পাকিস্তানের রাজনীতির মঞ্চে তখন তিনটি প্রধান পক্ষ—আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি এবং সেনাবাহিনী। আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্ব নিরসনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং আমরা প্রবেশ করেছিলাম একটা রক্তাক্ত অধ্যায়ে। এই বইয়ে আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ-পর্বের একটা ছবি এঁকেছেন গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
মহিউদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক দলের ইতিহাস অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগের উপর লেখা দ্বিতীয় বই - "আওয়ামী লীগ যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১" মোটামুটি তথ্যবহুল, কিন্তু অতি সংক্ষিপ্ত। একাত্তরে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের ভূমিকার কথা উঠেছে খুব কম। লেখক ফোকাসটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক দল (আওয়ামী লীগের) উপরে রাখতে পারেন নাই - কূটনীতি, প্রবাসী সরকারের ভূমিকা নিয়েই বেশি চর্বিত চর্বন করেছেন, যে তথ্যগুলো মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত প্রায় সব ভালো বইয়ে সহজলভ্য, সেগুলোই পুনরাবৃত্তি করেছেন।
যুদ্ধের ৯ মাস বাংলাদেশে আটকে পড়া আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগের নেতা কর্মীদের ভূমিকা কি ছিল, কোন উল্লেখ নাই। শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) গঠিত হয়েছিল, লেখক নিজে সে বাহিনীর সদস্য ছিলেন, তারপরেও সে বাহিনীর ভূমিকা কি ছিল, যুদ্ধের সময়ে তারা কি করেছে, সে সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমদ বিস্ময়কর রকম নীরব থেকেছেন।
মুজিবনগর সরকারে টানপোড়েনের একটা চিত্র পাওয়া যায়, কিন্তু স্পষ্ট না। ১৯৭১ সালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আর ছাত্র লীগের প্রধান নেতারা কি ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য কাজ, মুক্তিযুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, আর যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে তাদের অবস্থান কি ছিল সে সম্পর্কে আলাদা আলাদা করে ব্যক্তিগত প্রোফাইল করলে বইটা গুছানো আর আকর্ষণীয় হতো।
সব মিলে আমি হতাশ। এ বইয়ের যা লেখা আছে তা লেখকের পূর্ববর্তি বই আওয়ামী লীগ উত্থান পর্বের সাথে যুক্ত থাকলে হয়তো এতো হতাশ হতাম না। লেখক আলাদা বই বের করেছেন যখন - ১৯৭১ এ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ কি ভূমিকা রেখেছিল সে সম্পর্কে আরো গভীর গবেষণা ভরা বই প্রত্যাশা করেছিলাম। লেখক সে প্রত্যাশা মিটাতে পারেন নাই। বইটাতে তাড়াহুড়ো করে শেষ করার ছাপ আর সংবেদদনশীল প্রশ্নগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া খুবই দৃষ্টিকটু আর বেদনাদায়ক।
মোটের উপর - মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভূমিকার প্রামাণ্য গ্রন্থ এখনো রচিত হলো না। ভবিষ্যতের কোন সাহসী গবেষক এ কাজ করতে এগিয়ে আসবেন এ আশা করি।
শুরুতেই বলে রাখি, যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ ভাল ভাল কিছু পড়েছেন তাদের জন্য এই বইয়ে চমক খুব কমই রয়েছে। এই বইয়ে তাদের জন্য যেটা রয়েছে সেটা হলো খুব সহজ বর্ণনা আর সারসংক্ষেপে যুদ্ধদিনের আওয়ামীলীগ ও সেই সময়ের পর্যালোচনা। তবে বেশ কিছু নতুন তথ্য আমি পেয়েছি। মানুষ সাধারণত যা বিশ্বাস করে সে সেটাই বিশ্বাস করে চলতে চায় বা তার বিশ্বাসের খোজাপ্রহরী হয় বা তার বিশ্বাস কে আরেকটু শক্ত অবস্থানে আনতে চায়। এই বই অনেকের বিশ্বাস কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে আর তা না পারলেও বইয়ে দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করার অভিপ্রায় জাগিয়ে তুলবে অবশ্যই।
বইয়ের প্রধান ভাললাগা প্রচুর পরিমানে রেফারেন্স এবং সেইসব রেফারেন্স এর রিলাইবিটি ও ভ্যালিডিটি অনেকটাই গ্রহণযোগ্য। অনেকের সাক্ষাতকার নিয়েছেন এবং তাদের উক্তি অনুযায়ী পটকল্প এগিয়ে গেছে। বইটির আরেকটা ভাল লাগা লেখক খুব কমই বলেছেন নিজের কথা যা বলেছেন বিভিন্ন রেফারেন্স দিয়ে পট আলোচনা।
তবে, আমার কাছে ধারাবর্ণনা মাঝে মাঝে এলোমেলো বা ক্রমবিপর্যয় লেগেছে। আর লেখক অনেক কিছুই বলেছেন আবার মনে হয়েছে অনেক কিছুই বলেননি যা বললে ভাল লাগা আরেকটু বাড়তো।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মূলত দুই ধরনের৷ একটি রাজনৈতিক আরেকটা মাঠ পর্যায়ের। রাজনৈতিক ইতিহাসের পুরোটাই প্রায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক। ভিন্ন ভাবে হলেও পুরো যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে তারাই। সেনাবাহিনী, আমজনতা কিংবা বিশেষ ব্যক্তিগত উদ্যোগেও যুদ্ধ করতে দেখা গেলেও কেন্দ্রে ছিলো আওয়ামী লীগই। যদিও সেনাবাহিনীর একটা অংশ মনে করত তারাই শুধু যুদ্ধ করেছে। ৭১ এর এমন নানান টানা পোড়নের একটা অংশ নিয়ে লেখক গবেষণা করে বইটি লিখেছেন। যেখানে যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী নেতৃত্বের ভূমিকা গুলো তুলে ধরা হয়েছে৷
"যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা, যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা.." -নির্মলেন্দু গুণ গুণ সাহেব কবিতার লাইনটি তিনি কী বুঝে লিখেছিলেন জানি না। তবে লেখক, গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের "আওয়ামী লীগ যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১" পড়তে গিয়ে গুণের কবিতার লাইনটি মাথায় বারবার ঘুরাফেরা করছিল। বই নিয়ে আলোচনায় আসা যাক, বাংলাদেশের জন্ম কী শুধু একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে হয়েছে নাকী এই সংগ্রামের পেছনে সুদীর্ঘ পটভূমি রয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়েছে পাকিস্তানি শাসনের শোষণের পুরো ২৪ বছর ধরে। সেই সাধনাকে অগ্রগামী করে ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে বাংলার জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট।এই বইয়ের শুরুটা সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে। বইয়ের শুরুতেই চিত্রপটে হাজির প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। তিনি ভোটের ফলাফল নিয়ে বড্ড চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন। কেননা কিছুই তার পরিকল্পনা মাফিক হচ্ছে না দেখে অস্থির হয়ে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা সেলপ্রধান মেঃ জেঃ উমরকে ধমকের স্বরে বলেন, "উমর, এসব হচ্ছেটা কী? তোমার সব হিসাব-নিকাশ কোথায় গেল? কাইয়ুম খান,সবুর খান আর ভাসানীকে যে, এতো টাকাপয়সা দিলাম সেসব কোথায় গেল?" ননফিকশন হিসেবে নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত সূচনা করেছেন মহিউদ্দিন আহমদ। যাইহোক, সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের জয়ের কারণ ছয়দফা। এদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে জয় পেয়েছে পিপলস পার্টির ভুট্টো। ভুট্টো তো বিরোধী দলে বসতে রাজি নয়। আবার বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রীত্ব দিলে ছয়দফা বাস্তবায়ন করলে স্বয়ং পাকিস্তান ভেঙে যাবে তা নিয়ে সুনিশ্চিত ছিল ভুট্টো, ইয়াহিয়া দুজনেই। তাই ইয়াহিয়া তখন ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে, ভুট্টো তো আরো এককাঠি সরেস। সে সে চায় ক্ষমতার ভাগ অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।এজন্য শুরু হয় সময় ক্ষেপণের নামে আলোচনা, প্রস্তাব আর পাল্টাপ্রস্তাব। এই প্রস্তাব আর পাল্টাপ্রস্তাবের খেলাকে বড়ো সুন্দর করে রেফারেন্স দিয়ে পাঠককে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন লেখক। আওয়ামীলীগকে ব্যস্ত রাখতে হবে।নতুবা ক্ষমতা দিতেই হবে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে শপথ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু সরাসরি বলেন, "কেউ যদি বাংলার মানুষের সাথে বেঈমানি করে তবে তোমরা তাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।" বাংলাকে ঠকানোর পরিকল্পনা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। সেই পরিকল্পনা বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছে বেশ দ্রুত গতিতে। স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তুতি নিয়ে ড. কামাল বলেন, "স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের একটি খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে। আমি তাজউদ্দীন আহমদের পরামর্শে খসড়া তৈরি করি। " এদিকে, মার্চে পরিস্থিতি আরো উত্তাল হতে থাকে। আন্দোলনমুখর হতে থাকে জনতা,ছাত্রলীগের সিরাজুল আলম খান গ্রুপ যাদের দলের চরমপন্থি বলা হচ্ছে তারা বঙ্গবন্ধুকে চাপ দিতে থাকে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য। সেই চাপের কথা বঙ্গবন্ধুও ���ারবার স্মরণ করেছেন নির্বাচনের পর বহুবার। বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা অপারেশন সার্চলাইটের পূর্ববর্তী মার্চে ঘটে যাওয়া আরো ঘটনাকে নিয়ে। যেখানে লেখক ইয়াহিয়ার ভাবনা ছিল অধিবেশন স্থগিত করে "অপারেশন ব্লিৎস" পরিচালনা করে বাংলার জনগণ ও বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে উচিত শিক্ষা দেয়ার। এই শিক্ষাবিষয়ক পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও ভুট্টোর যৌথ প্রযোজনার চিত্রকে যেমন পেয়ছি নাটকীয়ভাবে, তেমনি জেনেছি অসহযোগ আন্দোলনে বাংলাকে কার্যত পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে মুক্তির স্বাদের আশ্বাস। জেনেছি সংলাপ, পাল্টা সংলাপ নিয়ে সে সময়ের নানাপক্ষের বয়ান। এদিকে ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, "জনসভায় তিনি কী বলেছেন, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না তিনি কী বলেন নি। তিনি সভা শেষ করলেন 'জয় বাংলা ' ধ্বনি দিয়ে। কেউ কেউ বলেন, ওইদিন তিনি 'জয় পাকিস্তান 'ও বলেছেন।" এক্ষেত্রে আশা করেছিলাম লেখক আরো গভীরতর গবেষণার মাধ্যমে পুরো সত্য জানার সুযোগ করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখানে "পলায়নপর" আচরণ করেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে । স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যতোগুলো কথা প্রচলিত তার সবই লিখেছেন পাঠককে জানানোর উদ্দেশ্যে।এখানে বিশ্লষণটা দারুণ লেগেছে। মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, "রেডিওতে জিয়ার ঘোষণা ওই সময়ে মানুষকে উৎসাহ জুগিয়েছিল। ঘোষণাটি দিয়ে তিনি কোনো অপরাধ করেননি, সাহসের কাজই করেছেন। ঘোষণার শব্দচয়ন নিয়ে যে বিভ্রান্তি বা ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল, আওয়ামী লীগ নেতাদের পরামর্শে জিয়া তাঁর ঘোষণার পরিমার্জন করে বিভ্রান্তি দূর করেছিলেন।এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে জিয়ার ঘোষণা শুনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি। একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রতিরোধ পর্বটি শুর হয়েছিল ২৫ মার্চ রাতেই। অবশ্য পুরো একটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে বিদ্রোহ করার কৃতিত্ব জিয়াউর রহমানকে দিতে হবে।।তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, শপথ নিয়েছিলেন জয়বাংলা স্লোগান উচ্চারণ করে।" আসলেই দারুণ বিশ্লেষণ! সকল পক্ষই খুশী থাকলো। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব নিয়ে খোদ আওয়ামীলীগের ঘরের দ্বন্দ্ব নিয়ে তাজউদ্দিন ও চারযুবনেতার বিরোধ, মুশতাক ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনেক কথা আছে। বামেদের যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে কথাবার্তা আছে। যা মঈদুল হাসানের "মূলধারা ৭১ " বইতেই বিশদ লেখা। তবে ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতি বাংলাদেশকে অনেক ভুগিয়েছে। "কেউ একজন নৈতিক ভুলটা করে বাংলাদেশ আার্মির সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট করেছিল' -এই তথ্যটা স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ভারতকে বুঝতে ইশারা রেখেছিল। ১৯২ পাতার বই হলেও ঘটনার সমাপ্তি ১৫৯ পাতায়। বইয়ের নাম নিয়ে অনেকের ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে। বিশেষত, যুদ্ধদিনের কথা মানবেন তারা, কিন্তু প্রশ্ন তুলবেন সাথে আওয়ামীলীগ কেন? সত্যটা বই পড়লেই বুঝবেন যে,বঙ্গবন্ধুর ৭১ এর আওয়ামীলীগ বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বোঝা বা জানা কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই বইয়ের নামকরণ যথাযথ মনে হয়েছে। তবে যিনি "জাসদের উত্থান-পতন" এর মতো কাজ করেছেন সেই মহিউদ্দিন আহমদের কাছে পাঠকের প্রত্যাশা একটু বেশিই থাকে। সেই প্রত্যাশার খুববেশি পূরণ তিনি এই বইতে করতে পারেন নি তা বলতে বাধ্য হচ্ছি। আরো গোছানো, গভীরতর ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা আশা করেছিলাম। অবস্থাবিশেষে,খানিকটা "গা বাঁচানো " প্রবণতা প্রিয় লেখকের লেখায় পেয়ে কতকটা মর্মাহত হয়েছি তা স্বীকার করেই বলছি তারপরেও "যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১ " খুব ভালো ননফিকশন।
যারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ইতিহাস নিয়ে লেখা ভালো কিছু বই পড়েছেন তারা মহিউদ্দিন আহমেদের এই বইয়ে তেমন নতুন কিছু পাবেন না। তবে সহজ সরল ভাষায় লেখা, অনেক তথ্য সম্বলিত এই বইটি নতুন পাঠককে অনেক কিছু জানাবে, যা সকলের জানা উচিৎ। এই বইয়ের কয়েকটি দিক চোখে পড়েছে। প্রথমত, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে কুতর্ক আমাদের রাজনীতিতে বিদ্যমান তার অসারতা তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন, ৭ই মার্চের ভাষণেই যে তা বাঙালির জানা হয়ে গিয়েছিলো তা লেখক সঠিকই বলেছেন। দ্বিতীয়ত, একাত্তরের প্রথম তিন মাস ধরে শেখ মুজিবের মাঝে যে দোদুল্যমানতা ছিলো তা তাঁর লেখায় পরিলক্ষিত হয়- তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীই হতে চেয়েছিলেন কিন্তু এটাও বুঝেছিলেন যে পাকিস্তানের ভাঙ্গন ঠেকানো যাবে না। পঁচিশে মার্চের পাকিস্তানিদের আক্রমণও তিনি আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। এই দুই বিষয়ে তাঁর মতামত হয়তো এখনকার আওয়ামী লীগের 'গ্র্যান্ড নেরেটিভ'-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হবে। ভুট্টোকে তিনি চরম ভিলেনের রূপে দেখেছেন, তা ঠিকই আছে, তবে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে তিনি যেন ইয়াহিয়াকে 'ভিক্টিম' মনে করে কিছু ছাড় দিয়েছেন। একাত্তরে অস্থায়ী সরকারের মাঝে আওয়ামী নেতৃত্বের কোন্দল তিনি তুলে ধরেছেন কিন্তু বেশি বিস্তারিতভাবে না। চরম বামপন্থীদেরও যেন কিছুটা গা বাঁচানোর সুযোগ দিয়েছেন।
একাত্তরে আওয়ামীলীগের ভূমিকা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পরিসর কিছুটা ছোট হয়ে গেছে। অনেক প্রশ্নের উত্তরই অধরা রয়ে গেলো। তবে সীমিত পরিসরে চমৎকার তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।
১৯৭১, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ ; এই তিনটির কোনটিকে আলাদা যেমন করা যাবে না, তেমনি অস্বীকার করেও স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস আনা যাবে না। বাংলাদেশের ঠিকুজি খুঁজতে গেলে আওয়ামী লীগ এর নাম এসে পড়বেই। বাঙালির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অনিবার্য গন্তব্য ছিল '৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্র ভেঙে জন্ম নিয়েছিল আরেকটি রাষ্ট্র ; বাংলাদেশ। আর, অস্বীকার করার উপায় নেই- সেই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিল সে সময়ে বাঙালির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক আওয়ামী লীগ।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এর রাজনৈতিক দল নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থের আওয়ামী লীগ নিয়ে লেখা দ্বিতীয় বই হচ্ছে 'আওয়ামী লীগ : যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১'। আওয়ামী নিয়ে লেখা তাঁর প্রথম বই 'আওয়ামী লীগ : উত্থান পর্ব', যেখানে আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকে '৭০ এর নির্বাচন পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছিল। আর এই বইয়ে উঠে এসেছে যুদ্ধকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের চিত্র। সেই সাথে প্রাসঙ্গিক আরো কিছু বিষয়।
ভূমিকা, উপসংহার ও পরিশিষ্ট বাদে মোট পাঁচটি অধ্যায়ে লেখক তুলে এনেছেন '৭১ এর বাংলাদেশ। তবে এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয়, বরং তখনকার আওয়ামী লীগের নানা বৃত্তান্তই এই বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য। তবে শুধু আওয়ামী লীগ নিয়েই লেখকের আলোচনা থেমে ছিল না, তার বাইরেও প্রসঙ্গক্রমে '৭০ এর নির্বাচন পরবর্তী ভুট্টো, ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবুর রহমানের সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক বিশেষত ভারত রাশিয়া চীন ও আমেরিকার নানা প্রচেষ্টা ও কর্মকান্ডের চিত্রায়ন ক���া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কাছে প্রচন্ড আবেগের এক বিষয়। এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ইতিহাসও এখানে বেশ স্পর্শকাতর। মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা ও তথ্য গ্রহন করার মত পাঠকমন তৈরি হয়নি অনেকক্ষেত্রে। রয়েছে রাজনৈতিক চাপ ও সীমাবদ্ধতা। অনেক সত্য এখানে চাপা দেয়া হয়েছে, কিংবা চাপা পড়ে গেছে। যে কারণে একটি নির্মোহ ইতিহাস রচনার সাহস সবাই দেখাতে পারেন না। মহিউদ্দিন আহমদ '৭১ এ আওয়ামী লীগের পথচলার বিবরন লিখতে গিয়ে বেশ নিরপেক্ষ ছিলেন, তা বলা যেতেই পারে।
তবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাসদ নিয়ে লেখা লেখকের অন্য তিনটা বইয়ের সাথে তুলনা করলে বলবো, এই বইটাতে লেখক আমাকে অনেকটাই হতাশ করেছেন। লেখায় তাড়াহুড়োর ছাপ ছিল স্পষ্ট। অনেক কিছুই অতিরিক্ত সংক্ষেপ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কয়েকটি ভালো বই পড়া থাকলে তা সহজেই আপনার চোখে ধরা পড়বে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই মঈদুল হাসানের লেখা 'মূলধারা ৭১' বইয়ের কথা উল্লেখ করতে চাই, যেটি আমার কাছে এই বইয়ের চেয়ে বেশি তথ্যবহুল ও বিস্তৃত মনে হয়েছে।
বিশেষত প্রবাসী সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর টানাপড়েন, সামরিক নেতৃবৃন্দের সাথে সিভিল প্রশাসনের দূরত্ব, মোশতাক গংয়ের সাথে আমেরিকার যোগাযোগ ও ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অনেক নেতার সাথে প্রবাসী সরকারের মতপার্থক্য এর মত বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়নি এখানে।
তবে এই বইয়ে থাকা অনেকগুলো কথোপকথন অন্য অনেক বইয়ে সেভাবে পাইনি। সেদিক থেকে এটাকে কিছুটা এগিয়ে রাখতে পারি। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় হিসেবে অনেকগুলো তথ্য এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। যা পাঠককেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
বইটি লিখতে গিয়ে লেখক অনেক বেশ পরিশ্রম করেছেন, যা পরিশিষ্ট, তথ্যসূত্র ও সাক্ষাতকারের তালিকা দেখলেই সহজে অনুমান করা যায়।
সবশেষে বলবো, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আওয়ামী লীগের পথচলার খন্ডিত বিবরণ জানতে পড়তে পারেন এই বইটি।
বই টি যেন একটু তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেলো। মহিউদ্দিন আহমেদ এর আমার পড়া প্রথম বই। লেখা বেশ সাবলীল লেগেছে। তবে মনে হয়েছে আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার কথা আরও বেশি আসতে পারত। যেমন মুজিব বাহিনী (বিএলএফ) সম্পর্কে তেমন কোনো আলোচনা ছিলো না যা আমার আগ্রহের ব্যাপার ছিলো। আমি মনে করি বই টি আরও বেশি বিশ্লেষণ নির্ভর হতে পারত। তবুও এক্ষেত্রে বই এর ভূমিকায় লেখকের বক্তব্য খুব একটা অভিযোগের জায়গা রাখেনি ---
"....তা ছাড়া অনেক কিছু লেখার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয় নি। নতুন তথ্য ও বিশ্লেষণ গ্রহণ করার মতো পাঠকমন তৈরী হওয়ার জন্যও সময় দরকার। এ দেশে ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে এটা একটা চ্যালেঞ্জ। "
আশা করি ভবিষ্যতে লেখকের থেকে এই বিষয়ে আরও বিস্তৃত ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা পাবো।
আওয়ামী রেজিমে বইটি লিখা হয় বলে অনেকক্ষেত্রেই লেখক কিছু বিতর্কিত বিষয়ে অস্পষ্টতা রেখেছেন। আবার কিছু নগ্ন সত্য স্বীকার করা থেকে এড়িয়ে গেছেন। যেহেতু আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর কথা এবং লেখালেখি আছে।তাই আমার মতে দু'পক্ষের কথাবার্তা শুনে এবং লেখালেখি পড়ার পরেই কোনটা সত্য সেটা আমাদের নিজেদের নিরুপণ করাটাই যুক্তিযুক্ত। সেক্ষেত্রে এই বইটিকে অনেকটাই আওয়ামিলীগ ঘেঁষা বই বলা যেতে পারে। বইটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য যেটা সবচে ভালো লেগেছে,সেটা হলো বইয়ে লেখক প্রচুর অথেনটিক সোর্স ব্যবহার করেছেন।তাই এই বইটিকে রেফারেন্স হিসেবে ইউজ করা অনেকটাই নিরাপদ।
মহিউদ্দিন আহমদ এর লেখার কথা শুনেছি; পত্রিকায় সমালোচনা দেখেছি কিন্তু এটাই আমার পড়া তার লেখা প্রথম বই। এক কথায় বললে I am disappointed. বইটি আওয়ামী লীগের ১৯৭১ এর যুদ্ধকালীন কার্যক্রমের উপর অথচ সেটার বর্ণনায় সবচেয়ে কম। বাজারে মুজিব নগর সরকারের কার্যক্রমের উপর অনেক বই আছে সেটা নিয়ে আলোচনা আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়েছে। আমি জানতে চেয়েছি ১৯৭১ এর আওয়ামী জনপ্রতিনিধি, নেতাদের ভুমিকা কি ছিল; তাদের সম্বন্ধে যে সব নেতিবাচক কথা শোনা যায় তা কতটুকু সত্য। দুঃখজনক ভাবে এগুলোর কিছুই নেই।
চমক দেওয়ার মতো সামান্য তথ্য আছে। যারা ইতিহাস চর্চা করেন তারা বইয়ের বিষয়বস্তু আগে থেকেই জানেন। কিন্তু মহিউদ্দিন আহমদের স্বভাব সুলভ প্রাণোজ্জ্বল বর্ণনা এই বইয়েও উপস্থিত। যারা যুদ্ধের সময় আওয়ামীলীগের ভুমিকা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করতে চান, তাদের জন্য এই বইটি সুখপাঠ্য হবে।
মহিউদ্দিন আহমদ ইতিহাস বলতে জানেন, জানেন ফেলে আসা সময়ের মাঝে দিয়ে পাঠককে ভ্রমণ করিয়ে নিয়ে আসতে। সে কারণেই হয়তো, উনার বই উপন্যাসের থেকেও বেশি পঠিত হচ্ছে এদেশে। এই চর্চা বজায় থাকুক