বহুদিন পরে অর্জুনের সাথে অভিযান। প্রিয় চরিত্র, তায় আবার আমার শহরের ছেলে। লেখক সমরেশ মজুমদার আমার শহরের আদি বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই এই তরুণ সত্যসন্ধানীটিকে কদমতলার মোড়ে আড্ডা দিতে, বা করলা নদীর ধারে বাইক চালাতে দেখে (পড়ে) রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। উপন্যাসগুলোতে থ্রিল কিঞ্চিৎ কম। একটু ধিমে তালে, সহজ সরল রহস্য। কিছুটা অ্যাডভেঞ্চার, কিছুটা প্রকৃতির মিশেল।
অবশ্য ষষ্ঠ খন্ডের প্রকাশকাল ২০১৬। লেখক অর্জুনের গল্প লেখা প্রায় থামিয়েই দিয়েছেন। কিছু অগ্রন্থিত অর্জুন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, প্রকাশকের সপ্তম খন্ড প্রকাশের কোনো উদ্যোগই নেই। পাঠক হিসেবে তাই মন প্রমাদ গোনে। এই শেষ পর্যায়ের কাহিনীগুলোতে, কি আর এমন নয়া রহস্যের উপস্থাপনা করেছেন লেখক? প্রশ্ন জাগে গল্পের মান নিয়েও।
এই সংশয় কিছুটা হলেও সার্থকতা পায় বইয়ের প্রথম উপন্যাস, 'বরফে পায়ের ছাপ' দিয়ে। ভীষণ দুর্বল এই গল্পটিতে হারিয়ে যাওয়া জনৈক মার্কিন সায়েন্টিস্ট ও তার মেয়েকে খুঁজতে অভিযানে নামে অর্জুন ও মেজর। বরফের দেশে তাদের এক্সপিডিশন, ঝিম ধরা ও আক্ষরিক অর্থেই ক্লান্তিকর। দোষ-গুণের নিরিখে বিবেচনা না করলে, মেজর-চরিত্র স্বল্প পরিমাণে বরাবরই উপভোগ্য। কিন্তু এখানে মেজরের উপস্থিতির প্রতি লেখকের রাশ টেনে ধরতে না পারায়, অর্জুন যেন নিজগল্পেই উপেক্ষিত। ১ তারা।
বইয়ের দ্বিতীয় গল্প, 'আদিম অন্ধকারে অর্জুন', খানিকটা একই ধাঁচের। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দিবাকরবাবুর আমন্ত্রণে অর্জুন পাড়ি দেয় নাথুয়া। প্রাক্তন শিক্ষকের অনুরোধে সে জড়িয়ে পড়ে এক আদিম ভুটানি গুপ্তধনের সন্ধানে। গল্পের দ্বিতীয় দফায় এসে হাজির হন মেজর নিজে, এবং দুয়ে মিলে তারা বেরিয়ে পরে নতুন এক অ্যাডভেঞ্চারে। গল্পে অর্জুনের ভূমিকা আবার প্রশমিত হলেও, আগের উপন্যাসের থেকে এটি কিঞ্চিৎ রোমাঞ্চকর। মনে ধরে জঙ্গুলে প্রকৃতির মনোরম বর্ণনাও। সব মিলিয়ে এবং কিছুটা ওই চমৎকার শুরুটার জন্যেই ৩ তারা।
'শুকনাঝাড়ে অর্জুন', আমার মতে বইয়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এক ভীষণ ঝড়বৃষ্টির রাতে অর্জুন এসে নামে শুকনাঝাড় স্টেশনে। সাক্ষাতপ্রার্থী জমিদার মঙ্গলময় বড়ুয়া। বিপদসংকুল পরিবেশে তিনি অর্জুনের সাহায্যের দাবিদার। কে বা কারা তাদের বংশের নাশ করতে বদ্ধপরিকর। অর্জুন সম্মুখীন হয় এক অদ্ভুত পরিস্থিতির। কেনই বা জমিদার পত্নীর অমন অদ্ভুত মানসিক ব্যারাম? ঠিক কেই বা রাত্তিরে ঘুরে বেড়ায় জমিদারবাড়ির বাগানে? প্রকৃত ও অতিপ্রাকৃতের মাঝবরাবর দাড়িয়ে দুর্দান্ত পরিবেশ একেছেন লেখক। গা-ছমছমে এই ছোট উপন্যাসটিতে অর্জুনকে ফিরে পাওয়া যায় সেই চিরাচরিত সত্যসন্ধানী রূপে। গল্পটিকে তাই ৫ তারা না দেওয়াটা অন্যায়।
পরবর্তী উপন্যাস, 'রক্তের আততায়ী' শুরু হয় তিস্তার চরে ছটপুজোর মেলায়, দুই ভুটানি তামাক ব্যবসায়ীর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে। এ গল্পে বহুদিন পরে স্বশরীরে আবির্ভূত হয়েছেন অমল সোম। অবশ্য তিনি আর এখন প্রত্যক্ষ গোয়েন্দাগীরিতে নেই, কেবল পরোক্ষ ভাবে অর্জুনের কর্মপদ্ধতিতে বিরাজমান। গল্পের দ্বিতীয় দফা অভিযানমূলক, অর্জুন এবং অমল সোমদের সাথে পাড়ি জমান মেজর এবং মার্কিন বিজ্ঞানী নাতাশা স্মিথ। উদ্দেশ্য ভুটান পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে রক্ত নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ। এ গল্পের কপালে ৩ তারাই বরাদ্দ ছিল, কিন্তু ঐ বিশ্রী মিইয়ে যাওয়া ক্লাইম্যাক্সটির দরুন কমে ২.৫।
পঞ্চম উপন্যাসে অর্জুনের বিদেশ যাত্রা। ওপার বাংলার বিশিষ্ট শিল্পপতি ফয়েজুর রহমান সাহেবের আমন্ত্রণে 'অর্জুন এবার বাংলাদেশে'। সোনারগাঁ অঞ্চলে তাদের পৈতৃক জমিদার ভিটে ঘিরে ঘনিয়মান রহস্য। রহমান সাহেব অমল সোমের বন্ধু এবং তাদেরই অনুরোধে অর্জুনের এই সত্যসন্ধান। এ গল্পের ফিনিশিং যথারীতি দুর্বল, তবুও গল্পের মেজাজখানা ভারী সুন্দর। ভালো লাগে অমল সোমের স্বল্প উপস্থিতিও। সেই নিরিখেই ৩ তারা।
সুদূর লখনৌ থেকে অর্জুনের কাছে জলপাইগুড়িতে হাজির হন কামরুজ্জামান খিলজি। তিনি নাকি মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির উত্তরপুরুষ। খিলজির সর্বনাশা তিব্বত আক্রমনের সময় হারিয়ে যাওয়া কিছু প্রভূত ধনরাশি, এবং এক অদ্ভুত গুহার খোঁজে, তিনি অর্জুনের দ্বারস্থ। 'খিলজির গুহায় অর্জুন' শেষ অবধি পৌঁছল কি না, সেটা জানার জন্যে গল্পটা পড়তে হবে। তবে কিনা ইতিহাস নিয়ে লেখায় যে সমরেশ মজুমদারের একটা সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে, সেটা তার অসাধারন 'কালাপাহাড়' পড়লেই জানা যায়। এ গল্পেও লেখকের কলমে একটা সমান্তরাল হিস্টরিকাল ন্যারেটিভ বেশ উপভোগ্য। ৩.৫ তারা।
বইয়ে শেষাংশের দুটো গল্প স্বল্পদৈর্ঘ্যের। পত্র ভারতী থেকে প্রকাশিত 'কিশোরবেলা' সংকলনের অন্তর্গত 'হাঙরের পেটে হীরে', টাইমলাইনের নিরিখে বহু পুরনো গল্প। সবে মাত্র লাইটার রহস্যের সমাধান করে অর্জুন তখনও নিউ ইয়র্কে। সঙ্গে মেজর এবং একটি চোরাই হিরের রহস্য। যার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি পেল্লাই সাইজের সাদা হাঙর! এছাড়াও শেষ পাতে দশ পৃষ্ঠার ছোটগল্প 'লাখ টাকার হিরে'। এ জিনিস দন্তবিহীন ব্যাঘ্রন্যায় নিরীহ। না পড়লেও কোনো ক্ষতি নেই। জলপাইগুড়ির পটভূমিতে রচিত এক অতি-সরল রহস্য কাহিনী। শেষ পাতে এক মুঠো মুখসুদ্ধি আরকি।
সর্বশেষে বলতে হয়, এ জিনিস এক-দুবার পড়াই যায়। ষষ্ঠ খন্ড হিসেবে runt of the litter আশা করে শুরু করলেও, খুব একটা হতাশ হতে হলো না।