Anwara Syed Haq is a writer of Bangla literature. She has written a number of novels, short stories, children's books and also written a number of essays. She has been praised for using her knowledge of human psychology beautifully in her writings. She is a psychiatrist by profession.
After completing her SSC and HSC in Jessore, Haq moved to Dhaka in 1959 and enrolled in Dhaka Medical College. She obtained her MBBS degree in 1965. In 1973 went to the United Kingdom for higher education. After having completed her post graduate degree in medical psychiatry in 1982 she returned home from the UK. She has since then worked at a number of institutions, among which are Bangladesh Airforce, Dhaka Medical College and BIRDEM.
Haq's first short story "Paribartan" was published in Sangbad in 1954. From 1955 to 1957, she regularly wrote for Ittefaque's "Kachi Kanchar Ashor". Her first novel was published in Sachitra Shandhani in 1968. After her first novel, she has written a number of novels and short stories. Many of her novels are set in Dhaka and London where she spent much of her time. Her publications consist of twenty-five novels, three volumes of poems, eight collections of short stories, eight collections of essays, three autobiography volumes, two collections of travel writing, forty fictional stories for young readers.
সবার শৈশবের ইনিংসটা দুধেভাতের সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয় না। আমরা অনেকেই দূরে চলে যাওয়া শৈশবকে আহ্লাদে ভেসে গিয়ে কাছে ডাকতে চাই। অনেকেই হয়ত তাদের শৈশবের বুকে বেশ করে ইরেজার ঘষে লোপাট করে দেয়া যেতো যদি, এমন আক্ষেপ নিয়ে দীর্ঘশ্বাস চাপেন। আমাদের ভাবনায় যে শৈশব আছে মলিনতাহীন, নিটোল এক সুন্দরের সরোবর হয়ে; অনেকের কাছে সেটা কেবলি সীমাহীন দুঃখের। সৌভাগ্যবশত আমরা যারা দারুণ শৈশবকে মুঠোবন্দী করতে সক্ষম হয়েছি, তারা ফেলে আসা চিররঙিন দিনগুলোর প্রতি সবটুকু ভালোবাসা মেখে বলতে চাই 'ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।' অন্যদিকে কষ্টময় শৈশবের মানুষটি তখন বয়ান করেন তার তিক্ত জন্ম ইতিহাস, 'একহাতে ফুলের গন্ধ, আরেক হাতে নরকের দুর্গন্ধ মেখে আমার জন্ম।'
এমন শৈশবের অধিকারী'র শৈশব নামের ক্যালাইডোস্কোপে চোখ রেখে আমরা মুগ্ধ হতে পারিনা, বরং সে অভিজ্ঞতায় মন আর্দ্র হয়ে ওঠে। বুকের ভেতর অচেনা একটা কিছু গড়িয়ে যায় এমন শৈশবের গল্প শুনে "জন্মের আগে যদি আমার কোন বক্তব্য থাকত তাহলে ঈশ্বরের কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করতাম যেন এরকম একটি সংসারে, এরকম একটি সময়ে এবং এরকম একটি যুগে তিনি আমার জন্ম না দেন। কিন্তু আমার সেসুযোগ ছিল না। পৃথিবীর এমন একটি অবহেলিত জনপদে, এরকম একটি সংকট সময়ে, এরকম একটি বিশৃঙ্খল সংসারে পাঠাবার আগে ঈশ্বর আমাকে কোন লাল বিপদ সংকেত দেননি।"
পৃথিবী জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব, দুর্ভিক্ষ, উপমহাদেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, স্বার্থপর নেতাদের মতলব হাসিলের রক্তান্ত পথ ধরে ভারতের বিভক্তি, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা, নিজভূমে পরবাসী হয়ে যাওয়া স্বজনের অচেনা আরচণের বৈরি একটা সময়ের দোরগোড়ায় 'নরক ও ফুলের কাহিনী' নামের আত্মজীবনীর পাঠ শুরু। বাইরের পৃথিবীর সাথে পাল্লা দিয়েই যেন বিপর্যস্ত পরিবারের বিশৃঙ্খল আর অনিশ্চয়তায় হাবুডুবু খেতে থাকা এক পরস্হিতিতে পাঠকের সাথে আনোয়ারা সৈয়দ হকের বিষন্ন শৈশবের সাক্ষাত ঘটে। স্বভাবতই সে শৈশব ভূলুণ্ঠিত, খানিকটা অবাঞ্ছিত। এরকম এক তালগোল পাকানো পরিবেশগত কাঠামোতে বেড়ে ওঠা শিশু মানস কতটা বিক্ষিপ্ত আর বিক্ষুদ্ধ হতে পারে তার নজির এ বইয়ের পাতায় পাতায় সেঁটে আছে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের সময় বিহারের শাশারামপুর থেকে পালিয়ে যশোর জেলার কোতোয়ালি থানার চুড়িপট্টি গ্রামে মোহাজের হয়ে আসেন আনোয়ারা হকের পূর্বপুরুষেরা। চুড়িপট্টি নামকরণের কারণ হলো সেখানে চুড়ির কারখানা বা ভাটি ছিল। তাঁর পূর্বপুরুষের কেউ কেউ এ ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। এঁদের চুড়িওয়ালা বলে সম্বোধন করতো অনেকে। এই চুড়িওয়ালাদের ছেলেমেয়েরা হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশই লেখাপড়া করতো না। স্হানীয় স্কুলে সেখানকার ছেলে মেয়েরা যেত ঠিকই, কিন্তু মেয়েদের ঋতুবতী হওয়ার আগেই বিয়ের পীড়িতে বসতে হতো আর ছেলেগুলোর অধিকাংশই স্কুলের শেষ পরীক্ষার আগে পারিবারিক ব্যবসায় নিযুক্ত হতো।
আনোয়ারার বাবা পূর্বপুরুষের দেখানো পথে হাঁটেননি মোটেও। শুধু কর্মক্ষেত্রেই নয়, বৈবাহিক দিক থেকেও তিনি পরিবারে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রাখেন। প্রথম বিয়ের স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ললিতমোহন মুখোপাধ্যায়ের কন্যা প্রতিভা মুখোপাধ্যায়ের সাথে পরিণয় সূত্রে বাঁধা পড়েন মুসলিম পরিবারের ছেলে রফিউদ্দিন চৌধুরী(ঘেনুয়া )। বিয়ের পর প্রতিভার নতুন নামকরণ হয় আসিয়া খাতুন চৌধুরী। বলাই বাহুল্য এই বিয়ে রফিউদ্দিনের জাদরেল জননী মেনে নেননি। এ কারণে যতদিন মঞ্জু অর্থাৎ আনোয়ারার দাদী বেঁচে ছিলেন ততদিন তার সম্পত্তির কোনো কিছুই তাদের বাড়ির জন্য বরাদ্দ ছিল না। আনোয়ারাদের প্রতি দাদীজানের বিতৃষ্ণা এতটাই প্রবল ছিল যে, ভাগের ফলফলাদি আত্মীয়স্বজন-পাড়াপড়শিদের বাড়ি বাড়ি গেলেও মঞ্জুদের ঘরে যায় না। ছোট্ট মঞ্জু সেখানে উপস্হিত থেকে এসব প্রত্যক্ষ করলেও, দাদীর পাথর হৃদয় সেটা গ্রাহ্যই করেনি। এরকম একবার কাঁঠালের ভাগ না পাওয়ার অপমান চুপচাপ সয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছ থেকে কাঁঠাল সংক্রান্ত খোঁটায় ছোট্ট মঞ্জু যখন লুকিয়ে চোখের জল ফেলে, পাঠক হৃদয় শিশু মঞ্জুর সে কষ্টে আর্দ্র হয়ে ওঠে।
স্বাস্হ্যকর একটা পরিবেশে শিশুর বেড়ে ওঠা যতটা নিরাপদ আর আনন্দময়, তার বিপরীত অবস্হায় শিশু ততটাই নিরাপত্তাহীনতায় আর নিরানন্দে বেড়ে ওঠবে এটাই স্বাভাবিক। আনোয়ারা যে পরিবেশে বড় হয়েছেন তা ছিল চূড়ান্তভাবে অস্বাস্হ্যকর। শিশু অবস্হাতেই তাঁর মগজে পরিবার-পরিবেশ কর্তৃক এই চরম সত্য গেঁথে দেয়া হয় তিনি মেয়ে, একটা ছেলের যতটা মূল্যায়ন, একজন মেয়ের ঠিক ততটাই অবমূল্যায়ন তার সমাজ-সংসারের জন্য জায়েজ। আশৈশব মঞ্জুর বাবা তাদের মায়ের প্রতি সম্মানহানির যে দৃষ্টান্ত রাখেন তা সন্তানদের মধ্যেও কমবেশি, বিশেষ করে মঞ্জুর মধ্যে প্রবাহিত হতে দেখি এই স্মৃতিকথনে। আগের দিনের মানুষজন চারিত্রিক ক্ষেত্রে সোনার মানুষ ছিল, এমন গালভরা মিথের মুখে সপাটে চড়া কষিয়ে দেয় মঞ্জুর বর্ণমালা পরিচয়ের গৃহশিক্ষক। মাত্র চার বছর বয়সেই সেই পাষণ্ড কর্তৃক মঞ্জুকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। খুব অল্প বয়সেই তার জানা হয়ে যায় 'আপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।'
মানুষের প্রতি মানুষের আচরণের ভিত্তি যখন ধর্মের বাটখারায় মাপা হয় তখন পারস্পরিক সৌর্হাদ্য সম্মান দেখানোতে যথেষ্ট মেকিত্ব ভর করে। ভদ্রতা বা সামাজিকতার খাতিরে উপরে উপরে সৌজন্যের ভণিতা চলে কেবল। সাতচল্লিশের ভারত ভাগের রাজনৈতিক নাটক এই সত্যিকে বড় বেশি প্রকট করে তোলে। মঞ্জুর জন্মস্হান, চুড়িপট্টিকেও মুখোমুখি হতে হয় সে সত্যের। প্রতিবেশি মুসলমান মানেই তখন হিন্দুর জীবন নাশকারী। এমন বাস্তবতার মুখে আশৈশবের পরিচিত জনেরা রাতারাতি নাড়ীর বাঁধন ছিঁড়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে ভারতে পাড়ি জমান। ভারত থেকেও বানের জলের মত আসতে থাকে মানুষ। ছড়িয়ে পড়া ধর্মের বিষ ছোট্ট মঞ্জুকেও নিস্তার দেয়না যেন; প্রিয় বন্ধু বেলি'র পেট কাটবে বলে কোমরে ছোট্ট দা নিয়ে বন্ধুর বাড়ির সামনে ঘুর ঘুর করে! এমন বিষের যন্ত্রণা নিয়ে মঞ্জুর কত বন্ধু হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে ফেলবার যাতনা বইয়ের শব্দ ফুঁড়ে পাঠক মনে ঘা মেরে যায়। বিষাক্ত এই পরিস্হিতি সৃষ্টিতে হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থবাদী মনোভাবের প্রতি আনোয়ারা তাঁর ক্ষোভ ঢেলে দিতে দ্বিধা করেন না, 'পাখির গা থেকে যেমন পালক খসে পড়ে, বড় হবার পর এদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও খসে খসে পড়েছে।'
একটা আত্মজীবনীতে অকপটে নিজের দোষত্রুটি তুলে আনার সততা দেখানো কঠিন বৈকি। নিজের শৈশবের নানান দোষ ত্রুটিগুলো তুলে আনবার জন্যে আনোয়ারা সৈয়দ হক সাধুবাদ পাওয়ার দাবী রাখেন। 'নরক ও ফুলের কাহিনী'কে পরিপূর্ণ আত্মজীবনী বলা চলে কিনা সেটি একটি প্রশ্ন হতে পারে। মেডিক্যালে পড়তে ঢাকায় যাচ্ছেন, এ পর্যন্ত এসেই কাহিনির সমাপ্তি ঘটে। তাঁর বর্ণনায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কিছু খুচরো আলাপে(ঘুগনি বিক্রেতা প্রসঙ্গ সহ আরো কিছু জায়গায় খুব সামান্য মুক্তিযুদ্ধের কথা এসেছে) বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি আসবার যে সম্ভাবনা পাঠক মনে উঁকি দিয়েছিল, সেটি পূরণ না হওয়ার একটা আফসোস থেকে যায়। তাছাড়া তার প্রথম উন্মুখ ভালোবাসার ঘটনা ঠিক কী কারণে ম্লান হয়ে গেলো সেটির ব্যাপারেও পাঠকের কৌতূহলী জিজ্ঞাসা তৈরি হয়। যদিও একপর্যায়ে তিনি জানাচ্ছেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে তাঁর প���রথম ভালোবাসা অর্থাৎ মুকুল যেন বাধা না হয় সেজন্য তাকে দূরে সরিয়েছেন, তারপরও শেষ হইয়াও হইল না শেষের একটা রেশ থেকে যায় এই ঘটনার পেছনে।
বইটি পড়তে পড়তে মিহির সেনগুপ্ত রচিত 'বিষাদ বৃক্ষ' এর কিছু কিছু ব্যাপারে কেমন একটা সাজুস্য খুঁজে পাই। কাহিনি বর্ণনায় সময়ের ধারাবাহিকতা ভেঙেছে 'বিষাদ বৃক্ষের' নিয়মই। পরের ঘটনা আগে, আগের ঘটনা পরে বর্ণনার খানিক ঝোঁক দেখা গেছে এখানেও, অবশ্য সেটি নিয়ে মিহির সেনগুপ্তের জবাবদিহি থাকলেও, আনোয়ারা সৈয়দ সে পথে হাঁটেননি। 'বিষাদ বৃক্ষ' এ পরিচিত স্বজনের বসতভিটে ছেড়ে চলে যাবার হাহাকার বাজতে শুনেছিলাম। জেনেছিলাম রাজনীতির নামে কিছু মানুষ কতটা স্বার্থপর হয়ে ওঠে। পাঠক হৃদয় কেঁদে ওঠেছিল মিহির সেনগুপ্তের জন্মভূমি ছেড়ে যাবার আহাজারিতে। অবশ্য 'নরক ও ফুলের কাহিনী'তে আনোয়ারার পরিবার ত্যাগের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন।
চুড়িপট্টির বদ্ধ সমাজ, অশিক্ষায় ভরা পরিচিত পরিবেশ, সবার জন্য অবারিত দ্বার বাড়িটিতে কখন কে নারীত্বের অপমান ঘটায় সে আশংঙ্কা ইত্যাদিকে পেছনে ফেলে চলে যাবার সময় পাঠক আনোয়ারা কে সঙ্গত কারণেই বিষন্ন হতে দেখেন না, বরং স্বাধীনতার আনন্দ, নারীত্বের বিকাশ ঘটবার তুমুল সম্ভাবনার প্রতিধ্বনি শোনেন 'আমি ঢাকা যাচ্ছি। শূন্য থেকে যাচ্ছি একশো'র দিকে। আমি মেয়ে মানুষ না, মানুষ হতে যাচ্ছি।' মায়ের ট্রাঙ্ক গোছানোর ফাঁকে দর্জির দিয়ে যাওয়া হাফ প্যান্টের রহস্য খুলে বলতেই চুপসে গেলো তার যাবতীয় উদ্দীপনা..বাস্তবতা মুখ নেড়ে জানিয়ে দিল তুমি আগে মেয়ে, তারপর হয়ত বা মানুষ! আশার কথা, আনোয়ারা সৈয়দ হক বাস্তবতার সাথে লড়াই করে নিজেকে প্রমাণ করেন যথাযোগ্য মর্যাদায়। চুড়িপট্টি থেকে উঠে আসা এই মানুষটি সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত, স্বনাম খ্যাত চিকিৎসক-সাহিত্যিক। এই সাফল্যের পেছনে তাঁর মেঘভর্তি মাথার অশিক্ষিত, বদরাগী, গোঁয়ার বাবা এবং শিক্ষাবঞ্চিত মায়ের মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যে দিয়ে নিজের স্বপ্নপূরণে যথেষ্ট কঠোর এবং ব্যাকুল অবদান অনেকের জন্যেই একটা দৃষ্টান্ত বটে। আনোয়ারা সৈয়দ হকের গুটি কয়েক ছোটগল্প, ছোটদের বই পড়েছি, যেগুলো সেভাবে মনে দাগ রেখে যায়নি। 'এখন তুমি বড় হচ্ছো' সুলেখিত ও গুরুত্বপূর্ণ বইটির পর আমার ধারণা 'নরক ও ফুলের কাহিনী' তাঁর আরেকটি সুলিখিত এবং পাঠক সমাদৃত হবার মতো বই।