বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বাঙালী জাতির মহান সন্তান বিচারপতি চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লন্ডনে তাঁর সদর দফতর স্থাপন করে পৃথিবীর দেশে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরূপে ছুটে বেড়িয়েছেন - সম্পন্ন করেছেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। শত্রুরা তাঁর প্রাণের প্রতি হুমকি প্রদর্শন করেছে - তাঁর প্রাণহানির আশঙ্কায় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড সর্বক্ষণ তাঁকে প্রহরা দিয়েছে। কিন্তু এই অবিচলিত শান্ত ও সাহসী মানুষটির ছিল একটিই কথা: ‘লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে তবু পাকিস্তানের সঙ্গে আপোস করে দেশে ফিরব না।’ মুক্ত স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার অর্পণ করা হয় তাঁকে। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি গ্রন্থে তিনি বিবৃত করেছেন প্রবাসে একাত্তরের দিনগুলির স্মৃতিকথা । তাঁর অকপটতা ও সারল্য দিয়ে নির্মিত এই স্মৃতিকথা ।
"লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে তবু পাকিস্তানের সঙ্গে আপোস করে দেশে ফিরব না।"
বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরী। বাংলাদেশের ২য় রাষ্ট্রপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তারচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ৭১ এ প্রবাসে বাংলাদেশের মুখ ছিলেন। ২৫শে মার্চের রাতে বাংলাদেশে থাকলে হয়তো তিনিও হত্যার শিকার হতেন। ভাগ্যক্রমে ছিলেন বিদেশে। জেনেভাতে। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে ঢাকার খবর পাওয়ার সাথে সাথে দুদন্ড তিনি চিন্তা করেন নি আসলে কি করতে হবে। গলগল করে ওইদিনই মানবাধিকার কমিশনের সভায় উপস্থিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালানো তান্ডবের কথা তুলে ধরেন। সেই দিনের পর আরো ৯ মাস তিনি তাই করলেন। প্রবাসী সরকার তাকে বিশেষ দূত নিযুক্ত করলেন, আর তিনি তুলে ধরতে লাগলেন ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান, সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার যুক্তি, কেন আমাদের স্বাধীনতা দরকার। তার জীবনঝুকি ছিলো। পাকিস্তানিরা তাকে মেরে ফেলার ছকও করেছিলো। প্রবাসী বাংগালীদের এক সূত্রে গেথেছেন। দেশে সাহায্য পাঠানোর অনুরোধ করে গেছেন ইউরোপের এখান থেকে ওখানে। তার প্রচেষ্টায় ইউরোপব্যাপী জনমত গড়ে উঠে বাংলাদেশের পক্ষে। পাকি প্রপাগান্ডা ভেস্তে যায়।
ভারত ছাড়া আর কোন দেশ যে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে, এই বই না পড়লে হয়তো জানতামই না । শুধু রাজনৈতিক কারনে সরকারী সমর্থন না, সাধারন বিদেশীরা যারা হয়ত আগে কোনদিন বাংলাদেশের নামও শুনে নি , তারা যে ভাবে এগিয়ে এসেছে , সেটা অসাধারন । শুধু একটা ঘটনা বলি, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর এক ব্রিটিশ দম্পত্তি নিয়ম করে বিবিসিতে প্রচুর ফোন দিয়ে যুদ্ধের খবর জানতে চাইতেন । তাদের ধারনা ছিল এতে করে বিবিসি বুঝবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ব্রিটিশদের আগ্রহ আছে এতে করে তারা আরও বেশি করে খবর প্রচারের চেষ্টা করবে ।
আরেকটা জিনিস অসাধারন লেগেছে, লেখকের ভদ্রতা । অন্যান্য লেখকের মত নিজের কাজকে উপরে তোলা কিংবা সব ক্রেডিট নিজে নেওয়ার চেষ্টা করেন নি । তার বিরোধীপক্ষকে গালাগালি করে জাতে তুলেন নি ।
❝লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে তবু পাকিস্তানের সাথে আপোস করে দেশে ফিরব না।❞
“প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি” অধ্যাপক আবু সাঈদ চৌধুরী রচিত একটি স্মৃতিকথা, যেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর দিনলিপি লিখে গেছেন। গ্রন্থটি অসমাপ্ত।
অধ্যাপক আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত এবং স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি৷ প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে তিনি চষে বেড়িয়েছেন ইউরোপ ও আমেরিকা। সেখানে সরকার প্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন৷ সাক্ষাৎ করেছন বিভিন্ন দেশি কূটনৈতিক ও সাধারণ মানুষের সাথেও। সবাইকে উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করেছেন — কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত।
উল্লেখ্য — ২৫ শে মার্চ তিনি একটি সম্মেলনে যোগদানের জন্য জেনেভায় ছিলেন। তিনি সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। ২৫ শে মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে তা শুনে ২৬ শে মার্চ সকালেই স্বীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন৷
❝আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলীচালনার পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম।❞
তিনি তাৎক্ষণিক লন্ডন এসে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে কাজে লেগে যান। সেখানে এসে তিনি প্রখ্যাত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে দেখা করেছেন এবং তাঁদের সাহায্য কামনা করেছেন৷ লন্ডনস্থ বাঙলিদেরকে সংঘটিত করে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করেন৷ এই স্টিয়ারিং কমিটির কাজ ছিলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও শরণার্থীদের জন্য ফান্ড সংগ্রহকরণ। পরবর্তীতে প্রবাসী সরকার গঠিত হলে তাঁকে প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বহির্বিশ্বে “বাংলাদেশের মুখ” ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। স্কন্ধে এই গুরুদ্বায়িত্ব নিয়ে একাগ্র চিত্তে কাজ করে গেছেন৷ কিন্তু বিন্দুমাত্র অহম্ ছিলো না তাঁর মধ্যে৷ বন্ধু-শত্রু সবাইকে সম্মান দিয়েছেন, কাছে টেনে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিয়ে তাদের মতামত শুনেছেন; তাই সম্মান কুড়িয়েছেনও সবার কাছ থেকে।
বইটিতে তিনি তাঁর নিজের স্তুতি গাননি৷ ছিলো না কোন প্রচেষ্টা নিজেকে জাহির করার। মুক্তিযুদ্ধে কিভাবে অসংখ্য বাঙালি ও অবাঙালি প্রত্যক্ষ্য ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছে, সাহায্য করেছে— তাই তুলে ধরেছেন। আর এরই আড়ালে মনে হলো আমাদের কাছে তাঁর ওপর অর্পিত দ্বায়িত্বের কৈফিয়ত দিয়েছেন। আর এভাবেই তিনি দেখিয়েছেন — তিনি কতো মহান। তিনি কতো গুরুদ্বায়িত্ব পালন করেছেন৷
এই বইটিকে আমরা কেন পড়বো? বইটিকে আমরা নেহাৎ একটি ইতিহাসের বই হিসেবে পড়বো না৷ কারণ বইটি সেভাবে রচিত হয়নি। বইটিকে একটি স্মৃতিকথা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ডায়েরি হিসেবে পড়বো৷ আর জানবো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার বাইরেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য একটি যুদ্ধ হয়েছে; যা রণাঙ্গনের যুদ্ধের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না৷ আমরা জানবো এবং চিনবো সেই সব স্বার্থহীনদেরকে যাঁরা সর্বস্ব দিয়ে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু বিনিময়ে কিছু চাননি। চেয়েছেন ন্যায় ও সত্যের জন্য এবং মানবাধিকার রক্ষা। অত্যন্ত দুঃখজনক হতেও সত্যি, এ সকল সৈনিকদের সংগ্রামের কথা কোথাও শোনা যায় না, কেউ তাঁদের নাম জানেন না৷ কিন্তু তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।
“কোনো কোনো সময় শুধু বেঁচে থাকাটাও একটা দেশ সেবা।”
"লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে তবু পাকিস্তানের সঙ্গে আপোস করে দেশে ফিরব না।" -আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭১ সালে আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ২৫ শে মার্চের গণহত্যার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন উক্ত পদ হতে। মুক্তিযুদ্ধের পর হয়েছিলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যেমন অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ছিল, তেমনি বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায়েও সোচ্চার ছিলেন দেশপ্রেমিক বাঙালিরা। বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায়ে কি পরিমাণ পরিশ্রম করেছেন তৎকালীন প্রবাসীরা তারই এক ঐতিহাসিক দলিল এই বইটি। লেখক চষে বেরিয়েছেন ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে। সাক্ষাৎ করেছেন বিশ্ব রাজনীতির হর্তা-কর্তাদের সাথে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন ও স্বাধীনতা অর্জনে প্রবাসীদের প্রভাব ছিল অদম্য। বইটি পড়লে আসলে বোঝা যায় যে শুধুমাত্র দেশের ভেতরেই না, দেশের বাইরে থেকেও যুদ্ধে অংশ নেয়া সম্ভব।
ইতিহাসের বই, রসকষহীন লাগতে পারে। কিন্তু এটাকে শুধু ইতিহাসের বই না ভেবে, প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের দিনলিপি হিসেবে অবশ্যই পড়া উচিৎ। হ্যাপি রিডিং।