'যে শিশু মানচিত্র ও প্রতিলিপি ভালোবাসে
তার কাছে এই বিশ্ব তার ক্ষুধার মতই প্রকান্ড
ওহ, প্রদীপের আলোয় কতই না বিশাল এই পৃথিবী
স্মৃতির চোখে এই পৃথিবী কতই না ছোট!'
শুরু করলাম 'চার্লস বেদলোয়া'র লেখা কবিতার কটা লাইন দিয়ে, নাহ কবিতা আমার পড়া হয়নি। সুনীলের অনুবাদে কবিতার এটুকু পড়লাম 'ছবির দেশে কবিতার দেশে' বইয়ে। আসলে ছবি বা পেইন্টিংতো লিখে দু'কথায় বর্ণনা করা সম্ভব না, তাই কবিতা দিয়েই শুরু করতে হল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একটা ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি ঔপন্যাসিক নাকি কবি! তার সৃষ্টি যদি পাঠক মনে ছাপিয়ে থাকে, তবে সেটা উপন্যাস বেশি। হ্যাঁ, তার লেখা কবিতাও জীবন্ত-সজীব। তবুও সুনীল বলেছিলেন, তিনি নিজেকে কবি ভাবতে ভালবাসেন। এমন কবির কাছে কবিতা যে আলাদা ও বিশেষ কিছু, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা চলে, 'অর্ধেক জীবন' বইটি যদি সুনীলের জীবনের প্রথম অংশ হলে 'ছবির দেশে কবিতার দেশে' বইটি তার বাকী অর্ধেকের আত্মজীবনী। তবে আমি বলব ভিন্ন কথা, বইটি শুধু আত্মজীবনী নয়। বইটি কাব্য, অনুবাদ, প্রবন্ধ আলোচনা অথবা নিখাঁদ খাঁটি একটা উপন্যাস; যে নামেই প্রকাশ করবেন, অপূর্ণ থেকে যাবে।
শুধু 'ছবির দেশে কবিতার দেশে' নিয়ে সংক্ষেপে রিভিউ লেখা সম্ভব নয়। নাম শুনে বলার অপেক্ষা রাখেনা ছবির দেশ বলতে আমরা প্রথমে ফরাসী দেশ পরে সমগ্র ইউরোপকেই বুঝি। সতেরো শতকের শুরু থেকে ইউরোপ�� যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল 'ছবির দেশে কবিতার দেশে'র ভাষায় সেটা শিল্প সাহিত্যের বিপ্লব। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বইটিতে তুলে ধরেছেন তার জীবদ্দশার পাঁচবার ইউরোপ তথা ফ্রান্স ভ্রমণের কাহিনী; যদিও তিনি বইটির শুরুতে বিশাল অংশ জুড়ে বর্ণনা করেছেন তার আমেরিকার প্রবাস জীবনের গল্পও। নিজের কথা বলার সাথে সাথে বইটির দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র সুনীলের ফরাসী বান্ধবী মার্গারিট ম্যাথিউ। হ্যাঁ, মার্গারিট ম্যাথিউ এসেছে সুনীলের লেখা বেশ কয়েকটি বইয়ে। তবে 'ছবির দেশে কবিতার দেশে'র মার্গারিটকে তিনি তুলে ধরেছিলেন অন্তরঙ্গ জীবনের নিক্তিতে। অকপটে বলেছেন মার্গারিটের সাথে তার স্মৃতির গল্প। বিশ্বাস করুন, এমন সমৃদ্ধ একটা উপন্যাসের একটা পর্যায়ে মার্গারিট বিষয়টা আপনাকে থমকে দেবে। আপনি আবেগি হলে কাঁদতেও পারেন।
'ছবির দেশে কবিতার দেশে' বইটি পড়ার আগে নিজেকে কিঞ্চিৎ পড়ুয়া দাবী করতাম। কয়েকবার পড়ার পরে এখন চিত্রশিল্প প্রেমীও দাবী করতে পারি। একটা বই যে কখনো একটা ক্লাস রুম হয়ে ওঠে, এই বইটি তারই নিদর্শন। আপনি যখন ভ্রমণ পড়বেন, খেয়াল করবেন লেখক তার ভ্রমণ কেচ্ছাকে সাহিত্যের স্বরে বর্ণনা করেছেন। অথবা স্থানীয় সংস্কৃতির মিশেলে গল্প সাজিয়েছেন। বইটিতে সুনীল সে পথে হাটেননি। শেষের চারবারের ভ্রমণের যে বর্ণনা তিনি করেছেন, তাতে তিনি কখনো গদ্যকার, কখনো কবি, আবার কখনো শিল্পীর গভীর জায়গা থেকে এমনভাবে লিখেছেন আপনার কাছে মনে হবে যেন ওই ভ্রমণে সুনীলের সাথে আপনিও সহযাত্রী ছিলেন। আমেরিকা সফরে বান্ধবী মার্গারিটের ক��ছ থেকে ফরাসী ভাষা, শিল্প ইতিহাস সম্পর্কে গভীর তথ্য সমৃদ্ধ হয়েছিলেন; তারই মিশেলে পরবর্তী চারবার ভ্রমণের চিত্রে ছিল গভীর ছোঁয়া। প্রতিবার ভ্রমণে বিষয়ভিত্তিক বর্ণনার সাথে সাথে ইতিহাস তুলে ধরেছেন গভীরভাবে। ঠিক এ কারণে প্রত্যন্ত 'লুদ' গ্রামে যদি কোন কারণে আপনার যাত্রা থমকে, তবে অবশ্যই ভাবতে বাধ্য হবেন বইটির কথা। আমেরিকায় হারিয়ে যাওয়া এই গ্রামের মেয়ে 'মার্গারিট' এর কথা। যার কাছে প্রেম ছিল পবিত্র, ভালবাসা ছিল অনেকটা ধর্মীয় সাধনার মত। তা সে যত কঠিনই হোক। ওই যে বইটিতে 'জ্যাক প্রেড' বলেছিলেন!
'লোহার বাজারে গিয়েছি আমি
শিকল কিনেছি,
কঠিন শিকল।
তোমারি জন্য, হে আমার প্রেম।'
কাহিনিঃ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ষাটের দশকে জীবনের প্রথম পাসপোর্ট বানিয়ে উড়াল দিয়েছিলেন আমেরিকাতে। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পল এঙ্গেল বিদেশী ভাষা নিয়ে কাজ করার জন্য সারাবিশ্ব থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটার নিচ্ছিলেন, আর সে দলেই ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কোলকাতা, চাইবাসা-সাওতাল পরগণার বাইরেও যে চমৎকার পৃথিবী রয়েছে সেটাই কাছ থেকে দেখা শুরু হয় তার আমেরিকা প্রবাসজীবনে। আইওয়া শহরের শ্বেতাঙ্গ স্বর্ণকেশীদের ভিড়ে কিঞ্চিৎ ভিন্ন চেহারার এক নারীকে আবিস্কার করেছিলেন সুনীল, হ্যাঁ এটাই মার্গারিট। যাকে চুমু খেতে চাওয়ার অপরাধে দীর্ঘ দিন বিচ্ছেদ মানতে হয়েছিলো। মার্গারিট বিশ্বাস করে, চুমু ভালবাসার অংশ। ভিন্ন ধর্মের একটা ছেলের সাথে এই অনুভূতি বিনিময়ের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। যদিও পরে সুনীলের সাথে সম্পর্ক গড়ে! সম্পর্কের আবর্তেই সুনীল জানতে পেরেছেন ফরাসী দেশ সম্পর্কে, সমগ্র ইউরোপের শিল্প সাহিত্য সম্পর্কে। শব্দ শব্দ ধরে মার্গারিট সুনীলকে শিখিয়েছেন ফরাসী কবিতার অর্থ।
আত্মজীবনীমূলক বইটিতে সুনীল উল্যেখ করেছেন মার্গারিটের সাথে তার বোঝাপড়ার কথা। একজন সমৃদ্ধ সাহিত্যিক হতে হলে তাকে যে আমেরিকা ছেড়ে কোলকাতায় ফিরতে হত সেটা মার্গারিটও মানতেন। বইটির শেষ দিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্বীকার করেছেন, মার্গারিট তাকে ভালবেসে কোলকাতায় অলিয়স ফ্রোজেসে চাকুরী নিয়ে আসতে চেয়েছিল। এছাড়াও প্রথম দিকেই তিনি উল্যেখ করেছেন বিখ্যাত সব অ্যামেরিকান কবিদের সাথে আড্ডার গল্প, যার মধ্যে এ্যালেন্স গিনসবার্গ অন্যতম। ১৯৭১ সালে এ কবির লেখা September on Jessore road বাঙালী জাতীর আত্মার গল্প।
বইটিতে প্রতি পরিচ্ছেদ শুরুতে বিখ্যাত সব কবিদের কবিতার অনুবাদ দিয়ে শুরু করেছেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এরপরে এনেছেন ভ্রমণ ও চিত্রশিল্পের বর্ণনা। চিত্রশিল্পের বর্ণনায় উঠে এসেছে সতেরো, আঠারো শতকের বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পীদের কথা। বইয়ের মধ্যেও রঙিন কাগজে আনন্দ পাবলিশার্স ছাপিয়েছে ইম্প্রেশোনিজম আন্দোলনের সদস্যদের গভীর সব চিত্রকর্ম। চিত্রকে টানতে গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন রেনোয়া, এ্যাডওয়ার্ড মানে, গ্যগা, পিকাসোদের বিখ্যাতসব চিত্রকর্ম আর তার চিত্রপটের বর্ণনা। ফরাসীদের ইতিহাস থেকে শুরু ইউরোপের ব্রিটিশদের আগমন এমনকী নেপোলিয়নের বর্ণনা করেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন মার্গারিটের খোঁজ পাননি সুনীল, এরপরে বিয়ে করেছেন স্বাতি গঙ্গোপাধ্যায়কে। মজার ব্যাপার হল মার্গারিটের প্রতি স্বাতির শ্রদ্ধা ছিল বোঝা যায়, লেখক আত্মজীবনীমূলক বইটিতে তুলে ধরেছেন তার ব্যক্তিজীবনের সেসব গল্পও। ফরাসী ভাষা জানা স্ত্রীকে নিয়ে পরবর্তিতে তিনি ফ্রান্স ভ্রমণ করেছেন লিখেছেন সে বিষয়েও। উল্যেখ করেছেন ফ্রান্সে তাদের বন্ধুদের কথাও। বইটির এভাগে তিনি এমন কিছু তথ্যযোগ করেছেন যা অনেকটা পাঠ্যবইয়ের মত। যেমন ফরাসীদের যুদ্ধ, ইম্প্রেশোনিজম আন্দোলনের বিষয়বস্তু, নেপোলিয়নের গল্প এবং সমৃদ্ধ কবিদের কবিতা নিয়ে সাহিত্য আলোচনা। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে বলেছেন ভ্রমণকাহিনীও।
মাঝের পরিচ্ছেদে তিনি একবার টেনে নিয়েছেন মার্গারিটের সাথে তার ফ্রান্স ভ্রমণের গল্পও, বইটিতে সুনীল অকপটে স্বীকার করেছেন তাদের এক সাথে থাকার কথা, ফ্রান্স জুড়ে জগতবিখ্যাত মিউজিয়াম আইফেল টাওয়ারে ওঠা নিয়ে মার্গারিটের অনাগ্রহও লিখেছেন তিনি। পরবর্তি আরো কয়েক পরিচ্ছেদে তিনি লন্ডন ও প্যারিস প্রবাসি বন্ধুদের সাথে উত্তর ফ্রান্সের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতিচারণ করেছেন।
বইটির শেষ দিকের কিছু কথা এমন যে শিল্প সাহিত্য এখন হয়ে গেছে নিউইয়র্ক কেন্দ্রিক বিশ্বের সেরা সব আর্ট গ্যালারী সব সেখানে অথচ একটা সময় বৈশ্বিক শিল্পের কেন্দ্র ছিল ফ্রান্স। ডেনমার্কের এক কবি তাকে বলেছিলেন তার বই দুশো কপি বিক্রি হলেই তিনি সার্থক, কারণ শিল্প সাহিত্য এখন আর ইউরোপে নেই সেটা গরীবদের খাদ্যে পরিণত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশে এসব নিয়ে মাতামাতি হয়! সত্যিই যদি তাই হত তবেই হয়েছিলো। সুনীল বেঁচে নেই, থাকলে আজ লিখত ছাপাখানার প্রসারতা বাড়লেও সাহিত্য বাড়েনি। তাই হয়ত 'ছবির দেশে কবিতার দেশে'র মত বইটি নিয়েও এখন তেমন কেউ মাতে না। বাংলাদেশেও আজ দুয়েকশ কপি বই বিক্রি হলেই নিজেকে সার্থক মনে হয়।
নিজস্ব মতামতঃ
রিভিউটি লেখার আগে দেখলাম বইটি নিয়ে খুব বেশি সমৃদ্ধ আলোচনা নেই। অথচ বইটি অনেকেই পড়েছেন। এমন একটি বই যা ভ্রমণ, সাহিত্য, ইতিহাস, চিত্রশিল্পের তথ্য সমৃদ্ধ। বইটি আগ্রহের পাঠ্যসূচীতে যুক্ত হলে এ যুগের বিসিএস পড়ুয়ারা গিলে খেতো। সে যা হোক, যে কথা শুরুতে বলছিলাম, এক কথায় আলোকপাত করে এই বইয়ের রিভিউ করা সম্ভব নয়।
বইপোকাদের গ্রুপে মাঝে মাঝে পোস্ট দেখি, আউটবই পড়বো নাকি টেক্সট বই! আউট বই বলতে তারা এসব বইকেই বোঝান। এইসব টেক্সটবুক পাঠকদের টেনে এনে যদি এমন সব বই পড়ানো সম্ভব হয় তবেই মৌলিক সাহিত্যের ধাঁরা যেমন সমৃদ্ধ হবে তেমনি গল্পে গল্পে কীভাবে নিজেকে সমৃদ্ধ করা যায় তাও সাধন হবে।
শেষ করবো বইটিতে উল্যেখিত ভলতেয়ারের দারুণ এক উক্তি দিয়ে,
I love physics so long; I did not try to take precedence over poetry. Now that it is crushing all the arts, I no longer wish to regard it as anything but a tyrant.
রেটিং: নাহ, এসব বইয়ের রেটিং দিতে পারব না।