দীর্ঘ রাজত্বকালের শেষে বিদায় নিচ্ছে শাসক, আসছে নতুন জমানা। বাতাসে উড়ে বেড়ানো আবিরের কণা জানান দিচ্ছে পালাবদলের। ভালো দিনের স্বপ্নে বিভোর গ্রামবাসীরা। সেই স্বপ্নের উড়ানে সামিল অভিনেতা ভুবনকুমারও, রাজনীতির জগতে তাঁর অনুপ্রবেশ ঘটে যায় হঠাৎই। জনপ্রিয়তার জেরে বিধায়করূপে নতুন পথে যাত্রা শুরু হয় তাঁর। গ্রামবাসীরা মেতে ওঠে তাদের বিধায়ককে নিয়ে। কিন্তু অভিনেতা ভুবনকুমার কি সত্যিকারের নেতা হয়ে উঠতে পারবেন? পারবেন কি মানুষের জন্যে যে সমস্ত পরিকল্পনা, সেসবকে বাস্তবায়িত করতে, নাকি স্বার্থান্বেষীদের সঙ্গে সংঘাত তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? ছায়াছবির নায়ক ভুবনের রাজনীতির মায়াজাল ভেদ করে বাস্তবের অধিনায়ক হয়ে ওঠার সেই যাত্রাপথের নথি এই উপন্যাস।
আজ থেকে বছর ছয়েক আগের সেই সময়টা আপনাদের মনে আছে, যখন হোর্ডিং-পোস্টার ছাপিয়ে সত্যিই আমাদের বুক কাঁপিয়ে তুলেছিল ‘পরিবর্তন’ নামক শব্দটা? যখন বসন্তের বজ্রনির্ঘোষের মতো করে নীল-সাদা হাওয়াই চপ্পল আর তেরঙা ঘাসফুলের মধ্যেই মানুষ শুনতে পাচ্ছে অনাগত যুগান্তরের পদধ্বনি? বাংলার বাইরের মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব, ঠিক কত বড়ো একটা পরিবর্তন ঘটছিল সেই সময়টায়। কিন্তু আমরা, মানে এই বাংলার মানুষেরা তো বুঝতে পেরেছিলাম। আর সেজন্যই বরাবর মনে হয়েছে, সেই সন্ধিক্ষণটাকে নিয়ে বাংলায় কেউ লেখে না কেন? জানি, বিচক্ষণ সাহিত্যিকেরা বলবেন যে একটা ন্যূনতম দূরত্ব তৈরি না হলে পরিপ্রেক্ষিত গুলিয়ে যায়, ফলে ব্যাপারটা অন্ধের হস্তিদর্শন হয়ে দাঁড়ায়। তবু, সময়টা কাছ থেকে দেখেছি বলেই হয়তো সেটা নিয়ে পড়তে ইচ্ছে করেছে বরাবর। অভীক দত্ত-র চাবুকের মতো নভেল্লা “নষ্ট সময়ের উপাখ্যান” সেই সময়টাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে ঠিকই, কিন্তু সে লেখার স্বাদ ছিল বড়ো বেশি ঝাঁঝালো। সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর দু’টি অবিস্মরণীয় উপন্যাস “ধুলোখেলা” এবং “সংক্রান্তি” বাংলার ইতিহাসের সেই সময়টাকে ধরেছে। প্রথমটির প্রেক্ষাপট বৃহত্তর হলেও দ্বিতীয়টি সেই ক্রান্তিকাল নিয়েই লেখা। এখনও, আমার মতে, সেই সময়টাকে ছুঁতে গেলে, তাতে মিশে থাকা কান্না-রক্ত-বারুদের গন্ধ পেতে গেলে, ওই উপন্যাসটা অবশ্যপাঠ্য। কিন্তু আরো কেউ যে লিখেছেন সেই সময়টা নিয়ে, এবং সে লেখায় যে আছে রীতিমতো থ্রিলারের স্বাদ, সেটা বুঝলাম দেবাঞ্জন মুখার্জি-র “অধিনায়ক” পড়তে গিয়ে।
এক সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক ভুবনকুমার ইন্ডাস্ট্রির দ্বিচারিতা, উপেক্ষা, এবং একাকিত্ব সহ্য করতে না পেরে প্রায় সন্ন্যাস নিলেন। পূর্ব মেদিনীপুরের মাঙ্গলাই গ্রামে একবার শ্যুটিং করতে এসে জায়গাটা তাঁর ভারি ভালো লেগেছিল। শহর ছেড়ে আরো অনেক দূরে যাওয়ার জন্য তিনি এই গ্রামের এক পরিত্যক্ত বাড়িই বেছে নিলেন। অভিমানী মানুষটি স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে মিশে হঠাৎ বুঝতে পারলেন, মানুষের ভালোবাসা সেলুলয়েডের বাইরেও পাওয়া যায়, যদি ‘তাদের’ একজন হয়ে ওঠা যায়। তাঁর একক জনসেবামূলক প্রয়াসগুলো খুব শিগগিরি শাসক ও বিরোধী, দুই দলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এদিকে তখন নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে। নেত্রীর নেতৃত্বে কোমর বেঁধে ঝাঁপাচ্ছে বিরোধী দল। শাসক দল ব্যাকফুটে। এই সময়, বিরোধী নেত্রী একটা মাস্টার স্ট্রোক নিলেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ও অরাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসা মানুষ হিসেবে তিনি ভুবনকুমার-কে প্রার্থী করা হল বিধানসভা ভোটে। ভুবনকুমার জিতলেন। কিন্তু তারপর কী হল? ক্ষমতার পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ হয় না, বরং হয় ঘোর কন্টকাকুল, তা ভুবন কীভাবে বুঝলেন? ক্ষমতায় আসা দল একের পর এক সংকট মোকাবিলায় শেষে কী পথ নিল?
থ্রিলারের মতো টানটান ও নির্মেদ এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে কোথাও গতি রুদ্ধ হয় না। কী ঘটছে তা বুঝেও আমরা পাতা ওল্টাই ঘটনাক্রম জানতে। তবে একটা জায়গায় গিয়ে দেবাঞ্জন বাস্তব থেকে আমাদের নিয়ে যান ইচ্ছাপূরণের মাটিতে। আর তখনই আমাদের চটকা ভাঙে। আমরা নির্মোহ হয়ে ভাবতে বসি, লেখাটা কেমন ছিল।
উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির পরিবেশিত দেড়শো টাকা দামের এই বইটির মুদ্রণ এমন কিছু নয়। ছাপার ভুল কম হলেও বইয়ের ভেতরে অলঙ্করণের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রচ্ছদে উত্তমকুমারের অনুকরণে মুখ্য চরিত্রকে আঁকা একটি অত্যন্ত সস্তা গিমিক বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এসব নয়। এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড়ো শক্তি এবং দুর্বলতা অভিনেতা ভুবন কুমার। এত সরলরৈখিক চরিত্র বাস্তবের মাটিতে আমরা দেখি না, তাই তাঁর উত্থান-পতনের সঙ্গী হতে, তাঁর হয়ে গলা ফাটাতে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না। সেই কারণেই তাঁকে দশচক্রে ভূতায়িত হতে দেখে আমাদের কষ্ট হয়। কিন্তু চরিত্রটি অবাস্তব বলেই মনে হয়, না, এঁর দ্বারা এই জিনিস হত না। কেন? হাতে গরম উদাহরণ রয়েছে এই রাজ্যেই। এবং সে বেচারির হাল দেখলেই তো বোঝা যায়, মহানায়ক থেকে অধিনায়ক হওয়া শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। উপন্যাসের চালিকা শক্তি হল রাজ্যের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন, এবং সেই ঘূর্ণিঝড়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র সহ বিভিন্ন মুখ্য ও গৌন চরিত্রের আনাগোনা। সেই জায়গাটা দেবাঞ্জন নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন সাংবাদিকের স্বাভাবিক কুশলতা ও নির্মমতার সঙ্গে, যেমনটা দেখা গেছিল তাঁর রহস্য উপন্যাস “অপ্রকাশিত ছবি”-তে। তবে সেখানেও লেখা সরলীকরণের শিকার হয়েছে। মানছি, ১৯১ পাতার একটা উপন্যাসে সব কিছু তুলে ধরা সম্ভব নয়। ক্ষমতার আলোর ঠিক নিচেই দানা বাঁধে যে অন্ধকার, তাও পুরোপুরি ফোটানো সম্ভব নয় হয়তো এই পরিসরে। কিন্তু তবু, এই উপন্যাসে যেভাবে এ-র পর বি, তারপর সি, ফলোড বাই ডি হয়েছে, সেটা বাস্তবে ঘটে না ও ঘটেনি। আর সেজন্যই পুরো লেখাটার মধ্যে, এমনকি মাঝেমধ্যে গুঁজে দেওয়া চমকে, আর শেষের ইচ্ছেপূরণেও একটা তাড়াহুড়ো রয়ে গেছে।
সামগ্রিকভাবে এটাই বলার যে ২০১০-১১-র সেই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন লেখক তাঁর এই বইয়ে, যেটা একবার পড়তে শুরু করলে মাঝপথে থেমে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু এটা তাঁর সেরা লেখা নয়। তাঁকে এখনও অনেক-অনেক পথ হাঁটতে হবে। আমি তাঁর কাছ থেকে কোনো একদিন ‘দ্য পেলিকান ব্রিফ’-এর মতো লেখা পড়তে পাওয়ার আশা রাখি।