কথাসাহিত্যিক আবু রুশদের তিন খণ্ডের আত্মকথা যথাক্রমে - 'জীবন ক্রমশ, ঠিকানা পশ্চিম এবং এখন বর্তমান' নিয়েই অখণ্ড আত্মজীবনী। ৪শ' পৃষ্ঠার গ্রন্থটি সুখপাঠ্য অথচ সারগর্ভহীন।
পশ্চিমবঙ্গের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মেছিলেন। মাতৃকূল থেকে এ কে ফজলুল হক আত্মীয় এবং পিতৃকূলের বংশলতিকাও বড় মানুষদের ভিড়ে জনাকীর্ণ। নিজস্ব বংশের বর্ণনা আর নিজের বেড়ে ওঠা নিয়ে বিশদ বিবরণ সহজ-সরল ভাষায় লিখেছেন আবু রুশদ। সেই লেখা থেকে মুসলমান খানদানি পরিবারগুলোর কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে কিছু কিছু জানা যায়।
দেশভাগপূর্ব কলকাতার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এঁকেছেন আবু রুশদ। তাতে অবশ্য বাঙালি মুসলমানের প্রাধান্য আছে। অপরপক্ষের কথা বেশি একটা নেই।
নিজের পড়াশোনা, উচ্চশিক্ষা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ প্রভৃতি ঘটনা নিজের স্মৃতি থেকে লিখেছেন আবু রুশদ।
কলেজে শিক্ষকতার অংশটুকু একঘেয়ে। বরং যখন সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড পড়তে গেলেন, তখনকার ঘটনাবলি পাঠক হিসেবে আমাকে আকর্ষিত করেছে। দু'বছর ব্রিটেনে ছিলেন আবু রুশদ। সেই দুই বছরের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাও স্থান পেয়েছে আবু রুশদের জবানিতে। তিনি নিজে অক্সফোর্ডের উচ্ছ্বল জীবনকে উপভোগ করেছিলেন নানা আঙিকে। পাঠকও বঞ্চিত হয়নি সুদূর অক্সফোর্ডের রূপ,রস থেকে।
দেশভাগ হওয়ার পর বাবা-মা আর বড়ভাই রয়ে গেল ভারতে। অনেক দ্বিধা নিয়ে শওকত ওসমান, ফররুখ আহমদ এবং গোলাম মোস্তফার মতো তিনিও চলে এলেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে।
ভারতে শুধু মা-ভাই নয়, আরেক ছোট ভাই কথাসাহিত্যিক রশীদ করিমও উচ্চপদে চাকরি নিয়ে থেকে গিয়েছিল।
কতো সাধ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা আবু রুশদের লেখা পড়লে বোঝা যায়। কিন্তু শিশু রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই অন্যায়ের শিকার হতে থাকে বাংলাদেশিরা। এই শোষণের কিছু নজির চাক্ষুষ করেছেন আবু রুশদ।
কলেজে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে কাজ করেছেন৷ ১৯৭০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান দূতাবাসে বদলি হন৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় দূতাবাসের বাঙালি কর্মীদের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণের ঘটনাগুলো পাবেন। উল্লেখ্য, দূতাবাসে তখন কর্মী হিসেবে এম এ মুহিত ও শাহ এস এম কিবরিয়াও ছিলেন।
সদ্যশত্রুমুক্ত দেশে অনেক স্বপ্ন নিয়ে ফিরলেন আবু রুশদ। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক পদ পেলেন৷ মূলত, এই বইয়ের চুম্বক অংশ বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল। মহাপরিচালকের মতো পদে থেকে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছিলেন আবু রুশদ। রাজনৈতিক সুপারিশ উপেক্ষা করার শাস্তি হিসেবে হতে হয়েছিল ওএসডি। নিজের দুঃখভরা সেই দিনগুলির কথা পাঠককে স্পর্শ করবে।
যেহেতু বঙ্গবন্ধুর আমলো ওএসডি হতে হয়েছিল, সেহেতু এর পরবর্তী শাসকদের প্রতি অ-প্রত্যক্ষ সমর্থন লক্ষণীয়। বিশেষ করে জিয়ার প্রতি।
জিয়ার আমলেই যোগ দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই অবসর নেন।
সাহিত্যিক আবু রুশদের আত্মজবানিতে একজন সাদামাটা মানুষের অবয়ব পাওয়া যায়। তাই বলব, একজন ব্যক্তি আবু রুশদের উপস্থিতির প্রাচুর্য তার আত্মকথায় নেই, বরং সমাজসচেতন, কথাসাহিত্যিক আবু রুশদের অনুপস্থিত বেশিমাত্রায় চোখে পড়েছে।