ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
ইমতিয়ার শামীমের একটা আলাদা সিগনেচার স্টাইল আছে। আমি এর নাম দিয়েছি আফসোসিক মেলানকলি (যেখানে আফসোস আর বিষণ্নতা একসাথে ঘর করে)। উনার প্রায় লেখাতেই দেখা মেলে এক গল্প কথকের, যে নিজের ছেলেবেলা কিংবা কৈশোরকাল কিংবা যুবা বয়সের সময়ে নিজে এবং পাঠকদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। যার ফলে সেই সময়ে হওয়া ঘটনার জন্য আর সময়ের জন্য এক অদ্ভুত আফসোস, শূন্যতা আর বিষণ্নতা কাজ করে।
• মা আমার ঘুম পাচ্ছে • মোমবাতির মৃত্যুদৃশ্য দেখে • এও এক ইতিকথা • মৃত নৌকা এবং অবগাহনের নদী • জলাভূমি • আমাদেরও কেউ ভালবাসত নামের ছয়টি ছোটগল্প নিয়ে এই বই। এবং অবশ্যই প্রতিটি গল্পেই আফসোসিক মেলানকলি মূর্তিমান আর গল্পগুলো মূলত যুদ্ধ পরবর্তী গঠিত বিভিন্ন দল আর আদর্শ নিয়ে।
১ম চারটা গল্প পড়ার পরও আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি কয়েকটি মৃত মুনিয়াকে। এই গল্প গেল কই!? পরে দেখি এই নামে কোনো গল্প নেই অথচ প্রতিটি গল্পেই মৃত মুনিয়া বিদ্যমান।
আমার পড়া ইমতিয়ার শামীমের প্রথম গল্পগ্রন্থ এটি। পড়েছিলাম '২০ সালে। ভাষাশৈলী বেশ কঠিন। কিছু কিছু অংশ তো প্রথমবার পড়ার পর মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছিল। তবে সবগুলো গল্পের ক্ষেত্রে একটি মিল আছে অবশ্যই, সেটি হলো- ভালো লেগেছে সবকটাই। 'আমাদেরও কেউ ভালোবাসত' গল্পটি পুরো বইয়ের সবচেয়ে সহজ সুন্দর গল্প মনে হয়েছে, পড়াও হয়েছে বেশ কয়েকবার।
ইমতিয়ার শামিমের লেখার স্টাইল বেশ ক্রিয়েটিভ, আর্টিস্টিক। এমন অনন্যচিন্তার/out of the syllabus টাইপের লেখার স্টাইল বাংলা সাহিত্যে বিরল। আপনি তার লেখা পড়ে হয়তো আমার মতো বলবেন "এমন অসাধারণ লেখা তো আগে পড়িনি!"
উনি হলেন শব্দ নিয়ে, ভাষা নিয়ে খেলেন,,যা আপনাকে মুগ্ধ করে ছাড়বে..... তবে উনার লেখার স্টাইলে complexity আছে... একটু ধৈর্য্য নিয়ে পড়লে আপনি তার লেখাতে ডুবে যাবেন আর মুগ্ধ হবেন.... তবে সাধারণ পাঠকের বেশ জটিল লাগবে বলে মনে করি এমন লেখার স্টাইল... যারা বই পড়ে অভ্যস্ত এবং জটিল লেখা পছন্দ করেন/এমন ভাষার খেলা পছন্দ করেন তাদের জন্য উনার লেখা রত্নসরূপ! সাধারণ পাঠক উনার মাহাত্ম্য বুঝবে না...
ইমতিয়ারের লেখাতে আসল ক্রিয়েটিভিটি হলো, উনি এক পৃষ্ঠাতে অনেকের গল্প বলেন। এক পৃষ্ঠাতে উনি পুরো একটি গ্রামের আনাচে কানাচে যারা আছে সবার গল্প বলতে পারেন, বলে ফেলেন পুরো শহরের গল্পও... তবে উনার রূপকের ব্যবহার একদম অনন্যসাধারণ! রূপক ব্যবহার করতে করতে উনি যেন যাদু-বাস্তবতা এর মতো একটা ব্যাপার সৃষ্টি করে ফেলেন
আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমার কেমন লাগছে এই বই, তাহলে অবশ্যই বলব উনাকে নিয়ে যা বলি কম হয়ে যাবে... তবে এটাও বলব, এমন লেখা সাধারণ পাঠকের জন্য না, তাদের কাছে বেশ জটিল লাগবে এমন লেখা... তবে আমি চিন্তা করছি উনার লেখা আরেকটু পরে গিয়ে পড়বো, আরেকটু সময় নিব উনার লেখা পড়তে
বাংলা কথা সাহিত্যে ইমতিয়ার শামীম এর নাম উচ্চারণ হওয়ার কথা ছিল জোরে শোরে। কিন্তু অনেকটা নিভৃতেই রয়ে গেলেন তিনি। হালে অবশ্য কিছুটা নাম ডাক উনার হচ্ছে। তবে সেটা উনার ক্যালিবারের তুলনায় নিতান্তই অল্প। তার মত একজন লেখকের যে কি পরিমাণ প্রয়োজন সেটা তার লেখা না পড়লে কেউ বুঝবে না। আবার মাঝে মাঝে আমার মনে হয় এই হিসাবে ভালোই হয়েছে উনি তেমন উচ্চারিন নাম না হওয়াতে। না হলে উনার লেখার যে কন্টেন্ট এতদিনে উনাকে জেল দর্শন ও করে আসতে হতে পারত। অদ্ভুত এক কারণে আমাদের দেশের লেখকরা স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েক দশক নিয়ে কিছুই লেখে না। আর এখন ইতিহাস যেভাবে রূপান্তর হচ্ছে কয়েক বছর পরে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ঘটা ঘটনাগুলিকে গাঁজাখুরি আর গুলবাজি বলেই উড়িয়ে দেওয়া হবে নির্ঘাত। ইমতিয়ার শামীমের লেখার বিষয় বস্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় যে অপার আশা নিয়ে দলমত নির্বিশষে সবাই যুদ্ধে যোগ দিল, পরবর্তী দেশের সেই মানুষগুলোর আশা আকাঙ্ক্ষার হিসাব নিকাশ নিয়ে। তার লেখায় হর হামেশাই চলে আসে রক্ষী বাহিনী,গনবাহিনী, বাম রাজনীতি এবং চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তাদের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ। যুদ্ধ পরবর্তী মুক্তিযোদ্ধার অসহায়ত্ব কিংবা পাওয়া না পাওয়ার হিসাব না মেলা বিপন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। আসে সেনা বাহিনীর বিদ্রোহ এবং বিপ্লব করা সেই মানুষগুলোর কথা।
"কয়েকটি মৃত মুনিয়া" মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক দশক নিয়ে ছয়টি গল্প সংকলন। "মা আমার ঘুম পাচ্ছে" গল্পটি সত্তুরের দশক থেকে নিয়ে এক কিশোর থেকে যুবকে উর্ত্তীন হওয়া একটা ছেলের গল্প। অদ্ভুত নস্টালজিয়ার মাধ্যমে লেখক বর্ননা করেছে একজন কিশোরের দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে দেশ এবং দেশের পরিস্থিতি।
"মোমবাতির মৃত্যুদৃশ্য দেখে" গল্পটি কয়েকজন ন্যারেটরের মুখ দিয়ে বাম রাজনীতি এবং মাওলানা ভাসানির কথা বলা হয়েছে।
"এও এক ইতিকথা" গল্পটি রাম রাজনীতি করে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাওয়া এক মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের গল্প। "মৃত নৌকা কিংবা অবগাহন নদী" বইয়ের একমাত্র গল্প যাতে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বিপ্লব নিয়ে কিছুই নেই। সম্পূর্ণ আউট অফ বক্স গল্প। "জলাভূমি' গল্পটি প্রাক্তন বাম রাজনীতিক এর নিজ শহরে ফিরে আশা এবং স্মৃতিচারণ করা নিয়ে। সেইসাথে জিয়ার সামরিক শাসন এবং বিপ্লব কেন সফল হলো না তার কিঞ্চিৎ আলাপ আলোচনা করা হয়েছে।
"আমাদেরও কেউ ভালোবাসত" গল্পটি সেনাবাহিনীর বিপ্লব নিয়ে ছোট একটা গল্প।
ইমতিয়ার শামীম যে খুব বেশিদিন লিখেছেন, তা নয়। আবার খুব কম লিখেছেন, সেটাও নয়। কিন্তু শুরু থেকেই আদায় করে নিয়েছেন স্বতন্ত্র একটা জায়গা। আলাদা করে সমীহ করা ছাড়া আছেই বা কি। তার লেখার সাথে অন্য কারোর তুলনা করা একদম ভুল কাজ হবে। সম্পূর্ণ নিজের ভাষায় লেখেন ইমতিয়ার শামীম। জলপাই বাহিনির অত্যাচারের কথা বলেন, রাতের অন্ধকারে তর্জনী উঁচানো কবজির ছাপমারা বাহিনীর রক্ত নিয়ে ব্যবসার কথা বলেন, প্রতিবাদের হুঙ্কার দিতে চান। আসলে যে সব কথা নিতান্তই অবাঞ্ছিত বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, উনি সম্ভবত সেসব কথাই বলতে চান। যেসব গল্প সুশীল সভ্য সমাজে বর্জিত, উনি সেই গল্পগুলোই বলতে চান। হয়তো এর অন্যতম কারণ হতে পারে যে, বয়সে তরুণ তবু অভিজ্ঞতায় পরিণত এই কথক প্রথম থেকেই ���টপৌরে সমাজের বাস্তবচিত্র থেকে খুব কাছ থেকে দেখে ফেলেছেন। সম্ভ্রান্ত আর সংকেতময়, নকশাল আর ইপিসিপি, অবিচার আর শোকের বেশ কিছু গল্প নিয়ে এই নতুন বই।
( মুনিয়ারা যদি স্বপ্নহয় ; তাহলে ঠিক আছে । এখানে কিছু মৃত ( /প্রায় মৃত ) স্বপ্নের কথা বলা হইছে । মূল উপজীব্য - নকশাল, ইপিসিপি , তর্জনী উঁচানো কবজির ছাপমারা বাহিনী আর জলপাই বাহিনী )
গল্পগুলো পড়তে পড়তে যে বিষাদমাখা অনুভূতি হয় সেটা আনন্দ নাকি বেদনা বোঝা কঠিন।
জানা যায় এক মুক্তিযোদ্ধা আরেক মুক্তিযোদ্ধাকে মারে। কেউ খুন করে বলে হারামজাদা ভারতের দালাল, কেউ খুন করে বলে শূয়রের বাচ্চা নকশাল। রাজাকার আলবদরেরা শুধু বেঁচে থাকে। মশাল মার্কারা শ্রেণীশত্রু খতম করে পালিয়ে বেড়ায়। তাদের পিছু নেয় হাতার মাথায় তর্জনী উঁচানো কবজির ছাপ মারা বাহিনী। কখনো কখনো তারা মশাল মার্কাদের মায়েদের পেট থেকে কথা বের করতে শুধু একটা গামছা পরিয়ে প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটায়। আজিজুর মিয়ার গাছ জোর করে কেটে নিয়ে তাই দিয়ে নৌকা বানিয়ে নৌকা বাইচের কন্টেস্টে গেলে সেই নৌকার পরে অভিশাপ নেমে আসে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, এমন বিচার হয় নাকি কোনদিন! জানা যায় জলপাই পোশাকের চশমা ওয়ালা পাহাড়ে বাহিনী পাঠাচ্ছে ব্যাটেলিয়ানের পরে ব্যাটেলিয়ান। পাঠাচ্ছে আর বলছে, 'আপনারা তো এখন বাংলাদেশি, বাঙ্গালি না। আমিও বাংলাদেশি আপনারাও বাংলাদেশি। আসেন এইবার আপনার পাছা মারি।' সবশেষে আরও জানা যায় শিউলি ফুল কেন সূর্যের উপর অভিমান করে সকাল হওয়ার আগেই ঝরে যায়।
লেখকের তৃতীয় গল্পগ্রন্থ এটি। মোট ছয়টা গল্প আছে এখানে। একটা বাদে বাকি পাঁচটাতেই লেখক বলেছেন বঙ্গবন্ধু, জিয়া ও এরশাদের শাসনামলের বাংলার কথা। সাথে এসেছে রাত বাহিনী, রক্ষীবাহিনী, সেনাবাহিনী, বিপ্লবী, বিপ্লব নিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হওয়া মানুষ আর পাহাড়িদের কথা। আর বাকি গল্পটা লেখক শুনিয়েছেন এক গ্রামের জীবনের কথা।
লেখকের লেখনীর ভক্ত আমি। কেমন যেন মায়া মায়া ধরণের লেখনী তাঁর। তেমন সহজ নয়, কিছুটা কঠিন ধরণের বাক্যে লেখা কথাগুলো চট করে ধরা না গেলেও মাথার উপর দিয়ে যায় না কখনোই। সাথে প্রচুর উপমা আর চিত্রকল্পের ব্যবহারের কারণে গল্পগুলো পায় ভিন্ন মাত্রা। এই বইয়ের ক্ষেত্রে আরেকটা ভালো লাগার জায়গা হলো লেখক তাঁর ও আমার জন্মস্থান সিরাজগঞ্জের পটভূমিতে লিখেছেন গল্পগুলো। ফলে স্থান, পাত্র, রীতিনীতি পরিচিতই লেগেছে আমার কাছে।