প্রণবেশ রায়, ওরফে পানু তাচ্ছিল্যে পেনো, চাপরাশি হয়ে পত্রিকার অফিসে ঢুকেছিল। পত্রিকার তৎকালীন কর্ণধারের দাক্ষিণ্যে সে সাংবাদিক বনে। পানু রিপোর্টার। কিন্তু স্নেহপরায়ণ মালিকের পুত্রের আমলে সে আর তেমন কল্কে পায় না। বর্তমান মালিক হাঁদু চক্কোত্তি তাকে একরকম বলেই দিয়েছে, যে ভাবেই হোক পত্রিকায় রকমারি ছন্দের কবিতা দিয়ে সে যদি তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকাটিকে পরাস্ত না করে তাহলে তাকে এই সাধের চাকরিটির মায়া কাটাতে হবে।
হাঁদু চক্কোত্তি আবার ছন্দরসিক। কোত্থেকে একটা পুরনো বাংলা পুঁথি যোগাড় করেছে। তাতে আছে অজ্ঞাত কবিদের লেখা নানান ছন্দের কবিতা। পানুর ওপর ভার পড়ে সেই সব প্রাচীন কবিদের কুলুজী খুঁজে বার করার। সেই কাজেই পানুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এক মাথা পাগলা কিন্তু মস্ত গুণী কবির। চরিত্রটি সরাসরি যেন উঠে এসেছে হ-য-ব-র-ল থেকে। তাই সে কখন পেটুক রামু, কখনও ছাপোষা কেরানি, কখনও বা বার্নার্ড পঞ্চাশ, অসিতবরণ, ভোলা নর্তক কিংবা বীরপুরুষ সাহা। অন্তিম অবতারে সে নিত্য গোঁসাই। একই অঙ্গে এতো রূপ! তুখোড় ছান্দসিক ও ছড়াকার।
আসলে কে সে? সেটাই রহস্য। সেটাই ইতিহাস। সেই নিয়েই গল্প। পঞ্চাননমঙ্গলের মতো রুদ্ধশ্বাস না হলেও কাহিনীতে মজা আছে। সম্যক জানতে হলে বইটা পড়া দরকার।
শেষে যা হয় হোক, এই উপন্যাসে প্রাপ্তি শুধু সেটাই নয়। কাহিনী ছাড়াও পুরো আখ্যান জুড়ে এর ছড়িয়ে আছে অজস্র ছড়া। অসম্ভব নিপুণতায় ছড়াগুলো নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন ছন্দে। ছন্দের দৃষ্টান্তরূপে গদ্যের মাঝে এলেও ছড়াগুলো কোথাও আরোপিত লাগে না। আর এগুলোকে মূলত ছড়া বললেও তার মাঝেই লেখক রেখে দিয়েছেন রামায়ণ, গীতগোবিন্দ, মেঘনাদবধ কাব্যের কিছু কিছু বাংলা ছন্দরূপ! যা অন্যান্য ছড়াগুলোর লঘুতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আছে দৃষ্টান্ত দিয়ে ছন্দের প্রকরণ বোঝানো। অবশ্যই গল্পের মধ্যে, অ্যাকাডেমিক ক্লিষ্টটা নেই তাতে। অথচ গঠন দেখে বোঝা যায় তার পিছনে রয়েছে বিস্তর অধ্যয়ন। পণ্ডিত লোক পাঠ করলে নিশ্চয়ই বুঝবেন। ভুলভ্রান্তি আছে কিনা তাঁরাই বলতে পারবেন।
"বিদঘুটে কবিগণ ঘুটঘুটে আঁধারে, কবিতার মিল খোঁজে রাতে বনে-বাদাড়ে। হ্যারিকেন হাতে নিয়ে ঝোপে মাথা ঢুকিয়ে - খুঁজে দেখে মিলগুলো আছে কোথা লুকিয়ে।"
সত্যিই তো! কোথায় লুকিয়ে আছে বলুন তো এই মিলগুলো? আবার,
"বৈশাখে ছোটো নদী জল কমে সরু, হাঁটু জলে চান করে কুমোরের গরু। বেগুন পটল মূলো - হাটে এল উচ্ছে, হাঁটুজলে গোরুদের গা-টি কে গো ধুচ্ছে?"
বিশ্বাস করুন, এতদিন আমি কবিতার কিস্যু বুঝতুম না। খালি ছন্দে মাথা দোলাতাম। ফেসবুকেও যেসব কবিতা সুন্দর ছন্দের তালে তালে যেত, সেখানেই কমেন্ট করে আসতাম। কিন্তু প্রীতম বসু যেন ছন্দের খেলার ছলে কখন আমার ক্লাস নিয়ে চলে গেলেন, টেরই পেলাম না। "ছিরিছাঁদ" বইয়ের জন্য সবার আগে আমি প্রীতম বাবুকে একটা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানাই। স্যার, আমি আপনার জাবরা ফ্যান হয়ে গেলুম!
"পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল" পড়েই বুঝেছিলাম যে প্রীতমবাবু যদি মঙ্গলকাব্য নিয়ে থ্রিলার লিখতে পারেন, তাহলে বাংলা ভাষা নিয়ে উনি যে আর কী কী করতে পারেন, তার হিসাব মেলা ভার। সেই রেশেই কিনে ফেললাম ২০১৩ সালে প্রীতম বাবুর প্রথম স্বপ্রকাশিত বই "ছিরিছাঁদ"। মাত্র ১১২ পাতার একটা উপন্যাস আমাকে ছন্দের যাদুতে আচ্ছন্ন করে ফেলল। কবিতাকে একটা নতুন দৃষ্টিতে দেখতে পারব এখন থেকে। এককথায় বলতে গেলে, ছন্দ নিয়ে ছেলেখেলা করলেন লেখক। অথচ কোথাও পণ্ডিতিয়ানা জাহির করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা দেখতে পেলাম না। সংস্কৃত এবং বাংলা ছন্দের যে-কটি মৌল রূপ আছে, তার মাত্রাগণনা আর পর্বভাগের কৌশল তিনি খুব সাবলীল বাংলায় আর গল্পচ্ছলে বুঝিয়ে দিলেন। একদিকে গল্প এগিয়ে চলল স্বচ্ছন্দে, অন্যদিকে পাঠকের ছন্দের শিক্ষা হল সম্পূর্ণ!
গল্পের মূল চরিত্র একজন রিপোর্টার। নাম পানু৷ "বঙ্গলেখনী" পত্রিকায় সম্পাদক হাঁদু চক্কোত্তির অধীনে পানু রিপোর্টার একজন মাথামোটা অপদার্থ, যাকে দিয়ে কোনও কাজ হয়না বলে হাঁদুবাবু মনে করেন। কিন্তু শুধু ওনার বাবার কথায় তিনি এই ছেলেটিকে চাকরিতে বহাল রেখেছেন। বঙ্গলেখনীর অফিসের ঠিক উল্টোদিকে হাঁদুবাবুর রাইভাল বিপুল লাহার "নববঙ্গ" পত্রিকার অফিস। তাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে হাঁদু চক্কোত্তি দেখিয়ে দিতে চান যে বাংলা কবিতায় ছন্দের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। এই কাজেই একদিন ওনার হাতে আসে বহু পুরনো দিনের জরাজীর্ণ একটা পুঁথি। "লালচে তুলোট কাগজ, জায়গায় জায়গায় জলের দাগ হলদে হয়ে বসে কালি থেবড়ে দিয়েছে।, কাগজের কোনাগুলো ছিঁড়ে গেছে। প্রথম পাতায় গোটাগোটা সুন্দর হাতে লেখা - 'শ্রীছন্দ'।"
এই শ্রীছন্দে এমন কিছু ছন্দ দেখতে পেলেন হাঁদু বাবু, যার ব্যবহার এখন আর পাওয়াই যায় না। তাই পানু রিপোর্টারের ওপর দায়িত্ব বর্তালো সেইসব কবিদের খুঁজে বার করার। এদিকে রাতের বেলা এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা মিউজিয়াম - এইসব জায়গায় শুরু হল চোরের উপদ্রব। চোর প্রচুর মূল্যবান বাংলা সাহিত্যের বই ঘাঁটাঘাঁটি করেছে, কিন্তু কিছুই খোয়া যায়নি। পানু হন্যে হয়ে খুঁজতে বেরোতেই ওর দেখা হতে লাগল বেশ কিছু লোকের সঙ্গে, যাদের ছন্দের জ্ঞান অফুরান, কিন্তু তাদের ট্র্যাক করা দুরূহ। কখনও দেখা হল পেটুক রামুর সাথে, আবার কখনও ছাপোষা কেরানির সাথে, কখনও সে নিত্য গোঁসাই, আবার কখনও অসিতবরণ। এইভাবেই জমে উঠল গল্প। আর গল্পের আড়ালে পরিচয় পেতে লাগলাম তোটক, চম্পক, বলাকা, মন্দাক্রান্তা, দিগক্ষরা, পঞ্চচামর, একপদী, দ্বিপদী, ত্রিপদী, অনুষ্টুপ, রুচিরা, পয়ার, ভুজঙ্গপ্রয়াত - এইরকম সমস্ত সংস্কৃত ছন্দের সঙ্গে, যারা প্রীতম বাবুর কলমের সহজ সরল "ড্যাডাং ড্যাং" বা "তা ধিন ধিন" ভাষায় আমার চোখের সামনে নাচতে লাগল। সাথে ওনার লেখা কবিতাগুলোর একেকটা ছন্দতে যেন প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল। রহস্য যত ঘনীভূত হতে লাগল, ততই মনে হল এমন বই হয়তো প্রীতম বাবুর পক্ষেই সেল্ফ পাবলিশ করা সম্ভব। যেখানে কন্টেন্টই আসল, বইয়ের প্রচ্ছদ, কোয়ালিটি এসব ম্যাটারই করে না সেইভাবে।
২০১৩ সালের প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হওয়ার পর দ্বিতীয় সংস্করণ আসে অগস্ট ২০১৭ তে৷ এর মানে বইটা পাঠকদের টনক নাড়াতে হয়তো একটু সময় নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অগুন্তি বইয়ের ভিড় থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে তাকে কষ্ট করতে হয়নি। লেখকের নতুন বইদুটির জনপ্রিয়তায় এই "ছিরিছাঁদ"-ও প্রচারের আলোয় চলে আসে। তবে ফেসবুকের প্রচার আরও বেশি থাকলে ২০১৩ সালেই এই বই বেস্টসেলার হতে পারত আমার ধারনা। লেখককে অনেকেই ফেসবুকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন আগে। উনি ছিলেন ফেসবুকে কিছুদিন আগে পর্যন্ত। তবে এখন প্রোফাইল ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিয়েছেন। হয়তো আবার কোনও রত্ন আমরা পেতে চলেছি অদূর ভবিষ্যতে৷
বইয়ের শুরুতেই শঙ্খ ঘোষ আর সুধীর চক্রবর্তীর মুখবন্ধ পড়লেই বুঝতে পারবেন কেন এই বইকে লেখক উৎসর্গ করেছেন কবি ভারতচন্দ্র রায় ও কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে৷ কবিতা যারা ইতিমধ্যে ভালোবাসেন, তাদের জন্য বইটা অবশ্যপাঠ্য। আর যারা কবিতাকে ভালোবাসতে চান, ছন্দের ভেলায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চান, তারা প্রীতম বাবুর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ুন। আপনার যাত্রা শুভ হতে বাধ্য। :)
অল্প কথায় বলতে গেলে, এই বই বা এই ধরণের বই যদি বাংলা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতো, ব্যাকরণের নামে ছাত্রছাত্রীদের গায়ে জ্বর আসা বন্ধ হতো। পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল, চৌথুপীর চর্যাপদ-র পর আরো একবার মুগ্ধ করলেন লেখক।
আমার কবিতার নামে জ্বর আসে। পড়তে পারি না একদম। কিন্তু এই বইটা পড়তে বসে, ভালোবেসে ফেললাম ছন্দ। Pritam Basu আপনার কাজে আমি মুগ্ধ। পরের বইগুলো পড়ব। এত সুন্দর করে ছড়া আর ইতিহাস একসাথে কখনও পাইনি। মন ভালো করা বই। আর আমি, পেটুক রামু থুড়ি অসিতবরণ থুড়ি শ্রীছন্দের (ওনার কি আর একটা নাম!) ভক্ত।।
একি ছন্দের খেলা খেলে গেলেন প্রিতম বসু, কিছুতেই মাথা থেকে বার করতে পারছিনা। হন্যে হয়ে এখন ছন্দের বই খুঁজে চলেছি। সব কবিতার বই আবার করে পড়তে মন চাইছে। মঙ্গলকাব্য গুলো পড়তেই হবে এবার। কে জানত এত ছন্দ আছে, তার এত সুন্দর ব্যাবহার। প্রত্যেকের একবার অবশ্য পাঠ্য বই এটি।
কবিতা পদ্য ছন্দ কখনই আমাকে টানেনি, আসলে বুঝিনি, কিন্তু এই বই পড়ার পর, সব কেমন ভাবে অনেক টা পাল্টে গেলো, নতুন করে কিছু জিনিস জানলাম বুঝলাম। খুব ভালো লাগলো।
অনেক কুঁড়েমির পড় অবশেষে এই বইটি পড়লাম, আজ্ঞে হ্যাঁ , পুরোই ধপ-পাস পড়লাম! তবে আবার পড়তে হবে, পড়তে হবে ছন্দের প্রেমে ... প্রীতম বসু একজন জিনিয়াস (আমার তো সন্দেহ হয় তিনিই শ্রীছন্দের বংশধর!)