ইংরেজপূর্ব অবিভক্ত বাংলায় সামন্তপ্রথার মতো কড়াকড়ি রাজস্ব আদায় পদ্ধতি ছিল না। মোগল ও নবাবি আমলে জমির মালিক স্বয়ং সম্রাট। বংশানুক্রমে জমিদার হওয়ার পথ ছিল রুদ্ধ। তখন খাজনা দিয়ে কৃষক নিজের জমিতে চাষাবাদ করে খেতে পারতো ; মালিকানা নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ওঠেনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হাতে ক্ষমতার যাওয়ার পর সমস্ত ভূমিব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কেননা কম্পানির একমাত্র লক্ষ্য বাড়তি রাজস্ব আদায়। প্রজার বাঁচা-মরা নিয়ে ভাবনা ভেবে কম্পানি সময় নষ্ট করেনি।
মোগল ও নবাবি আমলে ভূমিতে কৃষকের হক থাকলেও কম্পানির যুগে তা রহিত হয়ে যায়। প্রধানত দুইটি কারণে বাংলায় বেশি রাজস্ব আদায় হতো। প্রথমত. চমৎকার সেচব্যবস্থা যা দীর্ঘসময়ের চেষ্টায় গড়ে উঠেছিল এবং দ্বিতীয়ত. জমিনে কৃষকের অধিকার। যত্ন না নিয়ে সেচব্যবস্থা ধ্বংস এবং জমিনে কৃষকের অধিকার কেড়ে নেওয়ায় দীর্ঘদিনের রীতিতে প্রভাব পড়ে।
১৭৭০ সাল তথা ১১৭৬ বঙ্গাব্দের আকালে প্রায় তিন কোটি মানুষ মারা যান। এই দুর্ভিক্ষের জন্য অনাবৃষ্টি ও বন্যা খানিকটা নিশ্চয়ই দায়ী। কিন্তু মূল দায় কম্পানির। ক্ষেতে ফসল হয়নি। খাজনা দেওয়ার সামর্থ্য রায়তের নেই। তবু মওকুফ করা হয়নি খাজনা, ছাড় দেওয়া হয়নি কৃষককে। উপরন্তু ইংরেজের লক্ষ্য তখন আরও বেশি রাজস্ব আদায়। দেশে তখন চালের ব্যাপক ঘাটতি ছিল না। বরং ইংরেজ বেনিয়াদের চাল কিনে মজুদ করে দাম বাড়ানোর কারণেই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। কম্পানির অনেকেই তখন এই খাদ্য মজুদের ব্যাবসা করে লাখপতি হয়েছিলেন। তৎকালীন এক ইংরেজ বেনিয়ার কথা বদরুদ্দীন উমর এভাবে উল্লেখ করেছেন,
'এই জঘন্যতম ব্যবসায় মুনাফা হইল এত শীঘ্র ও এরূপ বিপুল পরিমাণে যে, মুর্শিদাবাদের নবাব-দরবারে নিযুক্ত একজন কপর্দকশূন্য ভদ্রলোক এই ব্যবসা করিয়া দুর্ভিক্ষ শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ৬০ হাজার পাউন্ড (দেড় লক্ষাধিক টাকা) ইউরোপে পাঠাইয়াছিলেন। '
দুর্ভিক্ষে বাংলার তিনভাগের একভাগ মানুষ প্রাণ হারালেও কম্পানির আয়ে সেই প্রভাব পড়েনি। আকালের আগের বছর রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ কোটি ৫২ লাখ ৪ হাজার ৮শ ৫৬ টাকা। না খেতে পেয়ে তিন কোটি মানুষ মারা যাওয়ার পর কম্পানি রাজস্ব বেড়ে দাঁড়াল ১ কোটি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ৫শ ৭৬ টাকা। খাজনা আদায়ের জন্য কম্পানি কতটা জুলুম করেছিল তা টাকার অঙ্কেকেই প্রকাশ্য।
রাজস্ব আদায়ের জন্য এক বছর, পাঁচ বছর ও দশ বছরের তিনটি পরিকল্পনা ব্রিটিশরা গ্রহণ করেছিল। কোনোটিই কম্পানিকে খুশি রাখার মতো পয়সার জোগান দিতে পারেনি। তখন কর্নওয়ালিশ ভাবলেন রাজস্ব আদায়ের ভার কোনো তৃতীয় পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দিয়ে দিলেই হয়। তাতে কম্পানির কাজ কমে যাবে এবং মুফতে রাজস্ব পকেটে চলে আসবে। এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে কর্নওয়ালিশ বলেছেন,
'আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই (এ দেশের) ভূস্বামীগণকে আমাদের সহযোগী করিয়া লইতে হইবে। যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিন্ত মনে ও সুখে-শান্তিতে ভোগ করিতে পারে, তাহার মনে তাহার কোনরূপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগিতেই পারে না। '
কর্নওয়ালিশ শতভাগ সঠিক চিন্তা করেছিলেন। এই ভূস্বামীরা সবসময় ব্রিটিশদের অনুগত থেকেছে। শুধু ভূস্বামীদের মনোজগতে ইংরেজবিরোধী কোনো ধরনের বদল আনার কুবুদ্ধি আসেনি এ যেমন সত্য, তেমনি বঙ্কিমবাবুর মতো ইংরেজভক্তগণও 'আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি।' - এই ধারণা কায়মনোবাক্যে বিশ্বাস করেছেন। ইংরেজ বিতাড়নে সমাজের সর্বস্তরের জনগণ কম-বেশি সহায়তা করেছিল। একটি জমিদারশ্রেণি কখনো এগিয়ে আসেনি। এ নিয়ে বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো স্মৃতিচারণ,
'এ কাজে (সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিতে) সরকারী ছোট-বড় কর্মচারীদের মধ্যে, এমনকি পুলিসের কাছেও বরং সাড়া পাওয়া গিয়েছিলো, কিন্তু জমিদার শ্রেণীর মধ্যে সবচেয়ে কম সাড়া পেয়েছি।'
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পূর্বের জমিদার ও পরের জমিদারদের মধ্যকার ব্যবধান আসমান-জমিন। মোগল আর নবাবি আমলের দেশিয় রাজ-রাজরাদের নিজেদের এলাকাতেই বংশপরিচয় বসবাস ছিল। প্রজার সাথে কিছুটা নৈকট্যের সম্পর্ক তাদের রাখতে হতো। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফাঁদে অনেক বড়ো বড়ো জমিদার ও দেশিয় রাজা নিঃস্ব হয়ে যান। তাড়াতাড়ি তাদের জমিদারি কিনে নেয় কম্পানির খেদমত ও বেনিয়াগিরি করে টাকার মালিক হওয়া বাবুগণ। এই বাবুরা বেশির ভাগ নিজস্ব জমিদারিতে থাকতেন না। নব্য জমিদারদের কেন্দ্রভূমি ছিল কলকাতা। তাই রাতারাতি খাজনা আদায় ও জমিদারি তদারক করার জন্য একটি মধ্যস্বত্বভোগীশ্রেণি। বদরুদ্দীন উমর এই পরিস্থিতিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন,
'পুরাতন জমিদারদের পরিবর্তে যারা নতুন জমিদার হলো তারা অধিকাংশই ছিলো শহরবাসী বেনিয়ান, দালাল, ব্যবসায়ী প্রভৃতি। শহরে বসবাস করার ফলে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে নিয়মিতভাবে তারা রাজস্ব আদায় করতে পারতো না। এই খাজনা আদায়ের প্রয়োজনেই তারা সৃষ্টি করে আর এক নতুন মধ্যস্বত্বভোগী। এই নতুন মধ্যস্বত্বভোগীকে সরকারও আইনসঙ্গত বলে স্বীকার করে নিলো এবং তারা জমিদারের মোট প্রাপ্যের ওপর নিজেদের অতিরিক্ত প্রাপ্য কৃষকদের থেকে আদায় করতে গিয়ে তাদেরকে সর্বস্বান্ত করে ধ্বংসের পথে এগিয়ে দিলো।'
আগে কৃষকদের শুধু জমিদারকে খুশি রাখলেই চলতো। নয়াব্যবস্থায় জমিদারকে নির্দিষ্ট খাজনা ব্যতীত আরও বিচিত্র রকমের কর দিতে হতো। সেই করের বোঝাকে অসহনীয় করে তোলার ভূমিকা রাখতো জমিদারি তদারককারি নায়েব ও গোমস্তাশ্রেণি।
আশঙ্কাজনক হারে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। অনেকক্ষণ দেখা যেত যে জমিদার খাজনা আদায় করে, সেই আবার চড়া সুদে কৃষককে ধার দেয়। এই খাজনা ও সুদের দুষ্টচক্রে পতিত হয়ে কত কৃষক সর্বস্বান্ত হয়েছে সেই পরিসংখ্যান হয়তো কেউ রাখেনি।
পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগুরু কৃষক বাঙালি মুসলমান এবং জমিদার-জোতদার ধর্মে হিন্দু। মূলত মুসলমান কৃষকের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ জালিম জমিদারের বিরুদ্ধে। যেখানে ঘটনাক্রমে জমিদার ও মহাজন হিন্দু। এই জমিদার বনাম রায়তের দ্বন্দ্ব কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দ্বৈরথে রূপান্তরিত হয়। অর্থনৈতিক বিরোধ জোগান দেয় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের। লীগে জমিদার কম জোতদার ও কৃষকের সমর্থক বেশি। অপরদিকে কংগ্রেস যতই নিজেকে সর্বভারতের একমাত্র মুখপাত্র দাবি করুক না কেন তারা বাংলায় শোষকের পক্ষে। অবিভক্ত বাংলার বিধানসভায় জমিদারদের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো প্রস্তাবে সায় দেয়নি কংগ্রেস। উল্টো সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধিতা করেছে কৃষকের অধিকারের। বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন,
'জমিদার-জোতদার, মহাজনদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাধান্যের ফলে জোতদার, মহাজন-কৃষক, খাতক শ্রেণী বিরোধকে তারা হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিরোধ হিসেবে উপস্থিত করেছিলো এবং বাঙলাদেশে মুসলমান কৃষকরা মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র সংগঠিত হয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো পাঁচ লক্ষে। '
বর্ণহিন্দুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯২৮ সালে প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনের প্রশ্নে। বিধানসভার কংগ্রেসিরা আইনের বিপক্ষে অবস্থান নেন, এমনকি সেই দলে ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্ব।
তেভাগা, আধিয়াসহ অন্যান্য কৃষক আন্দোলন নিয়ে বদরুদ্দীন উমর চমৎকারভাবে লিখেছেন।
জমিদারি প্রশ্নে কংগ্রেস ও লীগের মতানৈক্য থাকলেও দেশভাগের পরে পরিষ��কার হয়ে যায় দল দুইটির চরিত্র একই। কংগ্রেস বাংলায় জমিদারি উচ্ছেদের বিপক্ষে ছিল, এদিকে নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন পূর্ববঙ্গ সরকার বিনা খেসারতে জমিদারির মতো শোষণমূলক ব্যবস্থাকে বিলোপে রাজি ছিল না। লীগের উদারপন্থি আবুল হাশিম-সোহরাওয়ার্দী জোট বিনা খেসারতে জমিদারি বিলোপের দাবি জানায়। কিন্তু তৎকালীন প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী ফজলুর রহমান গড়ে দশগুণ বেশি ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব করেন। সরকারের যুক্তি ছিল জমিদারদের ক্ষতিপূরণে ব্যয় হওয়া একশ কোটি টাকা প্রাক্তন জমিদারগণ পূর্ববঙ্গে শিল্পস্থাপনে ব্যয় করবে! লীগের এই অর্থমন্ত্রী ভুলে গিয়েছিলেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলার গরিব কৃষককে লুণ্ঠনকারী জমিদাররা যথেষ্ট টাকাকড়ি আয় করেছে এবং বেশির ভাগ বাঙালি হিন্দু জমিদার-জোতদার ইতোমধ্যে দেশভাগের কারণে ভারতে চলে গিয়েছিল। তাহলে ক্ষতিপূরণের সেই একশ কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হবে তা সহজেই অনুমেয়।
জমিদারিপ্রথা নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যপূর্ণ এমন লেখা নিঃসন্দেহে দুর্লভ। বদরুদ্দীন উমরের গদ্য গতিময় নয়। তাই একবসায় বইটি পড়া যাবে না। এটুকু অনুযোগ রইল।