এ যেন সেই মিক্সচার যার মধ্যে গাঠিয়া, চানা ডাল, সবুজ মুগ, ঝুরিভাজা – সব আছে। ভৌতিক, হাসির, মানবিক, রূপকথাধর্মী, সায়েন্স ফিকশন – সবই আছে এই বইটাতে। ঝরঝরে লেখা, সুন্দর শব্দচয়ন গরগড়িয়ে চালিয়ে নিয়ে যাবে পাঠককে। ভয় পেলেন অভয়চরণ, রতনের অদ্ভুত রেডিয়ো, লাইব্রেরির ভৌতিক ডায়েরি পড়ে শিহরণ জাগবেই। তখনই পড়ে ফেলতে হবে বুফে, কুমার তনু, বিনয়বাবুর গল্পোর শ্রোতা। ব্যস্, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরবেই। এবার তাহলে একটু মানবিক হওয়া যাক। রতন ঘোষের মোরগ, রাজবল্লভপুরের ভূত আরাম দেবে মনকে। হালুম এবং মঙ্কু ও সুতোর মালা এনে দেবে রূপকথার অমলিন স্বাদ। লকাই আর সেই লোকটা পড়তে পড়তে কিশোর-কিশোরী বন্ধুরা চলে যাবে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে। বই ধরলে শেষ না করে স্বস্তি নেই। একমলাটে মিক্সচার ঠাসা!
ভয় পেলেন অভয়চরণ রতনের অদ্ভুত রেডিও ভেকুর কেরামতি কুমার তনু বুফে মিত্তিরমশাই রাজবল্লভপুরের ভূত লাইব্রেরির ভৌতিক ডায়েরি বিনয়বাবুর গল্পের শ্রোতা হাওয়া হালুম মংকু ও মুক্তোর মালা রতন ঘোষের মোরগ অদ্ভুত সেই টর্চটা কলা জগবন্ধু স্যারের পৃথিবী লকাই আর সেই লোকটা
বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।
শিশু-কিশোর সাহিত্য সৃজণ করা কি খুব সহজ কাজ? সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে ‘আনন্দমেলা’-র কিংবদন্তী সম্পাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সচেতনভাবে সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের কাছ থেকে ‘ছোটোদের’ জন্য লেখা নিয়ে একটা নতুন ঘরানার জন্ম দেন। ফলে আমরা এমন কিছু সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হই, যাঁরা ততদিন অবধি মূলত প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্যই লেখালেখি করেছেন। এঁদের মধ্যে সবাই সফল হননি, অনেকের লেখাই কালের কষ্টিপাথরে দাগ কাটতে না পেরে হারিয়ে গেছে। ‘ছোটোদের’ জন্য লিখে ব্যর্থ হওয়া লেখকদের এই নামের ভিড়ে এমন অনেক সাহিত্যিককেই পাওয়া যাবে, যাঁদের বাদ দিয়ে ‘বড়োদের’ বাংলা সাহিত্যকে কল্পনাই করা যায় না। এঁরাই প্রমাণ করেছেন, মনে রাখার মতো শিশু-কিশোর সাহিত্য সৃজণ মোটেই সহজ কাজ নয়। জনপ্রিয়, এবং বাংলা সাহিত্যে নতুন দিক-নির্দেশ করা কিছু সার্থক গল্পের রচয়িতা সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষালের ‘ছোটোদের’ লেখার এই সংকলনটি পড়তে গিয়ে তাই এই চিন্তা হচ্ছিলই যে, লেখাগুলো হিট হবে, না মিস/ফ্লপ? সৌভাগ্যের বিষয়, পত্র ভারতী থেকে এই বছরের বইমেলায় প্রকাশিত এই ১৬০ পৃষ্ঠার সুমুদ্রিত, অগ্নিভ সেন-এর অলঙ্করণ ও প্রচ্ছদে শোভিত হার্ডকভারটিতে মিস-এর সংখ্যা হিট-এর চেয়ে অনেক কম।
কী আছে এই বইয়ে? বইটিতে একটি সংক্ষিপ্ত ও অকপট প্রাক-কথন থাকলেও প্রথম প্রকাশকালীন কোনো তথ্য নেই বলে হতাশ হলাম। তারপরেই শুরু হয়ে গেল গল্পদের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয়।
(১) ভয় পেলেন অভয়চরণ: রাজ্যস্তরের ব্যায়ামবীর অভয়চরণ সন্ধান পেলেন রীতিমতো কম ভাড়ায় একটি চমৎকার বাড়ির। তারপর কী হল? অত্যন্ত পরিচিত প্লট নিয়ে লেখা এই গল্পটা বর্ণনার গুণে, এবং খুব হালকা হাস্যরসের উপস্থিতির ফলে পড়তে বেশ লাগে। (২) রতনের অদ্ভুত রেডিও: চাঁদনি থেকে স্পেয়ার পার্টস কিনতে গিয়ে একটা অ্যান্টিক রেডিও পেল রতন। কিন্তু সেটা চালিয়ে কী শুনল সে? আবারো এটাই বলতে হয় যে একটা চেনা ও বহুব্যবহৃত প্লট লেখকের কলমের নৈপুণ্যে সুখপাঠ্য হয়ে পেশ হয়েছে এই গল্পে।
(৩) ভেকুর কেরামতি: যেকোনো তালা খুলে ফেলতে পারে ভেকু। শুধু তাই নয়, তালা খুলতে না পারলে তার অবস্থাই সঙ্গিন হয়ে পড়ে! কিন্তু এই অদ্ভুত গুণ বা দোষ ভেকুর কাছে কি আশীর্বাদ হয়ে আসবে, না অভিশাপ? সহজ গল্প, অতি সহজ ভঙ্গি, এবং প্রত্যাশিত পরিণতি। তবে ছোটোদের মন ভালো করে দেওয়ার পক্ষে আদর্শ গল্প এটা।
(৪) কুমার তনু: সখেদে জানাই, প্রতিভাহীন একটি ছেলের গায়ক হওয়ার অপচেষ্টাকে হাস্যরসের মোড়কে তুলে ধরার চেষ্টা নিয়ে লেখা এই গল্পটা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
(৫) বুফে: হাসির গল্প লেখা যে সবচেয়ে কঠিন কাজ, এটাই লেখক আবার প্রমাণ করলেন এই হাস্যরস-বর্জিত এবং বিশুদ্ধ ক্রোধোৎপাদক গল্পটির মাধ্যমে।
(৬) মিত্তিরমশাই: সার্থক শিল্পী যেমন তুলির কয়েকটা আঁচড়েই দর্শকের সামনে এক নতুন জগৎ উন্মোচিত করতে পারেন, এই গল্পেও তেমন একটি আপাত সহজ পরিবেশে, সূক্ষ্ম কিছু রেখায়-লেখায় লেখক তুলে ধরেছেন এক মর্মান্তিক কাহিনি।
(৭) রাজবল্লভপুরের ভূত: প্রত্যাশিত প্লট, আকাঙ্ক্ষিত পরিণতি, কিন্তু পরিবেশনের গুণে এই গল্পটি অনীশ দেব-এর ক্লাসিক গল্প “ভয় পাওয়া মানুষ” (গল্পটা “ভূতনাথের ডায়েরি”-তে পাবেন)-এর অভিমুখী হয়েছে।
(৮) লাইব্রেরির ভৌতিক ডায়েরি: ডব্লিউ.ডব্লিউ. জ্যাকবস-এর অদ্বিতীয়, এবং আক্ষরিক অর্থে অতুলনীয় গল্প “দ্য মানকি’জ প”-এর প্লট অনুসারী এই গল্পের পরিণতিটা বেশ মন-ভালো করে দেওয়া।
(৯) বিনয়বাবুর গল্পের শ্রোতা: নাঃ! এটাও ব্যর্থ। এমন একজন সুলেখক, যাঁর লেখায় অনুচ্চ হিউমারের উপস্থিতি যথেষ্টই উজ্জ্বল, ঘোষিত ভাবে হাসির গল্প লিখতে গেলেই এমন কষ্টকর গল্প উপহার দেন কেন?
(১০) হাওয়া: ভূতের, বা ভয়ের গল্প হিসেবে এই প্লটটা বহুব্যবহারে এতটাই জীর্ণ যে গল্পটা পড়ে মোটেই ভালো লাগল না।
(১১) হালুম: গল্পটা কেমন, তার অ্যাসিড টেস্ট করলাম সেটা মেয়েকে পড়ে শুনিয়ে। সে হেসে কুটিপাটি হল। কাজেই বুঝতে পারছেন, গল্পটা ভালো হয়েছে!
(১২) মংকু ও মুক্তোর মালা: পশুপাখিদের নিয়ে লেখা হলেও এটা বড্ড ফ্ল্যাট এবং একমাত্রিক গল্প, যা পড়ে একটুও মজা পেলাম না।
(১৩) রতন ঘোষের মোরগ: এই গল্পটাও মেয়েকে পড়ে শোনালাম, এবং সে খুব মজা পেল। উদ্দিষ্ট পাঠক যখন খুশি হয়েছে, তখন আমি এই গল্পটা নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করার কে?!
(১৪) অদ্ভুত সেই টর্চটা: নাঃ! এটাও জমেনি। ভূত দেখার জন্য চশমা, টর্চ, ক্যামেরা, মায় মোবাইল নিয়ে এত-এত গল্প লেখা হয়েছে যে পরিবেশনে নতুনত্ব না থাকলে তাই দিয়ে পাঠককে প্রভাবিত করা মুশকিল। এই গল্পে তিনটি প্রধান চরিত্রের মধ্যে একজনের নাম অভিজ্ঞান। অন্য দু’জনের নাম সৈকত আর হিমাদ্রি দিলে তাও নাহয় একটু নতুনত্ব হত!
(১৫) কলা: গল্পটা চমৎকার সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করেও শেষে এসে না রাখতে পারল আকর্ষণ, না হাস্যরস। মনে পড়ে গেল, এই থিম নিয়েই একদা পড়েছিলাম হিমানীশ গোস্বামী-র অসামান্য স্যাটায়ার “রাষ্ট্রপতির নতুন অর্ডিন্যান্স”। হায়! কোথায় গেল সেসব অমূল্য রতন?!
(১৬) জগবন্ধু স্যারের পৃথিবী: অক্ষম ও ব্যর্থ হাসির গল্প নয়, লেখকের আসল সিদ্ধি যে অশ্রুবিন্দুর মধ্যে সিন্ধুকে ফুটিয়ে তোলায়, সেটাই প্রমাণিত হয় এই গলার কাছে গিঁট ফেলে দেওয়া গল্পে। একবার পড়লে আর ভোলা যায় না, এমনই এই গল্পটি।
(১৭) লকাই আর সেই লোকটা: ভূত আর কল্পবিজ্ঞান মিশিয়ে লেখা এই আদ্যন্ত প্রেডিক্টেবল গল্পটা মোটেই আহামরি নয়, তবে পড়তে বেশ লাগে।
সব মিলিয়ে এটাই বলার যে এই সংকলনটিকে ‘ক্লাসিক’ বা ‘না পড়লে বিরাট ক্ষতি’ গোত্রে না ফেলা গেলেও পড়তে বেশ লাগে, এবং এমন কয়েকটি গল্পের সন্ধান এদের মধ্যেই পাওয়া যায় যাদের মনে রেখেই দিতে হয়। তাই শক্তি-সুলভ দ্বিধায় ভুগবেন না। যদি বইটা পড়ার সুযোগ পান, মানে পড়তে পারেন, তাহলে দয়া করে পড়ে ফেলুন। “কেন পড়বেন” জাতীয় প্রশ্ন তুলে নিজেকে কষ্ট দেবেন না।
ছোটদের জন্য গল্প সংকলন। কিছু গল্পের কাহিনী বা শেষ আগে থেকেই আঁচ করা যায়। গল্পগুলো মাঝারি মানের লেগেছে, যদিও ছোটদের গল্প অনেকদিন পর পড়ছি, তাই পড়তে বেশ ভালোই লাগে।
ভয়, ভূত, সামাজিক, কল্পবিজ্ঞান, হাসি, রূপকথা মিলিয়ে মিশিয়ে সংকলনটি করা হয়েছে।
ভালোলাগা গল্পগুলো - বুফে, লাইব্রেরির ভৌতিক ডায়েরি, হালুম, মঙ্কু ও মুক্তোর মালা, কলা, লোকই আর সেই লোকটা।
'জগবন্ধু স্যারের পৃথিবী'-শীর্ষক গল্পটি ছাড়া আর কোনো গল্প ভালো লাগেনি। অন্যান্য গল্পগুলির প্লট অত্যন্ত কাঁচা এবং সহজেই অনুমেয়। লিখনশৈলীর মধ্যেও নতুনত্ব কিছু নেই। একটি গল্প ভালো লেগেছে বলেই দুই স্টার দিলাম।