প্রতি শীতেই কুলপিতে মনার মামাবাড়িতে যায় ইন্দ্র। ওখানে ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি অবধি একটি ক্রিকেট ট্যুরনামেন্ট হয়। ইন্দ্র আর মনা গাঙ্গুলিয়ান ক্লাবের নিয়মিত সদস্য। মনার মামাদের কাছে বেশ খাতির যত্ন জোটে ইন্দ্রর, কিন্তু এবার কেমন যেন ভাটার টান। কেউই পরিষ্কার করে কিছু বলে না কিন্তু বেশ বোঝা যায় কিছু একটা টেনশনের ব্যাপার আছে। অবশেষে মনার ছোটমামা, সম্রাট নেপোলিয়ন (পাড়ার লোকের দেওয়া নাম) মুখ খোলে। ইন্দ্ররা জানতে পারে মামাদের কাকা এক অদ্ভুত উইল করে গেছেন। তাঁর সঞ্চিত সমস্ত টাকাপয়সা বাড়ির লোকেরা পাবে বটে কিন্তু একটি শ্বর্তে। তাঁর ঘরে রাখা আছে একটি বিশেষ জিনিস। সেটা তাঁর এক বহুদিনের বন্ধুর হাতে তুলে দিলে তবেই তিনি সেসব টাকা দেবেন। জিনিসটা কি তা কাকা তাঁর বন্ধুকে বলে গেছেন অথচ ভাইপোদের বলেননি। সমস্যা হ'ল কাকার মৃত্যুর পর সেই ভদ্রলোককে মামারা ডেকে আনলেও তিনি সেই ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে বলেন সেই জিনিসটি নেই। জিনিসটি অতি সাধারণ, কাকার নিজের হাতে তৈরি একটা রাবার স্ট্যাম্প স্ট্যান্ড। গেল কোথায় সে জিনিস? সেটা এত মূল্যবানই বা কেন? চ্যালেঞ্জ নিয়ে এবং মামাদের প্রবল আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে গোয়েন্দাগিরি শুরু করে ইন্দ্র আর মনা। কোথায় গেল সে জিনিস? হারিয়ে গেছে? চুরি হয়ে গেছে? কাকার বন্ধু টাকা হাতানোর ধান্দায় মিথ্যে বলছেন না তো? টিনএজারদের জন্যে এই প্রথমবার কিছু লেখার চেষ্টা করেছি। নিয়ে আসছি পুজোর আগেই সিলমোহর রহস্য - লেখক
এমনিতে ইন্দ্র ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, তবে ধরাবাঁধা কাজের বদলে মাথা খাটানো যায় এমন বিষয়ে এবং রহস্যভেদেই তার আগ্রহ। কুলপি-র নামকরা এক পরিবারের সদস্যের পাতানো দাদা হিসেবে, সেখানে একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলার জন্য গিয়ে এবার কিন্তু সে জড়িয়ে পড়ে এক প্যাঁচালো রহস্যে, যেখানে খুব কম সময়ের মধ্যে, এক অদ্ভুত ‘গুপ্তধন’ উদ্ধার করতে না পারলে সেই পরিবারের সমূহ বিপর্যয় অনিবার্য। তারপর কী হল? ইন্দ্র কি সফল হল তার লক্ষ্যে?
পলিটিক্যাল থ্রিলার লেখায় দেবাঞ্জন মুখার্জির দক্ষতা প্রশ্নাতীত, এটা তাঁর “অপ্রকাশিত ছবি” এবং “অধিনায়ক” পড়তে গিয়ে টের পেয়েছিলাম, কিন্তু ছোটোদের, বা আরো সঠিক ভাবে বলতে গেলে ইয়ং-এডাল্ট পাঠকদের জন্য গল্প লেখা একদম অন্য চ্যালেঞ্জ। তাতে কি তিনি উতরোলেন?
একথা বলতে পেরে ভালো লাগছে যে বইটা একটানে পড়ে ফেলেছি, মাঝে একবারও “ধুর! কী সব হাবিজাবি লিখেছে!” এমন মনে হয়নি, এবং পাঠকের সামনেই সব ক্লু রেখে তাকেও রহস্যভেদের আহ্বান জানানোর ভঙ্গিটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। বইটা কোনো কিশোর পাঠকের ভালো লাগারই কথা।
কিন্তু... বাংলায় ছোটোদের জন্য রহস্য উপন্যাস লেখা হয় প্রচুর, কিন্তু সেগুলো পড়তে বসে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, দুটি জিনিস বড়ো বেশি করে চোখে লাগে: – ১. আনন্দ, দে’জ, পত্র ভারতী, দেব সাহিত্য কুটির বা হালে দ্য কাফে টেবল ছাড়া অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইগুলোর সর্বত্র থাকে অযত্নের ছাপ। আলোচ্য বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। মলাটের ছবি একে অত্যন্ত কাঁচা হাতে আঁকা, তায় তার সঙ্গে কাহিনির বা চরিত্রদের ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। ভেতরে ছাপা পরিষ্কার হলেও বানান-ভুল, বিশেষত কি আর কী নিয়ে সংশয় প্রচুর। ছোটোদের জন্য লেখা বইয়ে এই জিনিসগুলো ক্রমাগত উপেক্ষিত হতে দেখে এখন আর বিতর্ক-সভায় বসে “ছোটোরা কেন বাংলা বই পড়ে না” নিয়ে নিদ্রাকর্ষক আলোচনা শোনার প্রয়োজন হয় না, এমনিই বেশ বুঝে যাই। ২. সেই দীর্ঘদেহী মানুষটি শেষ ফেলুদা-কাহিনি লেখার পর আড়াই দশক পার হয়ে গেল, কিন্তু এখনও রহস্যভেদীর চরিত্র নির্মাণ করতে গেলেই রজনী সেন রোডের চারমিনার-আসক্ত মানুষটির ছায়াপাত ঘটে। এখানেও ইন্দ্র-র চরিত্রটি কার্যত “কৈলাশ চৌধুরী’র পাথর”-এর ফেলুদার কিঞ্চিৎ আধুনিক রূপমাত্র।
তাই, সামগ্রিকভাবে এটাই বলার যে লেখক তাঁর সযত্ন প্লট নির্মাণের পাশাপাশি এবার গল্প লেখার জন্য একটু অন্য রকম চরিত্র তৈরি করুন, সম্ভব হলে কোনো ডানপিটে মেয়েকে রহস্যভেদী বানান,... আর বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের জন্য অন্য কোনো ভালো শিল্পীকে পাকড়াও করুন। আপাতত এটুকুই বলার যে বইটা পড়ার মতো, এবং পড়ে বেশ আনন্দ পাওয়া যায়। তাই হাতে পেলে পড়ে ফেলার পরামর্শই রইল আমার তরফে।