন্যাসটি ২০১৫ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়। ‘অবন্তীনগর' উপন্যাসের জন্য ২০০৫ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার, সর্বভারতীয় কথা পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, গল্পমেলা, ভারতব্যাস পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। সাহিত্যের বাইরে তিনি গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
এ-কাহিনি শিক্ষক মণিলাল আইচের— যিনি আকাশ-পানে তাকিয়েও মাটির পৃথিবীর কথা ভুলে যাননি। বরং নিজের অতি সীমিত সাধ্য আর অনেকখানি সাধ নিয়ে অন্যদের আকাশপানে চাইতে শিখিয়েছিলেন। এ-কাহিনি নয়নচাঁদ ঘরামি'র— যাঁর শরীর হয়তো তাঁকে এতটা পথ হাঁটতে দিতই না, যদি না মণিলাল তাঁর সামনে ছায়াপথ খুলে দিতেন, যে পথের শেষে বহু না-পাওয়ায় বন্দি ছোট্ট প্রাণ মিশে যায় অনন্তে। এ-কাহিনি সুবলের— যে বৃহতের স্বপ্ন না দেখে ক্ষুদ্রের আরাধনাতেই নিজেকে সঁপে দিয়ে হয়তো আমাদের মতো বহু মানুষের গল্পই বলে দিয়েছে। এ-কাহিনিতে আছে গ্রাম-বাংলা। আছে তার সমাজ, বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি, ব্যর্থতা, কিছু প্রাপ্তি, আর ছোট্ট-ছোট্ট কিছু সুখ। আর আছে সময়! টেলিস্কোপের মধ্য দিয়ে যেভাবে দূরের অতি বিশাল বস্তু আসে কাছে, সেভাবেই এই ছোট্ট উপন্যাসের ব্যাপ্তিতে ধরা পড়েছে এক অতি দীর্ঘ সময়কাল আর ইতিহাস। তবে সব চেয়ে বেশি করে এই কাহিনি স্বপ্নের পেছনে ছুটে যাওয়ার— যার শেষে কেউ পায় সূর্যোদয়, আর কেউ শুধুই ছাই হয়! এইরকম অনুচ্চ কণ্ঠে আলো, ছায়া, কুয়াশা, আর আকাশ নিয়ে উপন্যাস... আমি আর একটিও পড়িনি। আদৌ এমন কিছু লেখা হয়েছে কি এর আগে বা পরে? কে জানে! আপাতত একটিই অনুরোধ~ যদি এটি না পড়ে থাকেন, তাহলে প্লিজ পড়ুন। এ শুধু এক অনন্য লেখাই নয়; একে পড়াও এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
এ উপন্যাসের কাহিনী পশ্চিম বাংলার বিজ্ঞানী নারায়ণচন্দ্র রানার যতখানি, তার চেয়েও বেশি এক বিদ্যোৎসাহী শিক্ষক মণীন্দ্রচন্দ্র লাহিড়ীর। নারায়ণচন্দ্র এখানে নয়নচাঁদ, আর মণীন্দ্রচন্দ হলেন মণিলাল। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কলমে মণিলাল যেভাবে নয়নচাঁদের মনে আকাশের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে তা এককথায় আসাধারণ। সব ঠিকঠাকই চলছিলো, কিন্তু শেষের দিকে এসে লেখকের কীসের যেন তাড়াহুড়া -- সদ্য স্কুল পাশ করা নয়নচাঁদকে বড্ড তড়িঘড়ি করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করিয়ে টাটা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানী বানিয়ে দিয়েছেন। শেষের অংশটুকু শৈশবের মতো মায়া নিয়ে লিখলে কী ভালোই না হতো!
ভালো কথা, এ উপন্যাস নিয়ে চমৎকার একটা নাটক কিংবা সিনেমা হতে পারে।
এই কাহিনী এক প্রত্যন্ত গ্রামের কৌতূহলী ছাত্র নয়নচাঁদ ঘরামি এবং এক সমর্পিত শিক্ষক মণিলাল আইচের।
সুন্দরবনের চাচরবেড়া এলাকার বুধখালি কৃপাসিন্ধু স্কুলের ভূগোলের শিক্ষক ছিলেন মণিলাল আইচ। মণিলালের পিঠে একটা কুঁজ ছিল। যার জন্য সে কুঁজো হয়ে হাঁটতো। ছোটোবেলায় এই কুঁজ সারানোর জন্য তার বাবা কলকাতায় ডাক্তারের খোঁজে গেলে বাড়ি ফেরার পথে ক্যানিং এর নদীতে নৌকাডুবি হয়ে মারা যান। মণিলাল সবাইকে তার বাবা কোথায় জিজ্ঞেস করলে, কেউ কেউ বলতো তিনি আকাশের তারা হয়ে গেছেন। সেই থেকেই মণিলাল আকাশের দিকে তাকিয়ে তার বাবাকে খুঁজতেন। আর এখান থেকেই আকাশকে জানার আগ্রহ তার বেড়ে ওঠে। তার সঞ্চিত জ্ঞান দ্বারা তিনি মহাকাশের রহস্যকে সন্ধান করার চেষ্টা করতেন।
মণিলালের এই অনন্ত মহাকাশ রহস্যের সন্ধানের পথে যোগ দেয় আরেকজন, তার প্রিয় ছাত্র নয়নচাঁদ ঘরামি বা নয়ন। সে গ্রামের বিজয় ঘরামির ছেলে। অত্যন্ত দারিদ্র্যতায় তাদের সংসার চলত। তাই তার বাবা চেয়েছিল ছেলে লেখাপড়া না করে তার সঙ্গে খড় বাঁধার কাজ শিখুক, তাতে সংসার চলবে। কিন্তু নয়নের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোড়ে সে তার পড়াশোনা চালিয়ে যায়। পাশে পায় সর্বদা মণিলাল স্যারকে, যিনি তার শিক্ষক থেকে অভিভাবক হয়ে ওঠেন।
কলকাতা বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামে গিয়ে মণিলাল স্যার ও নয়নের সাথে পরিচয় হওয়া অমিয় বড়ালের থেকে পাওয়া পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপটি দিয়ে মণিলাল স্যার নয়নকে আকাশ দেখাতেন। তিনিই নয়নের মধ্যে আকাশকে জানার আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছিলেন, আকাশকে ভালোবাসতে শিখিয়ে ছিলেন। "নয়নচাঁদ সম্মোহিতের মতো ওই আকাল তলে পড়ে থাকে, মাথার উপর মহা বিশ্ব। আর সাতটা ঋষি মিলে এঁকে রেখেছে একটা বিরাট প্রশ্ন চিহ্ন।"
"মানুষ জেনেছে অনেক, কিন্তু জানেনি তার চেয়ে অনেক বেশি।" ছোটো থেকেই আমরা পাঠ্য বইতে মুখ গুঁজে থাকি। পাঠ্য বইয়ের বাইরে কতটুকুই বা আমরা জানি বা জানার চেষ্টা করি? কিন্তু নয়ন চেষ্টা করেছিল। নানান দুঃখ-কষ্ট, দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, বঞ্চনার পরও সে তার জানার আগ্রহকে থামিয়ে রাখেনি। এক কঠিন রোগের শিকার হওয়া সত্ত্বেও নয়ন সব কিছুকে উপেক্ষা করে মণিলাল স্যারের স্বপ্নগুলোকে নিজের স্বপ্ন বানিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। মণিলাল স্যার চেয়েছিলেন সব অজানার খোঁজ নয়নকে দিতে হবে পড়াশুনা করে রিসার্চ করে, হতে হবে তাকে অনেক বড়ো জ্যোতির্বিজ্ঞানী। স্বপ্নপূরণ কি হবে তার?
আমাদের প্রত্যেকের জীবনে বাবা-মায়ের পরে শিক্ষকদের অবদান সবথেকে বেশি। শিক্ষকরাই আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখান, জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে পাশে থেকে সেই স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেন। আমরা কেউই আমাদের কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম না, যদি না শিক্ষকরা আমাদের পথপ্রদর্শন না করতেন। যেই অর্জুনকে আমরা শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর বলে জানি আজ, গুরু দ্রোণাচার্যের সহায়তা, তাঁর শিক্ষা যদি না পেতেন, তাহলে হয়তো তিনি কখনই শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হতেন না।
নয়নের জীবনেও ঠিক সেইরকম মণিলাল স্যারের অবদান অনেক বেশি। যদিও তিনি নয়নকে ক্লাস এইট অবধিই পড়িয়েছেন, তবুও সর্বদা তার পাশে থেকে অনন্ত আকাশের অজানার সন্ধান পাওয়ার পন্থা তিনিই তাকে খুঁজতে শিখিয়েছিলেন।
এই উপন্যাস একটা উপলব্ধি, যা মর্মে মর্মে অনুভব করতে হয়। বলার হয়তো আরও অনেক কিছুই ছিল, কিন্তু সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর লেখা এই প্রথম পড়লাম। এরকম অসামান্য লেখার জন্য আমি সত্যিই তাঁকে কুর্নিশ জানাই।
পাঠকদের অনুরোধ করবো এই বইটি একবার পড়ে দেখতে। অসম্ভব ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।
"নলেজ ইজ দি রেমিডি। নলেজই পারে সমস্যার সমাধান করতে। দেখো—একদিন আকাশে স্যাটেলাইট উঠবে, এক দেশের নলেজ অন্য দেশে যাবে। আকাল থেকে জ্ঞান বৃষ্টি হবে। সেই বৃষ্টিতে স্নান করে মানুষ শুদ্ধ হবে।"
একটা সিনেমা দেখেছিলাম। ক্লাস ১০ কি ১১ হবে। October Sky নাম। ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞান নিয়ে। অদ্বিতীয় একটি চলচিত্র। পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপে, সেই october sky কেই ফিরে পেলাম মনে হলো। মনিলাল, নয়নচাঁদ, অনন্যা, সুবল। হাতে গোনা কয়েকটি চরিত্র। অথচ লেখক কি মায়াজালই না গড়ে তুলেছেন তাঁর কলমে। কাহিনীর সাথে জড়িত অনুপ্রাণিত ইতিহাসই হয়তো এর অন্যতম কারণ। অনবদ্য আলেখের বুনোটে মুড়েছেন মধ্যবিত্ত বাঙালির ছাপোষা জীবন, এবং তার দূরবীনে চোখ রেখে মহাকাশে পারি দেওয়ার স্বপ্ন। অনিবর্চনীয় আস্বাদনের জন্যে লেখককে ধন্যবাদ।
"পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ" নামটা শুনেই শুরুতে কোনো রোমান্টিক উপন্যাস বলেই মনে হয়েছিল। পাউডার কৌটো শব্দ দুটি শুনলেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে গোলাপী রঙের একটা প্লাস্টিকের নল। কিন্তু উপন্যাসটি একদমই রোমান্টিক নয়, অস্বচ্ছ প্রেম কিছু থাকলেও তা মুখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয় একটা পাউডারের কৌটোয় বানানো টেলিস্কোপ। সেই টেলিস্কোপ কে ঘিরে কতগুলি মানুষের জীবনের স্বপ্ন পূরণের গল্প হলো এই উপন্যাস। উপন্যাসের শেষে Happy Ending না থাকলেও, স্বপ্ন পূরণ আর বাস্তববাদী আধুনিকতাই যেন এই উপন্যাসের সাফল্যের চাবিকাঠি। বছরের শুরুতে এই উপন্যাস পড়তে পেরে সত্যিই ভালো লাগলো।
একটি প্রতিভাবান, স্বপ্ন দেখানোর মতো শিক্ষক এবং আরেকজন প্রতিভাবান, দরিদ্র ছাত্রের একদম শূন্য থেকে শুরু করে অসীমে পৌঁছানোর গল্প এই উপন্যাস। শুধুমাত্র স্বপ্ন, বিশ্বাস ও ইচ্ছে শক্তির জোরে মানুষ কথা পৌঁছাতে পারে, সেটাই আরেকবার প্রমান করে এই উপন্যাস। সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলায় রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের জীবনের হদিস এই উপন্যাস।
- প্রচ্ছদটি অত্যন্ত সুন্দর। - লেখক লিখেছিলেন, "মনিলাল মাস্টারের চার বছরের কলকাতার জীবন নিয়ে লিখলে একটা আলাদা উপন্যাস হয়ে যাবে।" যদি সত্যিই ওনাকে নিয়ে আরেকটি উপন্যাস হয়, অপেক্ষায় রইলাম। - লেখার ছন্দ খুব সাবলীল। দু-এক জায়গায় প্রাপ্তবয়স্ক শব্দের ক্ষেত্রে লেখক যে শব্দ গুলি ব্যবহার করেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাই এটাকে অবশ্য কিশোর পাঠ্য বলেই মনে হয়েছে।
লেখকের কথায়, "স্বপ্ন দেখো। চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার মধ্যে কোনো দোষ নেই। চেষ্টা ছেড়ে দেয়াটাই দোষের।"
স্বপ্ন সফল করার তাগিদ , মানুষকে স্বপ্ন দেখার সাহস দেয় ,ইচ্ছাশক্তি বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। দরিদ্র ঘরামি বাড়ির ছেলে নরেন চাঁদ , যার বাবা ঘরামির কাজ করে , আর মা মুড়ি ভেজে বিক্রি করে , একদিন হঠাৎই নয়ন চাঁদের জীবনে প্রবেশ করে শিক্ষক মনিলাল । মূর্খ দরিদ্র গ্রামে যেখানে স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা , সেখানে নয়নের চোখে আকাশ এর নেশা লাগিয়ে দেয় মনিলাল মাস্টার । নয়ন যত দেখতে চাই ,যত হারিয়ে যেতে চাই আকাশের বুকে জ্বলতে থাকা গ্রহ নক্ষত্রের ভেতরে , মনিলাল তত নয়নের স্বপ্নের জাল গুলো নিজের হাতে বুনে দেয় তার পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ দিয়ে । নয়নের প্রশ্ন জাগে মনে, একের পর এক প্রশ্ন, মনিলাল সাধ্য মতন চেষ্টা করে তার উত্তর দেওয়ার। এমনি একদিন ছোট্ট নয়নের এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জ্বলজ্বল করে ওঠে মনিলালের চোখ , সে নয়ন কে বলে এর উত্তর আজ অবধি কেউ বের করেনি কিন্তু তুই বের করবি । নয়ন স্বপ্ন দেখে , তবে স্বপ্ন দেখা কি সোজা ? সে যত স্বপ্নের দিকে এগোতে যায় জীবন ততই তাকে টেনে ধরতে চাই পেছনে। কিন্তু মনিলাল নয়নের হাত ছাড়েনা । কি প্রশ্ন করেছিল নয়ন ? নয়ন কি পেরেছিল মনিলাল মাস্টার এর না দিতে পারা প্রশ্নের উত্তর বের করতে? কি এমন ঘটেছিল নয়নের জীবনে যা তার স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে দিতে চেয়েছিল ? সব প্রশ্নের উত্তর আছে এই বইটিতে।
বইটা ভীষণ সুন্দর , আগেও বলেছি কিছু কিছু বই মন্ত্রের মতন যা শুধু পড়ে নিলেই শেষ হয়ে যাইনা।তার রেশ থেকে যায় সারাটা জীবন।
পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ লেখক - স্বপ্নময় চক্রবর্তী প্রকাশক - মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স মূল্য - ১৫০ টাকা
কিছু বই পড়তে গিয়ে মনে হয়, এই সময় টা কি আমরা বাস্তবে আছি নাকি যা পড়ছি সবই চোখের সামনে ঘটছে, এই বই পড়তে পড়তে মন ভারী হয়, আবার চোখের কোণ চিকচিক করে... মুগ্ধতায় নাকি বিস্ময়ে? কে জানে??!! এই উপন্যাস যতখানি বাঙালি বিজ্ঞানী নারায়ণচন্দ্র রানার তার চেয়েও বেশি এক শিক্ষক মনীন্দ্রচন্দ্র লাহিড়ীর। নারায়ণচন্দ্র এখানে নয়ন চাঁদ আর মনীন্দ্রচন্দ্র হলেন মনিলাল আইচ (এম এল এ)। লেখকের কলমে মনিলাল বাবু যেভাবে আকাশ, মহাকাশ, তারা, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নীহারিকার প্রতি নয়নচাঁদের মনে ভালোবাসা এবং আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন তা এক কথায় অসাধারণ। নয়ন, মনিলাল, সুবল, অনন্যা অল্প কয়েকটি চরিত্র দিয়ে কি বিশাল এক মহাকাশ রচনা করেছেন লেখক, তা বইটা না পড়া অব্দি বোঝা যাবে না। অনবদ্য লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন সুন্দরবন এলাকার চাঁচরবেরিয়া গ্রামের মধ্য ও নিম্নবিত্ত জীবনযাপন, সাথে একটা পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপে চোখ রেখে মহাকাশ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন।
পটভূমি -
এই কাহিনী সুন্দরবন অঞ্চলের চাঁচরবেড়া গ্রামের অত্যন্ত গরিব বাড়ির ছেলে নয়ন, কিন্তু আকাশ দেখার, মহাকাশকে জানার ইচ্ছে তার ষোলো আনা। ছোটবেলায় ভূগোলের শিক্ষক মণিলাল হয়ে উঠেছিল তার পথ প্রদর্শক। মণিলাল স্যার হাতে গোনা সেই গুটিকয়েক শিক্ষকদের মধ্যে পড়েন, নিঃস্বার্থভাবে ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞানের সঞ্চার ঘটানো যাঁদের স্বপ্ন, যাঁরা ছাত্রদের এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দেয়। তিনি সমাজে শুধু শিক্ষকই ছিলেন না তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। প্রতিভা হয়তো অনেকেরই থাকে কিন্তু জানার স্পৃহাই একমাত্র পারে আর্থ সামাজিক সকল বাধা বিপত্তি সব কিছুকে পেরিয়ে প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে। আর তারজন্য দরকার কিছু মনিলাল আইচের মত পথপ্রদর্শকের। যিনি তাঁর ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়েও বৃহৎ স্বপ্ন এঁকে দিতে পারেন তাঁর ছাত্রের চোখে... তাঁর সেই পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপে দেখতে পাওয়া 'আকাশগঙ্গা'ই তো নয়নচাঁদকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলো। স্কুলে পড়াকালীন কলকাতার অমিয় বড়ালের দেওয়া পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ দিয়ে সে ও মণিলাল স্যার আকাশ দেখত। নয়ন স্বপ্ন দেখত তার অসুখ তার জীবন কেড়ে নেওয়ার আগে যেন সে তার নামটা রেখে যেতে পারে পৃথিবীর বুকে। সেই জন্যই সূর্যের ব্যাস জানার সূত্রটি এন সি জি এর সূত্র নামেই পরিচিত হয়।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
এই কাহিনী সুন্দরবন অঞ্চলের প্রান্তিক পরিবারের কিশোর নয়নচাঁদের জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার সংগ্রাম... নয়ন শুধুমাত্র জানা, জ্ঞানের জন্য ছুটে যেত স্কুলে তার দারিদ্র্যতা,অনাহার, 'লেফ্ট বান্ডিল ব্রাঞ্চ ব্লক' কে উপেক্ষা করে। আর তার জন্য প্রয়োজন পড়ে একজন মণিলাল আইচকে, ... একজন শিক্ষকই পারেন একজন ছাত্রকে স্বপ্ন দেখার মতো সাহসী করে তুলতে..তবে যে সব মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানেন, স্বপ্ন সত্যি করাই যাঁদের জীবনের লক্ষ্য, তাঁরা কিন্তু প্রায়শ্ই এই সমাজের বুকে স্বার্থপর বলে চিহ্নিত হোন...কারণ, সাংসারিক ভালো -মন্দের প্রতি বোধহয় তাঁরা নির্লিপ্ত হয়ে যান। লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর নাম বই���োকা হিসাবে কম বেশি সবাই শুনেছে তার হলদে গোলাপের জন্য। কিন্তু এটা আমার পড়া ওনার প্রথম উপন্যাস। এর আগে আমি লেখকের 50 টি গল্প পড়েছিলাম। এই উপন্যাস সত্যিই পড়তে পড়তে বুঁদ হয়ে যেতে হয়। লেখনীর বলিষ্ঠতা, ভাষা জ্ঞান, লেখন শৈলী এক কথায় অনবদ্য। 'মানুষ জেনেছে অনেক, কিন্তু জানেনি তার চেয়ে অনেক বেশি।' এই সকল লাইন মানব মনে এক প্রকার আলোড়ন এর সৃষ্টি করে, লেখক নিজে শিক্ষক হওয়ার কারণে উনি এটা প্রতিপদে উপলব্ধি করেন শিক্ষার ক্রমহ্রাসমান মূল্যবোধ, শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, ইদুর দৌড়, শেখার প্রতি অনীহা - এই সকলের জন্য দায়ী কারা? সঠিক শিক্ষণ পদ্ধতি না পথ প্রদর্শক এর অভাব? এই বই নিজে পড়ুন এই বই পড়া নিজের মধ্যেই এক অভিজ্ঞতা অর্জন করা, অন্যদের উপহার দিন।
মণিলাল তার ছাত্র নয়নচাঁদ ঘরামিকে আকাশ চিনিয়েছেন,প্রেরণা দিয়েছেন একদিন আকাশকে জয় করতে। তাদের এই স্বপ্নযাত্রায় সঙ্গী ছিল একটি পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ।নয়ন পেরেছিল আকাশসম কৌতুহলকে জয় করতে। কিন্তু নয়ন পরবর্তী সুবল সেই পথে পা দেয়নি,তার কাছে বাহ্যজগতই সত্য। প্রসঙ্গক্রমে গল্পে উঠে এসেছিল ভারতের রাজনীতি,মুক্তি আন্দোলন ও বিজ্ঞানের ছোটখাটো বিভিন্ন বিষয়।
বইটা পড়া শুরু করা মাত্রই মনের আকাশে নানারকম অনুভূতির মেঘ এসে জড়ো হওয়া শুরু করেছিল এবং শেষ হওয়া মাত্র আকাশ পরিষ্কার হয়েছে -- রয়ে গেছে শুধু মুগ্ধতা! এত সুন্দর করেও লেখা যায়!
"...মানুষ জেনেছে অনেক, কিন্তু জানেনি তার চেয়ে অনেক বেশি।"
This book has already attained classic status. Loosely inspired by the life of the late scientist, Shri Narayan Chandra Rana and his mentor, the story had a profound impact on me. The narrative is masterfully crafted, seamlessly transitioning between surrealism and lyrical prose. What truly sets this story apart is its unique ability to intertwine daily life, emotions, and social issues with the realm of science, making it truly exceptional.
For any lover of Bengali literature, this book is an absolute must-read!