কবিতার আমি কখনোই ভক্ত ছিলাম না। বিরক্ত লাগত, অর্থহীন কথাবার্তা। ওষুধ যেমন তেতো হলেও জোর করে খাওয়া লাগে, স্কুলে থাকতে ঠিক সেরকমভাবে কবিতা মুখস্ত করতে হত আমাকে। আর এই আমাকে কবিতার পাঁড় ভক্ত বানিয়ে দিয়েছে যে দুজন কবি, তাদের একজন হলেন হেলাল হাফিজ।
এদেশের তরুণদের কাছে হেলাল হাফিজ এক আশ্চার্য্যের নাম, এক বিষ্ময়ের নাম। এখনকার যুগে যেখানে মানুষ চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয়, সেখানে সেই আশির দশকে কোন এক নব্য কবি কি একটা কবিতার বই লিখে গিয়েছিল, একটা মাত্র বই লিখেই ডুব দিয়েছিল, জনসম্মুখে আসেনি আর কখনো, পত্রিকার আলোচনায় থাকত না কখনো, তার কবিতা মানুষ খুঁজে খুঁজে পড়বে, এটা তো একটা পুরো অসম্ভব মাত্রার বিষ্ময়ের ব্যাপার! অথচ এটাই ঘটেছে, ঘটছে প্রতিনিয়ত। 'যে জলে আগুন জ্বলে'র মোহ এতটাই প্রবল যে আজীবন তা মানুষকে টানবে।
আর টানবে নাই বা কেন? মাত্র দু'লাইনের একটা কবিতা- অশ্লীল সভ্যতা। 'নিউট্রন বোমা বোঝ, মানুষ বোঝ না।'- এত কম কথায় এত বিশাল ভাব বোঝাতে আর কোন কবি কি পেরেছিলেন? কিংবা নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়ের 'এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।'- এক নজরুল ছাড়া আর কেউ কি পেরেছিল এমনভাবে তরুণদের উদ্দীপ্ত করতে?
হেলাল হাফিজের কবিতা থেকে আমার অসম্ভব প্রিয় কিছু লাইন-
আমি আর কতটুকু পারি?
এর বেশি পারেনি মানুষ।
(পৃথক পাহাড়)
তুমি জানো, পাড়া-প্রতিবেশী জানে পাইনি তোমাকে।
অথচ, রয়েছ তুমি এই কবি সন্ন্যাসীর ভোগে আর ত্যাগে।
(প্রতিমা)
কষ্ট কেবে কষ্ট
হরেক রকম কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট!
..... ..... ..... ..... ....
আর কে দেবে আমি ছাড়া
আসল শোভন কষ্ট,
কার পুড়েছে জন্ম থেকে কপাল এমন
আমার মত ক'জনের আর
সব হয়েছে নষ্ট,
আর কে দেবে আমার মত হৃষ্টপুষ্ট কষ্ট।
(ফেরীঅলা)
কিছুই পারিনি দিতে, এই নাও বাম হাত তোমাকে দিলাম।
(বাম হাত তোমাকে দিলাম)
দুই ইঞ্চি জায়গা হবে?
বহুদিন চাষাবাদ করিনা সুখের।
(ভূমিহীন কৃষকের গান)
আগুন আর কতোটুকু পোড়ে?
সীমাবদ্ধ ক্ষয় আর সীমিত তার বিনাশ।
মানুষের মত আর অতো নয় আগুনের সোনালী সন্ত্রাস।
(মানবানল)
কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালবাসি।
(যাতায়াত)
একদিন ছিল সব কিছু তোর ডাক নামে,
পোড়ামুখী তবু তোর ভরলো না মন,
এই নে হারামজাদী- একটি জীবন।
(সম্প্রদান)
আজকাল অধঃপতনের দিকে সুপারসনিক গতি মানুষের,
সঙ্গত সীমা ছেড়ে অদ্ভুত নগরে যেন হিজরতের প্রতিযোগিতা।
(ব্যবধান)
জলের আগুনে পুড়ে হয়েছি কমল।
কী দিয়ে মুছবে বলো আগুনের জল?
(কোমল কংক্রিট)
আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন, মোটামুটি সুখেই আছেন,
প্রিয় দেশবাসী;
আপনারা কেমন আছেন?
(ইদানীং জীবন যাপন)
ইচ্ছে ছিল রাজা হব,
তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বানাবো,
আজ দেখি রাজ্য আছে,
রাজা আছে
ইচ্ছে আছে
শুধু তুমি অন্য ঘরে।
(ইচ্ছে ছিল)
ইচ্ছে হলে দেখতে দিও দেখো,
হাত বাড়িয়ে হাত চেয়েছি রাখতে দিও, রেখো।
(অমীমাংসিত সন্ধি)
আর না হলে যত্ন করে ভুলেই যেও, আপত্তি নেই।
গিয়ে থাকলে আমার গেছে, আর কী তাতে?
আমি নাহয় ভালবেসেই ভুল করেছি ভুল করেছি,
নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?
এক জীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,
এক মানবী কতোটা আর কষ্ট দেবে!
(প্রস্থান)