কী আছে এমন সেখানে যে তাকে বলা হয় ভূস্বর্গ? কেমন সেখানকার মানুষ? কেমন তাদের জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে আর জীবনের নানা অধ্যায়? কেমন তাদের ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার প্রকাশ? কী তাদের অতীত, ইতিহাস? বর্তমান তাদের কেমন? সংঘাতের না শান্তির? কী তাদের গন্তব্য? কোথায় ঠিকানা তাদের অনাগত আগামীতে?
"কাশ্মীর ইতিহাস ও রাজনীতি " বইটি লিখেছেন সাংবাদিক জাকারিয়া পলাশ।
পৃথিবার ভূস্বর্গকে নিয়ে লিখেছেন অনেকেই। যাযাবর লিখেছেন "ঝিলম নদীর তীর ", বুলবুল সরওয়ার লিখেছেন "ঝিলাম নদীর দেশ" কিংবা প্রবীর ঘোষের কাশ্মীর আজাদির দলিলও পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয়।এঁদের চাইতে জাকারিয়া পলাশের কাশ্মীর নিয়ে লেখার অধিকার কোনোঅংশে বেশি বৈ কম নয়। কেননা তিনি নিজে দুইবছর কাশ্মীরে ছিলেন, কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।
কাশ্মীরকে কেমন দেখেছেন জাকারিয়া পলাশ? উত্তর দিচ্ছেন, "কাশ্মীরকে দেখেছি সবকটি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে। " কাশ্মীর নিয়ে আগ্রহ দেখায় দু'দল। একদলে সৌন্দর্যপিপাসুরা আরেকদল উপমহাদেশের ভূরাজনীতি বুঝতে কাশ্মীরকে জানতে চায়। লেখক দুইদলেই ছিলেন।
কাশ্মীরের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটতে বসে লেখক জানালেন কাশ্মীর তো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো জনপদ নয়। বিখ্যাত সিল্করুটেও কাশ্মীরের অস্তিত্ব ছিল টনটনে। যাকে আমরা কাশ্মীর বুঝি সেই কাশ্মীর এতো সহজে নয়, না, রাজনীতিতে, না ভৌগলিক অবস্থানে। বর্তমানে ভারত শাসিত কাশ্মীরকে বলা হয় জম্মু এন্ড কাশ্মীর, পাকিস্তানিরা তাদের কাশ্মীরকে বলে আজাদ কাশ্মীর আর চীনের হাতেও কিছু কাশ্মীর (লাদাখ) আছে।
মূলদ্বন্দ্ব, জম্মু ও কাশ্মীর এবং আজাদ কাশ্মীর নিয়ে। ভারতশাসিত কাশ্মীরে আছে তিনটি অঞ্চলঃ জম্মু(আয়তনের ২৬ শতাংশ) , কাশ্মীর (১৬ শতাংশ) , লাদাখ (৫৮ শতাংশ) । ভারত অবশ্য পাকিস্তানের কাশ্মীরকে' দখলকৃত' কাশ্মীর বলে থাকে।
এই তিন অঞ্চলের মধ্যে কাশ্মীর উপত্যকার জনতা আলাদা হতে চায়। তারা জনসংখ্যায় ৬০ লাখের মতো। এই কাশ্মীরই কিছুদিন পরপর উত্তাল হয়ে উঠে, বিশ্বগণমাধ্যমের শিরোনাম হয় লাশের মাধ্যমে, রক্তের বিনিময়ে। এই রক্তরাঙা খেলার শুরুটা কোথায়? অষ্টম শতাব্দীতে নয় আরো আগেই ইসলাম এখানে এসেছিল বলে তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে জাকারিয়া পলাশ জানাচ্ছেন। তবে ব্যাপক বিস্তার কীভাবে এখানে ঘটে তার আলোচনায় জানা যায়, চতুর্দশ শতকে জোরেশোরে ইসলামের বিস্তার ঘটে এই উপত্যকায়। নবি আসেন নি, এসেছেন পীর আর দরবেশরা। বাংলাদেশের যেভাবে ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে সেখানেও তাই। মোগলদের হাতে কাশ্মীরের পদানত হওয়া কাশ্মীরিরা ভালো চোখে দেখেনি, যেমন দেখিনি লাহোরের রণজিৎ সিং যখন তার অধীনস্ত ডোগরা পরিবারের গুলাব সিংকে কাশ্মীর দান করে তখনও। সেই গুলাব সিং যে কীনা প্রতিজ্ঞা করেছিল রণজিৎ সিংকে আংরেজ হুকুমতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সহায়তা করবে। কিন্তু বেঈমান ও চতুর গুলাব সিং রণজিৎ সিংয়ের সাহায্য এগিয়ে আসেনি। ফলাফল রণজিৎ সিং পরাজিত আর আংরেজ প্রভুরা মাত্র ৭৬ লাখ টাকায় ১৮৪৬ সালে কাশ্মীরকে দান করে তাদের অতিবিশ্বস্ত গুলাব সিংকে তথা ডোগরা পরিবারকে।
মোগল আগ্রাসন থেকে শিখ আবার শিখদের হাত থেকে গুলাব সিং। এই হচ্ছে কাশ্মীরিদের পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্ধনের সূচনা । গুলাব সিংয়ের পর মহারাজা হয় তার গুণধর পুত্র রণবীর সিং। রণবীর সিংয়ের সময়কার কাশ্মীরিদের অবস্থা নিয়ে ১৮৮৪ সালে লর্ড কিম্বার্লি লিখেছিলেন ব্রিটিশ সরকারকে,
"যদিও হিন্দু পরিবারকে রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল, তবুও মহামেডান জনগণের পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপ করতে ইতোমধ্যেই দেরি হয়ে গিয়েছে।" পুরো ব্রিটিশশাসনে এভাবেই ছিল কাশ্মীরিরা। এবার আসলো, দেশভাগের খেলা। ৫৪৩ টি দেশীয় রাজ্যের মধ্য তিনটি ছিল মুসলমান অধ্যুষিৎ কিংবা মুসলমান শাসিত। এই তিনটি রাজ্য ছিল হায়দ্রাবাদ (এখানে জনগণ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ), জুনাগড় ও কাশ্মীর (পুরো মুসলমান অধ্যুষিৎ)।
হায়দ্রাবাদের নিজাম ভারতে যোগ দিতে না চাইলে ভারতীয় সামরিকবাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং পরে তার বৈধতা নিশ্চিতকল্পে গণভোট দেয়, জুনাগড় হায়দ্রাবাদ থেকে শিক্ষা নিয়ে সুড়সুড় করে ভারতে যোগ দেয়। হারাধনের বাকী ছেলে কাশ্মীরের তৎকালীন মহারাজা হরিসিং ফন্দি আঁটেন তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে স্বাধীন থাকবেন। এজন্য তিনি মাউন্টব্যাটেন ও কাশ্মীরি পন্ডিত নেহেরুকে নিরাশ করে জিন্না ও নেহেরুর সাথে দর কষাকষিতে মগ্ন থাকেন। সেখানকার জাতীয়বাদী বীর ছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ। এই শেখ আলীগড়ের এমএ ও দারুণ বাগ্মী। তিনি ১৯৩০ থেকেই কাশ্মীরিদের জাতীয়তাবোধে জাগ্রত করতে কাজ করছিলেন। সাধারণ জনতার কাছে ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন শেখ আব্দুল্লাহ। যেখানে তিনি ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরাজিত করেন শাহী জামে মসজিদের ইমাম পরিবারকে, যারা তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারত।
এদিকে জিন্নার তর সইছিল না কাশ্মীর নিয়ে, অথচ চুক্তি করে বসে আছেন সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালাতে পারবেন না। কিন্তু নেহেরু সেই চুক্তিতে সই করেন নি । এরপর বাকী ঘটনা খানিকটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। পাকিস্তান বুঝতে পারে হরিসিং ভারতে যোগ দিতে পারে। এই ধারণা করার যথেষ্ট কারণও ছিল। এরপর কাশ্মীরদের নিয়ে মুজাহেদীন বাহিনী কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অংশ করতে হামলা চালায়, আর সেইসময়ে হরিসিং তড়িঘড়ি করে ভারতে যোগ দিয়ে বসেন। পাকিস্তান মুজাফরাবাদ, গিলকিত, বালিস্তানসহ কাশ্মীরের কিছু অঞ্চল পায় যেটি এখন পাকিস্তান শাসিত আজাদ কাশ্মীর, আর বাকীটা ভারতের পাতেই রয়েযায়। পাকিস্তানপন্থী কাশ্মিরীদের হটাতে তুমুল লড়াই করেছিলেন শেখ আব্দুল্লাহর দল। তাঁকে জিন্না পছন্দ করতেন না, শেখ আব্দুল্লাহও জিন্নাহকে কাশ্মীরে অপদস্ত করেছিলেন ।শেখ আব্দুল্লাহর বড় সুহৃদ ছিলেন নেহেরু। তারই অনুরোধেই বর্তমান কাশ্মীর ভারতে থেকে যায়। পাকিস্তান কখনো তার "ব্ল্যাঙ্ক চেক" কাশ্মীর হারানোর বেদনা ভুলতে পারেনি, হালও ছাড়েনি ।
এবার, আলোচনা শুধু ভারতশাসিত কাশ্মীর নিয়ে। ৪৮ এ কাশ্মীরচ্ছেদের পর নেহেরু আর কাশ্মীরের অবিসংবাদিত নেতা শেখ আব্দুল্লাহর মাঝে সম্পর্ক অতিনিবির হয়ে ওঠে। তিনি শেখ আব্দুল্লাহকে কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী বানান। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ কাশ্মীরকে দেয় দেশের মধ্যে দেশ হয়ে থাকার নিশ্চয়তা। কিন্তু বিধিবাম, শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মিরকে সুইজারল্যান্ড বানাতে চেয়েছিলেন, স্বাধীনতার কাছাকাছি পৌছে দিতে গিয়ে ভারতীয় সরকারের রোষানলে পড়েন। তার বন্ধু নেহেরুই তাকে জেলে পাঠিয়ে দিয়ে উত্তাল কাশ্মীরের নতুন অধ্যায় সূচনা করেন।
এরপর বাকী ইতিহাস আর রাজনীতির কথা দ্রুত অল্পকথায় বলা যায়,শেরে কাশ্মীর সময়ের সময়ের আবর্তে হয়ে যান কাগুজে বাঘ আর কাশ্মীরিরা যেই ৩৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে নিজেদের স্বশাসন, নিজেদের কাশ্মীরত্ব বজায় রেখেছিল সেই ৩৭০ অনুচ্ছেদ এখন কাগজেকলমে আছে, কাজে নেই। ১৯৭৫ সালে এক কাশ্মীরিপন্ডিত ডি পি ধরের সৌজন্যে ইন্দিরা গান্ধি ৩৭০ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা হ্রাস করেন। এই কাশ্মীরি পন্ডিতরা কাশ্মীরের ইতিহাসকে বারবার প্রভাবিত করেছে আবার নিজেরাও হয়েছে বাস্তুহারা।
১৯৮৬ সালে থেকে কাশ্মীরে শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম। যেন দেয়াল পিঠ ঠেকে গিয়েছে কাশ্মীরবাসীর। ৩৭০ অনুচ্ছদের নামে প্রতারিত হয়েছেন শেরে কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লাহ, প্রতারিত স্বয়ং কাশ্মীরের জনতা, ভেঙে পড়েছে কাশ্মীরের অর্থনীতি,ঘরেঘরে সন্তানহারা মায়ের, স্বামীহারা স্ত্রীর কান্নায় কাশ্মীরের বাতাসকে অনুধাবন করতে চেয়েছেন জাকারিয়া পলাশ। কাশ্মীরের উপত্যকা আজ সেনাছাউনিতে ভর্তি। সেনাতন্ত্রে জোর খাটিয়ে জনমতকে দমানোর চেষ্টা করে, গণতন্ত্র চলে যায় ব্যারাকে ব্যারাকে। সেই ১৯৮৬ সালের সশস্ত্র মতকে দমন করে, কিন্তু মতকে দমানো সম্ভব নয়। তাই লেখকের একবন্ধু বলে ওঠেন, "হাম কেয়া চাতেহে? আজাদি, হক হামারা, আজাদি/ছিনকে লেঙ্গে আজাদি।" এই আজাদির বিপরীতে সেনারা বলে, "দুধ মাঙ্গগে তো ক্ষীর দেঙ্গ/আজাদি মাঙ্গগে তো চির দেঙ্গে।" ১৯৫৩ সালে শেখ আব্দুল্লাহর গ্রেফতারের পর তার দল ন্যাশনাল কনফারেন্স ও এই দলভেঙে গড়ে ওঠা পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ সবাই প্রো ইন্ডিয়ান দলে পরিণত হয়েছে। শেখের বেটা ওমর চিফ মিনিস্টার হয়েছিল, শেখের নাতি ফারুকও চিফ মিনিস্টার ছিলেন। এখন বিরোধীদলের নেতা। এইদলগুলো ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছে, জনতার নয়। তাই সাধারণ জনতা মুক্তির দাবীতে, ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রক্ত দেয় লাশ হয়।
জাকারিয়া পলাশ কাশ্মীরের জনতার ভেতরের কথা বুঝতে চেয়েছেন। কাশ্মীরের এক মায়ের মধ্যে খুঁজেছেন নিজের মাকে। কাশ্মীরের সৌন্দর্যকে তৃষ্ণিতের মত আকন্ঠ পান করেছেন দুইবছর।
জাকারিয়া পলাশের এই বই না ভ্রমণকথা, না গবেষণাগ্রন্থ। এটি এদুয়ের মিশেল। আর লেখকের জানাশোনার ব্যপ্তি বেশ থাকায় বইটিকে আরো প্রামাণ্য করে তুলেছে।
তবে, লেখায় একটা কাঠিন্যভাব ছিল।লেখক নিজেরকথা আরো সহজে লিখতে পারতেন বলেই মনে হয়েছে।ভাষা ব্যবহারে আরো যত্ন আশা করি কেননা প্রায়শই ইংরেজি বাংলার খিচুড়ি ভাষা লক্ষ করেছি। সাংবাদিক জাকারিয়া পলাশের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরো বিশ্লেষণী লেখার আশায় রইলাম।
ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর উপমহাদেশ তো বটেই বিশ্বের অন্যতম এক সংঘাতপূর্ণ এলাকা। ভারত, পাকিস্তান ও চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মীর নিয়ে মূল দ্বন্দ্বটা ভারত আর পাকিস্তানের ; উভয় দেশ-ই চায় জায়গাটার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। দেশভাগের সময় তৎকালীন শাসকের ইচ্ছে ছিল ভারতের অংশ হওয়ার কিন্তু নানা জটিল সমীকরণে আটকে গিয়েছে সে পথ। এখন ভারত নিজের অংশ বন্দুকের নলের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় ( প্রতি ১৬-১৭ জন নাগরিকের জন্য একজন সেনাসদস্য তো সে কথাই বলে!), পাকিস্তান নিজের অংশটা ধরে রেখে ভারতের অংশের দিকে লোভী চোখে তাকিয়ে থাকে আরেকটু নিজের করে পাওয়ার আশায় আর অন্যদিকে আছে কাশ্মীরী জাতীয়তাবাদীরা যারা চায় স্বাধীনতা। কিন্তু বরাবর-ই পরিস্থিতি সেখানে এতটা ঘোলাটে যে কারও আশাই সেভাবে পূর্ণ হচ্ছে না।
লেখক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে কাশ্মীরে ছিলেন দুই বছর। কাশ্মীরের সাথে মিশে থাকার এই অভিজ্ঞতা আর অসংখ্য বইপত্র পড়ে তবেই লেখক হাত দেন এই বইয়ের কাজে। শুরুতেই লেখক বলে নিয়েছেন সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাশ্মীরকে তিনি দেখতে চান গবেষকের চোখে আর সেই পর্যবেক্ষণকে প্রকাশ করতে চান বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে সাংবাদিকের কলমে।
বৌদ্ধ-হিন্দু আর মুসলিম ধর্মের ছায়ায় গড়ে ওঠা হাজার বছরের পুরোনো এই সভ্যতাকে লেখক প্রথমদিকে দেখেছেন প্রকৃতিপ্রেমীর চোখে। তারপরে সংক্ষেপে বলেছেন ইউসুফ শাহ চাককে আকবরের শঠতার মাধ্যমে পরাজিত করে কাশ্মীরে মুঘল শাসন, আফগান শাসন আর শিখ শাসনের কথা। এরপরেই শুরু হয়েছে লেখকের মূল আলোচনা ; অমৃতসরে কাশ্মীরের বেচা-কেনা, দেশভাগের সংকটময় মুহূর্তে হরি সিংয়ের ভারতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের রাজনীতি, স্বাধীন কাশ্মীরের দাবির প্রেক্ষাপট, কাশ্মীরী পন্ডিতদের গণপ্রস্থানের ইতিহাস বর্ণনা করে লেখক কল্পনা করার চেষ্টা করেছেন কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ।
বইটা পড়ে আমার যেটা লাভ হয়েছে তা হলো বেশকিছু বিষয় পরিস্কার হয়েছে আমার। এতদিন শুধু দেশভাগের পরপর পাঠানদের কাশ্মীর আক্রমণ বা নব্বইয়ের দশকে কাশ্মীরী পন্ডিতদের গণ-প্রস্থানের কথা শুনতাম বা কাশ্মীরে গণ-বিক্ষোভের কথা শুনতাম। কিন্তু এসব বয়ানের উল্টো দিকের বয়ান বা পিছনের রাজনীতি বা শুরুর দিনগুলোর পরিবেশ সম্পর্কে জানাল বইটা। মাটির জন্য পাগল যমজ দুই দেশ যে কাশ্মীরীদের কথা বেমালুম ভুলে সংখ্যা আর পরিসংখ্যানের রাজনীতি করছে, নিজেদের কৃতকর্মকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে অপরপক্ষের কৃতকর্ম দিয়ে সেসব উঠে এসেছে বইটাতে। আস্ত মুলোর জন্য দুই রাজার কামড়াকামড়িতে প্রাণ যাচ্ছে নলখাগড়ার কিন্তু রাজাদের কি আর ওসব দেখার সময় আছে! লেখক শান্তি অধ্যয়নের জনক গালটুংয়ের থিউরি দিয়ে দেখিয়েছেন কাশ্মীর সমস্যার বিভিন্ন ধরনের কারনগুলো, সাথে সমস্যা সমাধানের উপায়ও। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন উভয় দেশের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, কাশ্মীরীদের আলোচনার টেবিলে আনা।
আমি নিজে কাশ্মীরের জটিল রাজনীতির তেমন কিছু বুঝি না। কিন্তু এটুকু বুঝি কাশ্মীরের অবস্থান, রাজনৈতিক অর্থনীতি, আরব বিশ্বের সাথে পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে স্থল যোগাযোগ ইত্যাদির জন্য ভারত কখনও কাশ্মীরের দাবি ছাড়বে না আবার সিন্ধু নদের পানি, চীনের সাথে যোগাযোগ ও ইকোনমিক করিডর ইত্যাদি কারণে পাকিস্তানও দাবি ছাড়বে। কিন্তু স্বাধীনতাকামী একটা বিরাট অংশের দাবি কে শুনবে? পাকিস্তান নিজের সম্ভাব্য লাভের কথা চিন্তা করে একদিকে যেমন বারবার গণভোটের কথা বলে তেমনি ভারতও সম্ভাব্য ক্ষতির কথা ভেবে বারবার তা এড়িয়ে চলে। আর এই ডামাডোলে নিহতের সংখ্যা বাড়ে, বিধবা আর অর্ধ-বিধবাদের সংখ্যা বাড়ে, এতিমের সংখ্যা বাড়ে। ঝিইয়ে রাখা ভোগান্তি আর মানুষের দুর্ভোগকে দুই দেশ-ই ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উপাদান হিসেবে।
অনেক খেটেখুটে করা একটা বই। প্রচুর রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন লেখক। বেশি পড়াশুনা না থাকায় পক্ষপাত ধরতে পারি নি তেমন কিন্তু আমার মনে হয়েছে লেখক বেশ ব্যালেন্সড একটা লেখা উপহার দিয়েছেন। প্রতিটা ঘটনা লেখক বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, কোনো পক্ষকে দায়মুক্তি দেওয়ার কোনো প্রয়াস নেই বা নেই এক পক্ষকে অভিযোগে জর্জরিত করার চেষ্টা। কাশ্মীরকে আরেকটু ভালোভাবে চেনানোর জন্য তাই লেখককে ধন্যবাদ দিতেই হবে।