Jump to ratings and reviews
Rate this book

গ্রিক মিথলজি - আদি থেকে অন্ত

Rate this book
খুব কম মানুষই আছেন পৃথিবীতে, ছােট বেলায় রূপকথার আড়ালে যারা প্রাচীন মিথলজির গল্প শােনেন নি। ইকারিয়াসের পাখা, আফ্রোদিতির প্রেম, জিউস কিংবা তার ছেলে হেরাক্লেস, বীর হেক্টর কিংবা একচোখা সাইক্লোপ, আমাদের ছােটবেলার একটা একটা গল্পের মাঝেই কিন্তু ঘুরে বেড়াতে এরাই। মিথলজির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বহু বছর আগে থেকেই। আর সেই সব মিথলজির ভীড়ে অনন্য হয়ে রয়েছে গ্রিক মিথলজি, যার সূচনাও আসলে চমকপ্রদ একটা ব্যাপার। প্রাচীন গ্রিক অধিবাসীরা চেষ্টা করতাে জগতের সমস্ত ঘটনার এক একটা ব্যাখ্যা দাড় করাতে। আর সেই সীমিত বুদ্ধির অসীম কল্পনাই একে একে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য গল্পের। ক্যায়ােস থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি, আর তা থেকে পৃথিবী, যাকে ঘিরে অগুনতি দেবতা, অপদেবতা আর দানব মিলে সৃষ্টি হয়েছে সেই সব গল্প-গাঁথা। সেই গল্পের মহাসাগরে ডুব দিলে একটা সময় পাঠক নিজে থেকেই আবিস্কার করবে যে দেবতা মানেই ‘দেবতা' নয়, দেবতার ও চরিত্রে মিশে আছে শঠতা, লােভ, হিংসা কিংবা প্রতিশােধের স্পৃহা।

গ্রিক মিথলজি এমনই এক অনির্বাণ গল্পের স্রোত যেখানে দেবতা আর মানুষ যেন আয়নারই এপার ওপার। বাংলা ভাষায় গ্রিক মিথলজির বেশ কিছু অনুবাদ থাকার পরও এবারই প্রথম সম্ভবত কেউ সাহস করলাে সেই বিশাল গ্রিক গাঁথা গুলােকে মলাটবন্দী করে এক ফ্রেমে আনার। আদি থেকে অন্ত হােক কিংবা সৃষ্টি থেকে ধ্বংস, গ্রিক মিথলজির এই ভাবান্তর আপনাকে আটকে রাখবে এক অদ্ভুত মায়াজালে, যেনবা সেই কিন্নরি সাইরেনের মতােই ...

557 pages, Hardcover

First published February 23, 2017

41 people are currently reading
563 people want to read

About the author

S.M. Niaz Mowla

10 books116 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
32 (55%)
4 stars
15 (25%)
3 stars
7 (12%)
2 stars
3 (5%)
1 star
1 (1%)
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
Profile Image for Akash Saha.
156 reviews27 followers
August 23, 2021
বইয়ের নামঃ গ্রীক মিথলজি: আদি থেকে অন্ত
লেখকঃ এস এম নিয়াজ মাওলা
প্রকাশনীঃ জাগৃতি
রেটিংঃ ৯.৫/১০

“Mythology is composed by poets out of their insights and realizations. Mythologies are not invented; they are found. You can no more tell us what your dream is going to be tonight than we can invent a myth. Myths come from the mystical region of essential experience.” - Joseph Campbell


গ্রিক মিথলজি নিয়ে জানার আগ্রহ সেই ছোটবেলা থেকে। গ্রিক মিথলজি মনে আলোড়ন তোলেনি এমন মানুষ খুজে পাওয়াই ভার। ছোট থাকতে স্কুলের লাইব্রেরিতে গ্রিক মিথলজি নিয়ে যে বই ই পেতাম , গোগ্রাসে গিলে ফেলতাম। এভাবেই পরিচয় গ্রিক দেবতাদের সাথে, হারকিউলিসের সাথে। আরেকটু বড় হয়ে যখন মেডিকেলে পড়তে আসলাম , তখন দেখি অধিকাংশ শব্দই এসেছে গ্রিক পুরাণ থেকে। এরপর গ্রিক মিথলোজির উপর আগ্রহ আরো বাড়ল । অনেক দিন থেকেই এমন একটি বই খুজছিলাম, যেখানে গ্রিক মিথলজি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে, ভেঙ্গে ভেঙ্গে সব ব্যাখ্যা করা থাকবে। অবশেষে তাহাকে পাইলাম, আর তা হল এস এম নিয়াজ মাওলা ভাইয়ের “গ্রীক মিথলজি: আদি থেকে অন্ত “ বইটি।

“গ্রিক মিথলজি: আদি থেকে অন্ত” বইটি নিয়ে কথা বলার আগে লেখক নিয়াজ মাওলা ভাইয়ের সম্পর্কে কিছু বলে নেই। নিয়াজ ভাইয়ের লেখার সাথে পরিচয় অনেক আগে থেকে ,২০১১-১২ সালের দিকে ,সুড়ঙ্গ ব্লগের মাধ্যমে। সেই সময়েও তার গ্রিক মিথের গল্পগুলো বেশ শিহরিত করত। তারপর অনেক দিন কেটে যায়, ২০১৭ সালে “গ্রীক মিথলজি: আদি থেকে অন্ত” বইটি প্রকাশ পায়। কিন্তু তখন জানা ছিল না যে এই বইটির লেখক সুড়ঙ্গের নিয়াজ ভাই। মিশরীয় মিথলজি - আদি থেকে অন্ত পড়ার সময় জানতে পারি, দুইজন একই মানুষ। তারপর আর কি? - কিনে ফেললাম “গ্রিক মিথলজিঃ আদি থেকে অন্ত”।

বইটি শুরু হয়েছে একটি উক্তি দিয়ে,
“দেবতারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেননি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই দেবতাদের সৃষ্টি করেছে।”

গ্রিক পুরানকে বুঝতে হলে, প্রথমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিরহস্য বুঝতে হবে। গ্রিক পুরানে সৃষ্টির অনেকগুলো তত্ত্ব আছে যা আবর্তিত হয়েছে পৃথিবি বা গায়াকে ঘিরে। তারপর উত্থান ঘটে ইউরেনাসের। এরপর ধীরে ধীরে আবির্ভূত হয় প্রথম যুগের টাইটান দেবতারা। টাইটান দেবতা ক্রোনাস তার মায়ের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করে ইউরেনাসকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই হন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রাজা। কিন্তু ক্রোনাস নিজেই তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে তার নিজের সন্তানদের হত্যা(গিলে ফেলা) করতে থাকেন। একমাত্র জিউস রক্ষা পান তার মা রিয়ার চাতুরীতে। পরে জিউস তার বাকি ভাইবোনদের উদ্ধার করেন।এর থেকে শুরু হয় বিখ্যাত প্রথম টাইটান যুদ্ধ, যা দশ বছর ধরে হয়েছিল। জিউস ও তার ভাইবোনদের বলা হত অলিম্পিয়ান( অলিম্পাস পর্বতে অবস্থানের জন্য) । দশ বছরের ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শে্ষে অলিম্পিয়ানরা জয়ী হন। শুরু হয় নতুন যুগের, জিউসের তৈরি অসহায় মানব সমাজের যুগ।

কিন্তু এই অসহায় মানব সভ্যতা কি সবসময় অসহায় ও রুগ্ন হয়ে থাকবে? তাদের জন্য স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে আনলেন প্রমিথিউস, যাকে এই কাজের জন্য দেয়া হল কঠোর শাস্তি। গ্রিক পুরানের এই গল্পগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে হলে পড়তে হবে বইয়ের প্রথম অধ্যায় “ সৃষ্টিতত্ত্ব”।

এরপরের অধ্যায় হল, “ দেবতাদের গল্প”। গ্রিক মিথলোজিতে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে আছেন গ্রিক দেবতারা। অন্য যেকোন মিথলজির দেবতাদের সাথে গ্রিক দেবতাদের অনেক পার্থক্য রয়েছে। গ্রিক দেবতারা অনেকটা মানুষের মত, তারা যুদ্ধ করেন, অন্যের ষড়যন্ত্রের শিকার হন, মরণশীল মানুষের প্রেমে পড়েন, এমনকি নিজেদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা বিচারের ভার মানুষের উপরই ছেড়ে দেন( প্যারিস ও অ্যাপল অফ ডিসকর্ড) । এমনকি কোন নিয়ম ভাঙ্গলে পেতে হয় ভয়ঙ্কর শাস্তি। জিউস স্বর্গের রাজা হলেও তার নিজেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।

গ্রিক দেবতাদের মধ্যে অলিম্পিয়ান দেবতারাই সর্বাধিক পরিচিত। অলিম্পিয়ান প্রধান দেবতাদের মধ্যে আছেন জিউস, হেরা, হেফাস্টাস ,জ্ঞানের দেবী এথেনা, শিকারি দেবী আর্টেমিস, যুদ্ধের দেবতা অ্যারিস,নিরাময়ের দেবতা অ্যাপোলো,বার্তাবাহক হার্মিস,প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি, সমুদ্রের দেবতা পসাইডোন সহ আরো অনেকে। প্রত্যেক দেবতার জন্ম, তাদের ঘিরে নানা মিথ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় “ দেবতাদের গল্প” তে। গ্রিক মিথলজির গভীরে যেতে হলে, গ্রিক দেবতাদের সম্পর্কে জানার কোনো বিকল্প নেই। আর মিথগুলো যেন আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে নিয়াজ ভাইয়ের লেখনিতে।

গ্রিক মিথের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো দেবতা ও মানব বীরদের যুগলবন্দি। প্রাচীন গ্রিস ছিল কয়েকটি নগররাষ্ট্রের সমষ্টি। প্রতিটি নগররাষ্ট্রের আছে কিছু স্থানীয় মিথ। এই মিথগুলো নিয়েই তৃতীয় অধ্যায় “ স্থানীয় মিথ” । এই অধ্যায়ে আছে গ্রিক বীরদের গল্প। গ্রীকরা হল বীরের জাতি, তারা যুদ্ধ করতে ভালোবাসত। হোক সেটা দেবতার বিরুদ্ধে, অথবা কোন দানবের বিরুদ্ধে ! গ্রিক বীরদের অধিকাংশই হল ডেমিগড( Demigod)। তারা দেবতা ও মরণশীল মানুষের অংশ হতে সৃষ্ট। গ্রিক বীরদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলেন থিসিউস, পার্সিউস ও হেরাক্লেস; যাকে আমরা চিনি হারকিউলিস নামে। গ্রিক বীরদের নানা বীরত্বের গল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য মিথ; যেমন ক্যালিডোনের বন্য শুকর অভি্যান, পার্সিউসের মেডুসা বধ, হেরাক্লেসের বারটি শ্রমের মিথগুলো উল্লেখযোগ্য। এছাড়া গ্রিক সাহিত্যে ঈডিপাসের ট্রাজেডি(Oedipus Rex) সবসময় একটি বিশেষ স্থান দখন করে আছে। রাজা ঈডিপাসের করুন কাহিনিও আলোচিত হয়েছে তৃতীয় অধ্যায়ে।

গ্রিক মিথলজির যে অংশটি সবচেয়ে আলোচিত, তা হলো ট্রয়ের যুদ্ধ। গ্রিক ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প - সবকিছুকেই প্রভাবিত করেছে ট্রয়ের যুদ্ধ, যার উপর ভিত্তি করে লিখা হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান তিনটি মহাকাব্য - হোমারের ইলিয়াড, ওডিসি এবং ভার্জিলের ঈনিয়াড। ট্রয়ের যুদ্ধের পটভূমি অনেক গভীর, যেখানে আছে বীরত্ব, আছে দেশপ্রেম, আছে রাজনৈতিক কূটচাল। দশ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ প্রাচীন গ্রিসের গতিপথ যেন বদলে দিয়েছে। ট্রয় মুভিতে ওডেসিয়াস যেমন অ্যাকিলিসকে বলেছেন, “This war will never be forgotten, nor will the heroes who fought in it.” ট্রয়ের যুদ্ধ ও যুদ্ধের পরের বিস্তারিত কাহিনি আলোচিত হয়েছে বইয়ের চতুর্থ অধ্যায় “ট্রোজান যুদ্ধ” তে। অধ্যায়ের শুরু হয়েছে ট্রয় নগরীর ইতিহাস দিয়ে। তারপর এসেছে হেলেনের পরিচয়, ট্রয়ের রাজপরিবার, প্যারিসের গল্প, যুদ্ধের পটভূমি, জিউসের পরিকল্পনা , অ্যাকিলিসের জন্ম ও তার বীরত্ব, হেক্টরের বীরত্ব, ট্রোজান হর্স। এই কাহিনিগুলোই হোমারের ইলিয়াডের মূল। গদ্যের আকারে যেন লেখক সহজ ভাষায় ইলিয়াডের গল্পই বলেছেন।ট্রয়ের যুদ্ধের পরের কাহিনি হল ওডিসি ও ঈনিয়াড; গল্পের আকারে লেখক বলেছেন ওডেসিয়াসের ফিরে যাওয়ার গল্প। এই অধ্যায়টি ইলিয়াড, অডিসি - এই দুই মহাকাব্য পড়ে দেখার ইচ্ছা আরও বাড়িয়ে দিল।

এই হল চার পর্বের “গ্রিক মিথলজিঃ আদি থেকে অন্ত" । বইটিতে ইতিহাসের চেয়ে মিথ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এর উল্টোটা আমরা দেখি “মিশরীয় মিথলজিঃ আদি থেকে অন্ত” তে, যেখানে ইতিহাসের ভাগ ছিল বেশি।যদিও নিয়াজ ভাইয়ের ইতিহাসনির্ভর মিথ শুরুর দিকে মিস করেছি, কিন্তু ট্রোজান যুদ্ধ অধ্যায়ে সব পুষিয়ে গিয়েছে। “গ্রিক মিথলজিঃ আদি থেকে অন্ত" বইটি পুরো গল্পের ছলে লিখা, প্রাচীন গ্রিস যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে লেখকের কলমের ( নাকি কিবোর্ডের?) যাদুতে। বইটিকে গ্রিক মিথলজির এ টু জেড বললেও অত্যুক্তি হবে না। গ্রিক মিথ নিয়ে এত তথ্যবহুল বই বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়টি নে��। ছোট থেকে বড়, সব মিথগুলোই সংকলিত হয়েছে বইটির দুই মলাটের ভিতরে। যেকোন মিথলজি প্রিয় পাঠকের বুকসেলফ ও মনে জায়গা করে নিবে বইটি।


মিশরীয় মিথলজির মত “গ্রিক মিথলোজিঃ আদি থেকে অন্ত" বইটির প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠা, অধ্যায়বিন্যাস সবই অসাধারন। তবে কিছু বিষয় চোখে পড়ার মতো। প্রথমতঃ এত বড় বই হওয়া সত্ত্বেও ফিতা বা বুকমার্ক নেই। রজ্ঞিন ছবির আক্ষেপ এই বইটিতেও রয়ে গেলে। বইয়ের শেষে গ্রিক পুরানের দেবতা ও বিখ্যাত বীরদের তালিকা ও সংক্ষিপ্ত বিবরন সংযুক্ত করলে পড়তে আরেকটু সহজ হত, এটি না থাকায় প্রায়ই পিছনে ফিরতে হয়েছে, যা পড়ার সময় সামান্য বিরক্তির কারন হয়েছে। আসলে গ্রিক পুরানে এত বেশি চরিত্র , যে সেগুলো মনে রাখা প্রায় অসাধ্যই বলা চলে। আশাকরি, পরবর্তি সংস্করণে লেখক ও প্রকাশক বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখবেন।

গ্রিক মিথলজি নিয়ে বিস্তারিত জানতে “গ্রিক মিথলোজিঃ আদি থেকে অন্ত” বইটির বিকল্প নেই। প্রাচীন গ্রিসের গল্প, উপকথা, বীরত্বের কাহিনিগুলো জানতে ডুব দিতে হবে “গ্রিক মিথলোজিঃ আদি থেকে অন্ত” এর দুই মলাটের ভিতরে।

লেখকের পরবর্তী বই “ মিথলজির আদি অন্ত - ওলমেক থেকে ইনকা” এর অপেক্ষায় রইলাম।
২০২২ সালের বইমেলায় বইটি প্রকাশ পাবে।
Profile Image for Peal R.  Partha.
211 reviews13 followers
August 25, 2021
⚈ রিভিউ— ❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜

❝দেবতারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেননি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-ই দেবাতাদের সৃষ্টি করেছে।❞

তাহলে ক্যায়োস কে? ক্যায়োস কি দেবতা না অন্যকিছু? এই ক্যায়োস বা পুরো গ্রিক মিথের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে অনেকগুলো মিথ প্রচলিত রয়েছে। যে মিথগুলোর মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ পুরাণের বর্ণনা দিয়েছেন হেসিয়ড। হেসিয়ড হচ্ছেন ‘থিওগোনী’ পুরাণের জনক। এখানে বলে রাখা ভালো, পুরো গ্রিক মিথ নিয়ে হেসিয়ড ছাড়াও মহাকবি ভার্জিলের ‘ঈনিয়াড’, হোমারের ‘ইলিয়াড’, রোমান লেখক ওভিডের ‘মেটামরফোসিস’, অ্যাপোলোডোরাস, আলেকজান্দ্রিয়ার কবি কাল্লিম্যাকাস-সহ অনেকে কবি তাঁদের মহাকাব্যে ও কবিতার নানা তত্ত্ব দিয়ে পুরো গ্রিক মিথের স্তম্ভ করেছেন শক্ত। কেউ করেছেন আদিতে আর কেউ অন্তে।

তবে এতকিছু থাকার পরেও গ্রিক মিথ অনুযায়ী সৃষ্টির যে তত্ত্ব; তা নিয়ে মতভেদ থেকেই যায়। যা এখনও ধোঁয়াশাপূর্ণ। হাজার হোক মানুষের চিন্তাচেতনা বলে কথা। তবে ❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থটিকে লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা প্রায় ১৯টি বইয়ের সাহায্য নিয়ে গ্রিক মিথের সাথে অন্তর্ভুক্ত কবিদের তত্ত্ব তুলে নিয়ে এসেছেন। দিয়েছেন সবকিছুর ব্যাখা। মসৃণ লেখনশৈলীতে পুরো বইটি পরিণত করেছেন এক মহাকাব্যে। হ্যাঁ, ❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থটিকে আমি ‘মহাকাব্য’ ট্যাগ দিতেই পারি। কী নেই এই মহাকাব্যে? পুরো গ্রিক মিথলজির আদ্যোপান্ত খুবই সুনিপুণ দক্ষতার সাথে কী-বোর্ডের অনবরত চাপাচাপিতে হয়েছে জীবন্ত। আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় মিথ কী? কী উত্তর দিবেন? আমি দিব, মিথ হচ্ছে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সংযোগস্থল। ইট’স লাইক অ্যা পোর্টাল!

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ লেখক পাঠকদের সম্মুখে এমনই এক পোর্টাল তৈরি করে দিয়েছেন। যেখানে একবার ঢুকলে গ্রিক ইউনিভার্সের অজানা সব রহস্য নখদর্পণে চলে আসবে অনায়াসে। মিথ বা পুরাণকে অনেকে আলাদাভাবে দেখলেও বিষয়টি কিন্তু একই টাইমলাইনের অংশ৷ কেউ মনে করে মিথ মিথ্যা, পুরাণ সত্য! আসলে সবকিছু নিজ বিশ্বাসে ভেলা নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতোই। মিথ হতে পারে কল্পনা অথবা অলীক জগৎ। আর পুরাণ? পুরাণের বাস্তবতা উপলব্ধি কীভাবে করতে হবে তাহলে? সহজ উত্তর বা ব্যাখা আছে? মিথ ও পুরাণ নিয়ে নানা মতানৈক্য থাকলেও লেখক ভূমিকা অংশে এই নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থটি নিয়ে আমার অনুভূতি অসাধারণ। নিজে রিসার্চ করে যা-ই জেনেছি সেগুলো এই গ্রন্থে আরও বিস্তারিত আকারে জানতে পেরেছি। যা সত্যিই মুগ্ধকর। যা-ই হোক, গ্রিক মিথ নিয়ে কিছু কথা বলি। আমি আমার স্মৃতিপটের ঝাঁপি খুলে বরং আলোচনা করি...

● গ্রিক মিথের সাথে পরিচিতি ও সৃষ্টিতত্ত্ব—

ডিজনি’স হারকিউলিস গেমের কথা মনে আছে? প্রোটাগনিস্টের ভূমিকায় থাকা হারকিউলিস কে; সেটা আশা করি নতুন করে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। ১৯৯৭ সালে জুলাইয়ের ১ তারিখ ডিজনি’স হারকিউলিস গেমটি রিলিজ হয়। সিঙ্গেল-প্লেয়ার মোডের তৎকালীন সময়ে গেমটি কতটা জনপ্রিয় ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই গেম থেকে গ্রিক মিথের ডেমিগড হারকিউলিসকে চেনা। হারকিউলিস মূলত দেবতা জিউস ও মরনশীল আল্কমিনার সন্তান। তবে ❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থে হারকিউলিসকে ‘হেরাক্লেস’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন লেখক। কারণ হারকিউলিস শব্দটি ল্যাটিন, অরিজিনাল গ্রিক হচ্ছে হেরাক্লেস। যাহোক, হারকিউলিসের গেমের পরে বিভিন্ন বইয়ে গ্রিকের দেব-দেবীদের নিয়ে বিভিন্ন উৎস খুঁজে পেয়েছি। যা করেছে একইসাথে রোমাঞ্চিত ও উদ্ভাসিত। লেখকরা নিজেদের উপন্যাসে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন গ্রিক মিথের নানা ট্রাজেডি। যা এখনও চলমান, ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে৷ এই যে, এতসব কিছু খেলতে, পড়তে ও জানতে গিয়ে পরিচিত হয় গ্রিক মিথের সাথে। শুধু জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘ট্রয়’ সিনেমার একিলিসের কথা মনে আছে? প্যারিস, হেক্টরদের কথা? ট্রোজান যুদ্ধের কথা? যখন সিনেমাটি দেখতাম একেবারে নস্টালজিয়া হয়ে যেতাম। সেই তখন থেকে গ্রিক মিথের আদ্যোপান্ত জানার জন্য তোলপাড় শুরু করি ইন্টারনেট। তথ্য জানার জন্য হামলে পড়তাম উইকিপিডিয়া থেকে ইউটিউবে। তারপরও জানা হতো না, আসলে মূল সংযোগস্থল খুঁজে পেতাম না।

যখন যা-ই তথ্য পেতাম মোবাইলের নোটপ্যাডে টুকে রাখতাম। গ্রিক দেব-দেবী নিয়ে বেশ ভালো ধারণা পেলেও অ্যাপোলো, আর্টেমিস, হার্মিস, হেস্টিয়া, ডায়োনিসাস নিয়ে জ্ঞান ছিল একেবারে শূন্যের কৌটায়। এ ছাড়া বিস্তারিতভাবে জানতাম না গ্রিক মিথের সৃষ্টি রহস্য নিয়েও। ক্যায়োস কে, কীভাবে ক্যায়োস থেকে পুরো পৃথিবী, পাতালপুরী ও ভালোবাসার সৃষ্টি। এরপরে গায়া, যাকে গ্রিক পুরাণের মূল স্তম্ভ বলা হয়। গায়া বা পৃথিবী থেকে সৃষ্টি হয় ইউরেনাস। গায়া মা ও ছেলে ইউরেনাসের মিলিত হলে অভ্যুদয় ঘটে টানটানদের। টাইটানরা মোট ১২ জন। ভাই ৬ জন, বোন ৬ জন। ক্রোনাস হচ্ছে সেই টানটানদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো, যে কি-না তার বাবা ইউরেনাসকে করেছে নপুংসক আর ছোটো বোন রিয়াকে করেছে বিয়ে। ক্রোনাস ও রিয়া থেকে জন্ম নেয় জিউস-সহ বাকি পাঁচ ভাই-বোন। তারাই পরবর্তীতে ক্রোনাস থেকে পালিয়ে, টাইটানদের হারিয়ে অলিম্পাস পাহাড়ে বসবাস শুরু করে। তাই তাদেরকে অলিম্পিয়ান বলা হয়।

এছাড়া মানবজাতির সৃষ্টিতে প্রমিথিউসের ভূমিকা, পান্ডোরার জার বা বক্সের অভিশাপের মতো কাহিনিও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যা ফোকলার বা লোকগাথা হিসেবে বহুল প্রচলিত।

খুব সংক্ষেপে সব ব্যাখা করলেও কাহিনির বিস্তৃত অনেক বেশি। ক্রোনাসের উৎপত্তি থেকে জিউসের বেঁচে থাকার রহস্য। এ ছাড়াও ক্ষমতার লোভ যেন সৃষ্টির শুরু থেকে প্রবাহমান। ❛গ্রিক মিথলজি আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থটি ৪টি অধ্যায়ে ভাগ করা। প্রথম অধ্যায় হচ্ছে—সৃষ্টিতত্ত্ব। শুধুমাত্র ক্যায়োস থেকে জিউস পর্যন্ত আসতে লেখক খরচ করেছেন ৬০ পৃষ্ঠা। তাই প্রত্যক ঘটনার পেছনে কারণ জানতে হলে পড়া ছাড়া বিকল্প নেই।

● দেবতাদের গল্প—

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়। যেখানে রয়েছে অলিম্পিয়ান দেবতাদের পরিচিতি। শুরুটা হয় দেবতাদের রাজা জিউস থেকে। এরপরে আসে বিয়ে, নারী ও জন্মের দেবী হেরা, জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনা, কামার দেবতা হেফাস্টাস, শিকারির দেবী আর্টেমিস, আলো ও সত্যের দেবতা অ্যাপোলো, বার্তাবাহক হার্মিস, কুমারী দেবী হেস্টিয়া, যুদ্ধের দেবতা অ্যারিস, ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি, সমুদ্র দেবতা পসাইডন, পাতালপুরী দেবতা হেডিস, মর্ত্যের দেবী দিমিতার ও দেবতা ডায়োনিসাস।

প্রায় ২০৯ পৃষ্ঠা খরচ করে লেখক বর্ণনা করেছেন দেব-দেবীদের নান�� কাহিনি। যেখানে তাদের চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যাবলি, জন্ম ও শৈশব-সহ অলিম্পাস পর্বত এবং মর্ত্যে করা কর্মকাণ্ড দিয়ে পূর্ণ। মূল দেবতাদের বাইরে রয়েছে উপদেবতা, বন দেবী, গৌণ দেবতা-সহ জায়ান্ট, হাইড্রা, মেডুসার মতো আইকনিক অ্যান্টাগনিস্ট চরিত্রের সমাহার। তা ছাড়াও হেকাট, থানোটোস, মরফিয়াস, এরিনি-সহ অনেক পাতালপুরীর অধিবাসীদের কাহিনিও রয়েছে।

গ্রিক মিথের দেব-দেবীরা সবসময় ব্যভিচারে মত্ত থাকতেন। সবাই না। তবে কেউ প্রত্যক্ষ তো কেউ পরোক্ষভাবে। ব্যভিচার প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে পজিটিভ ও নেগেটিভ দুই দিক অবশ্য আসবে। তবে যে দিকটি বেশি প্রস্ফুটিত হতো তা হচ্ছে, কোনো দেবতা যখন মর্ত্যে কোনো মরণশীল মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করত তা দেখে অন্য দেবতা বা দেবী ঈর্ষা করা সেই মরণশীল মানুষটির ক্ষতি করত। দেবতারা যে একেবারে দুধে ধোয়া তুলসি পাতা ছিল না, তার প্রমাণ মিলে ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট কাজের মাধ্যমে। গ্রিক মিথের শুরুটা যেখানে হয়েছে সন্তান ও মায়ের মৈথুনের মাধ্যমে সেখানে এসব গর্হিত আচার খুবই তুচ্ছ মনে হবে। একেকজন দেবতার দেবী ছাড়াও থাকত অসংখ্য নারী প্রেমিকা। একইভাবে দেবীদের, দেবতা ছাড়াও অনেক মরণশীল পুরুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে জন্ম দিত উপদেবতার। সমকামিতার মতো অপকৃষ্টের উদাহরণ এই গ্রিক মিথ থেকে উদ্ভব হয়েছে।

পজিটিভ দিকে বলতে গেলে, মানব সভ্যতা বিকাশের জন্য দেব-দেবীদের মর্ত্যের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হতো। আর সেই সংযোগ স্থাপনের জন্য অপহরণ, ধর্ষণও তখন বৈধ ছিল। অর্থাৎ দেবতারা করলে যা বৈধ, আর মানুষরা করলে তা অবৈধ! এটাই মনে হয়, দেবতা ও মানুষদের মধ্যে পার্থক্য!

অন্যদিকে দেবতাদের মধ্যেও ছিল মানবীয় গুণাবলি, ত্রুটি, পরকীয়া, ঈর্ষাকাতরতা ও প্রতিশোধপরায়ণতা। মূলত এসব পজিটিভ দিকগুলোর কারণে গ্রিক মিথ মানুষদের নিকট এতটা আকর্ষণীয়। কিউপিড (এরোস, আফ্রোদিতির সন্তান) ও সাইকির অসাধারণ প্রেমকাহিনি এই অধ্যায়ের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

● স্থানীয় মিথ—

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়। দেবতাদের পরিচিতি করানোর মাধ্যমে মর্ত্যের অনেক নারী-পুরুষের পরিচিত দ্বিতীয় অধ্যায়ে চলে এসেছে। সেই নারী-পুরুষদের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যাবে স্থানীয় মিথে। কে কোন দেবতার সন্তান, কোন দেবীর সাথে কার সম্পর্ক, কে কাকে ঘৃণা করে, কে কাকে সাহায্য করে ইত্যাদি। এছাড়া মর্ত্যে যে মিথগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ডিওক্যালিয়ন প্লাবন, ক্যালিডোনের বন্য শূকর অভিযান, স্বর্ণ মেষের চামড়া অভিযান, থেবিসে সপ্তরথী হামলা, হেরাক্লেসের (হারকিউলিস) বারোটি শ্রম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া গ্রিক বীর পার্সিউস, মিনোস, মিডিয়া, থিসিউস ও ঈডিপাসের করুণ কাহিনি দিয়ে স্থানীয় মিথ পরিপূর্ণভাবে লেখা হয়েছে।

ট্রয় যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে অনেকে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ছিল। আবার কেউ কেউ সরাসরি অংশগ্রহণও করেছিল। তাছাড়া বিক্ষিপ্ত কোনো ঘটনার দেখা মিলেনি। ঘটনাগুলো এমনভাবে সাজানো যা অন্য ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। দ্বিতীয় অধ্যায় ও তৃতীয় অধ্যায় একই সমান্তরাল রেখায় চলছিল। জানাশোনা অনেক কাহিনি ‘স্থানীয় মিথ’ অধ্যায়ে খুঁজে পাবেন একইসাথে পরিচিত অনেক চরিত্রদের জীবন বৃত্তান্ত জানতে পারবেন। হেরাক্লেসের বারোটি শ্রম, স্বর্ণ মেষের চামড়া অভিযান রোমাঞ্চিত যেমন করবে তেমনই ঈডিপাস ও মিডিয়ার কাহিনি ব্যথিত করবে।

পুরো গ্রিসের যে সব নগররাষ্ট্র রয়েছে, সেগুলোর গোড়াপত্তনের কাহিনিও জানতে পারবেন। কীভাবে সেইসব রাষ্ট্রের নামকরণ হয়েছে, কে শাসন করেছে। কোন রাষ্ট্রের ওপরে কোন দেব-দেবীর শাসন চলে, কেন এই রাষ্ট্র নিয়ে দেব-দেবীদের মধ্যে যুদ্ধ লেগে থাকে ইত্যাদি। এ ছাড়া গ্রিক মিথে অন্যান্য মন্দির থেকেও সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ডেলফির মন্দির। যে মন্দির গেলে ভবিষ্যৎ জানা যায়! পুরো গ্রিক মিথের অগ্রে গণ্য হচ্ছে ডেলফির মন্দির। এই মন্দিরের প্রধান দেবতা অ্যাপোলো। যিনি মন্দিরের যাজিকাদের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বলে দিতেন।

তৎকালীন সময়ে মর্ত্যের মানুষদের পাতালপুরী দর্শন করার সৌভাগ্য হতো। মৃত্যুর পরেও প্রিয়জনদের সাথে দেখা ও কথা বলার সুযোগ মিলত। যা গ্রিক মিথের অন্যতম আকর্ষণও বটে।

এইসব কিছু ছাড়াও কীভাবে বিভিন্ন নদী, সমুদ্র, পাহাড়ের নামকরণ হয়েছে, মরুভূমির উৎপত্তি, কোন পাখি কে তৈরি করেছে, কীভাবে জন্তু-জানোয়ারের জন্ম হয়েছে, মিল্কিওয়ে কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে উদ্ভব ঘটেছে, নক্ষত্রপুঞ্জের অভ্যুদয়-সহ নানা মিথ এই অধ্যায় থেকে বিস্তারিতভাবে জানা যাবে।

● ট্রোজান যুদ্ধ—

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থের চতুর্থ ও শেষ অধ্যায়। একিলিস, প্যারিস ও হেক্টরের কথা তো আগেই বললাম। হেলেনকে চিনেন? না চেনার উপায় নেই। যার কারণে দীর্ঘ দশ বছর ট্রয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল গ্রিস বাহিনীরা। অনেকটা অলিম্পিয়ান ও টাইটানদের যুদ্ধের মতো। ওই যুদ্ধও দশ বছর স্থায়ী ছিল।

যাহোক, চতুর্থ অধ্যায়ের শুরুতে ট্রয়ের নগরীর গোড়াপত্তনের কাহিনি দিয়ে শুরু। একে একে পরিচিত করানো হয়েছে গ্রিস বাহিনীর সকল বীরদের। যাদের মধ্যে হেলেনের পাণিপ্রার্থী ছিল অসংখ্য। তারা সবাই ট্রোজান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। মূলত একিলিস ও আগমেননের কাহিনি ভিত্তি করে হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ট্রোজান বংশদ্ভূত যুবরাজের ঈনিয়াসের ভ্রমণকেই উপজীব্য করে মহাকবি ভার্জিলের ‘ঈনিয়াড’ রচয়িতা হয়েছে।

ট্রোজান যুদ্ধে গ্রিক দেবতাদের হস্তক্ষেপ ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। জিউস থেকে শুরু করে হেরা, পসাইডন, অ্যাপোলো, এথেনা এমনকি আফ্রোদিতি-সহ প্রায় দেব-দেবী এই যুদ্ধে নিজেদের সন্তানদের সাহায্য করার প্রয়াস করেছেন। একদল গ্রিসদের পক্ষে থাকলে, অন্য দল ট্রোজানদের পক্ষে লড়াই করেছেন। কলকাঠি শুধু যে অলিম্পাস পর্বতে বসে নাড়িয়েছেন তা নয়, স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে এসে নিজেরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করেছেন। যে লড়াইয়ের রেশ আবার অলিম্পাসে পর্বত পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

বাকি ট্রোজান যুদ্ধ শেষে কোন বীরের কী পরিণতি হয়েছে, দেবাতারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা একেবারে বই পড়ে জেনে নিবেন। গ্রিক মিথের এই জার্নি আপনাকে আমৃত্যু পর্যন্ত স্মরণ করাবে৷ আপনি যেভাবে বারবার পুলকিত হবেন অভিন্নভাবে ব্যথিত-ও হবেন।

-

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থটির অধ্যায় বিন্যাস সাজানো-গোছানো। তবে চরিত্র মাত্রাতিরিক্ত থাকাতে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে যেতাম। কয়েকবার গুলিয়েও ফেলেছি। ভুল হচ্ছে, আমি টানা পড়েছি। পুরো বই খতম দিতে আনুমানিক ৫ দিন ব্যয় করেছি। প্রথম অধ্যায় থেকে নিজেকে যেভাবে গ্রিক মিথের রাজ্যে হারিয়ে ফেলেছি—সেই থেকে আর বেরুতে পারিনি। এতদিনের আকাঙ্ক্ষিত কিছু যখন হাতে পাওয়া যায়, তখন সহজে ছাড়তে মন চায় না। এই মহাকাব্য প্রকৃতপক্ষে আয়েশ করে ঠান্ডা মস্তিষ্কে পুরো সৃষ্টিতে বিচরণ করার মতো। হুট করে ডুবে, টুপ করে উঠে গেলে মজা নষ্ট হবে। আর যদি নিজেকে ধরে রাখতে না পারেন, তবে বিলিয়ে দিন বিনা দ্বিধাদ্বন্দে। কিন্তু সাবধানে।

পুরো ❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থে ‘স্থানীয় মিথ’ অর্থাৎ তৃতীয় অধ্যায় হচ্ছে অনেক ইফেক্টিভ। বলতে পারেন প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ের যত কার্যক্রম সব তৃতীয় অধ্যায়ে এসে জড়ো হয়েছে। দেবতাদের হস্তক্ষেপ ট্রোজান যুদ্ধ থেকে স্থানীয় মিথে মাত্রাতিরিক্ত ছিল। তাই এই অধ্যায় ধীরেসুস্থে পড়া বাঞ্ছনীয়।

➣ লেখক নিয়ে কিছু কথা—

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থের শুরুতে লেখক ��স এম নিয়াজ মাওলা ভূমিকা অংশে পুরো গ্রিক মিথ নিয়ে সুন্দর ধারণা উপস্থাপনা করেছেন। যা বইটি শুরু করার পূর্বে ব্যাসিক লেসন হিসেবে কাজে দিবে। এছাড়া উনি পুরো গ্রন্থটি লেখতে কতটা পরিশ্রম করেছেন তা সহজে অনুমান করা যায়। ওনার এই পরিশ্রম ফল হয়েছে সুমিষ্ট। আমি ব্যক্তিগতভাবে ওনার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। শুধু গ্রিক মিথের জন্য না মিশরীয় মিথ-সহ লেখা অন্যান্য বইয়ের জন্যও। সময়-সুযোগ হলে ওনার বাকি বইগুলো অবশ্যই পড়ে ফেলব।

মিথলজি পাঠকদের বাইরে অন্যান্য পাঠকদের নিকট এই বই পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আশাবাদী। কোনো এক সময় এই গ্রন্থটি অ্যান্টিক পিস হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও অবাক হব না।

লেখকের পরবর্তী ❛মিথলজির আদি অন্ত— ওলমেক থেকে ইনকা❜ গ্রন্থটির জন্য অগ্রিম শুভকামনা।

● সম্পাদনা ও বানান—

সম্পাদনার ত্রুটি হিসেবে আমি নামের গড়মিল উল্লেখ করব। প্রথমে হেরাক্লেস নিয়ে বললে, হেরাক্লেস থেকেও হারকিউলিস জনপ্রিয় নাম। হোক তা ল্যাটিন। অন্যান্য চরিত্র যখন গ্রিক ও রোমান দুইভাবে পরিচিত করানো হচ্ছিল, উচিত ছিল ‘হেরাক্লেস (হারকিউলিস)’ এভাবে লেখে অন্তত জানিয়ে দেওয়ার। কারণ শুরু থেকে হেরাক্লেসের কার্যকলাপ লক্ষণীয়।

এছাড়া হার্মিস-কে হের্মিস, ঈটিস-কে ঈটিজ, এন্টিক্লিয়া-কে এন্টিসিলিয়া এরকম নামের দুটো ভার্সন দেখা গিয়েছে। এমনিতে প্রচুর ক্যারেক্টর তার ওপর নামের পরিবর্তন পড়ার গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। তাছাড়া বানানের আদ্যক্ষর হিসেবে ‘এ’ ও ‘অ্যা’ বিভ্রাট ছিল। কাটছিল-কে কাঁছিল, কাটলে-কে কাঁলের মতো টাইপো রয়েছে বেশকিছু।

তবে পড়ার ভূত একবার চাপলে তখন ডোন্ট কেয়ার মনোভাব এমনিতে চলে আসবে। আশা করছি, পরবর্তী সংস্করণে ছোটোখাটো ভুলগুলো ঠিক করে নেওয়া হবে৷

● প্রচ্ছদ, অলংকরণ—

প্রচ্ছদ মোটামুটি লাগলেও ভেতরের অজস্র অলংকরণ বেশ ভালো লেগেছে। অধ্যায় ও অনুচ্ছেদের সাথে মিল রেখে অলংকরণগুলো শোভা বর্ধন করতে বিশেষ সহযোগিতা করেছে। রঙিল হলে তো কোনো কথাই ছিল না।

● মলাট, বাঁধাই, পৃষ্ঠা—

❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜ গ্রন্থের মলাট টেকসই লেগেছে। বিশেষ করে সাইজের কারণে ভয়ে ছিলাম, যাতে কোনো ক্ষতি না হয়ে যায়। তবে বাঁধাই মজবুত হওয়ার কারণে সেটা আর হয়নি। তবে ঢাউস সাইজের বইটিতে একটি বুকমার্ক অনেক মিস করেছি। ব্যস্ততার কারণে হয়তো কোনোভাবে চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। এছাড়া পৃষ্ঠার কোয়ালিটি বেশ ভালো, লাইন গ্যাপ ও ফন্ট সাইজ পারফেক্ট। সুন্দরভাবে অলংকার দেওয়া, সেখানে রেফারেন্স হিসেবে চিত্রকরদের নাম উল্লেখ করা প্রশংসনীয়। সবমিলিয়ে দুর্দান্ত।

সবশেষে গুডরিডসে গ্রন্থটি খুঁজে পেতে ‘গ্রিক’ শব্দটি ‘গ্রীক’ লেখে সার্চ দিতে হবে।

⊙ বই : ❛গ্রিক মিথলজি— আদি থেকে অন্ত❜
⊙ লেখক : এস এম নিয়াজ মাওলা
⊙ জনরা : মিথলজি
⊙ প্রথম প্রকাশ : গ্রন্থমেলা ২০১৭
⊙ দ্বিতীয় মুদ্রণ : গ্রন্থমেলা ২০১৮
⊙ তৃতীয় মুদ্রণ : গ্রন্থমেলা ২০২১
⊙ অলংকরণ : শামীম আহম্মেদ
⊙ প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা
⊙ প্রকাশনা : জাগৃতি প্রকাশনী
⊙ মুদ্রিত মূল্য : ১০০০ টাকা মাত্র
⊙ পৃষ্ঠা : ৫৬০
Profile Image for Adham Alif.
335 reviews81 followers
November 27, 2022
এবছরের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে পড়া বই এটা। শুধু এবছর কেনো, আমার ক্ষুদ্র জীবনে এতো লম্বা সময় কোনো বইয়ের পেছনে যায়নি(টেক্সট বুক ছাড়া!)

প্রায় সাত মাস লাগল বইটার শেষ অব্দি পৌছাতে। গ্রিক দেবতারা সংখ্যায় বেশ সঙ্গে তাদের কর্মকান্ডও। দশ-পনেরো পৃষ্ঠা পড়ার পড়েই মনে হতো জট পাকিয়ে যাচ্ছে। এভাবে খুবই ধীরে সুস্থে কয়েকদিন পরপর পড়তে হয়েছে বইটা। চাইলে বহু অসমাপ্ত বইয়ের মতো এটাকেও আধেক পড়ে ফেলে রাখতে পারতাম কিন্তু গ্রিক মিথ নিয়ে প্রবল আগ্রহের দরুন শেষ দিলাম।

গ্রিক মিথোলজির বর্ণনা আসলে আরও বিশাল। লেখককে অনেক জায়গাতেই মূল বর্ণনা টেনে সংক্ষেপ করতে হয়েছে। তাতেই প্রায় ছয়শো পাতার বই হয়ে গিয়েছে৷ আমার এক বন্ধু মজা করে প্রায়ই বলে,"এই গ্রিক দেবতারা একটু কম হর্ণি হলে এই বইটা দশভাগের এক ভাগ হতো!"
Profile Image for Nuha.
Author 9 books26 followers
May 22, 2017
আমরা প্রায় সবাইই ছোটবেলা থেকে গ্রীক মিথলোজির নানা গল্প একটু একটু পড়েছি। দেবতা জিউস, ডানাওয়ালা ইকারুস, শক্তিশালী হারকিউলিস , কপালে এক চোখ নিয়ে জন্মানো সাইক্লোপ্স কিংবা আফ্রোদিতির প্রেম কথা, দেবী হেরা- এদের নিয়ে আমাদের আগ্রহের কোন কমতি নেই। প্রাচীন গ্রীসের মানুষজন অসংখ্য দেবতায় বিশ্বাস করতো। সুবিশাল গল্পের ভান্ডার সেই দেবতার। বাংলা ভাষা-ভাষীদের জন্য গ্রীক মিথোলোজির উপর বিস্তৃত এবং সুন্দর পরিপূর্ণ বিবরণ সহ একটি বই গ্রীক মিথোলোজি- আদি থেকে অন্ত।

আমি নিজে গ্রীক মিথোলজির একজন পাড় ভক্ত। বইমেলাতে এবারে যেসব বই কিনতেই হবে লিস্টিতে তার মধ্যে এটি ছিলো এক নম্বরে! সব্যসাচী হাজরার করা পরিষ্কার সুন্দর ঝকঝকে প্রচ্ছদ দেখতেই মন ভালো হয়ে যায়। প্রথম অধ্যায় শুরুই হয়েছে সৃষ্টিতত্ত্ব দিয়ে।হেসিয়ডের থিওগোনীর ব্যখ্যা দিয়ে শুরু করে বইটিতে জিউসে জন্ম, প্যান্ডোরার আগমন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়টি ছিল দেবতাদের নিয়ে। তৃতীয় অধ্যায়ে স্থানীয় মিথ গুলোকে স্থান দেয়া হয়েছে।চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা বিখ্যাত ট্রোজান যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারি। ঈনিয়াসের মৃত্যু সম্পর্কে কিছুটা ধারণা মধ্য দিয়ে বইটি শেষ করা হয়েছে। বইটির শেষে গ্রন্থসহায়িকাও যুক্ত করা হয়েছে। যে কেউ ছাইলে সেই বই গুলোও পড়ে নিতে পারেন!

গ্রীক মিথোলজি- আদি থেকে অন্ত বইটি অনেক অনেক অনেক বেশি ইনফরমেটিভ। যারা গ্রীক মিথোলোজি কে ধারাবাহিক ভাবে পড়তে, জানতে এবং বুঝতে চান তাদের জন্য অসাধারণ। বেশ সহজ এবং প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা। বিভিন্ন উৎসের ছবিও যুক্ত করা হয়েছে, পড়তে পড়তে চোখ বুলিয়ে নেয়া যায় তাই সহজেই। ছয়শ ঊনত্রিশ পাতার বইটি শেষ করতে বলাইবাহুল্য অনেক বেশিই সময় লেগেছে। তবে পুরোটাই WORTH IT!!! লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ এত চমৎকার একটা পদক্ষেপ নেয়ার জন্য।

Happy Reading! ^_^
Profile Image for মারজানা সাবিহা.
3 reviews4 followers
January 20, 2018
‘গ্রীক মিথোলজি-আদি থেকে অন্ত’
পুরাণকাহিনীর অতল মহাসমুদ্রে ডুবুরির সন্তরণ।

“নিহত জনক আগামেমনন কবরে শায়িত আজ...”
শামসুর রাহমানের এই অনবদ্য কথা মালা যখন পাঠ করি, এই প্রশ্নটা কি মনে গুঞ্জন তোলে না-কে আগামেমনন? কী ঘটেছিলো তার সাথে, যে কবি বঙ্গবন্ধুর সাথে তাকে তুলনীয় মনে করেছেন?

অথবা যখন পড়ি ইলেকট্রার গান- কিংবা মনে ঝঙ্কার তোলে চিরবিদ্রোহী নজরুলের ছন্দ-
“আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী, মহা-সিন্ধু উতলা ঘুম্‌ঘুম্‌
ঘুম চুমু দিয়ে করে নিখিল বিশ্বে নিঝ্‌ঝুম...”

ঠিক তেমনি কৌতুহলটুকু মনে দানা বাঁধে, কে ইলেকট্রা? কে অর্ফিয়াস? বুঝি খুব মাদকতাময় সুরে বাঁশি বাজাতে পারতো অর্ফিয়াস?

জানতাম সব প্রশ্নের উত্তর আছে গ্রীক মিথোলজিতে। কিন্তু এ কি আর সহজ বিষয়! সহজ ভাষায় সহজ কথায় কে আর লিখে রেখেছে এতো সব কৌতুহলের জবাব আমাদের জন্য? একেকটা বিষয়ে একেকটা লেখা পড়ি। তাতে তো মন ভরে না। তাই ‘গ্রীক মিথোলজি- আদি থেকে অ���্ত’ বইটির নাম যেদিন দেখলাম, মনে হলো এবার হয়তো পেয়েছি সেই পুরাণ কথার দারুণ দারুণ সব মণি মুক্তার সন্ধান এক মলাটের ভিতরে!

লেখক কে?- এস এম নিয়াজ মাওলা। ফেসবুক ভিত্তিক সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রুপ পেন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা এডমিন। ইতোমধ্যে যাঁর লেখার আকর্ষণী শক্তির সাথে পরিচয়ের সুবাদে নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম- এই বইটি পড়তে হবে। তাহলেই সেই ছোট থেকে শুনে আসা দূর দেশী কথাকাহিনীর নামগুলোর সাথে এবার চাক্ষুস পরিচয়ের সুযোগ হবে।

কিনে নিলাম বইটি, রকমারি ডট কম থেকে। প্রচ্ছদের পৌরাণিক চরিত্রগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হয়। ব্যাক কভারের দিকেও। পুরোটা মিলে একটাই চিত্র। এক নজরে দেখে ফেলার মতো নয়। প্রচ্ছদচিত্রই যদি এতো খুঁটিয়ে দেখতে হয়, সমস্ত বইটিতে না জানি কালির অক্ষরে কতো আগ্রহোদ্দীপক কাহিনীর ঠাসবুনোট! বইয়ের আকার আর পৃষ্ঠা সংখ্যাই সে কথা অনেকটা বলে দেয়। গ্রন্থসহায়িকা বাদে মোট ৬২৯ পৃষ্ঠার বই! এ যেন এক স্বর্ণখনি!

বলে রাখি, পুরো বইটিতেই এমন অসংখ্য চিত্তাকর্ষক ছবি আছে। সারা পৃথিবীর বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা গ্রীক মিথোলজির যে সব কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন রংতুলির আঁচড়ে, সেই সব চিত্রকর্মের ছবি রয়েছে বইটির পাতায় পাতায়। আছে ভাস্কর্যের ছবিও। কয় শত ছবি আছে গুণে দেখার চেষ্টাও করি নি। সাদাকালো না হয়ে ছবিগুলো রঙিন হলে একটা দুর্দান্ত ব্যাপার হতো, কিন্তু তখন বইয়ের দামটিও আমার মতো সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যেতো। তাই এ নিয়ে তেমন দুঃখ করছি না।

বইটির প্রকাশক এ সময়ের সাহসী প্রকাশনী জাগৃতি, যে জাগৃতি জঙ্গিবাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে চলমান রেখেছে তার অগ্রযাত্রা; পাশে দাঁড়াচ্ছে নবীন লেখকদের। আর সোনায় সোহাগা হয়ে চমৎকার শব্দগুচ্ছে বইটির সুখপাঠ্য মুখবন্ধ লিখেছেন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কথাশিল্পী মাহরীন ফেরদৌস।

আগ্রহের সাথে পড়া শুরু করেছি তাড়াতাড়ি। কী কী আছে এই এক মলাটের ভিতরে? কী নেই সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে হয়তো লেখা সহজ হতো। কিন্তু যেহেতু আমি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই, তাই বলতে পারছি না কিছু বাদ গিয়েছে কি না এতো বিশাল গ্রন্থ লেখার পরেও। তাই কী আছে সেদিকেই একটু চোখ বুলাই।

প্রথমেই এক সুবিন্যস্ত ভূমিকা। মিথের সংজ্ঞা, রকমফের, মিথের উৎস বর্ণনা। দেখছি, অনেক উৎস রয়েছে। জানতে পারলাম গ্রীক মিথের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবে মহাকবি হোমার, হেসিয়ড, গীতি কবি পিন্ডার, ঐতিহাসিক হেরোডটাস, রোমান কবি ভার্জিল, ওভিদ প্রমুখের নাম।

মূল বইটিতে কোন্‌ কোন্‌ বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে, একটু গুছিয়েই নজর দেওয়া যাক।

 সৃষ্টিতত্ত্বঃ
বইটি শুরু হয়েছে গ্রীক পূরাণে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব দিয়ে। পৃথিবী সৃষ্টির আদিকথা নিয়ে নানা মুনির নানা মত এবং সেসব কাহিনী পাওয়া যাওয়ার উৎসও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গায়া, টাইটান যুগের সূচনা, সাইক্লোপ, সেন্টরের জন্ম, জিউস, প্রমিথিউস প্রভৃতি দেবতাদের পর ক্রমান্বয়ে মানুষের সৃষ্টি, মানুষের জন্য প্রমিথিউসের স্বর্গ থেকে আগুন চুরি, পৃথিবীর প্রথম মানবী প্যান্ডোরার কাহিনী, ডিওক্যালিয়নের প্লাবন ... শুরু থেকেই এমন সব চমকপ্রদ বর্ণনা।

বই থেকেঃ
“...প্রমিথিউস অনেক চিন্তা ভাবনা করে, অসম্ভব যত্নে, প্রচন্ড আবেগ দিয়ে এক দলা মাটি নিয়ে মানুষ তৈরী করতে লাগলেন। প্রমিথিউস মানুষকে দেবতাদের মতো আকৃতি দিলেন, মানুষকে সোজা হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা দিলেন আর দিলেন আকাশের দিকে তাকানোর সামর্থ্য। ...
... মানুষ তৈরী করার পর প্রমিথিউস দেখলেন, তাঁর ভাই এপিমেথিয়াস জিউসের দেওয়া সব উপহার অন্যান্য পশু পাখিকে দিয়ে শেষ করে ফেলেছেন, এবং মানুষকে দেবার জন্য অবশিষ্ট আর কিছু নেই। যেখানে, অন্যান্য পশু পাখি শক্তিমত্তা, দ্রুততা, শক্ত খোলস, গরম পালকসহ অনেক কিছুই পেয়েছে, সেখানে মানুষ ছিলো নগ্ন, ছিলো দুর্বল, ছিলো অনিরাপদ।” (পৃষ্ঠা ৫৩)

এরপর প্রমিথিউস প্রিয় মানুষের জন্য আগুন চুরি করেছিলেন স্বর্গ থেকে। সে এক চমকপ্রদ কাহিনী।

 দেবতাদের গল্পঃ
দ্বিতীয় অধ্যায়ে গ্রীক মিথোলজিতে যত ছোট বড় দেবতার সন্ধান পাওয়া যায় সবাইকেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় আমাদের সাথে। আছেন জিউস, এথেনা, হেরা, আর্টেমিস, এপোলো, হার্মিস, আফ্রোদিতি, পসাইডেন , দেবতা প্যান, ডায়োনিসাস এবং আরো অনেক অনেক দেব-দেবী। তাদের বংশধারা, জীবনের সুখদুঃখ, যুদ্ধ -ষড়যন্ত্র, প্রেম ভালবাসা, হিংসা-বিবাদ, বিয়ে এমনকি পরকীয়া - যেন দেবকূলের মানবিক উপাখ্যান সাজানো ২৩৩ পৃষ্ঠার বিশাল কলেবর জুড়ে। আর লেখকের ভাষা সব প্রসঙ্গেই সমান প্রাঞ্জল, কোথাও হোঁচট খেতে হয় না।

বই থেকেঃ
“ইকো ছিলেন বনের একজন নিম্ফ। তার বসবাস ছিলো বোয়েশিয়ার সিথায়েরোন পাহাড়ে। দেবতা জিউস এইসব বনের অনেক নিম্ফের সাথে মিলিত হতে আসতেন। কিন্তু দেবী হেরা যাতে ব্যাপারটি বুঝতে না পারে অথবা বুঝতে পারলেও নিম্ফটি যাতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়, সেজন্য জিউস নিম্ফ ইকোর সাহায্য নিতেন। ...... হেরা পাহাড়ের কাছে এলেই ইকো তার সাথে অবিরাম বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। এই সুযোগে জিউসের সাথে মিলনরত নিম্ফটি বা জিউস নিজেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। একদিন হেরা ইকোর অবিরাম কথা বলার রহস্য বুঝে ফেললেন। ক্ষুব্ধ হয়ে তখন অভিশাপ দিলেন, অন্যের কথার প্রতিধ্বনি করা ছাড়া ইকো নিজের জিহবা ব্যবহার করতে পারবেন না।” (পৃষ্ঠা ২৭৪)

আমরা জানি ইকো মানে প্রতিধ্বনি, কথাটা তাহলে এসেছে এই পুরাণ কাহিনী থেকেই!

স্থানীয় মিথঃ
সম্ভবত গ্রীসের স্থানীয় বিভিন্ন চারণ কবিদের রচিত স্তবগাঁথায় পাওয়া মিথগুলো এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। আছে হেলেনের বংশধরদের কথা, এলিস ও ক্যালিডোনের পুরাণ, আটলান্টা, আর্গসের কিংবদন্তী, গ্রীক বীর পার্সিউসের কথা, মেডুসা বধ, মিনোসের গল্পগাঁথা, ক্যাট্রেয়াসের গল্প; এখানেই পাই আগামেমননকে। আছে আর্গো জাহাজে অভিযানের কাহিনী, ইউরোপা অপহরণ, ঈডিপাসের করুণ কাহিনী...আরো অনেক অনেক আকর্ষণীয় পুরাণ গাঁথা এই অধ্যায়ের ২০৪টি পৃষ্ঠা ভরে রয়েছে আমাদের কৌতুহল মেটানোর জন্য। একবার পড়ে মনেও রাখা সম্ভব নয় এতো কাহিনী।

 ট্রোজান যুদ্ধঃ
বিখ্যাত বা কুখ্যাত ট্রয় যুদ্ধের কথা কে না জানে। ছোটবেলায় বইয়ে দেখেছিলাম বিশাল কাঠের ঘোড়ার ছবি,যার পেটের মধ্যে লুকিয়ে ছিলো গ্রীক সৈন্যরা। কী রোমাঞ্চকর মনে হতো সেই সব বীরদের সাহসিকতার গল্প।এই অধ্যায়ে আছে সেই ট্রয় যুদ্ধের জানা-অজানা কাহিনী। পদস্খলনের গল্প, এক সমৃদ্ধ নগরের পতনের বেদনাগাঁথা। মানুষের বিরুদ্ধে দেবতাদের ষড়যন্ত্রের নিষ্ঠুর ইতিহাস। ট্রয় নগরী,হেলেন,প্যারিস,আপেল অব ডিসকর্ড,জাজমেন্ট অব প্যারিস, ট্রয় যুদ্ধের কারণ,গ্রীস বাহিনীর যাত্রা শুরুর কাহিনী,মেনেলাউসের সাথে প্যারিসের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ, বীর হেক্টর, জিউসের হস্তক্ষেপ,ট্রয়ের পতন,প্যারিসের মৃত্যু… সেই পৌরাণিক ইতিবৃত্তের আরো অনেক খুঁটিনাটি সুলতিত ভাষায় বর্ণনা করেছেন লেখক বইয়ের এই শেষ অধ্যায়ে।

বই থেকেঃ
“... প্যারিস তখন ইডা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু চূড়া গারগারাসে গরুর পাল চড়াচ্ছিলেন। এমন সময়ে হার্মিস দেবী হেরা, এথেনা এবং আফ্রোদিতিকে নিয়ে তাঁর সামনে আসেন। হার্মিস প্যারিসকে সোনালী আপেলটি দিয়ে জিউসের বার্তা শোনালেন, ‘প্যারিস, তুমি যেহেতু সুদর্শন একজন পুরুষ এবং হৃদয়ের ব্যাপারে তুমি খুবই বুদ্ধিমান, তাই মহান জিউস আদেশ দিয়েছেন-এই তিনজন দেবীর মধ্যে যিনি সবচেয়ে সুন্দরী, তাঁকেই এই আপেলটি দাও!’
ইতস্ততভাবে আপেলটি নিয়ে প্যারিস বললেন, ‘কীভাবে একজন সাধারণ রাখাল এই স্বর্গীয় দেবীদের সৌন্দর্য���য নিরুপণ করবে?’ উত্তেজিত ভঙ্গিতে প্যারিস বলে চললেন, ‘আমি বরঞ্চ আপেলটিকে কেটে তিন ভাগ করে দেই!’ (পৃষ্ঠা ৫২৮)

এর পর প্যারিস কাকে বেছে নিয়েছিলেন আর এই সুন্দরী নির্বাচন কিভাবে পরবর্তীতে ট্রোজান যুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিলো, সে সবই বইতেই পাবেন।

আগেই বলেছি, এ বই এক মহাসমুদ্রের মতো মণি মুক্তার আকর। অল্প কথায় সব বিষয়ের উল্লেখ করাও সম্ভব না। বইটির শুধু সূচীপত্রই আছে সোয়া সতেরো পৃষ্ঠা জুড়ে। গ্রীক মিথোলজির সমস্ত অলিগলি ঘুরে লেখক তুলে এনেছেন কখনো রোমাঞ্চকর, কখনো হাস্যরসাত্মক, কোথাও বিষাদে ভরপুর কোথাও বা দেবতার পশুপ্রবৃত্তিতে অ-সমীহ উদ্রেক করা সব কাহিনী।

একটি ব্যাপার বেশ কৌতুককর মনে হলো। মানুষের চেয়ে মিথের দেব দেবীরা দেখছি কোনো অংশেই উন্নত ছিলো না। তারা অনেকেই প্রতিহিংসাপরায়ণ, ইন্দ্রিয়পরায়ণ। তাদের কিছু শক্তি বা ক্ষমতা ছিলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা ব্যবহার করা হয়েছে স্থান বা ক্ষমতা দখলে, স্বার্থ উদ্ধারে বা সংকীর্ণ মনোবাসনা পূরণে, অপরকে হেয় করে নিজের গৌরব বাড়াতে। আর পরের বৌ বা বরকে প্রলুব্ধ করে নিজের কোলে টানা অথবা জোর করে কাউকে শয্যাসঙ্গী করার দৌড়ে তো দেবতারা একজন আরেকজনকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। দয়া দাক্ষিণ্য বা মহত্বের কাহিনীও যে নেই তা নয়, তবে সব মিলিয়ে দেবতাদের যে চেহারা ভেসে উঠেছে নয়নপটে তা দোষে গুণে মেশা চিরচেনা মানুষেরই অবয়ব। বরং মনে হয়েছে, মানুষই সেরা! আর তখনই মনে হয় , বইয়ের নামের নিচে লেখক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে হেসিয়ডের যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেটাই বাস্তব, সেটাই সারসত্য- ‘দেবতারা বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড সৃষ্টি করেন নি, বরং বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডই দেবতাদের সৃষ্টি করেছে।’

অল্প কিছু মুদ্রণ বিভ্রাট আছে। নিশ্চয়ই পরবর্তীতে তা সংশোধন করে নেওয়া হবে। তবে একটা ব্যাপার আমার কাছে বেখাপ্পা লেগেছে। বইটির সব কিছুই বাংলায়, শুধু সূচীপত্রের পৃষ্ঠাসংখ্যাগুলো কেন রোমান হরফে! চোখে লাগলো যেন। লেখকের কাছে অনুরোধ রইলো পরবর্তী সংস্করণের সময় এই বেমানান বিষয়টা নিয়ে আরেকবার ভেবে দেখার।
আচ্ছা ভালো কথা, বইটির মুদ্রিত মূল্য ৮০০/- টাকা। আমি রকমারি থেকে কিনেছি ৬৮০/- টাকায়।

সবশেষে আবারো বলি, ‘গ্রীক মিথোলজি-আদি থেকে অন্ত’ বইটি আমার খুব ভালো লেগেছে। যাদের পুরাণ কাহিনী বা মিথোলজিতে আগ্রহ আছে, নির্দ্বিধায় বইটি কিনে পড়তে পারেন। শুধু পড়ার নয়, সংগ্রহে রাখার মতও একটি বই এটি। লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা-কে ধন্যবাদ এই বিশাল পরিশ্রমটি করবার জন্য। প্রকাশককেও ধন্যবাদ, তিনি নিজেই এই বিপুল কলেবরের বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। লেখক-প্রকাশকের এই যুগলবন্দি ছাড়া এতো চমৎকার ভাবে তো মনের তৃষ্ণা মিটতো না পাঠকের।

এক নজরেঃ

বইয়ের নামঃ গ্রীক মিথোলজি -আদি থেকে অন্ত
লেখকঃ এস এম নিয়াজ মাওলা
প্রকাশকঃ জাগৃতি প্রকাশনী
প্রচ্ছদঃ সব্যসাচী হাজরা
প্রথম প্রকাশঃ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭
ধরনঃ হার্ড বাইন্ডিং
কাগজঃ অফসেট
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ৬৩১
মূল্যঃ ৬৮০/-(রকমারি)
Profile Image for Ishfaque Orko.
32 reviews13 followers
August 27, 2021
বই: গ্রীক মিথলজি আদি থেকে অন্ত
লেখক: এস এম নিয়াজ মাওলা
প্রকাশনী: জাগৃতি
ক্যাটাগরি: নন ফিকশন, ইতিহাস, পুরাণ

শিল্প,দর্শন,গণতন্ত্র আর বীরত্ব, মহাকাব্যিক প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার প্রধান চার স্তম্ভ, যা প্রায় চার হাজার বছর ধরে এখনো পৃথিবীর আনাচে কানাচে নিজেদের মহিমা বজায় রেখেছে। বর্তমান পৃথিবীর ভাষা,আইন,সংস্কৃতি,চিকিৎসা,সাহিত্য শিল্পকলা,স্থাপত্য,রাষ্ট্রতন্ত্র সহ প্রায় সবকিছুর সূতিকাগার হলো ভূমধ্যসাগরের তীরে গড়ে উঠা এই সভ্যতা।আর এই সভ্যতার পরিচয়ের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এই গ্রীক মিথলজি বা পুরাণ।আজকের বিশ্বে খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে যারা গ্রীক মিথ এর কোনো চরিত্রের নাম শোনেনি।সেই ছোটবেলা থেকে হারকিউলিস, জিউস কিংবা ট্রয়ের যুদ্ধ শুনে শুনে বড় হওয়া আমাদের বরাবরই অন্যরকম একধরনের আকর্ষণ থাকে এই পৌরাণিক কাহিনীগুলোর প্রতি।"গ্রীক মিথলজি আদি থেকে অন্ত" যেন এই আকর্ষণ থেকেই উদ্ভুত একটি চমৎকার সৃষ্টি, যা একজন মিথলজি প্রেমিকের জন্য এক লোভনীয় অমৃতস্বরূপ।

খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় আটশো বছর পূর্বে বর্তমান গ্রীসের উপকূলে গড়ে উঠে নতুন এক সভ্যতা, যারা এর আগে এই অঞ্চলের মাইসিনিয়ান সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল।সেই সময় মিশরের সভ্যতা বা পূর্বে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা দুইই দারুন প্রতাপে বিদ্যমান।কিন্তু এই নতুন সভ্যতা এমন এক নতুনরূপে বিকাশ লাভ করে যা কিনা ভবিষ্যতে অন্য সব সভ্যতাকে ছাড়িয়ে নিজেদের পরিচয়কে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পেরেছে। কিভাবে এবং কেন এত বিস্তৃত সময় ধরে গ্রীকরা প্রায় সমগ্র ইউরোপ,উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়া মাইনরের বিশাল অংশ শাসন করতে পেরেছে তা আমাদের কাছে নিতান্তই বিস্ময়ের ব্যাপার।গ্রীক মিথলজি এর বহু উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে আমরা গ্রীকদের এই বৈচিত্র্যময় সভ্যতা আর সমাজকে জানতে পারি, বুঝতে পারি কিভাবে তারা এত দুর্দান্ত প্রতাপের মাধ্যমে পৃথিবী শাসন করেছে।লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা ভাই তার এই চমৎকার বইটিতে চারটি ভাগে আমাদেরকে এই উপাখ্যানগুলোর সাবলীল বর্ণনা দিয়েছেন।

বই পর্যালোচনা:
বইয়ের শুরুতেই খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি কথা আছে যা কিনা সমগ্র গ্রীক মিথলজি এর ভাবমূর্তিকে ধারণ করে : "দেবতারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেননি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই দেবতাদের সৃষ্টি করেছে"। কেন এই লেখাটি তাৎপর্যপূর্ণ তা বুঝতে হলে বইটি শেষপর্যন্ত পড়তে হবে।
প্রথম ভাগে আলোচনা করা হয়েছে গ্রীকদের সৃষ্টিতত্ত্ব,অন্যান্য সভ্যতার মতোই গ্রীকরা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে তার এই অনন্য ধারণা বিশ্বাস করত যা বিভিন্ন গ্রীক মহাকবি তাদের কাব্যে বলে গিয়েছেন।এর মধ্যে হেসিয়ডের থিউগনি অন্যতম।এই পর্ব থেকে আমরা জানতে পারি সৃষ্টির শুরুতে ছিল শুধুই অন্ধকার এক বিশৃংখলা, যার থেকে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি হয় 'গায়া' বা আমাদের পৃথিবী,সে তার ভাই বা পুত্র ইউরেনাসের সাথে মিলে জন্ম দিতে থাকে অন্যসব সৃষ্টির, যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো টাইটান প্রজাতি।সেই টাইটানদের পরবর্তী বংশই হলো গ্রীকদের মূল দেবতাগণ, যারা অলিম্পিয়ান নামে পরিচিত।দেবতারা সৃষ্টি করলেন মানুষ,শুরু হলো দেবতা আর মানুষের এক অদ্ভুত সম্মিলিত পথচলা।এভাবেই গ্রীকদের দেবতারা এলেন সৃষ্টির সূচনালগ্নের অনেক পরে, যা কিনা অন্যান্য সভ্যতার দেবতাদের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ন।এই পর্বে লেখক বর্ণনা করেছেন কিভাবে টাইটান ক্রনস থেকে মা রিয়া জিউসকে রক্ষা করেন,তারপর টাইটান ও দেবতাদের যুদ্ধ, জায়ান্টদের সাথে দেবতাদের যুদ্ধ, মানবপ্রেমী প্রমিথিউসের আগুন চুরি,প্যান্ডোরার আশ্চর্য বাক্স ইত্যাদি সব চমৎকার কাহিনী যা গ্রীক সভ্যতার সূচনার প্রাণ।পর্বটি শেষ হয় ডিউক্যালিয়নের প্লাবনের বর্ণনা দ্বারা, যা কিনা বিবলীয় ইতিহাসের নোয়াহ এর প্লাবনের সাথে মিলে যায়।

দ্বিতীয় পর্বে শুরু হলো গ্রীক মিথলজির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ, দেবতাদের গল্প।অলিম্পিয়ান ১২ জন সহ অন্যান্য ছোটখাটো দেবতাদের কাহিনী এই অংশে বর্ণিত হয়েছে।আকাশের দেবতা জিউস,সাগরের দেবতা পসাইডোন, পাতালে হেডিস, জ্ঞানের দেবী এথেনা,নারী ও মাতৃত্বের দেবী হেরা,শস্যের দেবী দিমিতার,যুদ্ধের দেবতা এরিস,প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি,সূর্যদেব এপোলো আর চন্দ্রদেবী আর্টেমিস, স্থ্যাপত্যদেব হেফাসটাস, মদের দেবতা ডায়নাইসাস,বার্তাবাহক দেব হার্মিস আর গৃহস্থের দেবী হেস্টিয়া হচ্ছেন গ্রীকদের অলিম্পিয়ান দেবতাগণ।প্রাচীন গ্রীক দেবতারা অন্যান্য সভ্যতার দেবতাদের চেয়ে ছিলেন অনন্য।কেননা আমরা এই অংশে দেখি দেবতারা মানুষের চেয়ে ক্ষমতাশীল বা অমর হলেও, তারা ঠিক মানুষেরই প্রতিরূপ।তাদের মধ্যে যেমন প্রেম ভালোবাসা শ্রদ্ধা ইত্যাদি উৎকৃষ্ট গুন রয়েছে, ঠিক আবার হিংসা যুদ্ধ প্রতারণা খুনের মত নিকৃষ্ট উদাহরণ ও অজস্র। গ্রীকরা যেন আমাদের এই মানবসত্তাকেই দেবতারুপে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্ব্বোচ স্থান দিতে চেয়েছে।অন্যান্য মিথে যেখানে দেবতারা ছিল মানুষদের থেকে একেবারেই ভিন্ন, এমনকি তাদের অবয়বেও মানবিক বৈশিষ্ট্য ছিল না, সেখানে গ্রীক দেবতারা ছিল নিতান্তই মানুষের আদলে তৈরি অতিমানব। তারা মানুষের সাথে প্রেমে পড়তেন,সন্তান জন্ম দিতেন,যুদ্ধে জড়াতেন আবার মানুষকে দেবত্ব দিতেন। এ যেন এক অসম ক্ষমতার বণ্টন!

তৃতীয় পর্বে বর্ণিত হয়েছে গ্রীকদের স্থানীয় মিথ।প্রাচীন গ্রীকদের বিখ্যাত কিছু রাজ্য বা নগর রাষ্ট্র ছিল, যাদের ছিল চমৎকার কিছু স্থানীয় মিথ।এই মিথগুলোর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এর রচনাশৈলী।প্রাচীন যত মহাকবি গ্রীক মিথলজি এর সব উপাখ্যান মহাকাব্য রচনা করেছেন তার সবগুলোই ছিল মূলত ট্র্যাজেডি, সাহিত্যের অনন্য এক উপাদান।এরজন্য গ্রীক গল্পগুলোর সবগুলোই ছিল বিয়োগান্ত, মানবজীবনের দুঃখ এবং কষ্ট নিয়ে রচিত হয়েছে বিধায় মানুষও এদের সাথে নিজেদের বেশি সম্পর্কিত করতে পেরেছে, যুগে যুগে নিজেদের গল্প হিসেবে আপন করে নিয়েছে।এই মিথের গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে লেখক গ্রীক সভ্যতার একটি ধারাবাহিক সময়কালের ধারণা আমাদের দিতে চেয়েছেন।কিন্তু অজস্র রাজা রাণী আর তাদের সন্তানদের নাম এমনভাবে বিভিন্ন বংশের সাথে জড়িত যে ঠিকভাবে তাদের মনে রাখা খুবই কষ্টকর।লেখক যদিও মাঝে মাঝে ছক আকারে তাদের মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়েছেন, কিন্তু এর সংখ্যা আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। কে কার ভাই কে কার ছেলে এর মারপ্যাঁচে বারবার হারিয়ে গেলেও গল্পগুলো ছিল অসাধারণ।এই অংশে মূলত উঠে এসেছে বিভিন্ন নগরীর গোড়াপত্তন,বিখ্যাত সব গ্রীক বীরদের আত্মগাঁথা, দেবতাদের মনুষ্যসমাজে হস্তক্ষেপ ইত্যাদি। এই অংশেই বর্ণিত হয়েছে গ্রীক বীর পারসিয়াস এর অভিযান, থিসিউস আর মিনোটর,ইকারাসের আকাশে উড়া,জেসন আর আর্গণটদের অভিযান ইত্যাদি সহ আমাদের সবার পরিচিত হেরাক্লেসের বারোটি শ্রম আর জীবন গাঁথা।

চতুর্থ পর্ব গ্রীকদের সেই বিখ্যাত যুদ্ধ নিয়ে লেখা যা নিয়ে এখনো পৃথিবী হাজারো সাহিত্যকর্ম,সিনেমা নাটক রচিত হচ্ছে। ট্রয় এবং গ্রীকদের সেই বিখ্যাত যুদ্ধ।ছোটবেলায় ঘোড়ার ভেতর লুকিয়ে কিভাবে গ্রীকরা ট্রয় দখল করেছিল শুনলে খুব মজার শোনালেও, এর পেছনে যে কত রাজনীতি,ষড়যন্ত্র, বীরত্ব, প্রেম আর ত্যাগের কাহিনী ছিল তা জানতাম না। এই অংশে লেখক খুব সুন্দরভাবে একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পটভূমি, যোদ্ধাদের পরিচয় আর তাদের জীবনের সব কাহিনী এবং যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন।এই যুদ্ধকে আমাদের উপমহাদেশের মহাভারতের সমকক্ষ হিসেবে ধরা হয়।হোমারের ইলিয়াড আর ওডিসি, ভার্জিলের ঈনিয়াড সবখানেই এই যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়।যুদ্ধে আমরা দেখি বীরত্বের সাথে মানুষ যুদ্ধ করছে, সেই যুদ্ধে আবার দেবতারাও পক্ষে বিপক্ষে অংশ নিচ্ছে।নিশ্চিত মরণ জেনেও অসমের বিরুদ্ধে লড়ছে মানুষ, এভাবেই গ্রীকরা আবারও বলতে চেয়েছে মানবজাতির বীরত্বগাথা।যুদ্ধের শেষে গ্রীকদের বীরের যুগ শেষ হয়, শেষমেষ শেষ গ্রীক বীর ঈনিয়াসের হাত ধরে শুরু হয় নতুন রোমান সাম্রাজ্য, যা কিনা গ্রীক সভ্যতারই আধুনিক বিকশিত রূপ।

পাঠ প্রতিক্রিয়া:
পুরো বইটি পড়ার সময় লেখক বিভিন্নভাবে তার মতামত আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। যা কিছু অদ্ভুত বা যা কিছু বর্তমান সমাজের জন্য আশ্চর্যের বিষয় তা তিনি বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন।এর মধ্যে রয়েছে দেবতাদের পরাজয়, কিংবা তাদের সীমাবদ্ধতা।আবার সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ, সমকামিতা কিংবা দেবতাদের শাস্তি এগুলোও লেখক আলাদাভাবে তুলে ধরেছেন। লেখকের মিশরীয় মিথলজি আগে পড়ে ফেলার কারণে এই বইটির সাথে কিছু তুলনা করা যায়।মিথলজি সিরিজের প্রথম বই হিসেবে চমৎকার হলেও মিশরীয় মিথলজি আমার কাছে বেশি গোছানো আর তথ্যপূর্ণ মনে হয়েছে।যদিও গ্রীক মিথলজি মূলত সাহিত্য নির্ভর,অন্যদিকে মিশরের ক্ষেত্রে তা মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক।তবে মিথলজির ভক্ত হিসাবে অবশ্যই বইটির জন্য লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ। মিথলজি নিয়ে এত বিশদভাবে লেখা সত্যি প্রশংসনীয়। পুরো বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য যা আমার কাছে মনে হয় তা হলো, গ্রীক মিথলজি এর যেই অনন্য বৈশিষ্ট্য সেটা সার্থকভাবে তুলে ধরা।যদিও লেখক শুরুতেই ভূমিকায় সেটা বলে দিয়েছেন, তবুও গ্রীকদের এই মানবরূপী দেবতাগণ কিংবা অমরত্বের সাথে মরণশীল মানুষের যেই বিশিষ্ট যোগসাজস তা পুরো মিথলজির সর্বত্র বিদ্যমান। গ্রীক মিথলজিতে দেখানো হয়েছে মানুষদের চিন্তাশক্তি স্বাধীন হলেও তারা ভাগ্যের কাছে অসহায়।মানুষ যতই একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাক, তারা দেবতা বা উপরে যেই আছেন তার কাছে যেন একসময় পর্যুদস্ত হবেই।গ্রীক মহাকবি হোমার তাই বলেছেন,“Of all creatures that breathe and move on earth none is more to be pitied than a man.” তবুও মানুষ নিয়তির পাশাপাশি তাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি লালন করে।এই মনোভাব থেকেই বুঝা যায়, কেন গ্রিস কে গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলা হয়, কেনই বা দর্শনশাস্ত্রে গ্রীকদের এত প্রভাব।
গ্রীক মিথলজি মূলত অনেক মহাকবির বিভিন্ন রচনার মাধ্যমেই প্রথম আমরা জানতে পারি, সেই হিসেবে লেখকের প্রায় ১৯টি বই থেকে তথ্য নিয়ে লেখা এই বইটি বলতে গেলে পুরো মিথলজির একটি ছোট্ট উইকিপিডিয়া। এর মাধ্যমে আমরা সময়ের ক্রমানুযায়ী পুরা সভ্যতাকে চোখের সামনে পাচ্ছি, সেই সাথে বইয়ের প্রায় প্রতি পাতায় থাকা গ্রীক মিথলজি নিয়ে বিখ্যাত সব শিল্প আর ছবিও দেখতে পাচ্ছি। ছোটবেলার হারকিউলিস গেম খেলে বেড়ে উঠা আমার কৈশোরের প্রিয় বই ছিল রিক রিওরডান এর পার্সি জ্যাকসন সিরিজ,সেখানেই মূলত পুরো গ্রীক মিথলজির একটা ধারণা পাই।কিন্তু নিজ মাতৃভাষায় এরকম একটি বইয়ে জানা অজানা সব কাহিনী পড়তে পেরে সত্যি অনেক বেশি ভালো লেগেছে।বইটি পড়ার সময় বুকমার্ক বা ফিতার অভাব অনুভব করেছি, বাঁধাই এবং মলাট ভালো ছিল।লেখক সম্বন্ধে বলতে গেলে আবারও বলতে হয়, একজন চিকিৎসক হয়ে এত বৃহৎ পরিসরে এরকম একটি বই লেখা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ।তার জন্য লেখকের নিকট আমরা কৃতজ্ঞ।আসন্ন "মিথলজি আদি থেকে অন্ত: ওলমেক থেকে ইনকা" এর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
ব্যক্তিগত রেটিং: 9/10
Profile Image for এশা.
140 reviews53 followers
October 4, 2021
বই: গ্রীক মিথোলজি- আদি থেকে অন্ত
লেখক- এস এম নিয়াজ মাওলা
প্রকাশন- জাগৃতি প্রকাশনী
মলাট মূল্য- ১০০০ টাকা

গ্রীক মিথোলজি নিয়ে বাংলায় অসংখ্য বই থাকলেও একসাথে পুরো গ্রীক মিথোলজি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এমন বই হয়তো নেই। সেখানে লেখকের এরকম একটা উদ্যেগ নেওয়া সত্যিই বেশ প্রশংসনীয়। তথ্যবহুল লিখায় ভরপুর এই বই।
সব মিলিয়ে এটি একটি জেনুইন তথ্য ভান্ডার। যারা গ্রীক মিথোলোজিকে ধারাবাহিক ভাবে পড়তে, জানতে এবং বুঝতে চান তাদের জন্য অসাধারণ। বেশ সহজ এবং প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা। সংগ্রহে রাখার মতো বই।

মিথলজির এই বইটিকে মোট চারটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে-
��. সৃষ্টিতত্ত্ব
২. দেবতাদের গল্প
৩. স্থানীয় মিথ
৪. ট্রোজান যুদ্ধ

যা যা আছে অধ্যায়গুলোতে: টাইটান ও দেবতাদের যুদ্ধ, জায়ান্টদের সাথে দেবতাদের যুদ্ধ, মানবপ্রেমী প্রমিথিউসের আগুন চুরি,প্যান্ডোরার আশ্চর্য বাক্স,
আকাশের দেবতা জিউস, সাগরের দেবতা পসাইডোন, পাতালে হেডিস, জ্ঞানের দেবী এথেনা, নারী ও মাতৃত্বের দেবী হেরা, শস্যের দেবী দিমিতার, যুদ্ধের দেবতা এরিস,প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি,সূর্যদেব এপোলো আর চন্দ্রদেবী আর্টেমিস, স্থ্যাপত্যদেব হেফাসটাস, মদের দেবতা ডায়নাইসাস,বার্তাবাহক দেব হার্মিস আর গৃহস্থের দেবী হেস্টিয়া হচ্ছেন গ্রীকদের অলিম্পিয়ান দেবতাগণ সাথে তো ট্রয় এবং ট্রোজান যুদ্ধের বিস্তারিত আছেই।

বইটির পজিটিভ এবং নেগেটিভ দিক আমি দুইভাবে ভাগ করে বর্ণনা করলাম-

*পজেটিভ দিক
- বইটির প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠা, অধ্যায়বিন্যাস সবই অসাধারন।

- এতো বড় বই হওয়া সত্ত্বেও বানান ভুলও তেমন একটা নেই। তবে যেগুলো আছে খুবই অল্প এবং চোখে লাগার মত না৷

- বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা গ্রীক মিথোলজির উপর যেসকল ছবি এঁকেছেন, সেই সব চিত্রকর্মের ছবি রয়েছে বইয়ের পাতায়।
যেই ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এই ভিজুয়াল ব্যাপারের কারণে পড়ার আগ্রহ বাড়বে যে কারোর।

- একটা টপিকের হাত ধরে রিলেটেড অন্য টপিক নিয়ে এসেছেন লেখক। মাঝেমধ্যে এক টপিকের বিষয় অন্য টপিকে এসেছে, তবে লেখক ঐ সব যায়গায় বলে দিয়েছেন সেসব টপিক কোথায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

*নেগেটিভ দিক-
- বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি দামের তুলনায় খুবই দুর্বল। বাঁধাই আরও উন্নত হওয়া উচিত ছিল।

- এত বড় বই হওয়া সত্ত্বেও কোনো ফিতা বা বুকমার্ক নেই, যা বিরক্তিকর।

- বইয়ের শেষে গ্রিক পুরানের দেবতা ও বিখ্যাত বীরদের তালিকা ও সংক্ষিপ্ত বিবরন সংযুক্ত করলে পড়তে আরেকটু সহজ হত, এটি না থাকায় প্রায়ই পিছনে ফিরতে হয়েছে, যা পড়ার সময় সামান্য বিরক্তির কারন হয়েছে। আসলে গ্রিক পুরানে এত বেশি চরিত্র , যে সেগুলো মনে রাখা প্রায় অসাধ্যই বলা চলে।

- বইয়ের বাইন্ডিং বাজে হওয়ার দরুন প্রায়ই পৃষ্ঠা খুলে খুলে যায়। বইয়ের লেখাগুলো বেশ গ্যাপ দিয়ে দিয়ে লেখা। মনে হয়েছে ইচ্ছে করেই বইটা এতো বড় করা হয়েছে। আরো অনেক কম পৃষ্ঠাতেই শেষ করা যেতো বই। তখন দামও কম হতো। আর বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো তুলনামূলক বেশি পুরু, যার দরুন বইকে এতোটা বড় দেখায়।
Profile Image for Mehera Binte Mizan.
53 reviews25 followers
August 5, 2021
প্রথম বিরক্তি - বই এর নাম এ।
বই এ নাম "গ্রিক মিথলজি আদি থেকে অন্ত"
গুডরিডস এ "গ্রীক মিথোলজি আদি থেকে অন্ত" - এই সামান্য উনিশ বিশের জন্য বই এখানে খুজে পেতে কঠিন ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।
যাই হোক,দীর্ঘ সময়ের পড়ার সংগী ছিলো। সংগ্রহে রাখার মতো বই। কিন্তু টানা আগ্রহ ভরে পড়ে ফেলা যায় না। অভার অল একটা সামারি মনে থেকে যাবে।

এমন সব নাম - আর এর সাথে ওর, ওর সাথে তার,তার সাথে কার৷ এরকম কঠিন,জটিল এবং প্যাচানো সম্পর্ক আমার মাথায় গ্যাঞ্জাম পাকাতে অনেক সাহায্য করেছে।
ট্রয় যুদ্ধ নিয়ে অনেক কৌতুহল ছিলো। আরো বিশ্লেষণ থাকবে আশা ছিলো।

শেষ কথা, বইটা সব নির্ভরযোগ্য সুত্র থেকে তথ্য একত্র করে সহজ ভাষায় লেখা একটা সারমর্ম ছিলো। একবার ধৈর্য ধরে পড়া যায় কিংবা দরকারে তথ্যের জন্য ঘাটাঘাটি করা যায় এরকম বই!
Profile Image for Chowdhury Arpit.
188 reviews6 followers
October 14, 2022
এস এম নিয়াজ মাওলার লেখা জাগৃতি প্রকাশনীর 'গ্রিক মিথলজি আদি থেকে অন্ত' পড়া ছিল আমার জন্য একটা লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স। গ্রীক মিথলজি নিয়ে জ্ঞান ছিলো বলতে গেলে শূন্যের কাছাকাছি। বইটি পড়ে গ্রীক দেবতাদের আদ্যোপান্ত, মানুষের ভালোবাসা ঘৃণা প্রতিশোধ হানাহানি বিদ্বেষ যুদ্ধ চক্রান্তের ইতিহাসের পাশাপাশি সুবিখ্যাত ট্রোজান যুদ্ধ নিয়েও বিস্তৃত একটা ধারণা পেয়েছি। কত কিছু যে জেনেছি তার ইয়ত্তা নেই। তবে মাথা খারাপ হওয়ার দশা হয়েছে 'স্থানীয় মিথ' অংশটাতে গিয়ে। কে কোন রাজ্যের রাজা আর কে কার বংশধর তা বুঝতে গিয়ে অবস্থা কাহিল! পরে চার্ট করে পড়া লেগেছে। পুরোপুরি হজম করতে হয়তো পুরা বই আরো কয়েকবার রিডিং দেয়া লাগবে।

সুবিশাল সাড়ে পাঁচশো পৃষ্ঠার বই। আস্তে আস্তে বুঝে বুঝে এগিয়েছি। সবমিলিয়ে বলা যায় বইটা একটা অমূল্য সম্পদ। বাংলা সাহিত্যে মনে হয়না এর চেয়ে ডিটেলড কোনো বই প্রকাশিত হয়েছে গ্রীক মিথলজির ওপর। হাইলি রিকমেন্ডেড। কিছুটা কমপ্লেক্স। তাই কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আর ঘটনাগুলো মনোযোগ না দিয়ে জাস্ট চোখ বুলিয়ে যেতে পারেন।
Displaying 1 - 10 of 10 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.