মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দিন মুহাম্মদ উমরের ৪ ভাগের আত্মজীবনীর ১ নাম্বার ভাগ এটি। পহেলা খন্ডে ১৯৩১ - ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বয়ান করেছেন লেখক।
মূলত, এটি আত্ম কম এবং আত্মীয়জীবনী বেশি মনে হয়েছে।
বর্ধমানের এক প্রভাবশালী মুসলমান পরিবারে ১৯৩১ সালে জন্মেছেন বদরুদ্দীন উমর। গাছের ডালপালার মতোই বিস্তৃত তাঁদের পরিবার। এই সুবিস্তৃত পরিবারের বর্ণনা দিতে গিয়েই ২৪১ পাতার অাধা গায়েব হয়ে গিয়েছে। বড্ড বিরক্তিকর সেসব কথা,এসব পরিবারকথন শোনাতে গিয়ে আবুল হাশিম তনয় বদরুদ্দীন উমর আমাকে তো রিডার্স ব্লকে ফেলে দেবার পাঁয়তারা করছিলেন!
বাবা আবুল হাশিম বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পিতার সাহচর্য পেয়েছেন। বংশের সবাই কমবেশি বিভিন্ন দলের রাজনীতি করতেন। বিশেষত, কমিউনিস্ট পার্টির অনেক চাঁই তো তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও ছিল।তাই সেসব নিয়ে বিস্তর লিখেছেন।
কলিকাতার ডাইরেক্ট একশনের দাঙ্গার দায় কতটা মুসলিম লীগের কিংবা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর তা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণটি ছিল,
"কলকাতার দাঙ্গার জন্য কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে মুসলিম লীগ ও সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করা হল। আজ পর্যন্ত কলকাতার হিন্দু সমাজের একজনকেও পাইনি, যিনি বিশ্বাস করেন সোহরাওয়ার্দী দাঙ্গার জন্য দায়ী নয়। কিন্তু আসলে দাঙ্গা বাধানোর ব্যাপারে সোহরাওয়ার্দীর কোন ভূমিকা ছিল না। তিনি একজন উদারনৈতিক বুর্জোয়া ছিলেন। চিত্তরঞ্জন ও সুভাষ বসুর সাথে কলকাতায় রাজনীতি করেছিলেন। তাঁর চরিত্রে অনেক প্রতিক্রিয়াশীল দিক নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু দাঙ্গা বাধানোর লোক তিনি ছিলেন না। "
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দাঙ্গাকালীন ভূমিকা নিয়ে খানিকটা রহস্যময় মন্তব্য করেছেন বদরুদ্দীন উমর। এই তাত্ত্বিকের সুকৌশল স্মৃতিচারণ বলে,
" দাঙ্গা চলতে থাকার সময় কয়দিন ধরেই আমাদের বাড়ীতে লোকজনের আসা - যাওয়া অনেক বেড়ে গেল। মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী ছাড়াও, মুসলিম লীগের অন্য লোকেরাও এরমধ্যে ছিলেন। দাঙ্গার নানা খবর এঁরা আনতে লাগলেন। আমার মনে আছে, এক সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমান খুব উত্তেজিতভাবে এমন সব কর্ম করার কথা বলেছিলেন যা শুনে আমার খুব অবাক লাগলো। "
দেশভাগের পরেও বদরুদ্দীন উমরের পরিবার ভারতেই ছিলেন। ভারত ছাড়ার কোন ভাবনা তাঁদের ছিল না। কিন্তু হঠাৎ সদ্য কলেজ পড়ুয়া উমর দেখলেন, পরিবেশ যেন কেমন গুমোট হয়ে আসছে। স্বয়ং নেহেরু, তা্র ডেপুটি সরদার প্যাটেল আর হিন্দু মহাসভার চ্যালারা সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আনন্দবাজার ও যুগান্তর সেসব ছাপাচ্ছে বিপুল আগ্রহে। তার প্রভাবে মুসলমান নিধন চলছে। এদিকে পাকিস্তানেও শুরু হয়েছে হিন্দু নিধন। বাবার বন্ধুরা সব বদলে যাচ্ছে, যাবার বেলায় পিতৃবন্ধু টেগো সরকারের কাছে প্রতারিত হলেন, তাঁরা পাড়ি জমালেন ঢাকায়।
এই বইটি শতকরা ৬০ ভাগ জুড়ে বদরুদ্দীন উমরের পরিবার পাঁচালি পাঠকের নাভিশ্বাস বের করে দিবে। কিন্তু মাঝেসাঝে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আর দেশভাগ পরবর্তী সময় কত দ্রুত রঙ পালটাচ্ছিল তা সত্যিই পাঠককে অবাক করতে পারে ; হয়ত কষ্টও দিতে পারে!