এই উপন্যাস শুরু হচ্ছে ১৮৮৮ সালের এক ফরাসি শীতসন্ধে থেকে, যখন বন্ধু ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের কাছে থাকতে আসছেন পল গগ্যাঁ। আর সেখান থেকেই এই লেখা ঢুকে পড়ছে শিল্পী ও মানুষ ভিনসেন্টের আশ্চর্য, গতিময়, অতিনাটকীয় জীবনে।সমান্তরালভাবে ২০১৭ সালের কলকাতায় চলছে ঋত্বিকের জীবন, যে পেশাগতভাবে বিজ্ঞাপন জগতের কর্মী হলেও, আদতে একজন ব্যর্থ আঁকিয়ে। সেই ব্যর্থতা থেকেই শুরু হয় তার অস্তিত্বের সংকট, তার অসুখ, তার ডিপ্রেশন। তার চারপাশ বদলে যেতে থাকে এক হ্যালুসিনেশন ও ইলিউশন দিয়ে তৈরি পৃথিবীতে। আর সেখানেই তাকে বুঁদ করে রাখে ভিনসেন্টের অবিস্মরণীয় ক্যানভাস ‘দ্য স্টারি নাইট’।শেষমেশ, নিউ ইয়র্ক শহরে ঋত্বিককে নিয়ে যায় তার স্ত্রী শর্মিলা, ‘দ্য স্টারি নাইট’ দেখাতে চেয়ে। আর সেখানেই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ দেখা করতে আসেন ঋত্বিকের সঙ্গে। তৈরি হয় এক অনির্দিষ্ট সময়, এক অনির্ধারিত মাত্রা।শ্রীজাতর এই উপন্যাস একদিকে যেমন সামনে এনেছে গভীর মনস্তত্ত্বের অলিগলি, তেমনই তুলে ধরেছে শিল্পীর মধ্যেকার আগুন আর উন্মাদনার ছবি। আর এই উপন্যাসের বুননে, আঙ্গিকে ফুটে উঠেছে নতুনএক ভাষা শৈলী, এক অনাস্বাদিত চিত্র কল্পমালা। সবমিলিয়ে ‘তারা ভরা আকাশের নীচে’ এক শৈল্পিক মহাজগতের সন্ধান দেয়, পাঠকের চোখের সামনে মেলে ধরে এক অকল্পনীয় দিগন্ত।
Srijato Bandopadhyay (born 21 December 1975 in Kolkata), is an eminent poet of the Bengali younger generation. He won the Ananda Puroskar in 2004 for his book Udanta Sawb Joker: All Those Flying Jokers. He has also attended a writer's workshop at the University of Iowa.
His notable works include Chotoder Chiriyakhana: The menagerie for kids (2005), Katiushar golpo: Tales untold (2006), Borshamongol : The monsoon epic (2006), Okalboisakhi: Storms unprecedent (2007), Likhte hole bhodrobhabe lekho: Write politely, if you have to (2002), Ses Chithi: Last Letter (1999), Bombay to Goa (2007), Coffer namti Irish : Irish Coffee (2008), Onubhob korechi tai bolchi : Revealing the feeling (1998).
Having worked as journalist, he is now on the editorial board of the magazine "Prathama". He lived at Garia and spend his childhood at Kamdohari, Narkelbagan.
Srijato is the grandchild of classical vocalist Sangeetacharya Tarapada Chakraborty and nephew of musician and the Khalifa of Kotali Gharana Pandit Manas Chakraborty; his mother is also a classical vocalist Gaan Saraswati Srila Bandopadhyay.
Other than poetry he has also penned the lyrics of many popular playbacks in several movies like Autograph (2010 film,)Jaani Dyakha Hawbe, c/o Sir (2013 film),Mishawr Rawhoshyo,Iti Mrinalinee, charulata, Abosheshe etc.
ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ একজন প্রতিভাধর অথবা একজন উন্মাদের নাম। প্রবল জীবনতৃষ্ণা নিয়ে যে আত্মহননে মেতে উঠতে পারে।তারকাখচিত নীল আকাশের নিচে হলুদ সূর্যমুখী বাগানে যার বাস ছিলো অথবা এখনো আছে কিংবা থাকবে। ভিনসেন্টের জীবনের সমান্তরালে শ্রীজাত বলে গেছেন আরো এক জনের কাহিনী। যে অবশেষে পৌঁছে যায় তারাভরা আকাশের নিচে তবে শুধু কি সে ই যাবে? আমরা কি যাবোনা নীল নীল বিস্ময়ের কাছে, অবশেষে!?
আমি খুব আশাবাদী মানুষ!জীবন ভালোবাসি,পৃথিবী ভালোবাসি,ভালোবাসি প্রকৃতিও!আত্মহত্যার বিষয়টা আমি কখনোই সহজভাবে নিতে পারিনি।আমার মনে হয় জীবন নিয়ে হা-হুতাশ করার মানে হয় না!কিন্তু হা-হুতাশ না করার জন্য যে মানসিক শক্তিটা থাকা প্রয়োজন সেটা সবার থাকে না!সবার দুঃখবোধ,সবার কষ্ট গুলো আলাদা,সবার পরিস্থিতি আলাদা।এই দুঃখবোধের কঠোর দরজা থেকেই অনেকে ফিরে আসতে পারে না বলেই হয়তো তারা ইল্যুশন বা হ্যালুসিনেশন মাঝামাঝি আটকে থাকে!যেমনটা ভিনসেন্ট আর ঋত্বিক থেকেছে। ভিনসেন্টের জন্যে কষ্ট হয়, আবার ঋত্বিকের জন্যেও।যেকোনো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি যেকোনো সময়ে ঘটতে পারে – সে ভ্যান গঘের মত চিত্রশিল্পীর হোক বা ঋত্বিকের মত কর্পোরেট কর্মী। এই বিষয়টা নিয়ে এত সুন্দরভাবে লেখার জন্যে শ্রীজাতকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ভিনসেন্ট ভ্যান গগ এর সাথে আলাপ-পরিচয় কীভাবে হয়েছিল আজ আর মনে করতে পারছি না। লাগে যেন সে আমার ছোটবেলার বন্ধু। স্বীকার করি আমি ছবি বুঝি না। যেটা দেখতে ভাল্লাগে সেটাই আমার প্রিয় ছবি। যার আঁকাআঁকির দিকে তাকিয়ে থাকতে আরাম লাগে, চোখে-মনে শান্তি লাগে সেই আমার প্রিয় আঁকিয়ে।
বইয়ের কথায় আসি.... লেখক দুই সময়ের দুটো কাহিনী এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন সমান্তরালভাবে। একটায় চলছে ভিনসেন্টের জীবন আরেকটায় চলছে কলকাতায় ঋত্বিক নামে এক ভদ্রলোকের জীবন। শ'খানেক বছরের ব্যবধানে বয়ে চলা সময়ের মাঝে একটা জাগায় মিল আছে 'স্টারি নাইট'।
ঋত্বিকের হ্যালোসিনেশন শুরু হয়। এইসব থেকে বের হতে ডাক্তার জানতে চান ঋত্বিকের অতীত। আস্তে আস্তে উঠে আসে তার ছেলেবেলা, তার ভাই, তার প্রেম....একটা সময় ভিনসেন্ট এসে তার দরজায় কড়া নারে। পরম বন্ধুর মতন জানিয়ে দেন, সব পরিস্থিতিরই একটা না একটা দরজা থাকে। সেটা ঠেলে বেরোলেই শান্তি। চারপাশের মধ্যেই নিশ্চয়ই তোমার দরজাটা লুকিয়ে আছে। সেটাকে খোঁজে বের করো, দরজাটা খোলো, তারপর শান্তি। হ্যা তিনি দরজা খোঁজে পেয়েছিলেন এবং আশা করছি শান্তিতেই আছেন।
বইটা পড়ার সময়ে এমনকি বই নিয়ে দুই কথা লেখার সময়েও মাথার ভেতরে গুনগুন করে সেই গানটা বেজে চলেছে....
'And how you suffered for your sanity And how you tried to set them free They would not listen, they did not know how Perhaps they'll listen now Starry, starry night....'
"যে বাস্তবের কথা লোকে বলে, তা আসলে কল্পনাবিরোধী। বাস্তব হল কল্পনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ এক ষড়যন্ত্র। তাকে বিশ্বাস কোরো না। যারা চোখের সামনেকার ঘটে চলাটাই শুধু দেখতে পায়, অন্য কিছু পায় না, তারাই যে সুস্থ, এটা কে বলল?"
যাত্রা শুরু হয়েছিলো গতকাল রাতে। যখন ঠিক উপন্যাসটার মধ্যেখানে, ঘরের আলো নিভে যায় ঘুমানোর হুকুম আসে। সারারাত মাথায় ঘুরতে থাকে ভ্যান গঘ, ঋত্বিক আর জানি না কেন সুশান্ত সিং রাজপুত। এখানে শুরুতেই একটা কথা থাকে, "খ্যাতি, সে যত বড় মাপেরই হোক না কেন, আদতে মাইল দিয়ে মাপা যায়। কারও খ্যাতি শহর থেকে দশমাইল অবধি গড়ায় তো কারও বিশ মাইল। তারপর সকলেই সাধারণ, সকলেই সমান। "
We must die to become true human beings...
অথবা এই অন্যরকম মানুষ গুলোকে আমরাই মেরে প্রমান করি তোমরা সত্যিই বিখ্যাত ছিলে।
Almost a great novel, until it's not. This very well written and poetic story is severely damaged by forced melodrama.There's so much to love! But the ending ruined the magic spell for me.
"শোনো, জীবন আসলে শেষমেশ গমখেত আর রোদ্দুরের গল্প। তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সব।রাত,খিদে,যন্ত্রণা,উন্মাদনা,পাগলামো,দারিদ্র্য,স্বাচ্ছল্য,ক্ষোভ,ব্যর্থতা,প্রেম,যৌনতা,চিৎকার,নৈঃশব্দ,আদর,ঘৃণা,সভ্যতা,বিষাদ,অসুখ,উৎসব....সব। লুকিয়ে আছে ওই গমখেত আর রোদ্দুরের মধ্যেই।"
শ্রীজাত'র ' তারাভরা আকাশের নীচে' পড়ে ফেলুন জলদি। অসম্ভব ভালো লেখা, একটা সম্পূর্ণ নতুন সৃষ্টি।
এই উপন্যাসের কেন্দ্র হচ্ছেন ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ আর তার আকর্ষক উত্তাল জীবন। এই শিল্পীর আঁকা এক বিখ্যাত শিল্পকর্মের নামের বাংলা অনুবাদ হচ্ছে উপন্যাসের শিরােণাম। উপন্যাসের শুরুতেই লেখক আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন ভ্যান গঘের সেই বিখ্যাত “ইয়েলাে হাউস”এ, আর সেখান থেকেই উপন্যাসের আখ্যান প্রবেশ করছে গঘের ব্যক্তিগত জীবনচর্চায়...
কিন্তু এই উপন্যাস শুধুই ভিনসেন্টের জীবনচর্যা নয়, তার সাথে লেখক মিশিয়ে দিয়েছেন ডিপ্রেসড এক ব্যর্থ চিত্রশিল্পী ঋত্বিকের মনােজগত । যে বর্তমান কোলকাতা শহরে এক কর্পোরেট অফিসে কর্মরত । কিন্তু তার অবদমিত শিল্পীসত্তাকে লুকিয়ে রেখে এই কর্পোরেট জগতে আসা আলােড়ন তৈরি করছে তার মনােজগতে, আর সে ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক মানসিক রুগীতে, যে বাস্তব আর তার কল্পনার জগতের সীমারেখা হারিয়ে ফেলে আস্তে আস্তে। এখান থেকে তাকে উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে আসে তার স্ত্রী শর্মিলা আর এক মনােবিদ রুখসার আহমেদ । এই মনোবিদের পরামর্শেই শর্মিলা ঋত্বিককে নিউইয়র্কের মিউজিয়ামে দেখাতে নিয়ে যায় তার স্বামীর স্বপ্নের চিত্রকর্ম “দি স্টারি নাইট”... যা দেখে ফিরে আসার পর ভ্যান গঘ দেখা করতে আসেন ঋত্বিকর সাথে, ঠিক যেন এক আলাদা সময়ে, আলাদা মাত্রায়, কিন্তু বর্তমান জগতে!!
শ্রীজাত তার অসাধারণ বর্ণনায় ভ্যান গঘের গল্প বলেছেন । যেন মনে হয় তিনি তার সাথে থেকেছেন আর নিজ চোখে দেখেছেন ভ্যান গঘের জীবনের সেই মাতাল দিনগুলিকে । তার কলমে পাই -
.....অ্যাসাইলামের এই জানালা আর তার বাইরের বাগানই এখন ভিনসেন্ট এর পৃথিবী কিন্তু এসবের বাইরেও কোন এক পৃথিবীর অস্তিত্ব টের পান তিনি, যখন আঁকা শুরু হয়।
সেদিনও আঁকছিলেন সাদামাটা একটি রাতের ছবি মাত্র, কিন্তু সে যে এমন আশ্চর্য চেহারা নেবে,তা তিনি মােটেও জানতেন না!! যখন আঁকতে থাকেন ভিনসেন্ট, নিজের হাতের ওপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ থাকে না তার নিজের মনের ওপরও না সম্পূর্ণ অন্য একজন ভিনসেন্ট, এসে যেন ছবি গুলাে এঁকে দিয়ে যায় ।
এর আগে বহুবার এই ছবিখানার খসড়া করেছেন তিনি তখন বেশ সাদামাটাই মনে হচ্ছিল তার। কিন্তু শেষমেশ ছবিখানা যখন আঁকতে শুরু করলেন, দেখতে পারছিলেন, চোখের সামনেই তার হাত ঘােরাতে শুরু করেছে আকাশটাকে! আকাশ থেমে নেই আর সে তার অগণিত নক্ষত্র, মেঘপুঞ্জ, ছায়াপথ আর গ্যালাক্সি দের নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বয়ে চলেছে নিরন্তর এক অজানার দিকে নক্ষত্ররা ঘুরছে,তাদের বিকিরণ ঘুরছে, ছায়াপথ গুলি ঘুরে ঘুরে বয়ে যাচ্ছে অতিদুরের দিকে ঘুরছে গােটা ব্রহ্মান্ড তো আর এই এসাইলাম এর জানলায় চোখ রেখে, উন্মাদ আঁকিয়ে ভিনসেন্ট, যাকে তিনি নিজেই চেনেন না অনেক সময়ে, ধরে রাখছে সেই অতিকায় ঘূর্ণন ।
ছবিটা শেষ করার পর, এক রাত ঘুমােননি তিনি। ঘুমােতে পারে নি, জেগে থেকেছেন। তখন তিনি একজন শ্রান্ত, সাধারণ মানুষই বটে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভেবেছেন, কয়েক খানা পাউন্ড এর বিনিময়েও কি কেউ কিনবে না এ ছবি? তাহলে এখানকার খরচ এর জন্য ফের হাত পাততে হতাে না থিও'র কাছে....
কি ট্র্যাজেডি!! ভ্যান গঘ তাঁর “দি স্টারি নাইট” পেইন্টিং এর বিক্রি মূল্য আশা করেছেন মাত্র কয়েক পাউন্ড। কিন্তু হায়!! তিনি যদি জানতেন ২০১৬ সালে নিলাম হাউজের মূল্যায়নে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের এই চিত্রকর্মটির মূল্যায়ন করা হয়েছে ছিয়াশি মিলিয়ন ডলার ।।
Vincent Don McLean Starry, starry night Paint your palette blue and gray Look out on a summer's day With eyes that know the darkness in my soul Shadows on the hills Sketch the trees and the daffodils Catch the breeze and the winter chills In colors on the snowy, linen land…… খুব বিখ্যাত একটি গান,ছোটবেলা থেকেই গানটা শুনতাম। কিন্তু কিংবদন্তী চিত্রাকর ভিনসেন্ট ভ্যান গঘকে এই গানের মাধ্যমে আগে অনুভব করতে পাইনি। তারাভরা আকাশের নীচে নভেলটা পড়ার পরে বুঝতে পারলাম একজন মানুষ বিখ্যাত হলেই সে যে তার খ্যাতি ভোগ করে যেতে পারে তা না। চিত্রাকর ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ বিখ্যাত হইয়েছিলেন তার মৃত্যুর পরে। অনেক দিন পরে একটা নভেল মনের উপর ছাপ ছেড়ে গেলো। “জীবনের মানে আসলে কি?” এই প্রশ্ন মনে গেতে উঠলো। উপন্যাসের শুরু ফ্রান্সে ১৮৮৮ সালে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এবং তার বন্ধু পল গগ্যাঁ এর স্বাক্ষাতের মাধ্যমে। উপন্যাসে আমরা আরো দেখতে পাই ২০১৭ সালের কলকাতায় শর্মিলা এবং ঋত্বিকের। বিজ্ঞাপন সংস্থায় বড় পদে কাজ করা ঋত্বিকের চরিত্রে আমরা দেখতে পাই নিজের শিল্পী সত্ত্বাকে ত্যাগ করে অন্য পেশাকে বেছে নেয়ার বেদনা। শর্মিলা এবং ঋত্বিকের আলোকিত বিবাহিত জীবনে আকস্মিক নেমে আসে স্ট্রিট লাইটের আলোর মত আবছায়া। ঋত্বিকের হেলোসিনেশন তাদের জীবনকে অন্য মোড়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে গল্পের আরেক সময়ে খেপাটে ভিনসেন্ট জীবনের উপর তুলির আচড়ঁ চালিয়েই যেতে থাকে,কিন্তু আলোর দেখা পায় না। ভিনসেন্ট এবং ঋত্বিকের সেতুবন্ধন ঘটে গল্পের শেষে। দুই সময়ের দুইজন মানুষের মাঝে অনেক দূরত্ব, কিন্তু নিমিষেই শেষ হয়ে যায় তা। ফ্রান্স, কলকাতা ঘুরে নিউইয়র্কে “দ্য স্টারি নাইট” ক্যানভাস তাদের কাছে আসার মাধ্যম হয়ে উঠে। আমাদের জীবনের অপ্রাপ্তিগুলোর প্রতিচ্ছাবি যেন ভিনসেন্ট এবং ঋত্বিকের জীবন কাহিনি। “ঋত্বিক খুব ধীর পায়ে,হাঁটতে লাগল তার দিকে।হাঁটতেই লাগল………কিন্তু এই তারা ভরা আকাশের নীচে,রাতের ঘূর্ণনকে পায়ে বেঁধে নিয়ে ঋত্বিক হেঁটের যেতে লাগল ভিনসেন্টের দিকে।“ (শ্রীজাত)
Now, I understand, what you tried to say to me How you suffered for your… আশা করি সবার ভালো লাগবে। বেশি বেশি বই পড়ুন।
এক সিটিং-এ শেষ করতে বাধ্য হলাম। এর প্রতিক্রিয়া লিখতে পারব না ডিটেলে। ভাষা হারিয়ে ফেলব।
ভ্যান গঘের জীবন নিয়ে খুব বিস্তারিত জানতাম না কিছু ঘটনা ছাড়া। অপূর্ব লেখনী। শেষ দৃশ্যে মাস্টারস্ট্রোক। অনেক পাঠকের হয়ত শেষে ঋত্বিকের পরিণতি খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু ওটাই তো ওর জন্য সুখের শেষ ছিল। এটা স্পয়লার নয়।
দু একটা জিনিস একটু কানে লাগল। যেমন প্যারিসে ছবি বেচে "পাউন্ড" পাওয়ার শব্দটা। ওটা "ফ্রাঁ" হত। যদিও অন্য এক জায়গায় দেখলাম ঠিক আছে।
লেখক "নাকি" শব্দটার প্রতি দুর্বল। প্রচুর বাক্যে ব্যবহার করেছেন।
কোনও এক চরিত্রের আনমনা হয়ে যাওয়ার দৃশ্য আঁকতে গিয়ে শ্রীজাত সমান্তরালে হয়ে যাওয়া অনেক দৃশ্য তুলে ধরেন। এই স্টাইলটা খুবই ভালো, কিন্তু একই উপন্যাসে চার পাঁচবার ব্যবহার করলেন। সেটা ঠিক মনে ধরল না।
ছবিকাকুর চরিত্রটা অসাধারণ। নিখুঁত এঁকেছেন। নিউ ইয়র্কে গিয়ে স্টারি নাইটের সামনে দাঁড়িয়ে যখন ঋত্বিকের ছবিকাকুর কথা মনে পড়ছে, চোখে জল চলে এল। অপূর্ব!
সব মিলিয়ে অনেকদিন পর একটা অসাধারণ উপন্যাস পড়লাম।
এই লাইনটা মনে গাঁথা রয়ে যাবে চিরকাল।
"খ্যাতি, সে যত বড় মাপেরই হোক না কেন, আদতে মাইল দিয়ে মাপা যায়। কারও খ্যাতি শহর থেকে দশ মাইল অবধি গড়ায়, তো কারও বিশ মাইল। তারপর সকলেই সাধারণ, সকলেই সমান।"
"ঝড়কে হয়ত কোনদিনই সমুদ্র বোঝেনি। কিন্তু ঝড় ছাড়া তার জলে ওরকম ঢেউ তোলা আর কেউ কি ছিল? ছিলনা।"
উপরিউক্ত এই লাইনটি হয়তো পুরো বইটার সারমর্ম বুঝিয়ে দেয়। একজন মানুষের জীবন, তাঁর কল্পনার জগত, সৃষ্টি, তাঁর শিল্পীসত্তা যদি তথাকথিত বাস্তব থেকে আলাদা করে সেখানে এই প্রশ্নের উত্তর গুলো দেবে কে? কে বুঝবে এমন করে?
'তারা ভরা আকাশের নীচে' বইটি চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবনকে কেন্দ্র করে, সাথে সমসাময়িক এক শিল্পীর, শিল্পী না হয়ে ওঠার সাথে বাস্তবতার পরিহাস, এবং তার মানসিক অসুস্থতার মেলবন্ধন ঘটায়।
বইটি বিস্তারিত ভাবে ভিন্সেন্ট ভ্যান গঘের সম্পর্কে নানা তথ্য সামনে এনে সমৃদ্ধ করে, সাথে রয়েছে তাঁর অন্যতম সৃষ্টি "দা স্টারি নাইট" এবং সেই ছবিকে কেন্দ্র করেই উঠে আসে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট। ঋত্বিকের জীবন ও ভিন্সেন্ট ভ্যান গঘের জীবন সমান্তরালভাবে ভিন্ন সময়ের অনুসরণে চলতে থাকে। পরিশেষে দুটো ভিন্ন সময় একি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। অসময়ের সঙ্গী হিসেবে ঋত্বিকের স্ত্রী শর্মিলা চরিত্রটিও বেশ ভালো। আর যে চরিত্রটির কথা না বললেই নয় সেটি হল ছবিকাকু। ঋত্বিকের সাথে ছবি কাকুর মিষ্টি সম্পর্ক, ঋত্বিকের মনের আক্ষেপ ছবি কাকুর চলে যাওয়াকে ঘিরে, কি যত্ন দিয়ে চরিত্রগুলোকে এঁকেছেন লেখক!
ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে ছবি কাকু অথবা ঋত্বিকের জীবনের শেষ পরিণতিটা অন্যরকম হলেও হতে পারতো। কারণ ঋত্বিক নিজের অজান্তেই ইচ্ছামৃত্যু কে বেছে নিয়েছে। আর্টিস্ট = ইচ্ছামৃত্যু এই জায়গাটা বারংবার উঠে এসেছে। হয়তো যোগসুত্র আনতে গিয়েই লেখক গল্পের অন্যতম চরিত্র দুটিকে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের মতনই পরিণতি দেন।
সবশেষে এটাই বলব, "Now, I understand what you tried to say to me, and how you suffered for your sanity. And how you tried to set them free. They would not listen, they did not know how. Perhaps they'll listen now' একজন শিল্পীর জীবনের উন্মাদনা এবং মনের আনাচে কানাচে কি কি চলতে থাকে সেই জায়গা বুঝতে, শিল্পী জীবিত থাকে কখন মৃত্যুর আগে না পরে? এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে 'তারা ভরা আকাশের নীচে' অনবদ্য। ✨
ভ্যান গগকে আরো খানিকটা জানার ইচ্ছে থেকে পড়া। সে ইচ্ছে পূরণ হলেও বইটা মনের তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। ভ্যান গগকে নিয়ে আর কোনো বইয়ের সাজেশন কারো কাছে থাকলে জানাবেন প্লিজ।
এই বই পড়ার অভিজ্ঞতাটা হলো একটা বয়ে চলা নদীর সামনে বসে থাকার মত...সেই নদী কখনো শান্ত, কখনো বা ঢেউয়ের ধাক্কায় অস্থির, দিকবিদিকশুন্য...
এই বইটা হাতে পাওয়ার পর থেকে যেখানেই সময় সুযোগ পেয়েছি খুলে পড়তে বসে গেছি। ক্লাসে বসে পড়েছি, বাসের মধ্যে পড়েছি। আমার কানে তখন যেন কোনো শব্দ প্রবেশ করতো না। বাসের ভীড়, টিচারের লেকচার সব ছাপিয়ে আমার চোখে খালি একটা পাগলাটে মানুষের ছবি ভেসে উঠতো। অনেকের মাঝে থেকেও নিজেকে অনেক দূরে কোথাও মনে হতো৷ আর আজ বাসে আসতে আসতেই বইটা পড়া শেষ করলাম। বইটা হয়তো শেষ হলো কিন্তু আমি এতটাই অভিভূত ছিলাম যে বাস কখন আমার নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়িয়ে চলে গেছে টেরও পাইনি।
তারপর যখন বাস থেকে নামলাম, কড়কড়ে রোদের এই দুপুরে আমার মনে হলো আমি একা নামিনি। দুই ভিন্ন সময়ের দুইজন মানুষের অস্থিরতা সঙ্গী হলো আমার। সাথে জীবন নিয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন।
আমি শিল্পী মানুষ নই। শিল্পী স্বত্ত্বাও নেই আমার। কিন্তু বরাবরই শুনে আসছি শিল্পীরা পাগলাটে হয়। তারা অতি কল্পনাপ্রবণ হন। আমাদের মত আমজনতার ছাপোষা জীবন ছাড়িয়ে তারা জীবনের আরও গভীর রহস্যে হারিয়ে যেতে চান। আর এই হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কেউ জয়ী হয়, কেউ বা পথ হারিয়ে আরও গোলকধাঁধায় ঢুকে যান। তখনই শুরু হয় বাস্তব আর কল্পনার সংঘর্ষ।
এই সংঘর্ষ বাইরে থেকে সাধারণ মানুষ বুঝে না। কিন্তু যে এই সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে যায় তার জন্য জীবন হয়ে উঠে নরকসম। তারপর... We must die to become true human beings... তাদের চালিত করে। ক্ষুদ্রতর জীবন ছাড়িয়ে তারা বৃহত্তর জীবনে প্রবেশ করেন। আমাদের চোখে যা মৃত্যু, শিল্পীর চোখে তাই জীবনকাল। তাই হয়তো যে মর্যাদা তার প্রাপ্য ছিলো যখন পৃথিবীর আলো হাওয়ায় তার ভাগ ছিলো, সেই প্রাপ্য তার মিলে যখন নক্ষত্র হয়ে তিনি এই নশ্বর জীবনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান।
আর তারও বহু যুগ পর, আবারও কোনো পাগলাটে মানুষ আসে পৃথিবীতে। সেও একইরকম সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। বাস্তবতা নাকি কল্পনা... স্বপ্ন নাকি ভ্রম... হিসেব মেলানো যায় না। তারপর সেই মানুষটাও যোগ দেয় true human being হওয়ার মিছিলে। এইতো যুগে যুগে হয়ে আসছে...
এতক্ষণ বইয়ের কী বিষয়বস্তু, লেখা কেমন সেসব না বলে অর্থহীন কিছু উপলব্ধি শেয়ার করলাম কেবল৷ যাইহোক, বইটা আসলে ভিনসেণ্ট ভ্যানগগের জীবন সম্পর্কিত। তবে উনার জীবনী নয়। উপন্যাসের ধাঁচে লেখা। এই বিখ্যাত চিত্রশিল্পীকে সবাই চিনেন। হয়তো তার জীবন সম্পর্কেও খানিকটা জানেন। আমিও কেবল ভাসাভাসাই জানতাম। এই বই পড়ে মনে হয়েছে আমি আসলে কিছুই জানি না উনাকে নিয়ে। কত কম জানি...কত কম জানি। আরও পড়তে হবে...আচ্ছা এক জীবনে কতই বা পড়া যায়?
"শোনো,জীবন আসলে শেষমেশ গমখেত আর রোদ্দুদের গল্প।তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সব।"
হলুদ বাড়িতে ছবি এঁকে নিঃসঙ্গ অথচ ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছেন ভিনসেন্ট।ছোট ভাই থিও তার একমাত্র পৃষ্ঠপোষক। নিজের সময়ে ছবি এঁকেও অবহেলিত ভিনসেন্ট – তার ছবির কোনো কদর কিংবা পসার নেই।তাইতো ক্লান্ত, বিপর্যস্ত ভিনসেন্টের মাঝেমাঝে পাগলামি প্রকট আকার ধারণ করতো।স্বপ্ন দেখেছিল অন্যদের মতো তারও ছবির প্রদর্শনী হবে। কিন্তু হলো কই? অবশেষে অসহ্য জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে নিল সে।
কলকাতার চাকুরিজীবী ঋত্বিক, মাঝেমধ্যে চোখের সামনে দেখতে পায় অলীক জগৎ।যে জগতে একসময় সেও থাকতে চেয়েছিল। কল্পনা ও বিভ্রম প্রকট আকার ধারণ করে,ফলে বাস্তবতা তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়।স্ত্রী শর্মিলা দ্বারস্থ হয় চিকিৎসকের।জানা যায় তার মনের বিচিত্র অলিগলির সন্ধান। মাঝেমাঝে অতীতের দুঃসহ স্মৃতি ট্রমার মতো ফিরে আসে তার বর্তমান সময়ে। এছাড়া ছোটবেলায় ছবি আঁকার প্রচন্ড শখ ছিল যা বিরুদ্ধ পরিবেশের কারণে চাপা পড়ে যায়। যার কারণে কল্পনার স্টারি নাইট হয়ে উঠে তার স্বস্তিদায়ক বাস্তব। চিকিৎসকের পরামর্শে শর্মিলা তাকে নিউইয়র্কে "দ্য স্টারি নাইট" দেখাতে নিয়ে যায়। এখানে ভিনসেন্টের সাথে অলীক সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হয় ঋত্বিকের। ভিনসেন্ট তাকে কল্পনা ও বাস্তবতার যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে বলে। ঋত্বিক বেছে নেয় তারাভরা আকাশের নিচের জগতকে।
সমান্তরালে দুটি ভিন্ন সময়ের ভিন্ন গল্প চলে বইটিতে। কিন্তু একটি জায়গায় ভিনসেন্ট ও ঋত্বিকের বেশ মিল – দুজনেরই বাস্তব জগতের সহজ পাওনাগুলো অপূর্ণ থেকে গেছে। কিন্তু মস্তিষ্ক এই না পাওয়া বিষয়গুলোকে নিয়েই তৈরি করেছে অলীক জগৎ।যে জগতের নাগাল পেতে দুজনেই দুটো ভিন্ন জগতে পাড়ি জমায়।
ভ্যান গঘের সাথে আমার পরিচয় বেশ পুরনো। তখনও ফ্যাশন হাউজগুলোর বদৌলতে তাঁর স্টারি নাইট এতো পরিচিতি পায়নি আমাদের দেশে। ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক থাকায় ভ্যান গঘ, মনে, দালি বা ক্লিমটের কাজগুলো টুকটাক চিনতাম। তবে সবার কাজের মধ্যে ভ্যান গঘের কাজগুলোর প্রতি আকর্ষণ কাজ করত অন্যরকম। মাঝখানে অনেকটা অবসেসড হয়ে গিয়েছিলাম তাঁর আঁকা ছবিগুলো নিয়ে। বই-পত্র, সিনেমা, ডকুমেন্টারি যা হাতের কাছে পেয়েছি পড়েছি, দেখেছি। নিজেও অনেকবার চেষ্টা করেছি তাঁর স্��ারি নাইটকে রং তুলিতে নিজের আঁকার খাতায় তুলতে। ভিনসেন্টের ছবিগুলো মধ্যে একটা মাদকতা আছে। তাঁর স্টারি নাইট কিংবা ক্যাফে টেরেস অ্যাট নাইট কিংবা হুইটফিল্ড উইথ ক্রো'জ সবই কেমন যেন স্বপ্নীল। অথচ এই যে এতো বিখ্যাত পেইন্টিং স্টারি নাইট, তা ভিনসেন্ট এঁকেছিলেন অ্যাসাইলামে বসে এবং আশা করেছিলেন যে এর বিনিময়ে হয়তো কিছু টাকা পাবেন! আর এখন এর কপি বিক্রি হয় চড়া দামে! ভাগ্যের পরিহাস আসলেই নির্মম। জীবদ্দশায় ব্যর্থতা গ্রাস করে নিয়েছিল তাঁকে।
ঠিক তাঁর মতই আরকেজন ব্যর্থ আঁকিয়ের গল্প আছে এখানে, কলকাতায় বাস করা ঋত্বিকের। টপ মার্কেটিং এজেন্সির বড়কর্তা হলেও মনের গহীনে সবসময়ই লুকিয়ে ছিল রং-তুলি-ক্যানভাসের প্রতি ভালোবাসা। জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে ওসব ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলো ঋত্বিক। কিন্তু সুপ্ত ভালোবাসা কি আর সবসময় চাপা পড়ে থাকে? কখনো না কখনো তো দরজায় কড়া নেড়ে প্রতীয়মান হয় সামনে। আর তখন তাকে এড়ানো দায় হয়ে যায়।
ভিনসেন্ট এবং ঋত্বিকের গল্প প্যরালালি চলেছে বইয়ে। উপভোগ্য ছিল বেশ। তেমন কোন এক্সপেক্টেশন নিয়ে বইটা কিনি নি। নাম আর প্রচ্ছদ দেখেই কেনা। তবে বইটা বেশ ভালো লেগেছে। যদিও বিষণ্ণতা মাখা, তবুও সুন্দর। লেখকের লেখা কাব্যিক সুন্দর।
ডক্টর হু সিরিজের একটা এপিসোডে ভিনসেন্টকে টাইম ট্রাভেলিং-এর মাধ্যমে আধুনিক যুগে নিয়ে আসা হয় এবং নিজের আঁকা ছবিগুলোর এতো কদর দেখে ভিনসেন্ট রীতিমতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এই বইটা পড়তে পড়তে সেই অংশটুকুর কথা মনে পড়েছে। সত্যিই যদি পাগল মানুষটা দেখে যেতে পারতেন যে তাঁর নামের মিউজিয়ামে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ঢল নামে! তাঁর খ্যাতি আর মাইলে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে গিয়েছে পৃথিবী জুড়ে! কেমন অনুভূতি হতো তাঁর? ভালো নিশ্চয়ই...
4.5 Stars "দ্য স্টারি নাইট। আমার চারপাশটাই 'দ্য স্টারি নাইট'-এর ছবিটার মতো হয়ে যায়। আমি হুবহু ওই চারপাশ, ওই গাছ, বাড়ি, রাতের আকাশটা দেখতে পাই। ইন ফ্যাক্ট, ছবিটার মধ্যে হেঁটে বেড়াই।" -লাইন ক'টা পড়তেই শরীরের মধ্যে দিয়ে শিহরণ-স্রোত বয়ে যায়। এমন করে কেউ ভাবতে পারে এবং ভাববার রসদ জোগাতে পারে- সেটাই এই বইটির প্রতি একটা অন্য রকম মুগ্ধতা নিয়ে আসে। 'বাস্তব হল কল্পনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ এক ষড়যন্ত্র।'- সত্যি কথা বলতে, আমরা কেউ কেউ সেই ষড়যন্ত্রের শিকার কিংবা আমরা বেশিরভাগই সেই ষড়যন্ত্র গড়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কল্পনাশক্তি যে বাতাসের থেকেও দ্রুতগামী- আসলে সেটা আমরা ভাবতে চাই না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বলেও মনে করি। দু'টো কাল, দু'টো জীবন- একটি জীবনের মালিক ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এবং অন্যজন সাধারণ আমাদের এই 'ঘরোয়া শহর' কলকাতায় বেড়ে ওঠা ঋত্বিক। আর 'তারাভরা আকাশের নীচে' কিংবা সামনে দাঁড়িয়ে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এবং কলম-বন্দি ঋত্বিকের মধ্যে অদ্ভুত অন্তমিল পান শ্রীজাত। তাই এই অনন্ত মিল থাকা দু'জনের জীবনই হয়তো মিলে যায় 'দ্য স্টারি নাইট'- এর সেই গভীর, ঘন নীল, ঘূর্ণিত আকাশটার মধ্যে অথবা কল্পনার কোনো এক সমান্তরাল জগতে।💙
ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ-এর নাম জানেন কি? জেনে থাকলে তো ভালোই, না জেনে থাকলেও ক্ষতি নেই বিশেষ.. এই উপন্যাস পড়ার আগে আমিও শুধু নামটাই শুনেছিলাম, জানতাম না বিশেষ কিছুই.. তাঁর বিশ্ববিখ্যাত আঁকা "দ্য স্টারি নাইট" এর কথা অনেকেই শুনেছেন.. আবার কেউ কেউ দেখেওছেন.. কিন্তু কতটুকু জেনেছেন তাঁর ব্যাপারে.. ভিনসেন্ট মানুষটা কেমন? কেন তাঁর আঁকার প্রতি এতো টান? কেমন ছিল তাঁর জীবন-যাপন? এই সব নিয়েই সৃষ্টি শ্রীজাতর এই দুর্দান্ত উপন্যাস.. তবে ভাবলে ভুল হবে যে, লেখক শ্রীজাত তাঁর এই উপন্যাসে শুধুমাত্র ভিনসেন্টের জীবনী লিখতে বসেছেন.. তা কিন্তু নয়, উনি ভিনসেন্টকে উপস্থিত করেছেন এক সাধারণ মানুষের মতো.. হাসি-কান্না,রাগ-দুঃখ,ভালোবাসা-মন্দবাসার মতো অনুভূতিগুলো আর পাঁচটা মানুষের মতো যার ভেতরেও বর্তমান.. অষ্টাদশ শতাব্দীর প্যারিসের ভিনসেন্ট আর বিংশ শতাব্দীর কলকাতার ঋত্বিক যে কিভাবে দেশ-কাল-সময়ের ব্যবধানকে পিছনে ফেলে একে ওপরের সাথে মিলে গেছে... সময়ের এই বিপুল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তাদের জীবনের প্রতিটা বাঁকে উপস্থিত দমচাপা কান্নাটা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে... সেটা না পড়লে বলা ভারী মুশকিল.. তারাভরা এক আকাশের ছবি ঘিরে দুটি ভিন্ন শতাব্দীর মানুষের এক হয়ে যাওয়ার গল্পই ধরা পড়েছে শ্রীজাতর কলমে..
গতকাল রাতে পড়া শেষ করলাম।যে আনন্দ নিয়ে পড়া শুরু করেছি ঠিক ততটুকুই নাহ তার চেয়েও বিশাল বেদনার চাঙর নিয়ে শেষ করলাম।মাঝে মাঝে কবিতাগুলো দারুন ছিল।আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে মানসিক সমস্যা শারীরিক সমস্যার চেয়ে অনেক ভয়াবহ। সুস্থ সবল একটা মানুষ তিলে তিলে শেষ হয়ে যায়।পরিবার গুরুত্বপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ খোলাখুলিভাবে কথা বলা।অনেক বেশীই।আর নতুন করে আবার বুঝলাম আধ্যাত্মিকতার গুরুত্ব কতখানি,স্রষ্টার বিশ্বাসটাই সবখানি।উনিই সব।হতাশার সময় এর চেয়ে বড় শক্তি আর কি হতে পারে?আরও তীব্রভাবে বুঝলাম,পৃথিবী ভিন্নতা মেনে নিতে পারে না।স্রষ্টা তার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টিকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দেয়।আবার সে কষ্ট সহ্য করার উপায়ও বাতলে দিয়েছেন।অনেক মানুষ খুজে পায় না,অনেক মানুষ ভুলভাবে খুজে,আর অনেকে হয় বিভ্রান্ত।সৃজনশীল মানুষ যুগে যুগে কষ্ট পেয়েছে ভবিষ্যতে ও পাবে।এই হচ্ছে ধারা।জীবনীশক্তির সবটুকু ঢেলে দেয়,সৃষ্টি করতে গিয়ে।তারপর নিজে ধ্বংস হয়।
এইমাত্র শেষ করলাম শ্রীজাতের লেখা "তারাভরা আকাশের নীচে"। আমার কেনো যেনো এভারেজ লাগলো,শুরুতে ভ্যান গগ অংশটুকু ভালো লাগলেও কলকাতার ঋত্বিকের কাহিনীটা ভালো লাগেনি। তারপর অবশ্য আস্তে আস্তে দুটি টাইমলাইনই ভালো লাগতে শুরু করে, উপন্যাসে পুরো ডুবে যাই। কিন্তু বইয়ের এক তৃতীয়াংশে এসে আবার খেই হারিয়ে ফেলি। তবেশেষ দিকে আবার ভালো লেগেছে। বইটা নিয়ে আমার এক্সপেক্টেশন অনেক বেশি ছিলো তাই হয়তো হতাশ হয়েছি অথবা বইটা পড়ার মত যোগ্য পাঠক এখনো হয়ে উঠিনি। বর্তমানের অন্যসব উপন্যাসের মত ভেবে শুরু করলে হয়তো আরো ভালো লাগতো। তবে লেখকের নামটা যেহেতু শ্রীজাত তাই নিজের প্রত্যাশাকেও দোষারোপ করতে পারছি না
পড়তে পড়তে খুব একটা আহামরি লাগছিল না। তেমন৷ টানছিলও না। কিন্তু যেহেতু ছোট উপন্যাস তাই আস্তে আস্তে পড়তে থাকলাম। একেবারে শেষে গিয়ে যখন বাস্তব আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল অংশটুকু বেশ ভালো লাগলো। ঋত্বিক এবং ভিনসেন্টের মধ্যে কার কথোপকথন গুলির জন্যই চার তারা। এছাড়া বেশ কিছু লাইন আছে যেগুলো দারুন যেমন-
"সত্যি বলতে কি ভিনসেন্ট, একদিন লোকে তোমার ছবি দেখবে কেবল, কেনার ক্ষমতা থাকবে না।"
"তেমন বলতে গেলে আমার জীবিতকাল তো আমার মৃত্যুর পরেই শুরু হল, তাই না?"
"বাস্তব হল কল্পনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তাকে বিশ্বাস করো না।" (সেরা)।