অতীতকাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত আফগানিস্তানের দুঃসময়ের শেষ নেই। একসময় পশ্চিমের আক্রমণকারী ও ব্যাবসায়ীদের কাছে আফগানিস্তান ছিল ভারতবর্ষে ঢোকার দরজা। আধুনিক কালেও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক টানাপড়েনে বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে এই দেশ। ১৯৮৯ সালে রুশরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবার পর শুরু হয় ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ। অতি-সম্প্রতি তালিবান হামলায় ক্রুদ্ধ আমেরিকা বোমাবর্ষণ করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এই দেশ। সব ব্যাবস্থা তছনছ হয়ে গেছে। বিধ্বস্ত আফগানিস্তানে ডাক্তার হিসেবে গিয়েছিলেন 'কাবুলের পথে পথে'র গ্রন্থকার পান্থজন। ন'মাসের অভিজ্ঞতায় তিনি জেনেছেন, আড়াই কোটি আফগানির মধ্যে ষাট লক্ষের কোনও স্বাস্থ্যব্যাবস্থা নেই, পঁচিশ শতাংশ বাচ্চা মারা যায় পাঁচ বছরের আগেই, মেয়েদের একতৃতীয়াংশ মানসিক উদবেগজনিত অসুখে ভুগছে। তবু মানুষ বেঁচে থাকে, ভালবাসতে চায় জীবনকেই। 'কাবুলের পথে পথে' বিপর্যস্ত এক দেশের মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন, যেখানে ধ্বংসচিত্রের মধ্যেও জীবন বাঙময়।
আফগানিস্তানের কাবুলে ডাক্তার হিসেবে নয়মাস কাজ করেছেন পান্থজন। গিয়েছিলেন ২০০১ এ তালিবানদের প্রথমবার পতনের পর, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক জনপদে। আশংকাজর্জর পরিবেশে কাজ করতে গেলেও ধীরে ধীরে আফগান সংস্কৃতি ও মানুষজনের সঙ্গে পরিচিত হন লেখক। অবলোকন করেন তাদের শক্তি, সংগীত,খাবার, রুচি, প্রেম, দৈনন্দিন জীবন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিসহ বহু বিষয়।
কিছু ঘটনা এত অদ্ভুত!হাসপাতালে রোগীরা এসেছে, কে কার আগে চিকিৎসা করাবে তা নিয়ে তুমুল হট্টগোল আর মারামারি লেগে যখন ডাক্তারদের দিশেহারা অবস্থা তখন হঠাৎ শুরু হলো গোলাগুলি। ব্যাপার আর কিছুই না, আফগানিদের ঠাণ্ডা করতে শূন্যে ২০টা গুলি ছুঁড়েছে পুলিশ আর তাতেই সব চুপ! তারা নাকি বোঝেই শুধু অস্ত্রের ভাষা।
লেখকদের বাবুর্চি হঠাৎ কাজে ইস্তফা দিতে চাইলো, জানা গেলো সে ছিলো ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র আর ওর ভাই পড়তো ডাক্তারি। তালিবানদের কারণে পড়ালেখা ছেড়ে সে হয়েছে বাবুর্চি, ভাই হয়েছে ডিসপেনসারির পাহারাদার! তালিবানরা নেই, তাই তারা আবার পড়বে, আবার স্বপ্ন দেখবে। ভ্রমণের গল্পে আছে বেশকিছু নারী; যারা স্বাধীনচেতা ও কর্মঠ। জানতে ইচ্ছা হচ্ছে, এ মানুষগুলো তালিবান শাসনে এখন কেমন আছে?
পান্থজনের রসবোধ প্রখর। কিছু জায়গার বর্ণনা পড়ে মনে হয় ওয়েস এন্ডারসনের ছবির দৃশ্য; বিষণ্ণ, অসহায় পরিস্থিতিতে তুমুল হাসা যায় যেখানে।একবার হিন্দুকুশে পিকনিকে যেয়ে পেট খারাপ হয় লেখকের সঙ্গী ডাক্তার বালা'র। কিন্তু সেখানে একফোঁটা পানি নেই। যাচ্ছেতাই অবস্থা যাকে বলে। পান্থজন বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে -
"সে ছুটে ঝোপের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল। দশ মিনিট পরে ফিরে এল হাসি হাসি মুখ নিয়ে। হাতে একটা খালি কোকের বোতল। "টয়লেট পেপার ছিল নাকি?” "না এটাই সম্বল" বোতলটা দেখাল। "কিন্তু ওতে তো কোক ছিল।” "জানি তো”। আমাদের সবাইয়ের মুখ হাঁ। "তা হলে কোক দিয়ে...!" "উঃ দুর্দান্ত অনুভব।”
আফগানিস্তান একট্ব দু:খের কাব্য। সবসময়ই এর যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশ মানবিক মানুষের জন্য মর্মপীড়ার কারণ। সেই আফগানিস্তানে চিকিৎসক হিসেবে গিয়েছিলেন পান্থজন। তাঁর অভিজ্ঞতাই সহজভাষায় বর্ণিত হয়েছে কাবুলের পথে পথে গ্রন্থে। এসেছে সেখানকার পরিবেশ, মানুষ এদের কথা। এসেছে প্রেমের কথা। মাতৃস্নেহে আপ্লুত হওয়ার গল্প যেমন এসেছে তেমনি মজার মজার কিছু ব্যাপারও রয়েছে। আর রয়েছে আমাদেরই দেশের মতো একসাথে ডাক্তারের রুমে অনেক মানুষ ভীড় করে এক্সরে প্লেট ছুড়ে সেই ডাক্তারকেই মারারও গল্প! বইটা রীতিমতো উপভোগ্য।
আফগানিস্তান নিয়ে রচিত কোনো সাহিত্যের বিষয় অবধারিতভাবে সৈয়দ মুজতবা আলীর নাম চলে আসে। তাঁর লেখার সঙ্গে পান্থজনের লেখা ভিন্নই বলতে হবে। তালেবানদের পতনের পরে তিনি চিকিৎসক হিসেবে আফগানিস্তান যাত্রা করেছিলেন। সে সময়কার আফগানিস্তান ছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত। রাস্তাঘাটের বালাই ছিল না বললেই চলে। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো বিষয়গুলো ছিল সুদূরপরাহত। লেখক তাঁর অভিজ্ঞতা ভালোমতোই ফুটিয়ে তুলেছেন। এ বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যেও নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন পেশাগত দায়িত্ব পালনের। মিশেছেন সাধারণ মানুষের সাথে। এ সময়ের মধ্যে তিনি চেষ্টা করেছেন পুরো আফগানিস্তানের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে। বিশেষত বামিয়ানার বুদ্ধমূর্তি দর্শন ছিল উল্লেখ করবার মতো।
লেখক তখনই লিখেছেন যে আফগানিস্তান জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে। যেকোনো মূহুর্তে যেন অগ্নুৎপাত ঘটবে! মূলতঃ আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তিনি এ লাইনটা বোধহয় অনুমান করেছিলেন।
লেখকের অনুমান বিফলে যায়নি। যখন বইটা পড়ছি, আফগানিস্তানে পুনরায় তালেবান শাসন ফিরে আসার প্রায় ২ বছর চলছে।
কাবুল বা আফগানিস্তান নিয়ে বাঙালি লেখকদের মাঝে আলী সাহেব তার বইটিকে এক প্রকার অমরত্বের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তবে মুশকিল হল, আলী সাহেবের কাবুল আর এখনকার কাবুলের মাঝে বিস্তর ফারাক। এখনকার কাবুলকে জানতে হলে চাই এখনকার সময়ের কারুর বয়ান। মইনুস সুলতান তার "কাবুলের ক্যারাভান সরাই" বইতে তেমন কিছু বয়ান নিয়ে হাজির হয়েছেন বটে, তবে সেসবের মাঝে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গল্প কম ছিল। সেই সাথে অতি মাত্রায় দারি আর ফার্সি ভাষার শব্দ প্রয়োগের কারণে বিখ্যাত এই বইটি পড়তে গিয়ে আমাকে বেশ কয়েকবার থামতে হয়েছে। সেই তুলনায় "কাবুলের পথে পথে" অনেকটাই যেন মসৃণ পিচ ঢালা পথ, তরতরিয়ে এগিয়ে চলা যায়, গতি মন্থর করার প্রয়োজন হয় না। বইটি বেশ ইন্টারেস্টিং এর সময়কালের জন্যে। টুইন টাওয়ার গুঁড়িয়ে দেয়ার পর আমেরিকার বি-৫২ বোমারু বিমানগুলো তখন তখন চষে বেড়াচ্ছে আফগানিস্তানের আকাশ। কাবুলে নামতে শুরু করেছে ব্রিটিশ আর আমেরিকান সৈন্য। বাগ্রাম বিমান ঘাঁটিতে। ২০০২ সালের প্রথম ভাগ। এ সময়ে ভারত সরকার তাদের ধ্বংস প্রাপ্ত দূতাবাসটি মেরামত করে আবারও সেখানে শাখা খোলার পাঁয়তারা করে। তবে আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া যখন সেখানে উৎসাহী নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে, ভারত তখন সেখানে নিল ভিন্ন এক পদক্ষেপ। তারা এগিয়ে গেল চিকিৎসা সাহায্য নিয়ে। এই বইয়ের লেখক তেমনই একজন শল্য চিকিৎসক। দিল্লীর অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সেন্টারে খুব সম্ভবত কাজ করতেন। সরকারিভাবে তাকে আরও কয়েকজনের সাথে বিমান বাহিনীর এক পরিবহন বিমানে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়া হল কাবুলে। সাথে তিন টন ওষুধের চালান। সেখানে গিয়ে তারা খুললেন এক অস্থায়ী ক্লিনিক। ভাঙা একটি ঘরে চাটাই বিছিয়ে। বিচিত্র রকমের মানুষের সাথে তাদের পরিচয় হল। জানলেন,তাদের ক্যাম্পের দারোয়ান যে ছেলেটি– যুদ্ধের আগে সে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র। তাদের ক্যাম্প ঝাড়ু দেয় যে ছেলেটি, যুদ্ধের আগে সে ছিল মেডিক্যাল স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিল এদের যৌবন, এদের জীবন। চিকিৎসা ক্যাম্প করতে লেখকের সঙ্গী ডাক্তারেরা গেলেন আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে। সেই সূত্রে আফগানিস্তানের নানা গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সাথে, গভর্নরদের সাথে মোলাকাতের সুযোগ হল। সুযোগ হল বামিয়ান প্রদেশের সেই পাহাড়টি দেখার, যার গায়ে খোঁদাই করা বুদ্ধ মূর্তি কিছুদিন আগেই তালেবানরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তখনও এই মূর্তির আশেপাশে পোঁতা ছিল শত শত মাইন। এমন আরও কত কত রোমাঞ্চকর গল্প যে ছড়ানো এই বইয়ের পাতায়, সে বলে শেষ করা যাবে না।
বইটি কিনেছিলাম গতবছর ভাইফোঁটার দিনে। খুব উৎসাহ নিয়ে যে কিনেছিলাম এমনও বলতে পারি না, বরং বেশি উৎসাহ ছিলো এর সাথে কেনা অন্য বইটিকে নিয়ে, আর সেট��� তার কয়েকদিনের মধ্যে পড়েও ফেলি। এর পরে মাস কয়েক ঘুরে গেল, তার সাথে হঠাৎ করে আমরা জানতে পারলাম যে কাবুল নদী দিয়েও অনেক জল গড়িয়েছে, যার ভয়াবহ ছবি আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। মনে পড়ে ২০০১ সালে ৯ই নভেম্বরের দিনটি, সেদিনও খুব সম্ভবত ভাইফোঁটা ছিলো, আমি যাচ্ছিলাম দাসনগরে এক দিদির কাছে ফোঁটা নিতে, আর খবর কাগজে হেডলাইন ছিলো "Mazar-i-Sharif has fallen", পড়ে আনন্দ হয়েছিলো, মনে হয়েছিলো যাক এবার তাহলে তালিবানদের পতন হলো। ২০ বছর বাদে আবার সেই শহর শিরোনামে এলো কিন্ত মন খারাপ করে। ফিরে এলো সেই নামগুলো, দোস্তম,মহাকিক বা কারিম খালিলি। কিন্ত এবার তারা বুড়ো, লড়াই করতে পারল না তালিবানদের সাথে। লেখক ডাক্তারি করতে সেই সময়ে আফগানিস্তানে যান, যখন সবে তালিবানদের পতন হয়ে কারজাই নিজের সরকার গোছাচ্ছে। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়েই এই বই। বইটি শেষে মন খারাপ করে দেয়, কারন পাতায় পাতায় যে ভবিষ্যতবাণী লেখক করে গেছেন তাই তো ফলতে দেখছি আমরা ২০ বছর বাদে। "সব কি ঠিক হবে?" এই ভয় সেই ২০০২ সালেও আফগানিরা পেয়েছিলো, আর সে ভয় যে অমূলক ছিলো না, তা আজ প্রমান হয়ে গেছে। ও দেশে লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেক জায়গায়, আর কর্মসূত্রে চিনেছেন এমন অনেক লোকজনকে যাদের নিজেদের জীবন নিয়েই হয়ত এক একটা আস্ত বই হয়। এই বইটা পড়তেই হবে, যদি কিছুটা হলেও আফগানিস্তান আর সে দেশের মানুষদের ব্যাপারে জানতে হয়। আর আছেন সেই অতিমানবটি, যিনি দেশের মাটি ত্যাগ করেননি কখনও। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমি ছাড়েননি। তিনি পাঞ্জশের এর সিংহ, আহমেদ শাহ মাসুদ। সুইসাইড বোম্বাররা তাকে ২০০১ সালে মারতে পারেনি, উনি আজও বেঁচে আছেন স্বাধীনচেতা আফগানিদের মধ্যে, আছেন নিজের সুপুত্র আহমাদ মাসুদের মধ্যে, আছেন আমরুল্লাহ সালেহর মধ্যে। লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
Amazing travelogue, excellent point of view. প্রত্যেক পাতায় ফুটে ওঠা লেখকের আশঙ্কা সত্যি হয়েছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে । আফগানিস্তান আবার অধিকৃত হয়েছে তালিবান দ্বারা। বইটিতে থাকা ছবির প্লেট গুলিও অসাধারণ। পয়সা উসুল বই।