দেব্রীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (English: Debiprasad Chattopadhyaya) ভারতের কলকাতায় ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক। তিনি প্রাচীন ভারতের দর্শনের বস্তুবাদকে উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর লেখাগুলো একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়। এছাড়াও তিনি প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার জনপ্রিয়করণের অন্যতম পু্রোধা দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। বিজ্ঞানের নানা বিষয় অত্যন্ত সুখপাঠ্য ও প্রাঞ্জল করে লেখার মেধাবী হাত উনার ছিলো। বিজ্ঞানের নানান বিষয় রোমাঞ্চকর গল্পের মতো চিত্তাকর্ষকভাবে বলার চমৎকার ক্ষমতা উনার।লেখকের সেই অসাধারণ ন্যারাটিভ 'পৃথিবীর ইতিহাস' গ্রন্থে ও বিদ্যমান। তবে এই বইটির সহ-লেখক রমাকৃষ্ণ মিত্র ও দেবীপ্রসাদের সাথে তাল মিলিয়ে সুন্দর করে এগিয়েছেন।
পৃথিবীর ইতিহাস এর মতো ব্যাপক ও সুবিশাল বিষয়বস্তু নিয়ে সুখপাঠ্য,জনসাধারণের বোধগম্য এবং কৌতূহলোদ্দীপক বাংলা বই লেখা তাও ১৯৫০ এর দশকে নিঃসন্দেহে দূরহ তো বটেই, প্রশংসনীয় ব্যাপার ও বটে। লেখকদ্বয় অতি সংক্ষেপে পৃথিবী সৃষ্টির প্রাক্কাল থেকে চৈনিক সভ্যতা পর্যন্ত এই সুবিশাল ইতিহাস গল্পের মতো করে অভিনবত্বের সাথে বলে গেছেন, তাদের নিজ বর্তমান সময় পর্যন্ত আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে। এতো বিশাল সময়ের ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সাড়ে তিনশো পাতায় বিবৃত করা অবশ্যই প্রায় অসম্ভব ব্যাপার তবে মূল ইতিহাসের সরল স্রোতের আঁকাবাঁকা লাইনগুলোর মোটা দাগ ঠিকই উনারা বইতে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। তবে যেহেতু বইটি ৭০ বছর আগে লেখা, তখনকার সময়ে বিজ্ঞান যা জানতো না তার অনেক কিছুই এখন জানা হয়ে গেছে বা বিজ্ঞান অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে।ফলে বইয়ের অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য আপডেট হয়ে পরিবর্তিত হয়েছে বা অনেক অজানা ব্যাপার এখন ডিস্কোভারি বা জিওগ্রাফী চ্যানেলের কল্যাণে এখনকার শিশু-কিশোররাও জানে। তা সত্ত্বেও এই বইয়ের আবেদন বর্তমান একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। 'পৃথিবীর ইতিহাস' বিষয়ক প্রবেশিকা বই হিসেবে বইটি আজোও চমৎকার।
তামা যুগের শুরুতে (ব্রোঞ্জ যুগের খানিকটা আগে) তামার ব্যবহার যখন সর্বময় বেড়ে গেলো, খনি থেকে খুঁড়ে তামা সংগ্রহ করাটা তখনকার হালের ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়ালো। এরকম ই তামার সন্ধান করতে করতে এক জায়গায় একটা গোটা তামার দ্বীপই পাওয়া গেলো। পরে সেটার নামই হয়ে গেলো তাম্র দ্বীপ যেটাকে আমরা আজকে সাইপ্রাস নামে চিনি। সাইপ্রাস অর্থ হলো তামার দ্বীপ।
এরকম আরো অসংখ্য খুচরো, টুকরো-টাকরা চমকপ্রদ সব তথ্যে ভরা এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। পরবর্তীতে এর আধুনিক সংস্করণ বের হয় ১৯৯৪ সালে।
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তার এই বইটিতে ইতিহাসের অনেক জটিল বিষয়গুলিও এতো ঝরঝরে সুন্দর করে তুলে ধরেছেন যে, যেকোনো বয়সের ছেলে- বুড়োর ইতিহাসের বেসিক আউটলাইন জানার জন্যে এই বই অত্যন্ত উপযোগী। পড়ার সময় মনেই হয়নি যে এইটা আরো প্রায় অর্ধ শতাব্দীর বেশি (৬৫ বছর) আগে লিখা বই।
সত্যতার শুরু তেকে লৌহ যুগের সূচনা পর্যন্ত বিস্তুত আলোচনা করা হয়েছে এ বইতে। সহজ করে ছোট ছোট বাক্যে যে কোন কঠিন বিষয়কে বোঝানো হলো দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এর বিশেষত্য।