মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটা ডমিন্যান্ট বয়ান আছে আমাদের দেশে। এই বয়ান মূলত স্যেকুলারপন্থীদের তৈরি করা। সেখানে বলা হয়ে থাকে, আমেরিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল পক্ষে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ঠেকানোর জন্য আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। এই বয়ান তৈরি করেছে ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর মূলত বাংলাদেশের রুশপন্থী বামেরা এই বয়ান প্রচার করেছে। কেউ তাদের এই হেজিমনিক বয়ানকে কখনো চ্যালেইঞ্জ করেনি। আমেরিকান ডকুমেন্টগুলো অনলাইনে রিলিজ হওয়ার পরে আমরা নিখুঁতভাবে জানতে পারছি আমেরিকা আসলে কী চেয়েছিল, কেন চেয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে, নিক্সন প্রশাসন এটা জানত। এটা নিয়ে নিক্সন প্রশাসনের কোনো সন্দেহ ছিল না, বহু আগে থেকেই। আর এটা এতই অনিবার্য ছিল যে, সেটাকে ঠেকানোর উদ্যোগ নেয়ার কোনো চেষ্টাও করেনি আমেরিকা। কিন্তু তাদের উদ্বেগের জায়গা ছিল ভিন্ন। সেটা হলো, পাকিস্তানের অংশে থাকা কাশ্মীর। যেন এই সুযোগে, ডিসেম্বরের যুদ্ধের শেষবেলায় ভারতীয় সব সৈন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তান থেকে কাশ্মীর ছিনিয়ে নিয়ে না যায়। সেটা ঠেকানোই ছিল আমেরিকানদের উদ্বেগের বিষয়। প্রপাগাণ্ডায় আমরা শুনেছিলাম, বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া ঠেকাতে নাকি আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। এইটাও ডাহা মিথ্যা কথা। খোদ নিক্সন প্রশাসন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে নানা ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়েছিল। আমেরিকা ঠিক সেইসময়ে পাকিস্তানের মাধ্যমে চীনের বাজারে বিনিয়োগের লক্ষ্যে কাজ করছিল। পাকিস্তান ছিল এই গড়ে ওঠা নতুন সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী। তাই আমেরিকার তরফ থেকে পাকিস্তানকে ডিল করার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সতর্কতা নিতেই হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিপুল আয়তনের মার্কিন ডকুমেন্টের কিছু নির্বাচিত ডকুমেন্ট নিয়েই এখানে আলোচনা হয়েছে, সবগুলো নিয়ে নয়। এই আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন ভূমিকা বা কূটনীতি নিয়ে যে-সব বয়ান চালু ছিল বা আছে তার সাথে আমেরিকান ডকুমেন্ট মিলিয়ে যেন পাঠক পড়তে পারেন। এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকে আবারো মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন ভূমিকা মূল্যায়ন করতে পারেন সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই ডকুমেন্টগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। এই সিরিজটি মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জানা-বোঝার জায়গাগুলো আরো পরিচ্ছন্ন করতে পারবে বলে আমাদের আশাবাদ।
ইতিহাস বড় নির্মম। সে তার ধুলোকালি ঝেড়ে ফেলে আপন মহিমায় একদিন উত্থিত হবে। এই গ্রন্থ একটানা পড়ে শেষ করতে হয়েছে, কিছু কিছু অংশ একবারের অধিক পড়তে হয়েছে। না পড়ে থাকতে পারি নী।
বইটা কিছু মার্কিন নথির অনুবাদ। ৯৫ পাতার বই। বইটিতে আলোচিত অন্যতম বিষয়গুলো হচ্ছে, ১. শেখ মুজিব ফারল্যান্ড সাক্ষাৎ ; ২. মুক্তিযুদ্ধে সি আই এর অস্ত্র ব্যবসা ; ৩. আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধ নীতি ; ৪. ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ; ৫. সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন ; ৬. সপ্তম নৌবহর ; ৭. খন্দকার মোশতাক।
১. শেখ মুজিব ফারল্যান্ড সাক্ষাৎ :
২৮ ফেব্রুয়ারি '৭১ শেখ সাহেবের সাথে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যাণ্ডের সাক্ষাত হয়। আলোচনায় মুজিবের কথা অনেকটা যেন আমেরিকার কাছে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নালিশ দেবার মত। ফারল্যান্ড বলেন এটা অনেকটা রাজনৈতিক বক্তব্যের মত। উল্লেখ্য, শেখ সাহেব আমেরিকাকে নিজের পক্ষে টানতে চাচ্ছিলেন। কারণ, নিজেকে ফারল্যান্ডের কাছে কম্যুনিজম বিরোধী নেতা হিসেবে এই সংলাপে চিহ্নিত করে আমেরিকার সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেন। একটা বিষয় ভাবি, এই শেখ সাহেবই স্বাধীনতার পর সংবিধানে সমাজতন্ত্র মূলনীতি হিসেবে যোগ করেন। কারণটা কি এই যে সমাজতন্ত্রী রাশিয়ার বাংলাদেশ গঠনে সহায়তা?
২. মুক্তিযুদ্ধে সি আই এর অস্ত্র ব্যবসা :
সব যুদ্ধের মূলে থাকে অস্ত্র ব্যবসার ধান্দা। মুক্তিযুদ্ধেও যুদ্ধে আমেরিকা দুই পক্ষে ব্যবসা করেছে। প্রকাশ্যে আমেরিকা পশ্চিম পাকিস্তানের অস্ত্র বিক্রি করে। এই সম্পর্কে নিক্সন বলেছিলেন, মরণাস্ত্র না দেবার জন্য যা দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালাতে পারে। নিক্সন চুক্তি মোতাবেক পশ্চিম পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাতে নির্দেশ দেন। তবে নথি বলছে তা নাকি পাঠানো হয়নি।
পূর্ব পাকিস্তানের মুজিব বাহিনীর ট্রেইনার ছিল জেনারেল উবান। পিনাকী লিখেছেন, এই উবান ছিল সি আই এ'র এজেন্ট। এই উবানের মাধ্যমে আমেরিকা পূর্ব পাকিস্তানের গেরিলাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়েছিল। অর্থাৎ আমেরিকা দুই পক্ষেই অস্ত্র ব্যবসা করেছে।
৩. আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধ নীতি :
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথা ছিল না। আমেরিকা আগেই জানত পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ইয়াহিয়ার সাথে আমেরিকার জোট বাধার মূল কারণ, পশ্চিম পাকিস্তান, আজাদ কাশ্মীরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমেরিকা চাচ্ছিল ভারত যেন কোনোভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানের না প্রবেশ করে। এর অনেকগুলো কারণ। প্রথমত আমেরিকা চীনের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরীর পথে ছিল। এ সম্পর্কের চ্যানেল হিসেবে কাজ করছিল পাকিস্তান। তাই পাকিস্তানের সহায়তা আমেরিকার জন্য গুরুত্ববহ। দ্বিতীয়ত কেনেডির আমলে পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার মিত্রতা স্থাপিত হয়। ভারত যদি এ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্যে আমেরিকার মিত্র পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে পড়ে তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরব রাষ্ট্রগুলোও আমেরিকার বিরুদ্ধাচার করতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ঝুঁকবে। ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মারাত্মক বিঘ্নিত হবে। আর সে সময়টা ছিল আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়। আমেরিকা সবসময়ই ইসরায়েল নিয়ে চিন্তিত থাকে।
৪. ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা :
ভারত কয়েক বছর আগেই (১৯৬৫) পাকিস্তানের বেশ নাকানি চুবানি খাওয়ায় ছিল বেশ ক্ষুদ্ধ। ইন্দিরা গান্ধীর পরিকল্পনা ছিল, যুদ্ধটাকে পশ্চিম্ পাকিস্তানে নেবার। আজাদ কাশ্মীর দখলে নিয়ে আস্তে আস্তে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, বিমানঘাঁটি সব পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে দেবার। একই সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে আরও কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরীর ইচ্ছাও ছিল। ভারত আসলে চাচ্ছিল পাকিস্তানকে উপড়ে ফেলতে। উপরে বাহানা ধরে ছিল তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভে সাহায্য দিচ্ছে। আমেরিকা সেটা টের পেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে। গোপন নথিগুলো সেটিই বলছে। 'আমেরিকা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী' এটি মূলত ছড়িয়েছে সোভিয়েতপন্থী কম্যুনিস্টরা। আসলে তারা একটা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে সোভিয়েত প্রভাব বাড়াবার ধান্দায় ছিল। আমেরিকা পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে মাথা ঘামায়নি কারণ আমেরিকা এ ফলাফল আগেই জানত।
৫. সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন:
আমেরিকা পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এ নিয়ে পরমাণু যুদ্ধ লেগে যাবার মত অবস্থা দাঁড়ায়। অবশেষে আমেরিকা চীনকে পক্ষে টানতে সক্ষম হয়। চীন প্রয়োজনে ভারতে সেনা অভিযান চালাতে সম্মত হয়। যুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার সাথে হাত মেলায়। সোভিয়েত সরকার এ নিশ্চায়তা দেয় যে ভারত পশ্চিম পাকিস্তানে হামলা করবে না।
৬. সপ্তম নৌবহর :
প্রচলিত তথ্যমতে আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ দমনে। কিন্ত আমেরিকার প্রকাশিত নথিগুলো বলছে তার কারণ ছিল ভিন্ন। ভারতের পাকিস্তান দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয় আমেরিকার দৃষ্টিগোচর। ফলে আমেরিকা চায় মিত্রকে রক্ষা করে নিজ ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে। পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করতেই সপ্তম নৌবহর পাঠায় আমেরিকা। ভারতও ফলে সরে আসে তার সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে।
৭. খন্দকার মোশতাক : মুক্তিযুদ্ধকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী খন্দকার মোস্তাককে নিয়ে কল্পনা-জল্পনার শেষ নেই। নানা রহস্য জমে আছে এই মানুষটাকে ঘিরে।
মার্কিন নথিতে অনুযায়ী মোশতাক পাকিস্তানের সাথে একটা সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন দুই পাকিস্তান এক থাকুক। এই মর্মে তিনি ইয়াহিয়া-ভুট্টো গংয়ের সাথে সংলাপের চেষ্টা চালান। কিন্ত মার্কিন সরকার মোশতাককে সশরীরে উপস্থিত হতে বললে চতুর মোশতাক পিছলে যান। উল্লেখ্য, 'তাজউদ্দীন আহমেদ : নেতা ও পিতা' বইয়ে শারমিন আহমেদ লিখেছেন, তাজউদ্দীন মোশতাকের এ দ্বিমুখিতা টের পেয়ে যান। ফলে তিনি মোশতাককে এক প্রকার অবরুদ্ধ করে রাখেন।
মার্কিন নথিপত্রে মোশতাকের চেয়েও যে নামটি বেশি উল্লেখিত হয়েছে সেটা গণপরিষদ সদস্য জহিরুল কাউয়ুম। এই ব্যক্তি নিজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন ও মোশতাকের প্রস্তাব নিয়ে পাকিস্তানেও গিয়েছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আঁতাতের মূল ভূমিকা মোশতাক পালন করলেও সে ছিল অপ্রকাশ্য। কিন্ত জহিরুল কাউয়ুম ফিল্ড ওয়ার্কে প্রকাশ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এ কথাও জানা যায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম 'সংলাপ'এ আগ্রহী ছিলেন। কিন্ত ভারত সরকার তাকে এ অনুমিত দেয়নি।
সর্বশেষ, ভারত যে আসলেই কূটচালে পারঙ্গম নিক্সন সেটা ভালভাবেই বুঝেছিলেন। তার ভাষায়, '' যেই দেখি ভারতে যায় সে-ই ওদের প্রেমে পড়ে যায়, বিষয়টা কি? পাকিস্তানে গেলেও কারও এমন হয়। তবে ভারতের প্রেমেই পড়ে বেশি। কারণ পাকিস্তানিরা আলাদা জাত। পাকিস্তানিরা সোজাসাপ্টা আর কখনও কখনও চূড়ান্ত গর্দভ। আর ইন্ডিয়ানরা এমন কূটিল আর স্মার্ট যে মাঝে মাঝে আমাদেরকে ওদের মত চিন্তা করতে বাধ্য করে।''
বইটি পড়ে কেমন যেন মজা পেলাম না। খাপ ছাড়া লাগলো বিষয়গুলো। আরো ৫০/১০০ পেজ বাড়িয়ে কিছু ব্যাখ্যা প্রয়োজনীয় ছিলো। শুধু অনুবাদ থেকে ত���মন পরিষ্কার কিছু বুঝতে পারিনি। শুধু প্রচলিত কিছু কথার বিপরীতে দলিল পাওয়া গেছে৷
সবচেয়ে বড় যে কথা শুনে এসেছি এতদিন তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা। যদিও এখানে দেখানো হয়েছে মূলত ভারতের আগ্রাসন থেকে পাকিস্তানের কাস্মির রক্ষাই ছিলো তাদের মূল লক্ষ্য৷ এখানে ভারতীয় এক লেখকের কথাও বলা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে তাদের প্লান মতই ইয়াহিয়া ফাঁদে পা দিয়েছেন৷
তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র তখন সবে মাত্র চীনের সাথে নতুন সম্পর্কে যাচ্ছিলো পাকিস্তানের মাধ্যমে। তাই পাকিস্তানের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা সম্ভব ছিলো না৷ তবুও অর্থ, পণ্য, ভারতের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে, শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি না দিতে চাপ সৃষ্টি করে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা হতে সাহায্যই করেছে বলা যায়৷
মার্কিন ডকুমেন্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ৭১" বইটিতে লেখকের মত তিনি কেবল ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ডিসক্লাসিফাইড মার্কিন নথিগুলো থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত কিছু নথির অনুবাদ করেছেন। বইটিতে তিনি মার্কিন নথির উপর ভিত্তি করে দেখিয়েছেন,আমাদের স্বাধীনতা সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ৭১ সালের জানুয়ারি মাসেই ধারনা করেছিলো। সেই সময়ের পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে পাঠানো বিভিন্ন দলিল তা সাক্ষ্য দেয়। লেখক আরো দেখিয়েছেন সপ্তম নৌবহর পাঠানোর উদ্দেশ্য ভারতকে কাশ্মির দখল ঠেকানো। মার্কিনীরা ধারনা করতো ভারতের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে স্বাধীন করে পাকিস্তানের কাশ্মির নিজেদের দখলে নেয়া। লেখক এই বিষয়ে বইতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুনথির রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন। . এখন আমার নিজের কিছু মতামত। যদিও লেখক দেখিয়েছেন মার্কিনীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলো। তবে আমার নিজের কাছে মনে হয় নাই মার্কিনীরা চেয়েছিলো আমাদের স্বাধীনতা আসুক। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়টা ছিলো ষাটের দশক। তখন একটি যুদ্ধ চললাম ছিলো (ভিয়েতনাম) আর দুইটি যুদ্ধ কিছুদিন আগেই শেষ হয়েছিলো। (চায়না-ভারত আর আরব-ইজরায়েল)। সবকটি যুদ্ধেই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে মার্কিনীরা দ্বন্দে লেগেছিলো। এক কথায় বললে গনতন্ত্র বনাম সমাজতন্ত্র। আর এই যুদ্ধগুলোর মধ্যে মার্কিনীদের ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয় ঘটে ভিয়েতনাম যুদ্ধে। ৬৮ বা ৬৯ সালে মার্কিনী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের। আবার ঠিক ওই সময়টায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিজয়ী পক্ষের মিত্র চায়নার সাথে পাকিস্তানের মাধ্যমে আমেরিকা চাচ্ছিলো একটা ভাল সম্পর্ক তৈরি করার। চায়নার সাথে মার্কিনীদের সম্পর্ক জোড়ালো করার পিছনের কয়েকটা কারনের মধ্যে দুইটা হলো চায়নার বিশাল বাজারে বিনিয়োগ আর সেই সময়ের সমাজতন্ত্রের বড় শক্তি সোভিয়েত রাশিয়ার এবং চায়নার দ্বন্দ। চায়নার সাথে মার্কিনীদের সম্পর্ক গড়ে উঠছিলো পাকিস্তানের সাহায্যে। মার্কিনীরা চাইছিলো চায়না যেন বুঝে আমেরিকা তার বন্ধুর জন্য সব করতে পারে।পাকিস্তান যদি বিভক্ত হয়ে যায় আর সেই বিভক্তির পিছনে আমেরিকার হাত থাকে তাহলে আর যাই হোক চায়না মার্কিনীদের বন্ধুত্বে বিশ্বাসী হবে না। অপরদিকে আমেরিকার দ জনগণ চাইছিলো সরকার যেন বাংলাদেশে মানুষের পাশে দাঁড়াক। সব দিক বিবেচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নভেম্বর পর্যন্ত ধীরে চলো নীতিতেই চলছিলো। এবং নীতিটি ছিলো পাকিস্তানের অখণ্ডতা। . বইটি পড়লে আর সেই সময়ের রাজনীতি নিয়ে ধারণা থাকলেই বুঝা যাবে মার্কিনীরা চেয়েছিল পাকিস্তান অখণ্ড থাকুক তবে অবশ্যই পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার সুরক্ষিত করে। তবে লেখক কোন কারনে সরাসরি বুঝিয়েছেন মার্কিনীরা আমাদের স্বাধীনতা চেয়েছে তা আমার বোধগম্য হয়নি...
লেখকে মুক্তিযুদ্ধকালীন আমেরিকার ডকুমেন্টগুলো ব্যবহার করে রুশপন্থী বামেরা যে বয়ান প্রচার করেছিল তাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং আমেরিকার তৎকালীন নীতিগত লক্ষ্যগুলো পরিষ্কার করতে চেয়েছেন। এটি কূটনীতি নিয়ে আগ্রহীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বই, যা বিস্তারিতভাবে পড়া প্রয়োজন।
বইটির ভূমিকা বইয়ের সারাংশ তুলে ধরেছে। লেখক বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, যা বইয়ের মূল বিষয়বস্তু বুঝতে সহায়তা করে।
ভূমিকা পৃষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেয়া: 'একটা যুদ্ধ হবে আর সেখানে পরাশক্তির অস্ত্র-ব্যবসা হবে না?' এটা মূল বিষয়কে চিহ্নিত করে, যেখানে পরাশক্তির ব্যবসা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি উঠে আসে।
বইটির বিভিন্ন অংশে উল্লেখযোগ্য তথ্য রয়েছে:
- জোসেফ ফারল্যান্ডের চিঠি: তিনি শেখ মুজিবের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভুট্টোর ভূমিকা নিয়ে নতুন ধারণা প্রদান করেছেন, যা প্রচলিত বয়ানের বিপরীত।
- নিক্সনকে কিসিঞ্জারের চিঠি: শেখ মুজিবের স্বাধীনতার পরিকল্পনা এবং আমেরিকার নীতিগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
- আমেরিকার কূটনীতি: বইয়ে আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আমেরিকা ওই সময় রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ঝুঁকেছিল।
- খন্দকার মোশতাক: খন্দকার মোশতাককে আমেরিকার ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
- শেখ মুজিবের বিচারের বিষয়ে আমেরিকার চিঠি: শেখ মুজিবের বিচারের স্বচ্ছতা এবং ভারত সরকারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
বইটির প্রচ্ছদের ব্যাক পেইজে সারাংশ দেওয়া আছে, যা মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে।
এই বইয়ে আমেরিকা আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচলিত বয়ানের বিপরীতে যা যা পাবেন:
"বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বাধা দেয়ায় জন্যে আমেরিকা পাঠায়নি"
"স্বাধীন বাংলা সরকার শপথ নেয়ার আগেই সি আই এ মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষুদ্র অস্ত্র দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেছিল"
"পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার জন্যে আমেরিকা পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিল"
"পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১০ ডিসেম্বরেই ঢাকায় জাতিসংঘের কাছে আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিক ইচ্ছে জানায়"
“সোভিয়েতরা আমেরিকান স্বার্থ রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে একসঙ্গে কাজ করেছিল"
বইটি কূটনীতি এবং ইতিহাস নিয়ে আগ্রহীদের জন্য চিন্তার খোরাক হতে পারে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বইটি একটি মূল্যবান তথ্যসূত্র হতে পারে, যদিও ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। লেখককে ধন্যবাদ, ঐতিহাসিক বিষয়গুলো বাংলাতে সাবলীলভাবে তুলে আনার জন্য।
বইটিতে প্রচলিত সোভিয়েত সমর্থিত বয়ানের বিপক্ষে মার্কিন ডকুমেন্টের আসল ইতিহাস ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালে আমেরিকার উদ্দেশ্য কী ছিল সেটাও স্পষ্ট হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছিল এই অঞ্চলে একটি নতুন দেশের অভ্যুদয় হতে যাচ্ছে। বইয়ের শুরুতেই সেটা বলা হয়েছে। ইহাহিয়াও বিষয়টা জানতেন, ভুট্টোও কিছুটা আচ করতে পেরেছিল কিন্তু সমস্যা হল পাকিস্তানের তথাকথিত এলিটরা যারা আজও পাাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রন করে একটা মগের মুল্লুক বানিয়ে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটা বেশী সমস্যা ছিল না যে বাংলাদেশ স্বাধীন হচ্ছে কিন্তু তাদের মাথাব্যাথ্যার কারণ ছিল উল্লুক পাকিস্তানিরা যারা গাধার মত বিনা উস্কানিতে ভারতে আক্রমন করে দিয়েছে, ভারত এর প্রতিবাদস্বরূপ যখন পাল্টা আক্রমন শুরু করে পাকিস্তানের এয়ার স্পেস ডিসট্রয় করে দিয়েছে তারা যেকোন সময় পশ্চিম পাকিস্তানেও আক্রমন চালাতে পারে এবং কাশ্মীরও দখল করতে পারে। পাকিস্তান যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিল তাই তারা চায়নি এভাবে পাকিস্তানের মিলিটারি ধ্বংস হয়ে যাক। জিও পলিটিক্যাল কারনে পাকিস্তানের ঘাটি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ পাশাপাশি পাকিস্তানের কারনে চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক উন্নতি হচ্ছিল। পাশাপাশি আমাদের একটা ভুল ধারনা হল, আমেরিকা মনে হয় একতরফাভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল আমেরিকার পলিসি ছিল,ইহাহিয়াকে সময় দেয়া হোক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। তাকে যেন চাপ না দেয়া হয় আর দ্বিতীয়টি হল পাকিস্তানের কাছে যেন কোন ভারী অস্ত্র বিক্রি না করা হয়। তবে লেখকের উদ্দ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এ বিষয়ে আরো গবেষণা করতে হবে। তাহলে বিষয়টা আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হবে। লেখক নিজেই বলেছেন তিনি সব ডকুমেন্টের কথা তুলে ধরেননি। তাই এর উপরে একটা ইনসাইক্লোপিডিয়া বানানো যেতে পারে। তাহলে কোন তৃতীয়পক্ষ ফাকা বুলি ও গুজববাজি করার সুযোগ পাবে না।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অফিসিয়াল ডকুমেন্ট কে ভিত্তি করে রচিত বইটিতে অনেক কিছুই জানা যাবে ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মার্শাল কোর্টের মাধ্যমে যে ফাঁসির আদেশ হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের তা আমাদের অনেকেরই অজানা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের আগমনের যে কারণ শুধুই মুক্তিযুদ্ধ ছিল না সেটা ছিল কাশ্মীর এবং অন্যান্য বিষয়ে তাই বই থেকে জানতে পারলাম প্রথম।
বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়না এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং প্রতিযোগিতা তার স্বরূপ বিভিন্ন অধ্যায় পাওয়া যায়।
বইটি আকারে ছোট হলেও প্রতিটি লাইন তথ্য দিয়ে ভরপুর। অযাচিত কথাবার্তা দিয়ে বইটির কলেবর বৃদ্ধি করা হয়নি।
বইটি পড়ে, বিরাট দ্বিধাদন্দে পড়ে গেলাম। স্বাধীনতার ৪৫ ধরে আমরা জানি, আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল। আর তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এখন পর্যন্ত আমেরিকা পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রেখেছে। যা দেখে বিশ্বাস হওয়াটাই স্বাভাবিক যে, যুদ্ধের সময় আমেরিকা পশ্চিম পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেছিল। এই বইতে তার বিপরীত তথ্য! এমনকি এই বই এর দাবীনুসারে, আমেরিকা নাকি সেসময় রনতরীও প্রেরণ করেনি। বইটি পড়ে খুব বেশি কনফিউজড হয়ে গেছি।
সর্বোপরি বলতে হয়, লেখকের উপস্থানাভঙ্গি বেশ ভালো। আকর্ষণ ধরে রাখে।