একটা পুস্তিকা বা একটা বক্তৃতা। অথচ তাতেই যে সমস্ত কথা এসেছে তাকে সম্প্রীতির একটা মর্মকথা ধরে নেয়া যেতে পারে। মাত্র ৩৭ পাতার এই বইটিতে সুধীর চক্রবর্তীর একটি প্রাঞ্জল বক্তৃতা রয়েছে৷ যেখানে আলোচিত হয়েছে পাঁচমুড়ো, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি এলাকার লোকশিল্পের কথা।
লোকশিল্পকে উন্নত করতে গেলে হেড এন্ড হ্যান্ড এর যে একটি গূঢ় যোগাযোগ প্রয়োজন তা বুঝতে পেরেছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়৷ লোকসমাজ শিক্ষিত না হলে লোকশিল্পের উন্নতি দূরে, সেটি হারিয়েই যাবে। আর হারিয়ে তো যাচ্ছেই। প্রকৃত শিল্পীদের মূল্যায়ন কতটুকু করি আমরা?
এইযে শহুরে লোকেরা নানা অথেন্টিক মাটির মূর্তি বা কাঠের মূর্তি বা পটচিত্র দিয়ে ঘরদোর সাজান, তাঁরা নামী বিপণি থেকে দামে কিনলেও মূল শিল্পী কতটুকু পারিশ্রমিক পান তার একটা আন্দাজ তো আমরা জানি৷ সেগুলো নিয়ে অবশ্য মাথা ঘামানোর সময় নেই কারো।। ফলত কুমোরেরা ত্যাগ করছে বৃত্তি, বৃত্তি ত্যাগ করছে লোকশিল্পীরা। কারণ শিল্প বা পিতৃপুরুষের বৃত্তি বাঁচাতে গিয়ে সম্মান বা অন্ন কোনটাই তো ঠিকমতো জুটছে না।
লোকশিল্পের অবয়বের পারস্পরিক একটা লেনদেনের প্রসঙ্গ এনেছেন কথক। কৃষ্ণনগর আর পাঁচমুড়োর শিল্পীদের মধ্যে আইডিয়ার লেনদেনের মাধ্যমে নতুন কিছু সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে সুধী সমাজের এগিয়ে আসার কথা বলেছেন৷।
সম্প্রীতির কথা বলছিলাম শুরুতেই। মাঝি আর তাঁতি বা কৃষক আর তাঁতি ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সম্প্রীতির কথা বলেছেন লেখক তা আজকালকার দিনে আর অবশিষ্ট আছে কিনা জানা নেই। হয়তো আছে গ্রামে গঞ্জে। সেটা জানতে হলে সরেজমিন দেখে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা দ্বারা ঘরে বসে এই আশ্চর্য পৃথিবীর ততোধিক আশ্চর্য মানুষের নানা রূপ-রস-ঘ্রাণ যে আমরা সম্পূর্ণ পাব না তাতো জানা কথাই।
আমার পরিচিত এক সঙ্গীতপ্রেমী আছেন, তাঁর নাকি ফোক গানকে গান বলেই মনে হয় না! এই মাটির কাছাকাছি সুর থেকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও যেখানে আলোড়িত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছেন সেখানে এই কথাটি যে নিতান্তই হাস্যকর তাতো বলার অপেক্ষা রাখে না।
লোকশিল্প সম্পর্কে আমাদের এই ভাসা ভাসা জ্ঞান এবং লোকসমাজের অশিক্ষাই বোধহয় এই দুইয়ের মধ্যে এবং আরবান সোসাইটি আর রুরাল সোসাইটির মধ্যে ব্যবধানের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে৷ এই বিষয়টা নিয়ে ভাবার এবং কিছু করার সময় এখনো রয়েছে আমাদের হাতে।
এই বক্তৃতাটি প্রখ্যাত বিচিত্রকর্মা শিল্পী এবং শিক্ষক ললিতমোহন সেনের জন্মদিন উপলক্ষে স্মারক বক্তৃতামালার প্রথম বক্তৃতা। শান্তিপুরে রবীন্দ্র স্মৃতি ভবনে লেখক দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে লোকশিল্প এবং একজন মহান শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য পত্রলেখার এই প্রকাশনা।