বাংলায় আফ্রিকা নিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাজাত প্রথম প্রকাশিত বইয়ের লেখক ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস । কেনিয়া থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, এই ছিল রামনাথের আফ্রিকা সফর ।
রামনাথ বিশ্বাস একজন ভারতীয় বিপ্লবী, সৈনিক, ভূপর্যটক ও ভ্রমণকাহিনী লেখক। তিনি ১৯৩৬ ও ১৯৩৭ সালে সাইকেলে চড়ে বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন। রামনাথ ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারি অসমের সিলেট জেলার বানিয়াচং গ্রামের বিদ্যাভূষণপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন; যা বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। হবিগঞ্জের জাতীয় ভান্ডার সমিতির ম্যানেজার পদ যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। জাতীয় ভান্ডার সমিতির মোটর কারখানা থাকার সুবাদে মোটর চালনা শিক্ষা করেন। এখানে থাকাকালীন তিনি সাইকেল চালনারও সুযোগ পান এবং তাতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এরপর জাতীয় ভান্ডার সমিতির কাজ ছেড়ে অন্য একটি চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়েই গোপনে অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেন। কিন্তু তাঁর বিপ্লবী যোগ প্রকাশ হয়ে গেলে তিনি চাকরি থেকে বহিষ্কৃত হন। ইতিমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে যুদ্ধে যোগ দেন। বাঙালি পল্টনের সঙ্গে মেসোপটেমিয়ায় যান। ১৯২৪ সালে মালয়ে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি চাকরিতে যোগ দেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে অসমের সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। রামনাথ বানিয়াচঙ্গেই থেকে যান। কিন্তু তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করতে চাইলে কোন প্রকাশক এগিয়ে আসেনি। অগত্যা নিজেই পর্যটক প্রকাশনা ভবন নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে নিজের বই প্রকাশ করতে শুরু করেন। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পাট চুকিয়ে দিয়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে যান।
কলকাতায় বসবাসকালে রামনাথের ভ্রমণকাহিনী আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। পরে তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের উপর।
প্রায় একশো বছর আগে লেখা এ বইটি নিছক ভ্রমণকাহিনি নয়। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ সাথে থাকলে আফ্রিকার অনেক এলাকায় প্রবেশ করা যেতো না, পদে পদে ছিলো বিপত্তি; সম্পদ ও জীবন হারানোর ঝুঁকিও ছিলো কিন্তু লেখক সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে নিয়েই আফ্রিকা ভ্রমণ করেছেন।দেখেছেন বিচিত্র শ্রেণিপেশার মানুষ ও তাদের ততোধিক বৈচিত্র্যময় বিশ্বাস ও জীবনপ্রণালী; সর্বোপরি তিনি দেখেছেন ও ভালোবেসেছেন মানুষ। তাঁর পর্যবেক্ষণ এখনো প্রাসঙ্গিক। রামনাথ বিশ্বাস এতো আগেও যে উদার ও সংস্কারমুক্ত মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন তা বিস্ময় ও সম্ভ্রমের উদ্রেক করে।
লেখক বলছেন,যারা মনে করেন,ভ্রমণ কাহিনি উপন্যাস জাতীয় বই,তারা দয়া করে আর ভুল করবেন না। এতে উপন্যাসের কিছু নেই।....। ভ্রমণ কাহিনিতে কথাশিল্পের ও বিকাশ হয় না।
উপরের কথাগুলো একমাত্র "রমানাথ বিশ্বাস " ই বলতে পারেন। তার প্রমাণ "অন্ধকারের আফ্রিকা"। এই বইতে ছল চাতুরী মার্কা কথা নেই। কিংবা ভ্রমণের একটানা বেরস বর্ণনা ও নেই। তা স্বত্বেও এটা একটা যথাযথ ভ্রমণ কাহিনি। লেখক আফ্রিকা পরিভ্রমণে বেরিয়ে ছিলেন। তিনি ঘুরে দেখেছেন,টাংগা,জাঞ্জিবার,ডুডুমা,ন্যাসাল্যান্ডের মত জায়গা। যেখানে বসবাস করত মানুষ জাতির মধ্যে সবচে নিগৃহীত একটা সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের বলা হয় " নিগ্রো "। লেখক আফ্রিকা ভ্রমণ করে এই নিগ্রো জাতি পাশাপাশি তাঁর স্বদেশী, আরব, পর্তুগীজ এবং ইংরেজদের বিভিন্ন কথা তুলে এনেছেন। যেখানে সবচে' বেশি পাওয়া যায় নিগ্রো জাতির লাঞ্চিত হওয়ার কথা,তাদের উপর অত্যাচারের কথা। এছাড়া লেখক আরেকটা চমৎকার কাজ করেছেন,সেটা হলো বিদেশি এই জাতির বিভিন্ন আচার, আচরণ, স্বভাব, কাজ-কর্ম ইত্যাদির সাথে ভারতীয়দের তুলনা করে দেখেছেন,যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে ছিল নিগ্রোরা। ভারতীয়দের এই পশ্চাৎপদতার বিভিন্ন কারণ ও লেখক উল্লেখ করেছেন। সেখানে একটা লেখা খুব চমৎকার লেগেছে, লেখাটা এরকম "বিদেশের লোক শিক্ষার্থে ননারূপ উপায় উদ্ভাবন করে,আর আমরা গণেশ ঠাকুরকে জল দিয়ে ভাগ্য ফেরাতে চাই,সরস্বতীকে ফুল দিয়ে জ্ঞানার্জন করতে চাই। " এসব কথা লেখক লিখে গেছেন অনেক আগে কিন্তু তা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান। আমার মনে হয় এই কুসংস্কার কোন কালেই যাবে না,মানুষ কে ছেড়ে।
আমি ভ্রমণ কাহিনি পড়তে পারি না,একঘেয়ে লাগে। কিন্তু এই বইটা দিব্যি পড়ে গেছি,থামতে হয়নি মোটেও। নিগ্রোদের এই কষ্টের কথা জেনেছিলাম " আঙ্কেল টমস কেবিন " পড়ে,এখন আরো নতুন অনেক কিছুই জানলাম। যত জানছি খারাপ লাগা বাড়ছে বই কমছে না। পৃথিবীতে এই বৈষম্য, পুঁজিবাদ ছিল এবং আছে,সংখ্যালঘুরা যে জাতিই হোক বরাবর শোষিত,এত খারাপ লাগে এসব ভাবলে! মানুষ জাতটা কখনোই ভেদাভেদ, বৈষম্য ভুলতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। যাই হোক, বইটা চমৎকার। মুগ্ধ হয়ে পড়ার মত। লেখকের চিন্তা, চেতনা অভাবনীয়। লেখকের যে জিনিস টা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষন করেছে,সেটা তাঁর স্বদেশপ্রীতি।
ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের পৃথিবী ভ্রমণের উপর লেখা ৩০টি বইয়ের একটা। ১৯৩১-১৯৪০ এই সময়ে ভ্রমণ করেছেন আর বই লিখে গেছেন। এমন একটা সময় যখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। ওই সময়ে এদেশে ভ্রমণ কাহিনি কেউ লিখবে কিনা বা লিখলেও কেউ পড়বে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল লেখকের মনেও। তারপরেও তখনকার পরিস্থিতিতে নিজের ভ্রমণের বই লিখে যান। ওই সময়ের বর্ণবাদের রূপ, সমাজের বিভিন্ন ধ্যানধারণা অল্প কথায় খুব ভালভাবেই লেখা। আর শুধু যে আফ্রিকান মানুষদের বর্ণবাদ সেরকম না, এই রঙের খেলায় নিজেদের নড়বড়ে অবস্থান, সাথে সমাজের অনেক সূক্ষ্ম কিছু হিপোক্রেসি ও আছে। বইয়ের কিছু অংশ পড়ে নিজের ভেতরে বিরক্তি আসলেও সেটা আসলে ততকালীন সমাজের ধ্যান ধারণা থেকেই লেখা।
পছন্দের একটা অংশ বলি, " অনেকে আমাকে বলেছেন, 'দেখুন মশায়, আপনার ভ্রমণ কাহিনিতে যে সকল স্থানের নাম থাকে তা ম্যাপে পাওয়া যায় না। ' কথাটা অতীব সুন্দর এবং সরলতায় পূর্ণ। এ কথাটার উত্তরে আমি বলবো, ' বিদেশ সম্বন্ধে আমাদের দেশের লোকের অতি সামান্য জ্ঞান থাকার জন্যই আমাদের এ দুর্দশা। আমাদের দেশের দেয়ালপঞ্জিতে দেবদেবীর ছবি থাকে রাষ্ট্রনায়কদের ছবি থাকে, কিন্তু জাপানে, তুর্কিয়ায় এবং বর্তমানে ইরানের দেয়ালপঞ্জি দেশ-বিদেশের ভৌগোলিক তথ্যে সমৃদ্ধ থাকে।"......"বিদেশে লোক শিক্ষার্থে নানারূপ উপায় উদ্ভাবন করে, আর আমরা গণেশ ঠাকুরকে জল দিয়ে ভাগ্য ফেরাতে চাই, সরস্বতীকে ফুল দিয়ে জ্ঞানার্জন করতে চাই। সেজন্য আমার ভ্রমণ কাহিনির স্থানগুলোর নাম সকলে ম্যাপ খুলেও দেখতে পান না।"
ব্রিটিশ শাসনামলে বলা কথা হলেও ব্যাপারটা এখনো প্রযোজ্য। ভেবে দেখলে বুঝা যায় - শুধু ভ্রমণ না সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
রামনাথ বিশ্বাস যে সময়ে ভ্রমণ কাহিনি লিখতে আরম্ভ করেন তখন তার মতো আর কোনো বাঙালি ভূপর্যটক ছিলে কিনা জানা নেই। এই বইটিকে পুরোপুরি ভ্রমণ কাহিনি বললে ভুল হবে। কারণ লেখক শুধু ভ্রমণ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি। সারা আফ্রিকা জুড়ে নিগ্রোদের উপর চলা নির্যাতন তার বইয়ের প্রতি পাতায় পাতায় লেখা। ভারতীয়দের বর্ণবৈষম্য, ধর্মে ধর্মে প্রভেদের মতো বিষয়গুলো তিনি টেনে এনেছেন তার গ্রন্থে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে সুদূর আফ্রিকা ভ্রমণে কেন ভারতীয়দের বিদ্বেষগুলো তুলে এনেছেন। তার কারণ তখন ভারত এবং আফ্রিকার অধিকাংশ জুড়ে ছিলো ব্রিটিশ উপনিবেশ। সেই হিসাবে অনেক ভারতীয় কাজের জন্য আফ্রিকা পাড়ি জমিয়েছিলেন। তার ফল স্বরূপ তারাও নিগ্রোদের উপর নির্যাতন চালাতো। আর এইসব দেখে লেখক প্রতিবাদ করতেন। সেই প্রতিবাদ যেমন প্রকাশ্যে ছিলো তেমনি লেখাতেও আছে। তার ভ্রমণ বৃত্তান্তের সাথে সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে বলা ভাবনাগুলো তার ব্যাক্তিত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছে সুন্দরভাবে।
লেখক দুঃসাহসী ছিলেন; একটা সাইকেল সম্বল করে তখনকার দুর্গম আফ্রিকায় ঘুরে বেড়ানো যা-তা কথা না। আফ্রিকানদের ব্যাপারে তার সহানুভূতি ছিল, যদিও এখনকার প্রেক্ষাপটে দেখলে সেটাকে একেবারে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি বলা যাবে না, তবে সে সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর। এ লেখার ঐতিহাসিক মূল্য আছে, কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হলো, লেখার ধরণ খুবই এলোমেলো (অনেকটা ডায়েরি ধরণের, তা-ও গোছালো ডায়েরি না), আর মানও বেশ খারাপই বলতে হবে। বারবার প্রসঙ্গান্তরে চলে যাওয়ায় লেখার মূল সুরটাই ধরা গেল না।
প���িব্রাজক এবং ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাস। সাইকেলে চড়ে বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন তিনি। সাইকেলে লেখা ছিল ❛Round the World❜। সাইকেল ছাড়াও ভ্রমণের সঙ্গী ছিল এক জো���়া চটি, দুইটি চাদর। ভ্রমণ করেছে অসংখ্য দেশ। সাথে সেসকল ভ্রমণ নিয়ে লিখেছেন বই। পাঠক জেনে অবাক হবেন, রামনাথ বিশ্বাস সাইকেলে চড়ে পাড়ি দিয়েছেন ৫৩ হাজার মাইল পায়ে হেঁটেছেন ৭ হাজার মাইল এবং ২৭ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন রেলগাড়ি ও জাহাজে।
রামনাথ বিশ্বাস ১৯৩৮-১৯৪০ সালে আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। সাইকেল, পায়ে হেঁটে এবং মোটর-জাহাজযোগে ঘুরে দেখেছেন আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গা। ডুডুমা, জাঞ্জিবার, ন্যাসাল্যান্ড ইত্যাদি জায়গার অরণ্যে, গ্রামে, শহরে ভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। ভ্রমণকাহিনি পড়তে গেলে যেমন একঘেয়ে অনুভূত হয় বইটি সে ক্যাটাগরির মধ্যে পরে না। ভ্রমণের কথার পাশাপাশি লেখক বইতে তুলে এনেছেন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আফ্রিকা ভ্রমণকালের সময়টা ছিল পরাধীনতার। ব্রিটিশ রাজের রাজত্বে নিঃশেষিত হচ্ছিল ভারতবর্ষ। পরাধীনতা, শ্বেতকায়দের কাছে এশিয়াটিকদের নিচু হওয়া এবং সমাজে পিছিয়ে থাকার কারণগুলোও লেখক বইতে উল্লেখ করেছেন। আফ্রিকার নিগ্রো সমাজের দুর্দশার কথা লেখক নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন তার ভ্রমণে। হিন্দু সমাজে যেমন বর্ণবিদ্বেষ আছে, নিচুদের অচ্ছুৎ করে রাখার চলন আছে তেমনি ভাবেই এই নিগ্রোরা আফ্রিকায় নির্যাতিত ছিল। এই বিদ্বেষ সমাজে তাদের এগিয়ে যাওয়াকে প্রতিহত করছে তা তিনি উপলব্ধি করেছেন, চেষ্টা করেছেন তাদের উন্নতিতে অনুপ্রাণিত করতে। আফ্রিকার ভ্রমণের কথা লিখতে গিয়ে লেখক স্বদেশেও যেরকম বিবাদ, বিদ্বেষ, ধর্মে ধর্মে দাঙ্গা হয় সেরকম অবস্থা ঐ দূর দেশেও দেখেছেন। আফ্রিকা বলতে আমরা যে শুধু বুঝি ঘন জঙ্গল, সাপখোপের দেশ লেখক তার লেখায় সে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা নিরসন করেছেন। আফ্রিকা কত সুন্দর দেশ, কত সুন্দর আবাদভূমি তার বর্ণনা দিয়েছেন। আফ্রিকার নিগ্রোদের জীবনযাপনের ধরন, পুরুষ এবং নারীর স্বাধীনতা নিয়ে লিখেছেন। বইটি পড়তে আমার ভালো লেগেছে। লেখক ভ্রমণকাহিনির একঘেয়েমী থেকে ভিন্নভাবে পাঠকের জন্য প্রস্তুত করেছেন ❛অন্ধকারের আফ্রিকা❜ বইটিকে। পায়ে হেঁটে কিংবা উড়োজাহাজে করে আফ্রিকা দেখার সম্ভাবনা যেহেতু শূন্যের কোঠায়, তাই বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরে আফ্রিকা ভ্রমণ করতে চাইলে একবার পড়ে নেওয়া যায় ❛অন্ধকারের আফ্রিকা❜।
পড়ে ভাল লাগলো কিন্তু ঠিক পরিতৃপ্ত হতে পারলাম না। আফ্রিকার মত বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের সংস্কৃতি, খাবার, প্রকৃতি বা মানুষের গল্প প্রায় অনুপস্থিত। লেখক রাজনীতি নিয়ে একটু বেশিই বলেছেন, অতটা বোধহয় না বললেও হত।
ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের পৃথিবী ভ্রমণের উপর লেখা ৩০টি বইয়ের একটা। ১৯৩১-১৯৪০ এই সময়ে ভ্রমণ করেছেন আর বই লিখে গেছেন। এমন একটা সময় যখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। ওই সময়ে এদেশে ভ্রমণ কাহিনি কেউ লিখবে কিনা বা লিখলেও কেউ পড়বে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল লেখকের মনেও। তারপরেও তখনকার পরিস্থিতিতে নিজের ভ্রমণের বই লিখে যান। ওই সময়ের বর্ণবাদের রূপ, সমাজের বিভিন্ন ধ্যানধারণা অল্প কথায় খুব ভালভাবেই লেখা। আর শুধু যে আফ্রিকান মানুষদের বর্ণবাদ সেরকম না, এই রঙের খেলায় নিজেদের নড়বড়ে অবস্থান, সাথে সমাজের অনেক সূক্ষ্ম কিছু হিপোক্রেসি ও আছে। বইয়ের কিছু অংশ পড়ে নিজের ভেতরে বিরক্তি আসলেও সেটা আসলে ততকালীন সমাজের ধ্যান ধারণা থেকেই লেখা।
পছন্দের একটা অংশ বলি, " অনেকে আমাকে বলেছেন, 'দেখুন মশায়, আপনার ভ্রমণ কাহিনিতে যে সকল স্থানের নাম থাকে তা ম্যাপে পাওয়া যায় না। ' কথাটা অতীব সুন্দর এবং সরলতায় পূর্ণ। এ কথাটার উত্তরে আমি বলবো, ' বিদেশ সম্বন্ধে আমাদের দেশের লোকের অতি সামান্য জ্ঞান থাকার জন্যই আমাদের এ দুর্দশা। আমাদের দেশের দেয়ালপঞ্জিতে দেবদেবীর ছবি থাকে রাষ্ট্রনায়কদের ছবি থাকে, কিন্তু জাপানে, তুর্কিয়ায় এবং বর্তমানে ইরানের দেয়ালপঞ্জি দেশ-বিদেশের ভৌগোলিক তথ্যে সমৃদ্ধ থাকে।"......"বিদেশে লোক শিক্ষার্থে নানারূপ উপায় উদ্ভাবন করে, আর আমরা গণেশ ঠাকুরকে জল দিয়ে ভাগ্য ফেরাতে চাই, সরস্বতীকে ফুল দিয়ে জ্ঞানার্জন করতে চাই। সেজন্য আমার ভ্রমণ কাহিনির স্থানগুলোর নাম সকলে ম্যাপ খুলেও দেখতে পান না।"
ব্রিটিশ শাসনামলে বলা কথা হলেও ব্যাপারটা এখনো প্রযোজ্য। ভেবে দেখলে বুঝা যায় - শুধু ভ্রমণ না সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
Colonial Africa as perceived and seen by Ramnath Biswas, the second Bengali cum Indian globetrotter 🌎 , while his journey from Mombasa to Rhodesia via Tanga, Zazibar, Dar es Salaam & Nysaland consecutively.