‘সমুদ্রজননী’ উপন্যাসটির পটভূমি কলকাতা এবং আন্দামানের পোর্টব্লেয়ারের তীরবর্তী এলাকা। তিতলি ও অভিরূপ কাজকর্মের সূত্রে বসবাস করে আন্দামানে। তিতলির বাবা অনিমেষ বেড়াতে গেছেন ভুটানে, সঙ্গে আছেন অধ্যাপক শক্তিনাথ সেন এবং দুইজন তরুণ কবি কমল ও সৌরভ। ভুটানের পাহার ও নদীর অনুপম সৌন্দর্য দেখে তাঁরা মুগ্ধ। সেই মুহূর্তে কলকাতার বাড়ি থেকে অনিমেষের কাছে ফোন আসা এবং টাওয়ার ঠিক না পাওয়াতে ফোন কেটে যাওয়ায় শুভ অশুভ কি বার্তা, তাঁর উৎসুক্য থেকে বেশ নাটকীয়তা জমে উঠেছে।
তিতলি গর্ভবতী হয়েছে। তাঁর গর্ভে যমজ সন্তান এসেছে। একমাসের গর্ভবতী তিতলি তাদের নড়াচড়া ইত্যাদি অনুভব করতে পারে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে নবাগত ভ্রূণ ঘুমিয়ে পড়ে, তাও বুঝতে পারে। এই সমুদ্র তিতলিকে নেশার মতো আচ্ছন্ন করে তোলে। এমনকি সমুদ্র তীরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ তাঁর প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
যমজ ভ্রূণ একে অপরের সাথে গল্প করে। তিতলির সঙ্গে দেখা, গান শোনা এবং ঘুমিয়ে পড়া – এসবই ভ্রূণেরা টের পায়। তিতলি তাদের কাল্পনিক নাম দেয় ধিতাং ও ঝিলমিল। এইভাবে ধিতাং ও ঝিলমিল তিতলির শরীরের ভেতরে থেকে সমুদ্রের মধ্যে একাত্ম হতে থাকে। সমুদ্রই যেন তাঁর কাছে প্রাণস্বরূপ হয়ে ওঠে।
এদিকে তিতলির গর্ভবতী হওয়ার সংবাদ চারিদিকে বন্ধুমহলে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর বন্ধু চম্পা যমজ গর্ভবতীর কথা শুনে তাঁকে মালোপাড়ার বউ বলে তুলনা করে। মালোদের জোড়া সন্তান হওয়ার রীতি ছিল। চম্পারা যমজ ছিলেন। এরপর চম্পার যমজ চামেলির কাছে মালোপাড়ার যমজ সন্তানের নানান গল্প শোনে।
এমনসময় কলকাতা চলে আসার ব্যবস্থা ঠিক হয়েছে শুনে তিতলির মন উদাস হয়ে ওঠে। সে সমুদ্রতীর ছেড়ে আসতে চায় না। সমুদ্রের অভ্যন্তরেই সে দেখেছে ধিতাং ও ঝিলমিলকে খেলা করতে। শেষপর্যন্ত তিতলিদের সমুদ্র পাড়ি দিতে হয় এবং কলকাতাতে আসতে হয়।
কলকাতাতে চামেলিদি তাঁদের বাড়িতে আসেন। বাংলাদেশের মালোবুড়োকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে সে কথা জানান এবং তিতলিকে সাবধানে থাকতে বলেন। এদিকে স্বামী অভিরূপের কাছে চামেলিদির কথা শুনলে তিতলির মন খারাপ হয়ে যায়। আবার ভ্রূণ অবস্থায় ধিতাং একরকম চুরি করে বাব মায়ের কথা শুনে মাতৃগর্ভের অনন্ত আঁধারেই ছটফট করে বাতাসের জন্য। এখান থেকেই বোঝা যায় ধিতাং-এর মৃত্যুর বীজ নিহিত রয়েছে অর্থাৎ ঘটনা কোনদিকে মোড় নিতে পারে তার একটা পূর্বাভাস লেখক দিয়ে দিচ্ছেন উপন্যাসের মধ্যেই।
উপন্যাসটির প্রায় অর্ধেক অংশে সমুদ্রতীরবর্তী আন্দামানের কথা এবং বাকি অংশে রয়েছে কলকাতার কথা। এখানে তিতলি হল সমুদ্রজননী। যার গর্ভে যমজ সন্তান এসেছে। পটভূমি বদলে গেলেও জননীকে নিয়েই মূল ঘটনা আবর্তিত হয়েছে। যার ফলে উপন্যাসের নামটি সার্থক হয়েছে।
যমজ সন্তানের গর্ভবতী মা-কে নিয়ে লেখা উপন্যাস একুশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ধারার এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। গর্ভের মধ্যে থেকে যমজের একে অপরে গল্প করা ও শোনা, তাদের মা-বাবার গল্প শোনা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উপন্যাসটিকে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে।
উপন্যাসটির পটভূমি আন্দামান ও কলকাতা হলেও এখানে অনেক গ্রাম্য শব্দ আছে। যেমন – জুড়া, এয়েছে, হতি, পুয়াতি, ওট, তুমার, শুনবা, দেখবা, বুন, কানছে, এনিছি ইত্যাদি। এছাড়া উপন্যাসে দুইবার জোড়া কথার প্রসঙ্গ আছে। এই জোড়া কথার মধ্যে এক গ্রামীণ সংস্কার কাজ করছে। জোড়া কথা মানে শুভ কিংবা বাড়িতে অতিথি আসবে ইত্যাদি।
অমর মিত্র সমাজের বাস্তব দিকের কথা তুলে ধরলেন তাঁর ‘সমুদ্রজননী’ উপন্যাসে। গর্ভে থাকাকালীন সন্তান হত্যা যা একবিংশ শতাব্দীতে অনেক দৃষ্টান্ত দেখা মেলে। উপন্যাসের মধ্যে আমরা দেখতে পেলাম ভ্রূণহত্যা না করে সঠিক স্থানে পৌঁছে সুস্থভাবে সমস্যা সমাধান করা যায়। এর ফলে পাঠাকেরা অনেক উপকৃত হবেন এবং সমাজের উপকার করবেন। সমাজবাস্তবতার দিক থেকে লেখক এই উপন্যাসে এক অনন্য মাত্রা দান করেছেন।
Amar Mitra (Bengali: অমর মিত্র (born 30 August 1951) is an eminent writer in Bengali living in Kolkata, West Bengal, India. A student of chemistry, he has been working for the Land Reforms Department of The Government of West Bengal. He was awarded with Sahitya Akademi Award for his novel Dhurbaputra (Bengali: ধ্রুবপুত্র) in 2006. He has also received the Bankim Puraskar from Government of West Bengal for his novel, Aswacharit (Bengali: অশ্বচরিত) in 2001, kAtha award for his short story 'Swadeshyatra' in the year 1998, Mitra O Ghosh award in the year 2010, Sharat puroskar in the year 2018 and edited the new generation Bengali Webzine Bookpocket.net and Katha Sopan, a Bengali literary Magazine. He participated in the First forum of Asian countries' writers held in Nur Sultan city, Kazakhstan in September 2019 and was present in the inaugural session presided by the hon'ble President Of Kazakhstan. Awarded with 2022 O' Henry prize for his short story, The Old man of Kusumpur (গাঁওবুড়ো). He is the first Indian language recipient of O' Henry prize for short fiction. His novel Dhapatir Char has been translated in to English and published by Penguin Random House, in their vintage section.